• অন্যান্য খবর
  • " />

     

    ঈশ্বর ও মানুষ

    ঈশ্বর ও মানুষ    

    ডিয়েগো ম্যারাডোনার মৃত্যুর পর তাঁর সতীর্থ এবং শিষ্য আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের সাবেক ফরোয়ার্ড মার্টিন পালের্মো প্লেয়ার্স ট্রিবিউনে একটি শোকগাঁথা লিখেছিলেন। সেটিরই চুম্বক অংশের অনুবাদ এখানে।  

    ডিয়েগোর গলা আমি শেষ শুনেছি গত বছরের শুরুর দিকে। তখন আমি মেক্সিকোর ক্লাব পাচুকার দায়িত্ব ছেড়ে কেবল আর্জেন্টিনায় ফিরেছি। ফোনটা বেজে ওঠার পর স্ক্রিনে নামটা দেখে বেশ অবাকই হয়েছিলাম। আমার ধারণা ছিল ডিয়েগোর কাছে আমার খোঁজখবর নেওয়ার মত সময় নেই।
     
    আমি জানি ডিয়েগোর মনটা অনেক বড়, তিনি সবাইকেই ভালবাসেন। কিন্তু ডিয়েগো ম্যারাডোনা হওয়াটাই যে একটা ফুলটাইম চাকরি। ২৪ ঘন্টাই সাংবাদিক আর পাগল ভক্তকুল আপনার পিছে পিছে দৌড়াচ্ছে। তার উপর ডিয়েগো তখন আর্জেন্টিনার টপ ডিভিশনের ক্লাব জিমনাসিয়ার দায়িত্বে। ডিয়েগোর হাতে তো আমাকে ফোন দেওয়ার মত সময় থাকার কথা নয়। 

    আমার ধারণা ভুল করে দিয়ে ডিয়েগো সময় বের করে আমাকে কল দিয়েছেন। আমাদের সম্পর্কটা দীর্ঘদিনের, বেশ গভীর সম্পর্ক। প্রায় এক দশক ডিয়েগোর সাথে আমার কোনো কাজ করা হয়নি। তবে ফোন ধরেই আরো একবার আমি বুঝলাম, ডিয়েগোর সাথে আমার সম্পর্কটা কাজের নয়, ব্যাপারটা একান্তই ব্যক্তিগত। সবার সাথেই ডিয়েগোর সম্পর্কটা ব্যক্তিগত।
     
    তিনি বললেন, “এই মার্টিন, কী খবর তোমার? বাসার সবাই কেমন আছে? আমার বাসায় ডিনার করতে কবে আসবে?”


    ডিয়েগো এমনই। তিনি জানেন তাঁর আশেপাশের মানুষের কাছে তাঁর উপস্থিতিটা কতটা মূল্য রাখে। তিনি এই একটা ফোনকলের মাধ্যমেই আমাকে জানিয়ে রাখলেন যে, যে কোনো দরকারে তিনি আমার পাশেই আছেন। শত ব্যস্ততার মাঝেও নিজের প্রিয়জনদের খোঁজ নিতে ডিয়েগোর ভুল হয় না। এভাবেই হুটহাট করে আপনাকে অবাক করে দিয়ে ডিয়েগো আপনার পাশে এসে হাজির হবেন। 
    ডিয়েগো যে শুধু আমার সাথেই এমন তা নয় কিন্তু। সকল কাছের মানুষের জন্যই তাঁর এতটা মায়া। তাঁর হৃদয়ের উষ্ণতার স্পর্শ যারা অনুভব করেছে তারা সবাই আপনাকে একই কথাই বলবে, ভাষায় প্রকাশ করার মতন না ব্যাপারটা।
     
    এসব কারণেই ডিয়েগো যে নেই এই ব্যাপারটা এখনো আমি মেনে নিতে পারি নি। খবরটা শোনার সাথে সাথেই আমি এক পরিচিত সাংবাদিককে টেক্সট করলাম, ডিয়েগো নেই? ঠিক শুনেছ, ছোট করে তার জবাব এল। বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, কীভাবেই বা করব বলুন? এরকম কতবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে ডিয়েগো আমাদের অবাক করে দিয়েছেন। এটা সম্ভবই না, হয়তো এখনি আবার খবর আসবে ডিয়েগো আবার রিকভার করেছেন, আবার স্বাস্থ্য ফিরে পেয়েছেন।

    না, সেই খবর এবার আর এল না। 

    আমি তবুও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আমি ডিয়েগোর স্ত্রী, মেয়েদের টেক্সট করলাম। তারাও জানাল, ডিয়েগো নেই। আমার মন তবুও মানতে পারছিল না। ডিয়েগোর তো ১০০ বছর বেঁচে থাকার কথা, তিনি নেই মানে?

