• লা লিগা
  • " />

     

    'দর্শক' রোনালদো, ভিনিসিয়াস 'সিনিয়র' আর বৃষ্টিস্নাত বার্নাব্যুর খরা কাটানোর রাত

    মাদ্রিদে রোববার বৃষ্টি ঝরেছে দুপুরের পর থেকেই। স্পেনের আবহাওয়াকে অন্তত ইউরোপের তুলনায় চরমভাবাপন্ন বলা চলে না। তবে মাদ্রিদের সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে একটা খরা চলছিল এতোদিন। ১৯৫৫ দিনের খরা। সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে ঐতিহাসিক ‘শত্রু’ বার্সেলোনার বিপক্ষে একটি জয় দেখতে ১৯৫৫ দিন অপেক্ষা করতে হয়েছে রিয়াল মাদ্রিদকে। এই সময়ে তিনবার ইউরোপসেরা হয়েছে লস ব্লাংকোরা। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ক্লাব ছেড়ে গেছেন। জিনেদিন জিদান একবার ছেড়ে আবার ফিরে এসেছেন। পরের সময়টাতেও ভুগতে হয়েছে রিয়াল মাদ্রিদকে। এল ক্লাসিকোর আগে নিজেদের শেষ ম্যাচে ম্যানচেস্টার সিটির কাছে হার ভাবিয়ে তুলেছিল। রিয়াল আবার কবে নিজেদের দাপট দেখাবে সে প্রশ্নের জবাব খুঁজেছেন রিয়াল সমর্থকেরা। প্রায় দুই হাজার দিনের অপেক্ষার প্রহর কাটিয়ে আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে এর চেয়ে উপযুক্ত সময় আর হয় না!


    ২০১৮ এর গ্রীষ্মে রিয়াল মাদ্রিদ ছেড়ে গিয়েছিলেন রোনালদো। মাঝের এতোদিনে একবারের জন্যও সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে ফেরা হয়নি তার। এল ক্লাসিকো চলার সময় রোনালদোর খেলার কথা ছিল ইন্টার মিলানের বিপক্ষে। করোনা আতঙ্কে জুভেন্টাসের ম্যাচ বাতিল হওয়ার পর ফুরসত মিলেছে রোনালদোর। সোজা হাজির হয়েছেন বার্নাব্যুতে, যেখানে তিনি অমর।

    রোনালদোর ফেরা নিশ্চিতভাবেই সমর্থকদের উদ্দীপনা যুগিয়েছে। মাঠের খেলোয়াড়দের কতোখানি উৎসাহ যুগিয়েছে সেটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তবে গোলের পর কর্নার ফ্ল্যাগের কাছে গিয়ে ভিনিসিয়াস জুনিয়রের রোনালদোর ‘সিগ্নেচার সেলিব্রেশন’ নকল করার চেষ্টা অকপটে একটা বিবৃতি দিয়ে দেয়। ওই মুহুর্তটা বার্নাব্যুর জন্য সোনায় সোহাগা। এর বেশি নাটক জমিয়ে বার্নাব্যুর খরা কাটানো যায় না।

    ঠিক এক বছর আগের ভূত চেপে বসেছিল মাদ্রিদে। সেবার এক সপ্তাহের ব্যবধানে লিগ, কোপা ডেল রে, চ্যাম্পিয়নস লিগ থেকে বিদায় নিয়েছিল রিয়াল মাদ্রিদ। ম্যান সিটির কাছে বার্নাব্যুর হারের আগে লিগের টানা দুই ম্যাচে পয়েন্ট হারিয়ে শীর্ষস্থানটাও খোয়া গিয়েছিল জিদানের দলের। কোপা ডেল রে থেকে আগেই বিদায় নিশ্চিত হয়ে ছিল। বার্সা বার্নাব্যুতে শেষ ৪ যাত্রায় জয় নিয়ে ফিরেছে। বার্সার পাঁচে পাঁচ মানে- শীর্ষস্থান থেকে পাঁচ পয়েন্টে রিয়ালের পিছিয়ে যাওয়া। ১২ ম্যাচ বাকি থাকতে লিগের আশা একরকম মাটিচাপা দেওয়া। মাদ্রিদে সঙ্কট তো হবেই।


    পরিত্রাণ মিলল রিয়ালের দশে দশ এক পারফরম্যান্সে। মার্সেলো সিটির বিপক্ষে দলে সুযোগ পাননি। বার্সার বিপক্ষে প্রথমার্ধে যেমন খেললেন তাতে জিদান তাকে উঠিয়ে নিলেও অবাক হওয়ার মতো কিছু ছিল না। রিয়ালের আগের সেই ধার নেই। কিন্তু মার্সেলো এক ট্যাকেলে দেখিয়ে দিয়েছেন তার অর্জন রাতারাতি পাওয়া সাফল্য নয়। তিনিও চোখের পলকে হারাবেন না। ম্যাচের ৭৫ মিনিটে লিওনেল মেসি সোজা গোলের দিকে এগুচ্ছিলেন। মার্সেলোর দুর্দান্ত এক ট্যাকেল তখন বাঁচিয়ে দিল রিয়াল মাদ্রিদকে। রোনালদো দর্শকসারিতে বসে দর্শক আয়নের ভূমিকায়, ওর চেয়ে বড় অনুঘটক হয়ে বার্নাব্যুতে কাজ করল মার্সেলোর উদযাপন। শূন্যে অদৃশ্য কারও সঙ্গে হাত মেলালনে, এর পর বুক চাপড়ে বার্নাব্যুর দর্শকদের তাঁতিয়ে দিলেন। মার্সেলোর অ্যাড্রেনালিন তখন চরমে। এক উদযাপন সঞ্চারিত হলো পুরো স্টেডিয়ামে। রিয়াল মাদ্রিদ সমর্থকেরা ভিনিয়াসের গোলের পর অতোখানি নিশ্চিন্ত হননি, যতোখানি নির্ভার হয়েছেন মার্সেলোর এক ট্যাকেলে। বৃষ্টিস্নাত বার্নাব্যু তখন জেনে গেছে, এই ম্যাচ আর হারছে না তারা। মাঠের দৃঢ় বিশ্বাস উদ্দীপকের মতো কাজে দিয়েছে বাকি সময়টা।

    রিয়াল মাদ্রিদের জয়ের নায়ক দিনশেষে ভিনিসিয়াসই। নামের শেষ অংশের জুনিয়র বাদ দিয়ে এখন সিনিয়র জুড়ে দিতে পারে এই ম্যাচের পর। এল ক্লাসিকোতে এই শতাব্দীর সর্ব কনিষ্ঠ গোলদাতার রেকর্ড বাগিয়ে নিয়েছেন তিনি। সেটাও মেসির কাছ থেকে। ভিনিসিয়াসের উত্থান হয়েছিল গত মৌসুমে। এর পর ধপ করে আবার হারিয়ে গিয়েছিলেন। হারিয়ে গিয়েছিলেন আসলে ওই এক সপ্তাহে। যে সপ্তাহ ফিরে না আসার প্রার্থনায় বসেছিল রিয়াল মাদ্রিদ সমর্থকেরা। রিয়ালের মতো ভিনিয়াসও ভাগ্য ঘুরিয়ে নতুন পথে হাঁটতে পারেন এখন। ফাড়া তো এবার কেটেছে।

    রিয়ালের একাদশে এদিন খেলেছেন ৩ ব্রাজিলিয়ান। শেষজন কাসেমিরো। তিনি রিয়ালে আসার পর থেকে প্রায় প্রতি ক্লাসিকোতে মেসির পাশে ছায়া হয়ে থেকেছেন। ফাড়া কাটানোর দিনে মেসির জম হয়ে গেলেন তিনি। সপ্তাহখানেক আগেও ৪ গোল করে এসে মেসি তাই বার্নাব্যুতে নিজের ছায়া দেখলেন। বার্সেলোনাও অনুমিতভাবে আটকে গেল তাতে।


    মেসি সবশেষ এল ক্লাসিকোতে গোল করেছিলেন ২০১৮ সালের মে মাসে। সেটি হয়ে থেকেছে রোনালদোরও শেষ ক্লাসিকো। রোনালদো বার্নাব্যুতে ফিরলেও মেসিকে ফিরতে দিল না রিয়াল মাদ্রিদ। যোগ করা সময়ে মারিয়ানোর গোল বার্সার দুর্দশার ষোলকলা পূর্ণ করে রিয়ালের উদযাপনে যোগ করেছে ভিন্ন মাত্রা। লিগে এই মৌসুমে প্রথমবার খেলতে নেমেছিলেন মারিয়ানো। রোনালদোর ৭ নম্বর জার্সি এবার ছেড়ে দিতে হয়েছিল তাকে। ক্লাসিকোতে গোল করে মারিয়ানোকে বুড়ো বয়সে নাতি-পুতিদের এখন আর জার্সির অস্বস্তিকর গল্প শোনাতে হবে না। বদলি হয়ে নামার ৫০ সেকেন্ডের ভেতর গোল করে রেকর্ড গড়ার গল্প এখন তার সঙ্গী।

    মারিয়ানো মাঠে নেমেছেন, খেলেছেন ১ মিনিট, প্রতিপক্ষের বক্সে বল টাচ করেছেন ১ বার, শট নিয়েছেন ১টি, গোল করেছেন ১টি। আর রিয়াল মাদ্রিদ বার্সেলোনার চেয়ে এগিয়ে গেছে ১ পয়েন্টে। বার্নাব্যুতে রিয়ালের পাজল মিলেছে এমন ছন্দ গেঁথে।

    ৩৫৬ দিন। দ্বিতীয় দফায় রিয়াল মাদ্রিদের দায়িত্ব নেওয়ার পর ৩৫৬ তম দিনে এসে জিদান বড় স্বপ্ন দেখার সাহস যুগিয়েছেন সমর্থকদের। রোনালদো কেন গেলেন, হ্যাজার্ড কেন চোটে পড়েন, বেনজেমা কেন নিয়মিত গোল পান না- রিয়াল সমর্থকদের এসব অভিযোগের তীর গত দেড় বছরে সমাধানের বদলে হাহাকার ছড়িয়েছে মাদ্রিদে। এমন একটা রাত দরকারই ছিল রিয়াল সমর্থকদের। ভেঙে গড়ার প্রক্রিয়ায় জিদানের দলের ওপর ভরসা বাড়াতে দরকার ছিল। শেষ পর্যন্ত এই ম্যাচ রিয়াল মাদ্রিদকে লিগ জিতিয়ে দিলে সেটা ঢুকে যাবে ইতিহাসে। তাতে ছোট ছোট গল্প হয়ে থাকবেন জুভেন্টাসের রোনালদো থেকে ‘অখ্যাত’ মারিয়ানোদের সবাই।