• ফুটবল, অন্যান্য
  • " />

     

    ট্যাকটিকসে হাতেখড়ি ৯ : ফলস ১০ এর ফাঁকিবাজিতে উইঙ্গারের প্রস্থান

    ফলস নাইনের ব্যাপারটা লিওনেল মেসির কল্যাণে বেশিরভাগ ফুটবলভক্তেরই খানিকটা জানা আছে। সে তুলনায় ইনভার্টেড উইঙ্গার বা ফলস ১০ এর বিষয়টা বেশ একটু আড়ালেই পড়ে যায়। আপনি যদি নিয়মিত ফুটবল খেলা দেখে থাকেন, ফলস ১০ দেরকে আপনি অবশ্যই দেখেছেন, হয়ত বুঝতে পারেননি তাদের কাজটা কী। ফলস ১০ বা ইনভার্টেড উইঙ্গারদের কাজ এবং দায়িত্ব ট্রাডিশনাল উইঙ্গারদের থেকে পুরোপুরিই ভিন্ন। ট্রাডিশনাল উইংগাররা সাধারণত কাজ করেন মাঠের ১৩, ১৮, ১৫, ১৬ জোনগুলোতে। তাদের কাজ? প্রতিপক্ষ ফুলব্যাকদের টেক্কা দিয়ে উইং দিয়ে দৌড়ানো, ফর্মেশনের প্রশস্ততা বাড়ানো এবং সুযোগ পেলে ডি বক্স বা জোন ১৪ তে ক্রসের যোগান দেওয়া। যেহেতু ক্রস করাটাই মূল লক্ষ্য এজন্য সাধারণত ডান পায়ের উইঙ্গাররা ডান উইংয়ে এবং বাম পায়ের উইঙ্গাররা বাম উইংয়ে খেলে থাকেন। কিন্তু ফলস ১০ বা ইনভার্টেড উইঙ্গার, নামের সাথে সাজুয্য রেখে পুরোই উলটো কাজ করেন। বাম পায়ের খেলোয়াড়রা খেলেন ডান উইয়ে এবং ডান পায়ের খেলোয়াড়রা দৌড়ান বাম উইং ধরে। কারণ একজন ফলস ১০ মোটামুটি কখনোই ক্রস করার উদ্দেশ্যে উইং ধরে বল নিয়ে এগুতে যান না। ফলস ১০ এর কাজ হল উইঙ্গার (৭ বা ৮) এবং প্লেমেকার (১০) পজিশনের মাঝে অদলবদল করে খেলে যাওয়া। 

    ফুটবল মাঠের জোনগুলো

     

    একজন ফলস ১০ উইং দিয়ে দৌড়াবেন ঠিকই কিন্তু তাঁর লক্ষ্য থাকবে জোন ১৪। তিনি কাট করে উইং থেকে জোন ১৪ এর দিকে এগোবেন, তাঁর খালি করে দেওয়া উইং-এর জায়গা ধরে এগোবেন তাঁর দলের ফুলব্যাক। জোন ১৪ তে পোঁছে গেলে বা কাছাকাছি এলে তিনি ডিফেন্স চেরা পাসও বাড়াতে পারেন বা বেশিরভাগক্ষেত্রে যা হয়, গোলে শটও নিতে পারেন। খেলার ধরনটা পরিচিত মনে হচ্ছে? তা হবেই, কারণ এটাই আরিয়েন রোবেন, ফ্রাংক রিবেরি, আলেক্সিস সানচেজদের ট্রেডমার্ক খেলার স্টাইল। 