    আমি জানি শুধু আমি একা নই, অসংখ্য আর্জেন্টাইনেরই ম্যারাডোনাকে ছাড়া পৃথিবী মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। আমি যখন ছোট তখন থেকেই ডিয়েগো মানেই আমার কাছে ফুটবল। ব্যাপারটা আসলে কেমন? একটু ব্যাখ্যা করি।  মেক্সিকোর '৮৬ বিশ্বকাপের সময় আমার বয়স ১২, টুকটাক ফুটবল খেলি। আমার বাবারও ফুটবলের প্রতি তেমন আগ্রহ ছিল না। ঐ সময়ে পুরো পরিবারের সাথে আমরা টিভিতে '৮৬ বিশ্বকাপ এবং ডিয়েগো ম্যারাডোনাকে দেখি। তখনই আমি প্রথম একটু করে অনুভব করতে পারি ফুটবল ব্যাপারটা আসলে কেমন। ফুটবলের আবেগ, প্যাশন, প্রাপ্তি, গৌরব সব কিছুর ঝাঁপি একসাথে আমার সামনে মেলে ধরেন নীল সাদা জার্সির ডিয়েগো ম্যারাডোনা এবং তাঁর ফুটবল।
     
    ফুটবল মানে যে কেবল আনন্দ আর গৌরব নয়, ফুটবল মানে যে বেদনা এবং তিক্ততা সেটাও আমি ধীরে ধীরে বুঝতে শিখি। ফুটবলের বেদনার দিকটাও আমাকে দেখান এই ডিয়েগোই, ৯৪ বিশ্বকাপে। আমার বয়স তখন ২০, দুই বছর আগে আমি পেশাদার ফুটবল খেলা শুরু করেছি মাত্র। আমি দেখি ডিয়েগোকে ছুঁড়ে ফেলা হল বিশ্বকাপ থেকে, আর্জেন্টিনা দল থেকে। ডিয়েগোর বেদনা দেখি আমি, তাঁকে কাঁদতে দেখে আমিও কাঁদি। ডিয়েগোকে সামনাসামনি না দেখেই তাঁর সাথে একটা আত্মার বাঁধনে জড়িয়ে যাই তখনই। আমি বুঝতে পারি ডিয়েগো ঈশ্বর, আবার একই সাথে তিনি আমাদের মতো রক্তমাংশের মানুষও।
     
    ডিয়েগোর পাশে দাঁড়াতে পারব এমনটা স্বপ্নেও ভাবি নি কখনো। আমার না দেখা স্বপ্নটা পূরণ হয় ১৯৯৬ সালে, তখন আমি এস্তুদিয়ান্তেসের হয়ে খেলছিলাম। বোকা জুনিয়র্সের বিপক্ষে আমাদের খেলা ছিল, ডিয়েগো ছিলেন বোকার অধিনায়ক, আমি ছিলাম এস্তুদিয়ান্তেসের। খেলা শুরুর আগে সেন্টার সার্কেলে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আমার পা কাঁপছিল, আমি ফিসফিসিয়ে বললাম, ম্যাচ শেষে আপনার জার্সিটা কি আমাকে দেওয়া যাবে ডিয়েগো? ঐ ম্যাচে আমরা জিতলাম, আমি একাই দুই গোল করেছিলাম। ম্যাচ শেষে কিটম্যানের হাত দিয়ে ডিয়েগো তাঁর জার্সিটা পাঠিয়ে দিলেন আমার কাছে। 
    এর কয়েক মাসের মাঝেই ডিয়েগো বোকার প্রেসিডেন্ট মাউরিসিও মাক্রিকে অনুরোধ করলেন যেন এস্তুদিয়ান্তেস থেকে আমাকে বোকাতে সাইন করানো হয়। ১৯৯৭ সালে আমি বোকায় যোগ দিলাম। বোকার দল ছিল অসাধারণ সব ফুটবলারের মিলনমেলা- ডিয়েগো ম্যারাডোনা, ক্লদিও কানিজিয়া, ডিয়েগো লাতোরে, নাভারো মন্টোয়া, নেস্টর ফাব্রি… আরো অনেকেই। তবে বোকার তখন খারাপ সময় যাচ্ছিল, লম্বা ট্রফি খরা। ভক্তদের অখুশি হওয়ার যথেষ্ট কারণ ছিল, কেবল ডিয়েগো ছিলেন বলেই সবাই তখনো খুশি। সব ঠিকঠাক।
     
    আমি সবসময়ই আমার ভাগ্যকে ধন্যবাদ দেই যে আমি ডিয়েগোর সাথে খেলার সুযোগ পেয়েছি। হোক না সেটা তাঁর ক্যারিয়ারের অন্তিমকালে। হ্যাঁ, আমি জানি আমি আশির দশকের ম্যারাডোনাকে পাই নি, আর্জেন্টিনার ম্যারাডোনা বা নাপোলির ম্যারাডোনার সাথে মাঠে নামি নি। কিন্তু ঐ বয়সেও তিনি যা করতেন, অনুশীলনে আমরা বাকিরা বিস্ময়ে হা করে তাকিয়ে থাকতাম। তিনি হয়তো আনমনেই বল নিয়ে খেলছেন, বা ইচ্ছে হল একটা ফ্রি কিকে বল টপ কর্নারে ঢুকিয়ে দিলেন। বল নিয়ে তিনি যা ইচ্ছে করতে পারতেন, আমি মোটেও বাড়িয়ে বলছি না। 

    ডিয়েগোর ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ ছিল সুপারক্লাসিকো। রিভারপ্লেটের বিপক্ষে যখন আমরা মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামের মাঠে নামছিলাম তখনি আমি ডিয়েগোর উত্তেজনা টের পাচ্ছিলাম। দূর্ভাগ্যজনকভাবে হাফটাইমের আগেই ইনজুরির কারণে তাঁকে মাঠ ছাড়তে হয়। ঐ ম্যাচে আমার গোলেই বোকা সুপারক্লাসিকো জিতেছিল। ম্যাচ শেষে তাই দ্বিগুণ উদযাপন হল, সুপারক্লাসিকো জেতার এবং ডিয়েগোর বিদায়ের। সারারাত আমরা জেগে ছিলাম, গান গেয়েছি, নেচেছি। ডিয়েগোর সাথে অমন একটা সময় কাটানো- এটা কেবল ভাগ্যে থাকলেই সম্ভব। 

    ডিয়েগোর সাথে আমি মাঠে খেলেছি কেবল কয়েকটা মাস। ডিয়েগো জানতেন তাঁর অবসর নেওয়ার সময় হয়েছে। তবুও তিনি শেষ পর্যন্ত যুঝে গিয়েছেন। ফুটবলের জন্য তিনি নিজের সবটাই দিয়ে গিয়েছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত তাঁর শরীরে কুলিয়েছে। ম্যারাডোনা একা ছিলেন একজন শিল্পী আর সতীর্থ হিসেবে তিনি ছিলেন একজন গ্ল্যাডিয়েটর। শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্তই লড়ে গিয়েছেন।
     
    ডিয়েগোর অবসরের পর তাঁর সাথে আমার সম্পর্ক আরো গভীর হয়। আমি বোকাতেই ছিলাম আর তিনি ক্লাব ডিরেক্টর হিসেবে বোকাতে যোগ দেন। আমাদের নৈকট্য বাড়ে। আমার বিয়ের সময় তিনি আমার পাশে ছিলেন। আমার প্রথম সন্তানের জন্মের সময়ও।
     
    ম্যারাডোনার সাথে আবারো আমার কাজ করার সুযোগ হবে সেটা আমি কখনোই ভাবি নি। ১৯৯৯ সালের পর আমি আর্জেন্টিনা দলে ডাক পাইনি। তার ওপর ২০০৮ সালে আমি এক ভয়াবহ ক্রুশিয়েট লিগামেন্টের ইনজুরিতে পড়লাম, ক্যারিয়ার শেষ করে দেওয়ার মত ইনজুরি। তখন আমার বয়স ৩৪। 

    ভাগ্যের এক চরম জাদুমন্ত্রবলে ২০০৯ সালের গোড়াতেই আমি কীভাবে যেন ফিট হয়ে গেলাম আর ডিয়েগোও পেলেন জাতীয় দলের দায়িত্ব। ডিয়েগো তখন আর্জেন্টিনায় যেসব ফুটবলাররা খেলছে তাদের উপর গুরুত্ব দিচ্ছিলেন। প্রায় ১০ বছর আমি জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপাই নি, এর মাঝে ডিয়েগো আমাকে দলে ডেকে নিলেন। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের শেষদিকে তখন আমরা। ঐ বছরের অক্টোবর, বাছাইপর্বের শেষ ম্যাচ পেরুর বিপক্ষে। বিশ্বকাপ খেলতে হলে আমাদের পেরুকে হারাতেই হবে। দুই দশক বিশ্বকাপ জিতছি না সেটা তখন বড় কথা নয়। আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ খেলবেই না? এটা কেউই মেনে নিতে পারবে না। আমাদের মনে হচ্ছিল আমাদের গলায় কেউ চাকু ধরে আছে। 
    পেরুর বিপক্ষে ম্যাচ ছিল বুয়েনস আয়ার্সে। ঝমঝমে বৃষ্টির মাঝে খেলছিলাম আমরা। প্রথমেই আমরা গোল পেয়ে গেলাম। সবাই একটু আশ্বস্ত তখন। কিন্তু বিধি বাম, ঠিক ৯০ মিনিটের আগে আগে পেরু গোল করে সমতা এনে ফেলল। আমাদের তখন পাগলপ্রায় অবস্থা, বৃষ্টির মাঝেও আমরা গ্যালারি থেকে দর্শকদের গালিগালাজ শুনতে পাচ্ছি। আর্জেন্টিনা তাহলে বিশ্বকাপে যাচ্ছে না? ম্যারাডোনাও তাহলে এখানেই খতম? এমনিতেই আমার মত একজন বুড়ো স্ট্রাইকারকে এত গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে খেলানোর জন্য ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন তিনি ম্যাচের আগেই। তাহলে এখানেই কী সব শেষ?

    স্টপেজ টাইমে আমরা একটা কর্নার পেলাম। কীভাবে যেন বলটা আমার সামনেই পড়ল আর আমিও বলটা জালে ঢুকিয়ে দিলাম। বৃষ্টি কাদার মাঝে আমি পাগলের মত দৌড়াচ্ছিলাম, আমার সতীর্থরা আমার পিছু পিছু। দর্শকরাও আনন্দে উন্মাতাল। ডিয়েগো ঐ কাদামাখা মাঠেই গড়াগড়ি খেতে লাগলেন, সেই দৃশ্য ভোলার মত নয়।
     
    এভাবেই ডিয়েগোর সাথে আমার বন্ধন আরো দৃঢ় হল। কেউ আমাকে মনে করিয়ে দিল, '৮৬ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বের শেষ ম্যাচটাও ছিল পেরুর বিপক্ষেই। ঐ রুদ্ধশ্বাস ম্যাচের শেষ গোলটা করেছিলেন ডিয়েগোই, নিয়ে গিয়েছিলেন আর্জেন্টিনাকে মেক্সিকোতে। 
    অমন একটা গোল করে আমিও স্বপ্ন দেখতে থাকলাম বিশ্বকাপে খেলার। ডিয়েগো তখনো বিশ্বকাপের স্কোয়াডের ঘোষণা দেন নি তবে নিয়মিত ফোন দিয়ে আমার খোঁজখবর ঠিকই নিতেন। এরকমই একদিন ফোনে খোঁজখবর নেওয়া শেষে ডিয়েগো খুব স্বাভাবিক সুরেই বললেন, সোমবার মনে করে মাঠে এসো কিন্তু মার্টিন। তুমি বিশ্বকাপে যাচ্ছ। সেই মুহূর্তটা আমার আজীবন মনে থাকবে। 

    আমি জানতাম বিশ্বকাপে গেলেও আমি ম্যাচে সুযোগ পাব না। দক্ষিণ আফ্রিকাতে আমরা যখন ল্যান্ড করলাম তখন আমার বয়স ৩৬ আর আমার দলে আছে লিওনেল মেসি আর কার্লোস তেভেজ নামে দুইজন অসম্ভব প্রতিভাবান স্ট্রাইকার। কাজেই আমার কোনো আশা ছিল না। গ্রুপ রাউন্ডের শেষ খেলা ছিল গ্রিসের বিপক্ষে, ততদিনে আর্জেন্টিনা নকআউটে কোয়ালিফাই করে ফেলেছে। ম্যাচ শেষ হওয়ার ১০ মিনিট আগে ডিয়েগো আমাকে মাঠে নামালেন। মাঠে নামলাম আমি, গোলও করলাম। গ্যালারিতে আমার স্ত্রী, ছেলে, ভাইয়েরা সবাই ছিল। আমার জীবনের সবচেয়ে গৌরবময় মুহূর্ত ছিল ওটা।
     
    ডিয়েগোর হয়ে খেলাটা ছিল একটা অন্যরকম অভিজ্ঞতা। মাঠের কৌশল, ট্যাকটিকস ইত্যাদি জটিলতা বাদ দিয়ে কেবল ডিয়েগোর হয়ে খেলছি এই অনুভূতিটাই আমাদের জন্য বিশাল প্রেরণা ছিল। আমরা আসলেই বিশ্বাস করতাম যে আমরা ঐবারই বিশ্বকাপ জিতব, কারণ ডিয়েগো আমাদের সাথে আছেন। ডিয়েগো খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপ জিতেছেন, কোচ হিসেবে বিশ্বকাপ জিতবেন - এটা অতি অবশ্যই তাঁর ভাগ্যলিপিতেই ঈশ্বর লিখে রেখেছেন। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল ডিয়েগোর ভাগ্যের প্রতি। ঐ বিশ্বকাপ আমাদের জেতা হয় নি, এটা আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ থেকে যাবে। তবে ঐ আক্ষেপের মাঝেও কেবল স্মৃতি ছাড়াও আমার আরেকটা বড় প্রাপ্তি ছিল। ডিয়েগো তখন কানে চমৎকার ঝকমকে একটা দুল পরতেন। একদিন আমি ঠাট্টাচ্ছলে বললাম, আগামি ম্যাচে যদি গোল দিতে পারি ঐ কানের দুলটা আমাকে দিয়ে দেবেন। আমি ভুলেই গিয়েছিলাম, কিন্তু পরের ম্যাচে গোল করার পর ড্রেসিং রুমে ফিরতেই ডিয়েগো কানের দুলটা খুলে আমার হাতে সোপর্দ করলেন। এখনো সেই দুলটা আমি রেখে দিয়েছি, যক্ষের ধনের মত, লুকিয়ে রেখেছি কোন এক কোনায়। 

    বিশ্বকাপের পর ডিয়েগোর জীবনে অনেক চড়াই উৎরাই যায়। সবাইকে যেটা বুঝতে হবে, একজন পেশাদার ফুটবলার বা কোচ হওয়া খুবই কঠিন একটা কাজ। আর সেই কাজটাই শতগুণে কঠিন হয়ে যায় যখন আপনার নাম ডিয়েগো ম্যারাডোনা। তাঁকে ২৪ ঘন্টাই মানুষজন অনুসরণ করে, তাঁর প্রতিটা কাজের চুলচেরা বিশ্লেষণ হয়। তাঁকে লোকে পূজা করে, গালি দেয়, ছুঁতে চায় আবার আঘাতও করে। পৃথিবীর কোন রাস্তায় একা হেঁটে যাওয়া ডিয়েগোর পক্ষে সম্ভব না, স্বাভাবিক জীবনযাপন করা ডিয়েগোর পক্ষে সম্ভব ছিল না।
     
    আমি যদি অতীতে ফিরে যেতে পারতাম, আমার সমস্ত সামর্থ্য দিয়ে আমি ডিয়েগোকে সাহায্য করার চেষ্টা করতাম। যাতে তিনি একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পারেন, একজন সাধারণ মানুষের মত বেঁচে থাকতে পারেন। তাঁর জীবনের শেষ দুই বছর তিনি যে শারীরিক ও মানসিক অবস্থায় ছিলেন তা আমার মোটেও পছন্দ ছিল না। কিন্তু ডিয়েগোকে সাহায্য করাটাও খুব কঠিন কাজ, অনেকেই চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে আমার মতই।
     
    ডিয়েগোকে বিচার করার ক্ষমতা আমার নেই। হ্যাঁ, তিনি জীবনে অনেক ভুল করেছেন, সেটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু আমি সেটা নিয়ে ভাবি না। ডিয়েগো আমার কাছে কেবল একটা অনুভূতির নাম। ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করাটা কঠিন। যারা ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন তাঁরা হয়ত খানিকটা বুঝতে পারবেন। ঈশ্বর যেমন সবকিছুতে আছেন, সবজায়গায় আছেন। ডিয়েগোও তেমনি আমার জন্য ফুটবলের সবকিছুতে আছেন, সবজায়গায় আছেন।
     
    হয়তো কখনোই আমি মেনে নিতে পারব না যে ডিয়েগো নেই। ঠিক যেমনটি ঈশ্বর যে নেই এটা কেউ আমাকে বিশ্বাস করাতে পারবে না। আমার জন্য ঈশ্বরও আছেন, ডিয়েগোও আছেন। থাকবেন সবসময়।    

     
     

     

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন