• " />

     

    করোনায় কেন বেতন কাটতে হচ্ছে ধনী ফুটবল ক্লাবগুলোর?

    করোনাভাইরাসের প্রকোপ যত বেড়ে চলেছে বিশ্বে, ততই আমাদের সামনে প্রকট হয়ে বের হয়ে আসছে কিছু তেতো সত্য। উন্নত পাশ্চাত্যের স্বাস্থ্যখাত যে শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে নেই, তা যেন একদম হাতে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল করোনাভাইরাস। ইউরোপ-আমেরিকার নেতৃত্বও অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন। থমকে গিয়েছে ক্রীড়াঙ্গনও। একের পর এক বন্ধ হয়ে গিয়েছে সবরকম লিগ-টুর্নামেন্ট। অলিম্পিক-ইউরো-কোপা আমেরিকার মত বড় বড় ইভেন্টও পিছিয়ে গিয়েছে অন্তত এক বছরের জন্য। আয়োজকদের পোহাতে হচ্ছে কয়েকশ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির আচমকা ধাক্কা। বার্সেলোনা-জুভেন্টাস-অ্যাটলেটিকো-বায়ার্নের মত নামকরা ক্লাবসহ মোটামুটি সিংহভাগ ক্লাবের খেলোয়াড়দের নিতে হবে পে-কাট। 

    এখানেই আসছে প্রশ্নটা। এতদিন ধরে আমরা যে ধনী ফুটবল ক্লাবগুলোর তালিকা দেখে আসছি, কয়েক মাস খেলা না হওয়াতেই কেন ক্লাবগুলোর টাকশালে এত টানাটানি পড়ল? কয়েকশ মিলিয়ন ডলারের বাৎসরিক আয় থাকা সত্বেও কয়েক মাস খেলোয়াড়দের বেতন-ভাতা নিজেদের অ্যাকাউন্ট থেকে কেন দিতে পারছে না ক্লাবগুলো? নাকি ক্লাবগুলো দাঁড়িয়েই আছে শুভঙ্করের কোনো ফাঁকির ওপর? 

    উত্তরটা পেতে আমাদের আগে জেনে আসা দরকার একটা ফুটবল ক্লাব চলে কিভাবে; কী তাদের আয়ের উৎস আর তাদের খরচ হয় কোন কোন ক্ষেত্রে। 

    ক্লাবের আয়-ব্যয় আসে কোন কোন খাত থেকে? 

    সাধারণত আয়ের জন্য ফুটবল ক্লাবগুলো প্রতি সপ্তাহের ম্যাচের ওপরই অনেকখানি নির্ভরশীল। স্টেডিয়ামের ম্যাচডে টিকেট বা গেট-মানি, দলের জার্সি স্পন্সর বা অন্যান্য স্পন্সরশিপ কন্ট্রাক্ট, টিভিতে সম্প্রচার স্বত্ব থেকে প্রাপ্ত আয়, ঘরোয়া লিগ বা চ্যাম্পিয়নস লিগ-ইউরোপা লিগে অংশ নেওয়া বাবদ আয়- এসব থেকেই মোট আয়ের সিংহভাগ আসে ক্লাবগুলোর। খেলোয়াড়দের জার্সি, স্যুভেনিরসহ অন্যান্য মার্চেন্ডাইজিং আইটেম বিক্রি থেকে বাকি আয় হয়।   

    আর খরচের দিকটার প্রায় ৬০-৭০ ভাগই যায় খেলোয়াড়-ম্যানেজার-কোচিং স্টাফ-স্কাউটদের বেতন-বোনাসে। বাকি ব্যয়টা হয় ক্লাব এডমিনিস্ট্রেশন আর ম্যানেজমেন্টের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, মার্কেটিং-প্রমোশনাল কর্মকান্ড, স্টেডিয়াম বা ট্রেনিং ফ্যাসিলিটির রক্ষণাবেক্ষণসহ অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজে। 

    ক্লাবে খেলোয়াড় কেনাবেচা বা ট্রান্সফার সিজনের সময়ও আয়ব্যয়ের হিসেবে যোগ-বিয়োগ হয়। লিগ বা টুর্নামেন্ট জিতলে প্রাইজমানি যোগ হয় এর সাথে।  

    এখন ধনী ক্লাবগুলো আসলে কেন প্রকৃত ধনী না, সেটা বুঝতে কিছু কেতাবি বিষয় সহজ করে উপস্থাপন করছি। ব্যক্তিগত বা প্রতিষ্ঠান উভয় ক্ষেত্রেই এই ব্যাপারটা বুঝতে হলে আয় বিবরণী (ইনকাম স্টেটমেন্ট) আর স্থিতিপত্রের (ব্যালেন্স শিট) ব্যাপারগুলো সামনে চলে আসে আমাদের, সেটা জ্ঞাতসারে হোক বা অজ্ঞাতসারে।

    আয় বিবরণী আর স্থিতিপত্র

    প্রথমে আয় বিবরণী আর স্থিতিপত্রের মধ্যে মোটা দাগে কী কী বিষয় আসে, সেটার ধারণা দেওয়া যাক  (চিত্র-১)। প্রথম ছকের আয়-ব্যয়ের হিসাবটা নিত্যকার জমাখরচের খতিয়ান। আর সম্পদ হল মূলত ঐরকম আয়ের উৎস যখন কাজ না করলেও বা সপ্তাহান্তে খেলা না চললেও আপনাকে আয় এনে দেবে। আর দায় হল ব্যাংক লোন বা অন্যান্য স্বল্পমেয়াদী বা দীর্ঘমেয়াদী ঋণ-বন্ধকের জন্য ব্যয় হওয়া অর্থ।


    (চিত্র-১) 


      এবার ফুটবল ক্লাবগুলোর আয়-ব্যয়ের খাতগুলোকে এই ছকে ফেলি (চিত্র-২) :


    (চিত্র-২) 


    এরপর দেখা যাক, ফুটবল ক্লাবগুলোর নিত্যকার আয়-ব্যয়ের ধরণটা (ক্যাশ-ফ্লো) কেমন  (চিত্র-৩)। যত বেশি ফুটবল ম্যাচ হবে, গেট-মানি, টিভি সম্প্রচার স্বত্ব থেকে আয় আসবে ক্লাবগুলোর। আর এই আয় ব্যয় হবে বেতন-বোনাস, স্টেডিয়াম-ফ্যাসিলিটি রক্ষণাবেক্ষণে আর ব্যাংক লোন বা অন্যান্য দায় মেটাতে। আর যখন ম্যাচ থাকেনা তখন আয় আসতে পারে সম্পদে উল্লিখিত খাতগুলো থেকে। মোটা দাগে এভাবেই পরিচালিত হয় ক্লাবগুলোর বিজনেস মডেল। 


    (চিত্র-৩) 


    ধনী ক্লাবগুলো কেন 'প্রকৃত ধনী' না? 

    আয় এবং সম্পদ যেহেতু ভিন্ন ব্যাপার, উপরে (চিত্র-৩) তাই দেখা যাচ্ছে, ক্লাবগুলোর সম্পদ বানানোর উপায় খুব সীমিত। মাঠে ম্যাচ না চললে ক্লাবগুলোর আয় তাই অনেকটাই বন্ধ হয়ে যায়। আবার এই মহামারির সময়ে মার্চেন্ডাইজ আইটেম কেনার জন্যও ভীড় করা যাচ্ছে না স্টোরগুলোতে। অথচ ব্যয় এবং দায়ের ঘরে উল্লেখ করা সব খরচ কিন্তু এখনও বহন করে যেতে হচ্ছে ক্লাবগুলোকে। এজন্য খেলা যদি কয়েক মাস বন্ধ থাকে, তাই টানাটানি পড়ে যায় কোষাগারে। 

    ক্লাবগুলো ‘প্রকৃত ধনী’ হতে পারত তখনই, যখন তার সম্পদের ঘরে আরও কিছু উপাদান থাকত। তবে বিশ্বজুড়ে ফুটবল ক্লাবগুলোর বিজনেস মডেল কমবেশি এরকমই। তাই এই করোনা দুর্যোগকালীন সময়ে এই করুণ দশা তথাকথিত ধনী ক্লাবগুলোর। 

    যেমন বার্সেলোনার কথাই ধরা যাক। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বার্ষিক রিপোর্টে ক্লাবের আয় ৯৯০ মিলিয়ন ডলার দেখানো হয়েছে, সাথে ব্যয় হয়েছে ৯৭৩ মিলিয়ন ডলার। ট্যাক্স বা অন্যান্য কর বাদ দিয়ে ক্লাবের মোট লাভ দেখানো হয়েছে ৪ মিলিয়ন ডলার। এখন হিসেব করে দেখুন, দুই-তিন মাস খেলা বন্ধ থাকলে বা সিজন স্থগিত হয়ে গেলে এই লাভটাও থাকবেনা। স্টোর-মিউজিয়াম থেকেও কোনো বিক্রিবাট্টা নেই। পুরোনো ম্যাচ বা হাইলাইটস দেখানোর স্বত্ব থেকে অল্পকিছু আয় আসতে পারে বড়জোর। উল্টোদিকে প্রতি মাসে খেলোয়াড়-কোচ-স্টাফদের জন্য প্রায় ৪০ মিলিয়ন ডলার খরচ হয় বার্সার। সাথে ২১৭ মিলিয়ন ডলারের দীর্ঘমেয়াদি ঋণের বোঝা তো আছেই। তাই ৭০ শতাংশ পে-কাট ছাড়া অন্য কোনো উপায়ই নেই ক্লাব কর্তৃপক্ষের কাছে।  

    ইংলিশ ক্লাবগুলোর আবার টিভি সম্প্রচার স্বত্ব থেকেই আয় সবচেয়ে বেশি। মৌসুমের বাকি সব ম্যাচ না হলে টিভি চ্যানেলগুলোকে বড় অংকের জরিমানাও দিতে হবে ফুটবল বোর্ড আর ক্লাবগুলোকে। আবার মে-জুনের দিকে ম্যাচ শুরু করতে পারলেও কীভাবে ফিক্সচার সাজানো হবে তা নিয়ে রয়ে গিয়েছে ধোঁয়াশা। সব মিলিয়ে ফুটবল অঙ্গনজুড়েই ছড়িয়ে গিয়েছে অস্থিরতা।  

    এখন পর্যন্ত বার্সেলোনা, অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ, জুভেন্টাস, বায়ার্ন মিউনিখের মত শীর্ষ ক্লাবগুলো  ক্লাবসংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের বেতন নিশ্চিত করতে খেলোয়াড়-কোচদের বেতন-ভাতা কর্তনের ঘোষণা দিয়েছে। খেলোয়াড়রাও নিজ থেকে অর্থ অনুদান দিচ্ছেন কিছু কিছু ক্ষেত্রে। তবে প্রিমিয়ার ডিভিশনে খেলা ইংলিশ ক্লাবগুলো এখনও এই পথে হাঁটেনি। বরং তারা নিয়েছে আরও বিতর্কিত এক সিদ্ধান্ত। খেলোয়াড়-কোচদের উচ্চ বেতন-ভাতা বহাল রেখে ক্লাবসংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের নূন্যতম বেতন দেওয়ার জন্য ক্লাবগুলো ব্যবহার করবে সরকারি ইমার্জেন্সি ফান্ড, যে ফান্ডের টাকাটা আসে আবার দেশের সাধারণ লোকজনের দেয়া ট্যাক্সের টাকা থেকে। 

    ছোট ক্লাবগুলোর আরও করুণ দশা 

    অন্যদিকে দ্বিতীয় বা তৃতীয় বিভাগের ছোট ক্লাবগুলোর কথাই ভাবুন। বেশিরভাগ ছোট ক্লাবগুলোর বাৎসরিক আয় থেকে ব্যয় বেশি। টিভি সম্প্রচার স্বত্ব বা জার্সি বিক্রি থেকেও এদের আয় খুবই কম। শুধু ম্যাচের দিন গেট-মানি থেকেই ক্লাবগুলোর আয়ের সিংহভাগ আসে। খেলা বন্ধ বলে এসব ছোট ক্লাবেরই ক্ষতি হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। আবার এসব ক্লাবের খেলোয়াড়-কোচরা বেতনও পায় বেশ কম। তাই বেতন-কর্তন বা এরকম কোনো সিদ্ধান্ত সরাসরি তাদের পেটে লাথি দেয়ার মতই। 

    আবার এরকমও প্রস্তাব এসেছে, শীর্ষ ক্লাবগুলোর পে-কাট থেকে একটা ফান্ড যাবে ফুটবল নিয়ন্ত্রক বোর্ডে, সেখান থেকে ভর্তুকি পাবে ছোট ক্লাবগুলো। কিন্তু যেখানে ‘ধনী’ ক্লাবগুলোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই নাজুক, সেখানে এই প্রস্তাব ধোপে না টেকারই কথা। তবে সরকারি ফান্ড ব্যবহার না করে ক্লাবসংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের বেতনের ব্যবস্থা শীর্ষ ইংলিশ ক্লাবগুলোর নিজেদেরই করা উচিত। 

    বদলে যাবে অনেককিছুই 

    বোঝার সুবিধার্থে সরলীকরণ করলেও ক্লাবগুলোর বিজনেস মডেল মোটা দাগে সারা পৃথিবীজুড়েই এমন। আর গুটিকয়েক শীর্ষসারির ক্লাব বাদ দিলে বেশিরভাগ ক্লাবই দেনার দেয়া জর্জরিত। করোনাভাইরাসের এই ভয়াবহতা অর্থনৈতিকভাবে আরও নাজুক করে তুলবে ফুটবলের এই ক্লাব-সিস্টেমকে।  

    করোনাভাইরাস মহামারি সামনের দিনগুলোতে আরও অনেক কিছুই বদলে দিবে। ক্লাবগুলোকেও এরকম দুর্যোগপূর্ণ অবস্থা সামলিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে ভাবতে হবে নিত্যকার খরচের লাগাম টেনে ধরার রাস্তা, সাথে খুঁজতে হবে বিকল্প আয়ের আরও নতুন নতুন উপায়।