    জোন ১৪ সম্পর্কে আরো জানতে পড়ুনঃ  ট্যাকটিকসে হাতেখড়ি-৬ : 'জোন ১৪' এর অতল গহ্বরে


    প্রশ্ন হতে পারে, ফলস ১০ আর ইনভার্টেড উইংগার ব্যাপার দুটো কি একই? উত্তরটা হবে, কাছাকাছি। একজন ফলস ১০ খেলা শুরু করে প্লেমেকার পজিশন থেকে, কিন্তু প্রয়োজনে উইংএ চলে যায়। আবার একজন ইনভার্টেড উইঙ্গার খেলা শুরু করে উইং ধরে- কিন্তু সে ফাইনাল থার্ডে এসে ক্লাসিক প্লেমেকারের পজিশনে সরে আসে। শুরুর পজিশনের ব্যাপারটা বাদ দিলে এই দুই ধরনের খেলোয়াড়দের কার্যক্রম আর দায়িত্ব মোটামুটি একই। বলা চলে, সকল ইনভার্টেড উইঙ্গারই আসলে ফলস ১০ কিন্তু সকল ফলস ১০ ইনভার্টেড উইঙ্গার নন। তবে যারা ইনভার্টেড উইঙ্গার তাদের সাধারণত গোল দেওয়ার দিকে বেশি মনোযোগী থাকে। আর ফলস ১০ রা প্লেমেকারের দায়িত্বটাই গুরুত্ব দেয় বেশি। 

    উইং এ থাকলেও তাঁদের কাজ প্লেমেকারদের মতই

     

    আর্সেনালে মেসুত ওজিল বা বার্সেলোনার কিছু কিছু ম্যাচে লিওনেল মেসি এমন ফলস ১০ এর দায়িত্ব পালন করেন। এরা ছাড়াও, মারিও গোৎজে, হামেস রদ্রিগেজ, রবার্তো ফিরমিনোরা ফলস ১০ ধরনের খেলার স্টাইলের ভাল উদাহরণ। ফলস ১০ বা ইনভার্টেড উইংগারদের সাধারণত খেলানো হয় ৪-১-৪-১ বা ৪-২-৩-১ ফর্মেশনে। ফলস ১০ এর দায়িত্ব নেওয়া কেউ প্লেমেকার বা সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হিসেবেও খেলা শুরু করতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এ দায়িত্ব পাওয়া ফুটবলার দলের সবচেয়ে বুদ্ধিমান এবং প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের একজন হন। এমন ক্ষেত্রে অন্য যেকোন খেলোয়াড়দের থেকে বেশি ঘুরে বেড়ানোর স্বাধীনতা দেওয়া হয় তাঁকে। বায়ার্নে মুলার বা বার্সায় মেসি যেমনটা ভোগ করেন। 

    তাহলে ফলস ১০ বা ইনভার্টেড উইংগারদের উদ্দেশ্যটা কী? খুব সোজা, প্রতিপক্ষকে তার নির্ধারিত পজিশন থেকে সরিয়ে মাঠে স্পেস তৈরী করা। একজন ফলস ১০ যখন উইং থেকে বাঁক নিয়ে হাফ স্পেস বা তারও ভেতরে ঢুকবেন, তখন তিনরকম ব্যাপার হতে পারে - 

    • প্রতিপক্ষ ফুলব্যাকও ফলস ১০ খেলোয়াড়কে মার্ক করার জন্য তার পিছু নেবে। এতে উইং এ বড় একটা স্পেস তৈরী হবে যেখান দিয়ে ফলস ১০ এর সতীর্থ ফুলব্যাক উপরে উঠে যেতে পারবেন। 

    প্রতিপক্ষ ফুল ব্যাক পিছু নিতেই পারেন, ধরতে পারবেন কিনা সেটা আরেক ব্যাপার

     

    • প্রতিপক্ষ ফুলব্যাক তার নিজ জায়গায় থাকবেন, কিন্তু প্রতিপক্ষ সেন্টার ব্যাক মার্ক করবেন ভেতরে ঢুকতে যাওয়া ফলস ১০ কে। এতে দলের স্ট্রাইকারের জন্য জোন ১৪ তে স্পেস ফাঁকা হবে এবং ফলস ১০ সেখানে পাস বা থ্রু বাড়াতে পারবেন। 

    বার্গক্যাম্পের এই বিখ্যাত গোলটা হয়ত আপনার মনে আছে, পিরেসের পাসটাও মনে আছে তো? 

     

    • প্রতিপক্ষ ফুলব্যাক বা সেন্টার ব্যাক কেউই ফলস ১০ কে মার্ক করার জন্য নিজের জায়গা ছাড়বেন না। এক্ষেত্রে ফলস ১০ এর নিজেরই গোলে শট নেওয়ার সুযোগ তৈরী হবে। 

    রিবেরি, রোবেনদের এমন গোল দেখার অভ্যাস সব ফুটবল ভক্তেরই আছে মনে হয় 

     

    কথাবার্তা শুনে আপনার মনে হতে পারে, আরে এত চমৎকার ট্যাকটিকস, এটা সব দল কেন প্রয়োগ করে না? ভাই, থামেন! বিষয়টা কাগজে কলমে যত সহজ বাস্তবে ততটা নয়। ফলস ১০ এর প্রকৃত প্রয়োগ করতে হলে আপনার প্রয়োজন একজন অতিমাত্রায় প্রতিভাবান ফুটবলার। ভেবে দেখুন, এমন একজনকে আপনার দরকার যে একজন ক্লাসিক উইঙ্গারের মত উইং দিয়ে ঝড়ের বেগে এগিয়ে যেতে পারবে, উইং থেকে কাট করে ভেতরে ঢোকার জন্য লাগবে ড্রিবলিং দক্ষতা, জোন ১৪ এর কাছাকাছি এলে ক্লাসিক প্লেমেকারের মত বক্সে বা জোন ১৪ তে নিখুঁত পাস বা থ্রু বাড়াতে পারবে এবং সুযোগ পেলে ক্লাসিক স্ট্রাইকারের মত গোলে দূর পাল্লার শটও নিতে পারবে। এমন বহুমুখী প্রতিভাবান খেলোয়াড় ফুটবল জগতে খুব বেশি নেই। 

    ফলস ১০ খেলানোর বিপদও একেবারে কম নয়। ডিয়েগো সিমিওনের মত যেসব কোচ কম্প্যাক্ট ডিফেন্স লাইন খেলান তাদের বিপক্ষে এই কৌশলই হিতে বিপরীত হতে পারে। ফলস ১০ বা ইনভার্টেড উইঙ্গারদের মূল কাজ হল দ্রুতগতির কাউন্টার অ্যাটাকে নেতৃত্ব দেওয়া। রবং একজন ফলস ১০ যখন কাট করে ভেতরে ঢুকবেন বা হাফ স্পেস থেকে বেরিয়ে উইং এ আসবেন, তখন তাঁর খালি করে যাওয়া শূন্যস্থান পূরণ করতে হবে তার দলেরই একজন ফুলব্যাক বা সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারকে। এক্ষেত্রে আক্রমণভাগের পেছনে বেশ বড় একটা গ্যাপ তৈরি হয়ে যাবে। বলের দখল হারিয়ে ফেললে প্রতিপক্ষ যদি  ক্ষীপ্র হয় তবে প্রতি আক্রমণেই যথেষ্ট রকম নাকানিচুবানি খাইয়ে দেওয়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে।

    একজন ডান পায়ের খেলোয়াড় হয়েও যখন আপনি বাম উইংয়ে খেলবেন তখন আপনার কাজ করার ক্ষেত্র অনেক বেড়ে যাবে। উইং থেকে যখন আপনি কাট করে ভেতরে ঢুকবেন তখন গোটা ফাইনাল থার্ডের চিত্র আপনার কাছে স্পষ্ট। একবার ভেতরে ঢুকে গেলে আপনি কাছের কাউকে পাস বাড়াতে পারবেন, আবার স্ট্রাইকারদেরও থ্রু বল দিতে পারবেন, চাইলে নিজে এগিয়ে গিয়ে গোল করার চেষ্টাও করতে পারবেন। আপনি তখন আপনার স্ট্রং ফুটে আছেন, আপনার আত্মবিশ্বাস বেশি থাকবে। এ কারণেই আর্সেনালে আমার ইনভার্টেড উইংগার বা ফলস ১০, যেটাই বলেন না কেন, আমার পজিশনটা বেশ কৌতুহলোদ্দীপক ছিল। আজকাল এ বিষয়টা খুব সাধারন হয়ে গিয়েছে কিন্তু সেকালে আমাকে আর্সেন ওয়েংগারের সাথে মিলে অনেক খাটুনি দিতে হয়েছে এর পেছনে। - রবার্ট পিরেস, সাবেক ফ্রান্স ও আর্সেনাল ফরোয়ার্ড।

    ইনভার্টেড উইঙ্গার বা ফলস ১০ এর ধারণা প্রথম কীভাবে ফুটবলে এল তা জানতে আমাদের চলে যেতে হবে রবার্ট পিরেস আর আর্সেন ওয়েঙ্গারের আমল থেকে ৭০ বছর পেছনে। ৩০ এর দশকে আর্সেনালেরই আরেক প্রতিভাবান উইঙ্গার-কোচ জুটি ইংলিশ ফুটবলকে চমকে দিয়েছিলেন। আর্সেনালের কিংবদন্তী ম্যানেজার হার্বার্ট চ্যাপম্যানের অধীনে খেলতেন ব্রিটিশ ফরোয়ার্ড ক্লিফ ব্যাস্টিন। ইংলিশ ফুটবলে তখন মাত্র দুটো ফর্মেশনেই খেলা হত, ২-৩-৫ অথবা ৩-২-৫। মূল স্ট্রাইকারের দুইপাশে খেলতেন দুজন ইনসাইড ফরোয়ার্ড আর দুই উইংএ খেলতেন দুজন আউটসাইড ফরোয়ার্ড বা উইঙ্গার। উইঙ্গারদের কাজ সে আমলে বেশ সোজাসাপ্টা ছিল, বল নিয়ে উইং ধরে এগিয়ে যাও, ডি বক্সে ক্রস কর। ব্যাস্টিন আদতে ফরোয়ার্ড হলেও চ্যাপম্যান তাঁকে খেলাতেন বাম উইংয়ে। উইং থেকে চকিতে হাফ স্পেস দিয়ে ঢুকে প্রায়ই গোল করতেন ব্যাস্টিন। আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, প্রায়ই মানে কত? পরপর দুই মৌসুমে তিনি ইংলিশ লিগের সেরা গোলদাতা হয়েছিলেন। সেকালে একজন উইঙ্গার হিসেবে এ রেকর্ড মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতই। আরো অবাক করা বিষয় হল, আর্সেনালের হয়ে ব্যাস্টিন গোল দিয়েছেন ১৭৮টি। প্রায় ৫১ বছর ব্যাস্টিন ছিলেন আর্সেনালের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলতাদা, পরে ১৯৯৭তে ইয়ান রাইট এবং এরপর থিয়েরি অঁরি ব্যাস্টিনের রেকর্ড টপকে যান। এখনো ক্লিফ ব্যাস্টিন আর্সেনালের ইতিহাসের ৩য় সর্বোচ্চ গোলদাতা। তবে চ্যাপমানের এই অভিনব কৌশল সাথে সাথেই সবাই গ্রহণ করে নিয়েছে এমন নয়।

    এমিরেটস স্টেডিয়ামে্র গায়ে অমর ব্যাস্টিন


    ব্যাস্টিনের পর আবারো আমরা উইং থেকে গোল করার মত আরেকজন জাদুকরকে খুঁজে পাই ব্রাজিলে, ৫০ এর দশকে। তাঁর নাম গারিঞ্চা। গারিঞ্চার ড্রিবলিং দক্ষতা ছিল মারাত্মক আর সুযোগ পেলেই তিনি দূরপাল্লার শট নিতেন। তবে গারিঞ্চার ছিল ঈশ্বরপ্রদত্ত ক্ষমতা, তাকে ঠেকানোর জন্য যে প্রতিপক্ষ ম্যানেজার অন্য কোন কৌশলের আশ্রয় নেবেন বা একই কৌশলে আরেকজন খেলোয়াড় নিজের দলে খেলাবেন সে সুযোগ খুব একটা ছিল না, চিন্তা ভাবনাও কেউ করেননি ও পথে। কিংবদন্তী রেড ডেভিল জর্জ বেস্টের ক্ষেত্রেও সেই একই কথা, প্রতিভার ঝলকটাই কৌশলটাকে আড়াল করে দিত। তবে বেস্টের খেলার ধরন গারিঞ্চার থেকে বেশ ভিন্ন ছিল, তিনিও গোল করতেন তবে তাঁর মূল প্রভাব ছিল জোন ১৪ এ পাসিং এবং স্ট্রাইকারের সাথে তাঁর বোঝাপড়া। অনেকটা আজকালের ফলস ১০ এর মতই। তবে একজন উইঙ্গার তার নিজ অবস্থান থেকে সরে গেলে সেই জায়গা যে নিজ দলের অন্য কারো সাথে অদল বদল হবে এ ধারণার জন্ম নিতে আরো একটু দেরি হয়ে গেল। ৭০ এর দশকে আয়াক্সের ম্যানেজার রাইনাস মিখেলস এ কাজটা করে দেখালেন তাঁর দলের সবচেয়ে  প্রতিভাবান খেলোয়াড় ইয়োহান ক্রুইফকে দিয়ে। এবং প্লেমেকিং সেন্টার ব্যাক হিসেবে একই কাজটা বায়ার্ন মিউনিখে করে দেখালেন ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার। ওভারল্যাপিং ফুলব্যাকের ধারণাটা জনপ্রিয় হল ৮০ আর ৯০ এর দশকে, এর পরের গল্প সবটাই প্রায় জার্মানি আর বায়ার্ন মিউনিখের। ম্যাথিয়াস সামার, লোথার ম্যাথাউসথের হাত ঘুরে বায়ার্ন পেল ফুটবলেরই হয়ত সেরা দুইজন ইনভার্টেড উইঙ্গার আরিয়েন রোবেন আর ফ্রাংক রিবেরিকে। ইনভার্টেড উইঙ্গার এর আগেও খেলানো হয়নি এমন না। আর্সেনালে রবার্ট পিরেস, চেলসিতে রোবেন ইনভার্টেড উইঙ্গার হিসেবেই খেলেছেন। তবে দুই উইংএ দুইজন ইনভার্টেড উইঙ্গারের ধারণা জনপ্রিয় হতে হতে চলে এসেছে ২০১০ সাল। প্রিমিয়ার লিগে ফুলহ্যামের ম্যানেজার রয় হজসন এবং অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের কিকে সানচেজ ফ্লোরেস এই কাজটা শুরু করেন। হজসনের হয়ে দুই উইং এ খেলতেন ডেমিয়েন ডাফ আর সাইমন ডেভিস আর কিকে সানচেজের হয়ে দুই উইংয়ে ত্রাস সৃষ্টি করতেন সিমাও সাব্রোসা এবং সদ্য প্রয়াত হোসে আন্তনিও রেয়েস। তবে অবাক করা ব্যাপার হল রোবেন-রিবেরির অসামান্য ইনভার্টেড উইঙ্গার জুটি যে ম্যানেজারের হাত ধরে এসেছে সেই লুই ভ্যান হাল আজীবনই ছিলেন ক্লাসিকাল উইঙ্গারের কট্টর সমর্থক। তবে মরিনিয়ো এবং স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের ডিফেন্সিভ উইঙ্গারের সফল প্রয়োগ দেখে এই কৌশলের প্রতিষেধক খুঁজতে গিয়েই ভ্যান হাল নিয়ে আসেন ইনভার্টেড উইংগার জুটি। জি সুং পার্ক, গোরান পান্ডেভ, ডার্ক কাউটদের মত ডিফেন্সিভ উইঙ্গারদের ঠেকানোর মোক্ষম অস্ত্র ছিল রোবেন-রিবেরি জুটি। রোবেনের গোল বললেই যেই ছবি আপনার মাথায় ভাসে, তাঁর ৪০% বুন্দেসলিগা গোলই এসেছে ঐ একইভাবে। পরিসংখ্যান বলে প্রতি ২৫ মিনিটে রোবেন একবার ভেতরে ঢুকে বাম পায়ে শট নেওয়ার চেষ্টা করেন। পেপ গার্দিওলা যখন বায়ার্নের দায়িত্ব পেলেন তখন অনেকেরই ধারণা ছিল তিনি রোবেনের এই ডিরেক্ট স্টাইলের খেলা পছন্দ করবেন না। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে গার্দিওলা কেবলমাত্র রোবেনকে সাপোর্ট দেওয়ার জন্যই ফর্মেশনে ফিলিপ লামকে উপরে উঠিয়ে আনলেন, রোবেনকে দেওয়া হল আরো স্বাধীনতা।  রোবেন আগে ছিলেন কেবল ইনভার্টেড উইংগার, গার্দিওলা তাকে পুরোপুরি ফলস ১০ বানিয়ে দিলেন। 

    রোবেনের ট্রেডমার্ক গোল, গার্দিওলা এতে বাঁধা দেন নি

    ফুটবল এককালে খুব সোজাসাপ্টা খেলা ছিল। গায়ে গতরে বড় সড় ছেলেরা খেলত সেন্টার ব্যাক বা সেন্টার ফরোয়ার্ড হিসেবে। শক্তসমর্থ ছেলেরা খেলতো ফুলব্যাক হিসেবে। চালাক চতুর ছেলেরা খেলতো ইনসাইড ফরোয়ার্ড হিসেবে। শক্তসমর্থ আবার কিছুটা বুদ্ধিও আছে এবং বুদ্ধিমান এবং হাল্কা শক্তসমর্থও এমন ছেলেপেলেরা খেলবে হাফ উইংয়ে। হালকা-পাতলা এবং দৌড়াতে পারে এমন ছেলেরা খেলবে উইংএ। বাম পায়ের ছেলেরা বাম উইংয়ে, ডান পায়ের ছেলেরা ডান উইংএ। আর যার কোন বন্ধু নেই সে দাঁড়াবেগোলকিপার হিসেবে। ব্যস! - জোনাথান উইলসন, ক্রীড়া বিশ্লেষক।  

    উইলসনের কথাটা ঠিকই আছে, ফুটবল এখন আর আগের মত সোজাসাপ্টা নেই। ক্লাসিক ১০, ক্লাসিক ৭ বা ৮ রোলে এখন কোন খেলোয়াড়কে সচরাচর খেলতে দেখা যায় না। ‘স্পেশালিস্ট’ এর দাম কমে গিয়েছে, এখন হতে হবে মাল্টি ট্যালেন্টেড। ফলস ১০, ইনভার্টেড উইঙ্গার, ইনসাইড ফরয়ার্ডদের আগমনে ক্লাসিক উইঙ্গার ব্যাপারটা প্রায় হারিয়েই যাচ্ছে আধুনিক ফুটবল থেকে। বড় কোন দলেই এমন কোন উইঙ্গার আপনার চোখে পড়বে না যার কাজ কেবলমাত্র টাচলাইন ধরে দৌড়ানো এবং ক্রস করা, এককালে ড্যানিশ উইঙ্গার ডেনিস রোমেডাল যেমন করতেন বা এখন হেসুস নাভাস যেমনটা করেন। এখন অবধারিতভাবেই উইঙ্গাররা প্রয়োজনে ১০ নাম্বার পজিশনে এসে প্লেমেকারের ভূমিকা পালন করেন অথবা তৃতীয় স্ট্রাইকারের দায়িত্ব পালন করেন। পেপ গার্দিওলা এক্ষেত্রে তাঁর ম্যানচেস্টার সিটিকে নিয়ে গিয়েছেন আরো এক ধাপ সামনে। ইনভার্টেড উইংগারের সাধারণ ধারণা হল, উইঙ্গাররা কাট করে ভেতরে ঢুকবে এবং ফুলব্যাকরা উইং ধরে সামনে আগাবে। গার্দিওলার নতুন সিস্টেমে ফলব্যাকরাই ভেতরে ঢুকছে এখন। ভবিষ্যতে প্রতিভাবান ম্যানেজার এবং খেলোয়াড়দের মাথা আর পা থেকে হয়ত আরো অনেক এমন অভিনব কৌশল বের হবে। হয়ত ক্লাসিকাল উইঙ্গার আর ক্লাসিক প্লেমেকারের মত ইনভার্টেড উইঙ্গার ব্যাপারটাও পরবর্তী দশকে সেকেলে হয়ে যাবে। আসবে নতুন কোন কৌশল আর আমরা থাকব দেখবার অপেক্ষায়।