• চ্যাম্পিয়নস লিগ
  • " />

     

    ট্যাকটিকসে হাতেখড়ি ১১ : নাগেলসম্যান, মিনি মরিনহোর মেগা বিপ্লব

    ট্যাকটিকসে হাতেখড়ি ১১ : নাগেলসম্যান, মিনি মরিনহোর মেগা বিপ্লব    

    "খারাপ খবর আছে জুলিয়ান।" 

    ডাক্তারের মেঘাচ্ছন্ন চেহারা দেখেই ব্যাপারটা আঁচ করা যাচ্ছিল যদিও তাও জুলিয়ানের বন্ধুদের সবার অন্তর থেকেই একসাথে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এল। আরও খারাপ সংবাদ? ছেলেটার বাবা মারা গেছেন কিছুদিন আগে। ক্লাবের সবচেয়ে প্রতিভাবান সেন্টার ব্যাক, কিন্তু ইনজুরির যন্ত্রণায় বেচারা খেলতেই পারল না প্রায় এক বছর, আবারো খারাপ খবর? 

    খারাপ খবরটা মারাত্মক ছিল। ১৯ বছর বয়সী জুলিয়ান নাগেলসম্যান জানতে পারলেন তাঁর পিঠের ইনজুরিটা সামান্য কোনো চোট নয়, তার আর জীবনে প্রফেশনাল ফুটবল খেলা হবে না। 

    "তাও ভাল ইনজুরিটা ভুঁড়িতে হয়নি, আমার ভবিষ্যতের ম্যানেজারি ক্যারিয়ারটাই বরবাদ হয়ে যেত। হাঁটু ছাড়া খেলা যায় বটে, ভুঁড়ি ছাড়া ম্যানেজার হওয়া যায়?" 

    এত দুঃখের মাঝেও জুলিয়ানের প্রতিক্রিয়া শুনে না হেসে পারল না তার বন্ধুরা। জুলিয়ান এমনই, যেকোনো সময়েই হাসিয়ে দিতে পারে সবাইকে। 

    ঐ মুহূর্তে ঠাট্টা করলেও ম্যানেজারি ক্যারিয়ারের ব্যাপারটা জুলিয়ান নাগেলসম্যানের জন্য ঠাট্টার বিষয় ছিল না। খেলতে না পারলেও খেলার সাথে থাকার অদম্য ইচ্ছেটা ওই বয়সেই তাঁর ছিল। তুখোড় ছাত্র নাগেলসম্যান দ্রুতই ফিজিকাল ফিটনেসের উপর গ্রাজুয়েশন শেষ করে কোচিং লাইসেন্সটা নিয়ে নেন। ২৩ বছর বয়সে নিজের পুরনো ক্লাব আউসবার্গে থমাস তুখলের অধীনে স্কাউট হিসেবে যোগ দেন। দুই বছর পরই হফেনহাইমের ইউথ ম্যানেজার হিসেবে নিয়োগ পান তিনি। আর ২৮ বছর বয়সে জুলিয়ান নাগেলসম্যান যখন তার প্রফেশনাল ম্যানেজারের দায়িত্ব নেন হফেনহাইমে তখন ক্লাবটার তথৈবচ অবস্থা। তিনি যোগ দেওয়ার আগের দুই দিনেই হফেনহাইম দুইজন ম্যানেজার বদলিয়েছে। বুন্দেসলিগায় তখন হফেনহাইম রেলিগেশন জোনে। ২০ ম্যাচ খেলে হফেনহাইমের সংগ্রহ মাত্র ১৪ পয়েন্ট, টেবিলের তলায় থাকা হ্যানোভারের সমান। হাতে ম্যাচ বাকি আছে আর কেবল ১৪টা। এমন সংকটময় অবস্থায় ২৮ বছর বয়সী একজনকে ম্যানেজার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া, যার কিনা এটাই প্রথম সিনিয়র দলের ম্যানেজারি চাকরি - গোটা ব্যাপারটাই একটু গোলমেলে। বেশ কয়েকটা জার্মান সংবাদপত্র নাগেলসম্যানের নিয়োগকে হফেনহাইম ডিরেক্টর আলেক্সান্ডার রজেনের স্টান্টবাজি হিসেবেও প্রমাণ করবার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিল। হফেনহাইমের স্পোর্টিং ডিরেক্টর আলেক্সান্ডার রজেনের বয়স মাত্র ৩৬, তাঁর আর নতুন ম্যানেজারের বয়স যোগ করলেও যে আর্সেনালের তখনকার ম্যানেজার ওয়েঙ্গারের বয়সের সমান হয় না -- এ নিয়েও কৌতুক করতে ছাড়েনি অনেকেই।

    তবে নাগেলসম্যান সবার মুখ বন্ধ করতে সময় বেশি নেন নি। বাকি ১৪ ম্যাচের ৭টিতেই জিতে রেলিগেশন জোনের উপরেই শেষ করে হফেনহাইম। এর পরের মৌসুমে হফেনহাইম শেষ করে লিগে চতুর্থ হয়ে। ক্লাবের ইতিহাসে প্রথমবারের মত চ্যাম্পিয়নস লিগ খেলার সুযোগ পাইয়ে দিয়ে ক্লাব ইতিহাসের অংশ হয়ে যান নাগেলসম্যান। ওটাই তাঁর ইতিহাস গড়ার শুরু কেবল। 

    একজন খেলোয়াড় হিসেবেও খেলার অবস্থা পড়ে ফেলার ক্ষমতাই বাকিদের থেকে জুলিয়ান নাগেলসম্যানকে আলাদা করে রেখেছিল। সেন্টার ব্যাক হলেও কোনো ট্যাকল না করেই বলের দখল ছিনিয়ে নেওয়ার একটা দারুণ ক্ষমতা ছিল তাঁর। খেলার গতি বুঝে ঠিক ঠিক জায়গায় নিজের পজিশনিং করাটা ছিল তাঁর সহজাত প্রবৃত্তি। ২৩ বছর বয়সে যখন আউসবার্গে থমস তুখলের অধীনে স্কাউট হিসেবে কাজ করতেন, তখন তুখল ভালভাবেই তাঁর এই প্রতিভাটা আঁচ করতে পেরেছেন। পরে ধরতে পেরেছে হফেনহাইমের ম্যানেজমেন্ট, এজন্যই মাত্র তিন বছরের মাথায় হফেনহাইমের অনূর্ধ্ব ১৬, এবং অনূর্ধ্ব ১৯ দলকে কোচিং করিয়েই তিনি মূল দলের দায়িত্ব পেয়ে যান। খেলার গতিপ্রকৃতি আগে থেকেই অনুধাবন করার অস্বাভাবিক ক্ষমতা দেখে হফেনহাইম ও জার্মানির সাবেক গোলকিপার টিম উইজ তাঁর নাম দিয়েছিলেন মিনি মরিনহো।

    খেলার গতিপ্রকৃতি হয়তো অনেক ম্যানেজারই বুঝতে পারেন, কিন্তু নাগেলসম্যানকে আলাদা করে রাখবে তাঁর ম্যাচের মাঝে খেলার ফলাফল বদলে দেয়ার মত পরিবর্তনগুলো। এইত্‌ গত মৌসুমেই ঘরের মাঠে বায়ার্নের হাতে নাস্তানাবুদ হচ্ছিল নাগেলসম্যানের লাইপজিগ। তিন মিনিটেই গোল দেগে দেন লেভানদফস্কি। খেলার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল গোল আরো ৪-৫টা হবে। প্রথমার্ধ কোনোমতে ১-০ তে রেখেই শেষ করল লাইপজিগ। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে টানেল থেকে বের হয়ে এল যেন পুরোপুরি নতুন এক দল। ৩-৫-২ তে খেলা শুরু করা লাইপজিগ দ্বিতীয়ার্ধ খেলল ৪-৩-২-১ ফর্মেশনে। এরপর বায়ার্নকেই নাকানিচুবানি খেতে হল। ম্যাচ শেষে বায়ার্ন কোনোমতে ১ পয়েন্ট নিয়ে বাড়ি ফিরে স্বস্তি পেয়েছিল সেটা বলাই বাহুল্য। তবে কী এমন করেছিলেন নাগেলসম্যান? এই তরুণ কোচ কীভাবে এমন একটা নতুন দলকে এমন একটা নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছেন এই ব্যাপারটার সামান্য খানাতল্লাশি না করলেই নয়। নাগেলসম্যানের ফুটবল কৌশল এবং দর্শনের মূলে আছে তাঁর কৌশলগত নমনীয়তা, পরিবর্তনশীলতা এবং প্রযুক্তির ব্যবহার। সেটা কেমন?

     

    ভি ভাসার যাইন

    এ দর্শনটা বেশ মজার এবং মূলতঃ এটাই নাগেলসম্যানের লাইপজিগের মূল দৃষ্টিভঙ্গি। "ভি ভাসার যাইন" এর অর্থ হল পানির মত হও। পানি যেমন যে পাত্রে রাখা হয় সে পাত্রের আকার ধারণ করে তেমনি নাগেলম্যানের দলও প্রতিপক্ষের রকমফের দেখে নিজেদের কৌশল পরিবর্তন করে। হফেনহাইমের ম্যানেজার থাকাকালীন যদিও তিনি নাগেলসম্যান থ্রি ম্যান ব্যাকলাইন খেলিয়েছেন, কিন্তু লাইপজিগে আসার পর থেকে তেমন কোনো ফিক্সড ফর্মেশান আসলে তাঁর নেই। জোর করে বলতে গেলে ৪-২-২-২ তাঁর সবচেয়ে ব্যবহৃত ফর্মেশান। তবে তিনি ৫-৩-২, ৩-৩-৩-১, ৩-২-৩-২ এবং ৩-৪-৩ ফর্মেশনেও লাইপজিগকে খেলিয়েছেন। প্রতিপক্ষ এবং খেলার স্কোরলাইনের ওপর নির্ভর করে নাগেলসম্যান ঠিক করেন তার দলের শেইপ কেমন হবে। প্রায়ই হাফ টাইমেই দলের ফর্মেশন বদলে যায়। 

    কেবল ফর্মেশন নিয়েই নাগেলসম্যান নমনীয় শুধু তাই নয়। অন্যান্য ম্যানেজাররা যেখানে একটা কোর স্কোয়াড গোটা মৌসুম ধরে খেলানোর চেষ্টা করেন সেখানে নাগেলসম্যান ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তার সব খেলোয়াড়দের খেলান, যখন যেমন দরকার হয়। এতে তাঁর স্কোয়াডের সবাই ম্যাচ ফিট আর ম্যাচ রেডি থাকে এবং ইঞ্জুরি বা সাসপেনশান জাতীয় সমস্যা খুব একটা ভোগায় না। ২০১৯/২০ বুন্দেসলিগা মৌসুমে তিনি ২৭ জন খেলোয়াড়কে মাঠে নামিয়েছেন, যাদের মাঝে ১৭ জন ১০টারও বেশি ম্যাচ খেলেছে। দলে কেবল দুইজন আউটফিল্ড খেলোয়াড়ের জায়গাটাই পোক্ত, চেলসিতে যোগ দেয়া স্ট্রাইকার টিমো ভের্নার এবং অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার মার্সেল সাবিৎজার। নাগেলসম্যানের দলে আরেকজন নিয়মিত মুখ ফ্রেঞ্চ মিডফিল্ডার ক্রিস্টোফার এনকুঙ্কু। 
     

    এনকুঙ্কুর ভার্টিকাল মুভমেন্ট

     

    ফর্মেশন আর খেলোয়াড়দের রোটেশনের সাথে সাথে খেলোয়াড়দের পজিশনিংয়েও 'ভি ভাসার ভাইন' নীতি মেনে চলে লাইপজিগে। প্রতি খেলাতে এবং খেলার মাঝেও যেহেতু পজিশনিং আর রোল পরিবর্তন হচ্ছে কাজেই নাগেলসম্যানের শিষ্যেরা সবাই একাধিক পজিশনে খেলার জন্য প্রস্তুত থাকে, এবং তিনি সবাইকে ওভাবেই খেলান। লাইপজিগের অস্ট্রিয়ান মিডফিল্ডার কনরাড লাইমার যেমন রাইট ব্যাক, ডিফেন্সিভ মিড, সেন্ট্রাল মিড সবজায়গাতেই ঘুরে ফিরে খেলেন ম্যাচের প্রয়োজনমত। লুকাস ক্লস্টারম্যান রাইট ব্যাক, রাইট উইং এবং সেন্টার ব্যাকে খেলে এখন সেন্টার ব্যাকে একটু থিতু। রেজিস্তা রোলে কনরাড লাইমার, কেভিন ক্যাম্পল এবং ড্যানি অলমো ঘুরেফিরে খেলেন, তবে এরা অ্যাটাকিং মিডেও খেলেছেন প্রায়ই। 

    ভি ভাসার ভাইনের সুবিধা নাগেলসম্যান পান গোল করার ক্ষেত্রে। লাইপজিগের গোল করার রাস্তা বেশ অনেকগুলো। বুন্দেসলিগার গত মৌসুমে লাইপজিগের থেকে বেশি গোল করেছে কেবল বায়ার্ন এবং ডর্টমুন্ড। এই গোলগুলোর ৫ ভাগের এক ভাগ এসেছে সেট পিস থেকে। সেট পিসে ইউরোপের সবচেয়ে বিপজ্জনক দলগুলোর একটি এখন লাইপজিগ। ওদিকে ন্যারো ফর্মেশন এবং ইনভার্টেড উইঙ্গারদের ভেতরে ঢোকার প্রবণতার কারণে লাইপজিগের সিংহভাগ গোলের সুযোগ তৈরী হয় সেন্টার স্পেস এবং জোন ১৪ থেকে। তবে উইং ব্যাকরা নিয়মিতই উইং ধরে এগিয়ে স্ট্রাইকারদের উদ্দেশ্যে মাটি ঘেঁষা ক্রস করেন। সাধারণত ছোট পাস এবং পজেশনভিত্তিক ফুটবল খেললেও কড়া প্রেস কাটানোর জন্য লং বলের ব্যবহার করতেও দ্বিধা করে না নাগেলসম্যানের দল। লং বল রিসিভ করবার জন্য পলসেন এবং ওয়ার্নার চমৎকার ভাবে সিদ্ধহস্ত।  

     


    ভার্টিকাল আক্রমণ, কেবল গতি আর মুভমেন্টের জোরে

    ডাবল পিভট

    ডাবল পিভট ফুটবলের ট্যাকটিকসের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে আছে বেশ অনেকদিন ধরেই। বুন্দেসলিগার বেশিরভাগ দলই ডাবল পিভট ব্যবহার করে থাকে। তবে নাগেলসম্যান এর মাঝেও এনেছেন নতুনত্ব। সাধারণত দলগুলো ডাবল পিভট ব্যবহার করে রক্ষণের সাথে আক্রমণভাগের যোগাযোগ করানোর জন্য। রক্ষণ থেকে বল আক্রমণে পাঠান ডাবল পিভটে থাকা একজন রেজিস্তা বা ডিপ লাইং প্লেমেকার। তবে নাগেলসম্যানের ডাবল পিভট ওভাবে কাজ করে না। বল দ্রুত রক্ষণ থেকে আক্রমণভাগে পাঠানোর জন্য নাগেলসম্যানের দলের পিভট দুজনের কেউই সাধারণত অংশগ্রহণ করে না। রক্ষণ থেকে বিল্ড আপের সময় সাধারণত ডিফেন্ডাররা মিডফিল্ডারদের বাইপাস করে সরাসরি ফরোয়ার্ডদের পাস দেন। উপেমাকানো এবং ক্লস্টারমানরা পাস বাড়ান উইঙ্গার এবং ফরোয়ার্ডদের দিকে। ফরোয়ার্ডদের একজন নিচে নেমে এসে বল উপরের দিকে নিয়ে যান বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই। আক্রমণভাগে বলের পজেশন ঘোরানোর মূল দায়িত্বটা থাকে নাগেলসম্যানের রেজিস্তাদের। রক্ষণে তাঁরা স্ক্রিনিং করেন এবং আক্রমণে ফরোয়ার্ডদের সাথে প্রেসিং করেন এবং আক্রমণের গতি প্রকৃতি নির্ধারণ করে দেন। এর মূল উদ্দেশ্য হল ফরোয়ার্ডদের কেউ যদি বলের দখল হারিয়েও ফেলেন সেক্ষেত্রে প্রতিপক্ষ বল নিয়ে এগোতে গেলে দেখবে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডাররা সবাই জায়গামতোই আছে। 

     

    পিভটদের আক্রমণ আর রক্ষণে সমান পারদর্শিতা

     

    পেন্ডেলেফেক্ট

    পেন্ডেলেফেক্ট বা পেন্ডুলাম ইফেক্ট নাগেলসম্যানের একটা প্রেসিং কৌশল। ব্যাপারটা বেশ সহজ, যখন প্রতিপক্ষের কেউ মাঠের ডান উইং এ বলের দখল পাবে তখন রাইট উইং ব্যাক, ডানের ফরোয়ার্ড ও সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার তাকে ছেঁকে ধরে প্রেস করবে বলের দখল ফিরে পাবার জন্য। ওদিকে একজন মিডফিল্ডার পেছনে নেমে এসে ব্যাক ফোর তৈরী করে রক্ষণের শেইপ ঠিক রাখবে। এই কৌশলের মূল লক্ষ্য হচ্ছে প্রতিপক্ষ দলের ভার্টিকাল পাসিংয়ের পথ রোধ করা। পেন্ডেলেফেক্টের মুখোমুখি হলে প্রতিপক্ষ বাধ্য হবে উইং চেঞ্জ করতে বা সামনের দিকে লম্বা বল বাড়াতে। উইং পরিবর্তন করলেও প্রেসটা পেন্ডুলামের মত সরে গিয়ে আবার অন্য উইংয়ে প্রেস করবে। আর কোনভাবে প্রতিপক্ষ প্রেস কাটিয়ে বের হয়ে গেলে দেখবে যে লাইপজিগের রক্ষণের শেইপ ঠিকঠাকই আছে।

      

    ডান উইংয়ে পেন্ডেলেফেক্টের প্রেস

     

    প্রেন্ডেলেফেক্ট প্রেসিং

     

    ফুটবলনট পাসিং

    নাগেলসম্যানের দল সবসময় ওয়ান টু পাসিং এবং ওয়ান টাচ পাসিংয়ে বিশ্বাসী। বল একজন খেলোয়াড়ের কাছে ধরে না রেখে সেটাকে গতিময় রাখাটাই মূল উদ্দেশ্য। এই কৌশল রপ্ত করানোর জন্য নাগেলম্যান দুই ধরনের পন্থা অবলম্বন করেন। এর প্রথমটা হল ভিডিও ওয়াল। ট্রেনিং এর সময় দুই গোলের পেছনে এবং মাঝমাঠের মাথার উপর ড্রোন ক্যামেরা সেটআপ করা থাকে যার নিয়ন্ত্রণ করেন নাগেলসম্যানের কোচিং স্টাফরা। ভিডিওর লাইভ ফিড মাঠের পাশেই সেট করা একটা বিশাল ভিডিও ওয়ালে দেখা যায়। এতে করে কোচ চাক্ষুষভাবে খেলোয়াড়দের দেখিয়ে দিতে পারেন কে কী ভুল করছে, কার কোন জায়গায় থাকা উচিত ছিল। নাগেলসম্যানের দ্বিতীয় কৌশলটা হল ফুটবলনট পাসিং। ব্যাপারটার প্রথম প্রচলন করেন থমাস তুখল, ডর্টমুন্ডের ট্রেনিংয়ে। ফুটবনট বেসিকালি একটা বর্গাকার আবদ্ধ জায়গা। একজন খেলোয়াড় এর মাঝে দাঁড়াবেন। মেশিন থেকে বিভিন্ন দিক থেকে তার দিকে বল আসবে, এবং দেয়ালের বিভিন্ন জায়গায় লাইট জ্বলবে। খেলোয়াড়কে বল কন্ট্রোল করে ঠিক জায়গায় বল ফেরত পাঠাতে হবে। এই ট্রেনিং মেথডের কারণে নাগেলসম্যানের দলের খেলোয়াড়দের ওয়ান টাচ পাসিং দক্ষতা ঈর্ষণীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। 

     

    ফুটবনট ট্রেনিং

    প্রেস-কাউন্টার প্রেস 

    পেন্ডুলাম ইফেক্ট নাগেলসম্যানের মূল প্রেসিং কৌশল। লাইপজিগের মূল লক্ষ্য থাকে পেন্ডুলাম ইফেক্টের মাধ্যমে প্রতিপক্ষেকে উইং এর দিকে ঠেসে ধরা। উইং ব্যাক, স্ট্রাইকার, সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার আর একজন পিভট মিলে ডায়মন্ড শেপে প্রেস করে ওয়াইড এরিয়াতে। মূল লক্ষ্য থাকে বলের দখল নেওয়া বা প্রতিপক্ষকে ভার্টিকালি এগোতে না দেওয়া। প্রেসের মাধ্যমে যদি প্রতিপক্ষের থার্ডেই বলের দখল পাওয়া যায় তবে সাবিৎজার এবং এনকুংকুর মত প্রতিভাবান এবং গতিময় ফরোয়ার্ডরা চোখের পলকে আক্রমণে এগিয়ে যান। বিপক্ষ দলে যদি একজন প্রতিভাবান রেজিস্তা বা ডিপ লাইং প্লেমেকার থাকে সেক্ষেত্রে নাগেলসম্যান মাঝমাঠে ৩-৫-২ তে খেলে মাঝমাঠে প্রাধান্য বিস্তার করেন এবং প্রতিপক্ষ যাতে সেন্টার স্পেস দিয়ে বল পাস দিতে না পারে সেই ব্যবস্থা করেন। অতি দ্রুত কাউন্টার প্রেসিং এবং কাউন্টার অ্যাটাকের জন্যই লাইপজিগ কেবল আক্রমণেই নয়, রক্ষণের সময়ও ভয়ানক বিপজ্জনক প্রতিপক্ষ। তবে ডর্টমুন্ড, বায়ার্নের মত নাগেলসম্যানের দল নিরন্তর প্রেস করে যায় না। প্রেসিংয়ের মূল নেতৃত্ব দেন সচরাচর কনরাড লাইমার। ডাবল পিভট বা সিঙ্গেল পিভট - নাগেলসম্যান যে কৌশলেই খেলান না কেন, লাইমার সাধারণত রেজিস্তার ভূমিকা পালন করে থাকেন। প্রতিপক্ষের প্রেস হজম করা এবং পেন্ডেলেফেক্ট দিয়ে প্রতিপক্ষকে প্রেস করা, দুটো কাজেই মূল ভূমিকায় থাকেন এই অস্ট্রিয়ান তরুণ। 

     

    আক্রমণে কাউন্টার প্রেস

     

    রক্ষণে ডায়মন্ড প্রেস

     

    মিনি মরিনহো ডাকা হলেও জুলিয়ান নাগেলসম্যান নিজে পেপ গার্দিওলার ভক্ত এবং ঐ ঘরানার কোচ। জার্মানিতে যেখানে প্রায় সব দলই প্রেসিং ফুটবল খেলে সেখানে নাগেলসম্যান পজিশনাল এবং পজেশান ভিত্তিক ফুটবলকে ফিরিয়ে এনেছেন। গার্দিওলার সিটি এবং তুখলের ডর্টমুন্ড নাগেলসম্যানের মূল অনুপ্রেরণা। লাইপজিগের খেলোয়াড়রা তাকে ভীষণ পছন্দ করে, কারণ ম্যানেজার হলেও তিনি প্রায় তাদের সমবয়সী। আড্ডা মাতিয়ে রাখতে তাঁর জুটি মেলা ভার। তাঁর খোলামেলা কথাবার্তা, চমৎকার হিউমার সেন্সের কারণে যেখানেই গিয়েছেন সেখানেই সবার প্রিয়ভাজন হয়েছেম। তাঁর আইডল পেপ গার্দিওলা তাঁর দক্ষতার ওপর আস্থা রেখেই সিটি থেকে অ্যাঞ্জেলিনোকে ধারে খেলতে পাঠিয়েছেন লাইপজিগে।  বায়ার্নের ফরোয়ার্ড সার্জ গ্যানাব্রিও অকপটে বলেছেন, খেলোয়াড়দের সহজে একটা ট্যাকটিকস বোঝানোর ব্যাপারে নাগেলসম্যান অদ্বিতীয়। আজ আমি যেভাবে খেলি তার বেশিরভাগই তার অবদান। খেলোয়াড়দের বন্ধু জুলিয়ান নাগেলসম্যান এর মাঝেই সবার হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। বুন্দেসলিগায় বায়ার্ন আর ডর্টমুন্ডের দ্বিচ্ছত্র আধিপত্যতে লাইপজিগ স্থান করে নিতে পারবেন কিনা সেটা ভবিষ্যতই বলে দেবে। মিনি মরিনহোর মেগা বিপ্লবের এইতো সবে শুরু! 

     

    ট্যাকটিকসে হাতেখড়ির পূর্বের পর্বগুলোঃ

    ট্যাকটিকসে হাতেখড়ি ১০: বিয়েলসিস্তা, এল লোকোর লৌকিকতায়

    ট্যাকটিকসে হাতেখড়ি ৯: ফলস ১০ এর ফাঁকিবাজিতে উইঙ্গারের প্রস্থান

    ট্যাকটিকসে হাতেখড়ি ৮: গেম অফ জোনসের প্রথম পাঠ - হুয়েগো দে পসিসিওন

    ট্যাকটিকসে হাতেখড়ি-৭: ক্লাসিক ১০ এর মৃত্যু

    ট্যাকটিকসে হাতেখড়ি-৬: 'জোন ১৪' এর অতল গহ্বরে

    ট্যাকটিকসে হাতেখড়ি-৫: লেস্টার জলসায়

    ট্যাকটিকসে হাতেখড়ি-৪: একজন শূন্যসন্ধানী বা 'রমডয়টারের' গল্প

    ট্যাকটিকসে হাতেখড়ি-৩: রেজিস্তাদের রাজত্বে

    ট্যাকটিকসে হাতেখড়ি-২: গেগেনপ্রেসিং

    ট্যাকটিকসে হাতেখড়ি-১: কাতেনাচ্চিওর "কূটকৌশল"

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন