• পাকিস্তানের ইংল্যান্ড সফর ২০২০
  • " />

     

    জিমি অ্যান্ডারসন : চলনসই, টেকসই এবং প্রাসঙ্গিক

    জেমস অ্যান্ডারসনের ৬০০ উইকেটের মাইলফলকের ৫ দিন হয়ে গেছে।

    স্টুয়ার্ট ব্রড ছুটি কাটাতে যাচ্ছেন। টি-টোয়েন্টি দলে ফেরার লক্ষ্য নিয়ে জো রুট খেলছেন ইয়র্কশায়ারের হয়ে টি-টোয়েন্টি ব্লাস্টে। ইংলিশ গ্রীষ্মে টেস্ট শেষ, সীমিত ওভার এখন- পাকিস্তানের পর অস্ট্রেলিয়া। প্রিমিয়ার লিগের নতুন মৌসুম শুরু হচ্ছে, কদিন পরই খেলতে নামবে বার্নলি এফসি।

    এমনকি অ্যান্ডারসনও ফিরেছেন বিবিসির ধারাভাষ্য-বিশ্লেষণে। করছেন পডকাস্ট। অ্যান্ডারসন শেষ সাদা বলের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেছেন ৫ বছর আগে। কোভিড-১৯ এ থমকে যাওয়া মনুষ্য পৃথিবী যেভাবেই হোক, এগিয়ে যাচ্ছে আবারও। 

    এখনও অ্যান্ডারসনকে নিয়ে আলোচনা কি প্রাসঙ্গিক হবে? 

    ___________


    অ্যালেস্টার কুকের দুই হাত পকেটে, শ্যাম্পেনভেজা হয়ে দাঁড়িয়ে হাসছেন। পাশে গম্ভীর জিমি অ্যান্ডারসন। ক্যামেরায় পেছনে ওভাল চেনার অন্যতম উপায় তেল শোধনাগারের স্টিলফ্রেমটা দেখা যায়। 

    কুক বিদায় বলছেন টেস্ট ক্রিকেটকে। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর। ওভালে নিজের শেষ টেস্ট ইনিংসেও তিনি পেয়েছেন সেঞ্চুরি, হয়েছেন ম্যাচসেরা। ম্যাচ শেষের পর কুককে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে শেষ করতে পারেননি অ্যান্ডারসন, কান্নাভেজা কন্ঠে ক্যামেরার সামনে থেকে সরে গেছেন। পুরস্কার বিতরণীর পর কুকের সঙ্গে আবারও এসেছেন ইয়ান ওয়ার্ডের সামনে। 

    “তোমার বন্ধু অনেক আবেগী!”, ওয়ার্ড বলছিলেন। 

    “আমি দেখিনি আগের ব্যাপারটা। এর চেয়ে চলো জিমির সঙ্গেই কথা বলে দেখি আবার। তার কী বলার আছে শুনি!”, কুক আরেকদফা হাসেন। অ্যান্ডারসন তখনও চেষ্টা করে যাচ্ছেন, আগেরবারের মতো যেন কিছু না হয় এবার। 

    কুককে মিস করবেন অ্যান্ডারসন। কুক তার ‘বেস্ট মেট’। কুক মিস করবেন প্রথম স্লিপে দাঁড়িয়ে অ্যান্ডারসনের বলে ক্যাচ ফেলা। তাকে আরেকটু ফুললেংথে বোলিং করতে বলে রক্তচক্ষুর শিকার হওয়া। তবে যাওয়ার আগে কুক দেখে যেতে পারলেন একটা রেকর্ড। মোহাম্মদ শামিকে বোল্ড করে ইতিহাসের সফলতম পেসার হিসেবে গ্লেন ম্যাকগ্রার উইকেটসংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছেন অ্যান্ডারসন। 

    এ উইকেটটার জন্য ছিল অপেক্ষা। টানা ১৪ ওভারের স্পেল করছিলেন অ্যান্ডারসন, সিরিজের শেষ টেস্ট সেটি। কুক টেস্ট ক্রিকেটকে বিদায় বললেন ৩৪ পূর্ণ করার আগেই। অ্যান্ডারসন তার দুই বছরেরও বেশি বড় বয়সে। 

    অ্যান্ডারসন খেলা চালিয়ে যেতে থাকলেন। আরও কয়েকটা উইকেট লাগবে তার। তার মতে, তিনি তখনও চলনসই। 

    ___________


    বার্নলি এফসির ঘরের মাঠ টার্ফ মুর। এক মাঠে টানা খেলে যাচ্ছে কোনো ক্লাব, ইংলিশ ফুটবলে এমন পুরনোতম মাঠগুলির একটি এটি। এর একটি স্ট্যান্ডের নাম ক্রিকেট স্ট্যান্ড। 

    এই টার্ফ মুরের লাগোয়া আরেকটি টার্ফ মুর, বার্নলি ক্রিকেট ক্লাবের মাঠ। ফুটবল মাঠ ১৮৮৩ সালের, ক্রিকেট মাঠ তারও ৫০ বছর আগের। ল্যাঙ্কাশায়ার লিগে বার্নলির দাপট চিরায়ত। শেন ওয়ার্ন বার্নলির মাঠেই প্রথম দেখেছিলেন অ্যান্ডারসনকে, ল্যাঙ্কাশায়ার লিগে খেলার সময়। অ্যান্ডারসন তখন বোর্ডে স্কোরিংয়ে সহায়তা করেন, চক্ষু বিশেষজ্ঞ বাবার সঙ্গে মাঠে আসতেন। 

    বার্নলির দ্বিতীয় একাদশে অ্যান্ডারসন সুযোগ পেলেন পেসার হিসেবে। তখনও অ্যান্ডারসনকে আলাদা করে চোখে পড়ার কথা নয়। হুট করেই লম্বা হয়ে গেলেন। পেস বাড়লো। বার্নলি থেকে অ্যান্ডারসন হয়ে গেলেন ল্যাঙ্কাশায়ার কাউন্টি ক্রিকেট ক্লাবের। বয়সভিত্তিক দল পেরিয়ে ১৭ বছর বয়সে সুযোগ পেলেন ল্যাঙ্কাশায়ারের দ্বিতীয় একাদশে। মাইক ওয়াটকিনসন তখন দ্বিতীয় একাদশের কোচ। এর আগ পর্যন্ত অ্যান্ডারসন সুইং-টুইং সেভাবে পারতেন না, শুধু জোরের ওপর বোলিং করতেন। এবার শিখলেন আউটসুইং। 


    ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ রান, সর্বোচ্চ উইকেট


    ২০০২ অ্যাশেজে একের পর এক চোটে পড়ছিলেন ইংল্যান্ড পেসাররা। অধিনায়ক নাসের হুসেইনের কাছে খবর গেল, ল্যাঙ্কাশায়ারে এক পেসার আছেন। তাকে উড়িয়ে নেওয়া হলো অস্ট্রেলিয়ায়। টেস্টের আগে-পরে মিলিয়ে ওয়ানডে সিরিজ-- ভিবি সিরিজ। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে অভিষেক হলো তার। হুসেইন তার হাতে ক্যাপটা তুলে দিলেন। হুসেইন বুঝেছিলেন, অ্যান্ডারসন বিশেষ কিছু। তবে কতোটা, সেটা বুঝতে পারেননি। 

    পরের বছর বিশ্বকাপ। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পাকিস্তান ২৪৭ রানতাড়ায় পরিণত হলো ৫৬ রানে ৬ উইকেটে, অ্যান্ডারসন নিলেন এর ৪টি। শোয়েব আখতার সে ম্যাচে ইতিহাসে প্রথম বোলার হিসেবে অফিশিয়ালি তুললেন ঘন্টায় ১০০ মাইল গতি। অ্যান্ডারসন আশির মাঝামাঝি গতিতে বোলিং করেন তখন।

    অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২ ওভারে ১৪ রান প্রয়োজন থাকতে হুসেইন বোলিং দিলেন অ্যান্ডারসনকে। ২০৫ রানতাড়ায় ১৩৫ রানেই ৮ উইকেট হারিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। স্লোয়ারের চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে অ্যান্ডি বিকেলের কাছে ইয়া বড় এক ছয় খেয়ে বসলেন অ্যান্ডারসন। ইংল্যান্ড হারলো, বিদায় নিল বিশ্বকাপ থেকে। 

    অ্যান্ডারসনের যাত্রায় ছেদ পড়লো কিছুটা। তার বোলিং কতোটা টেকসই হবে? 

    ___________


    আপনার প্রিয় ক্রিকেটীয় অভ্যাস কোনটা? বাস বা ট্রেনে যেতে যেতে হুট করে একটা ক্রিকেট ম্যাচ দেখতে পেলে পরের ডেলিভারিটা পর্যন্ত দেখার প্রাণপণ চেষ্টা করে যাওয়া? হাতে কিছু একটা থাকুক বা না থাকুক, হুট করেই ব্যাটিংয়ের শ্যাডো করা-- ফ্লিক বা পুল, বা কাভার ড্রাইভ? নাকি বলা নেই কওয়া নেই, কয়েকধাপ দৌড়ে কারও অ্যাকশন কপি করে আপিল করা? অথবা দৃষ্টিসীমায় কোনও ল্যান্ডস্কেপ দেখে সেখানে একটা ক্রিকেট মাঠ কল্পনা করে নেওয়ার মতো কিছু করেন কি? 

    যদি শেষেরটি হয়, তাহলে সেডবার্গ স্কুলের মাঠটা হয়তো আপনার সেই কল্পনাশক্তির বাস্তবিক রূপ। শতাব্দীপ্রাচীন স্থাপনা, পাহাড় মিলে-মিশে ছবিতে কেমন ‘পারফেক্ট’ মনে হয়। ইংল্যান্ডে এমন মাঠের সংখ্যা যে খুব কম, তা নয়। সেডবার্গের স্কুল মাঠে সেই ১৮৪৮ সাল থেকে ক্রিকেট হলেও এটি ইংল্যান্ডের নবীনতম প্রথম শ্রেণির ভেন্যু। ল্যাঙ্কাশায়ারের ১২তম আউটগ্রাউন্ড। ২০১৯ সালের জুলাইয়ে কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপে ডিভিশন টু-তে ডারহামের বিপক্ষে স্বাগতিকদের ম্যাচ দিয়ে অভিষেক হয়েছে এর। সে ম্যাচ ছিল সেডবার্গের উৎসবের উপলক্ষ্য।

    ম্যাচের তৃতীয় দিন সে উৎসবে ক্ষণিকের জন্য ছেদ পড়লো একটু। ডারহামের ব্যাটিংয়ের প্রথম ইনিংসে নিজের ১৯তম ওভার করতে এলেন ল্যাঙ্কাশায়ারের অ্যান্ডারসন। তৃতীয় বলটা করতে গেলেন। একবার, দুইবার, তিনবার। পায়ের মাংসপেশির টানটা অসহনীয়, বারতিনেকের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর ল্যাঙ্কাশায়ার ফিজিওর সঙ্গে উঠে গেলেন তিনি। 

    ইংল্যান্ডে তখনও বিশ্বকাপের জ্বর। সেডবার্গের এই কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপের ডিভিশন টু-এর ম্যাচ তেমন প্রাসঙ্গিক নয়। তবে বোলারের নাম যখন অ্যান্ডারসন, মাসখানেকের ব্যবধানে ঘরের মাঠে অ্যাশেজ-- তখন সেডবার্গ প্রাসঙ্গিক। 

    নতুন মাঠে ড্র হলো ল্যাঙ্কাশায়ার-ডারহামের ম্যাচ। অ্যান্ডারসন সে ম্যাচে বোলিং করতে পারলেন না আর।

    ___________

    লাইফ, দ্য ইউনিভার্স অ্যান্ড এভরিথিং। 

    ডগলাস অ্যাডামসের হিচহাইকারস সিরিজের বিখ্যাত সায়েন্স ফিকশন। সে সিরিজের দুই চরিত্র হুট করেই ভিনগ্রহ থেকে এসে হাজির হলেন এ পৃথিবীতে-- লর্ডসে। 

    লর্ডস এমনই-- ইংল্যান্ড অথবা ক্রিকেটের যে কোনও কিছুর সঙ্গে প্রাসঙ্গিক। দুইদিন পর যখন পৃথিবী ধ্বংস হবে আবারও, ঠিক তখন গল্পের অন্যতম প্রধান দুই চরিত্র এসে হাজির হন লর্ডসে, যখন চলছে অ্যাশেজ। লর্ডসে এনে যেন যে কোনো কিছুই আপতিত করা যায়। 

    বার্নলির জিমি, ল্যাঙ্কাশায়ারের জিমির জন্য লর্ডস তার অভিষেক টেস্টের মাঠ। ২০০৩ সালের মে মাসের এক বৃহস্পতিবার এখানেই ইংল্যান্ডের ৬১৩ নম্বর টেস্ট ক্যাপটা পেয়েছিলেন তিনি। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সে ম্যাচে ফ্লিনটফের চোটের কারণে অভিষেক হয়েছিলো অ্যান্থনি ম্যাকগ্রার। সে বন্ধনীতে ম্যাকগ্রা অ্যান্ডারসনের সঙ্গে বন্দি। যদিও এখন অ্যান্ডারসনের সঙ্গে আসে আরেক ম্যাকগ্রার নাম। 

    মার্ক ভারমিউলেনের সেটি ছিল দ্বিতীয় টেস্ট। ভারমিউলেন সে বছর আরও ৫টি টেস্ট খেলেছিলেন। এরপর হারিয়ে গিয়েছিলেন, আগুন লাগিয়েছিলেন হারারের স্পোর্টস একাডেমিতে। ১১ বছর পর টেস্টে ফিরেছিলেন ২০১৪ সালে। 
     


    সেডবার্গ স্কুলের মাঠ। কোনটি বেশি সুন্দর? অ্যান্ডারসনের বোলিং নাকি সেডবার্গের এই মাঠ?


    সেই ভারমিউলেনকে বোল্ড করে টেস্টে উইকেটের ট্যালি খুললেন অ্যান্ডারসন। অভিষেকে ৫ উইকেট পেলেন, পরের টেস্টে চেস্টার-লি-স্ট্রিটে ম্যাচে নিলেন আরও ৬টি। 

    তবে অ্যান্ডারসন ইংল্যান্ডের পেস আক্রমণে টেকসই হয়ে উঠতে পারেননি শীঘ্রই, তাকে থাকতে হয়েছিল ‘স্টপ-গ্যাপ’ হিসেবেই। এখানে-ওখানে-সেখানে ডাক পড়ে, অ্যাশেজে গিয়ে ছাতুপেটা হন, শ্রীলঙ্কা গিয়ে সবকিছু নিঃশেষ হয়ে যায়। কোচ অ্যাকশন বদলাতে বলেন, সে অ্যাকশনের চাপ নিতে পারেনা শরীর, হয়ে যায় স্ট্রেস ফ্র্যাকচার। 

    অ্যান্ডারসন অনুশীলন কমান না তবুও। 

    তিনি জানেন, তার এক্সপ্রেস গতি নেই। উইকেট নিতে হলে, ফ্ল্যাট উইকেটে টিকে থাকতে হলে স্কিল বাড়ানোর দিকে মনযোগ দেওয়া ছাড়া উপায় নেই তার। তার মতো বোলারের টেকসই হওয়ার ইনস্যুরেন্স লিখে রাখেনি কেউ।

    ___________

    এজবাস্টন। ‘এপিক’ এজবাস্টন। ২০০৫ অ্যাশেজে এজবাস্টন যখন ‘এপিক’ হয়ে উঠেছিল, অ্যান্ডারসন ইংল্যান্ড স্কোয়াডে ছিলেন না। মাইকেল ভনের ‘ফ্যাব-ফোর’-- স্টিভ হার্মিসন, ফ্রেডি ফ্লিনটফ, ম্যাথু হোগার্ড ও সাইমন জোন্সদের ভীড়ে জায়গা হয়নি তার। অ্যাশেজ খেলার অপেক্ষাও বেড়েছে তাই। 

    ২০১৯ অ্যাশেজে অ্যান্ডারসন ইংল্যান্ডের বোলিং আক্রমণের নেতৃত্বে, সেটি আছেন প্রায় এক যুগ ধরেই। সেডবার্গের সেই চোট কাটিয়ে প্রথম টেস্টে দলে ফিরেছেন এজবাস্টনে, এর আগে সতর্কতা হিসেবে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে একমাত্র টেস্টে খেলানো হয়নি তাকে। 

    সেডবার্গ থেকে এজবাস্টন-- মাসখানেকের ব্যবধানে অ্যান্ডারসন ফিরে এলেন, তবে মাত্র ৪ ওভারের জন্য। প্রথম ইনিংসে ৪ ওভার বোলিংয়ের পর উঠে গেলেন, সেডবার্গে পাওয়া সেই চোট থেকে সেরে উঠতে পারেননি। 

    অ্যাশেজে ফিরে আসতে চতুর্থ টেস্ট টার্গেট করলেন, ল্যাঙ্কাশায়ারের হয়ে খেললেন দ্বিতীয় একাদশের ম্যাচও। পারলেন না। অ্যাশেজে আর খেলা হলো না তার। বেন স্টোকসের হেডিংলি-রুপকথা কিংবা সিরিজ ড্রয়ের পর আর্ন হারিয়ে ফেলা-- অ্যান্ডারসন দেখলেন বাইরে থেকেই। 

    জফরা আর্চার, মার্ক উড, স্যাম কারান… ইংল্যান্ড কি অ্যান্ডারসনকে রেখে সামনে এগিয়ে গেল? অ্যান্ডারসন অবশ্য আসছে শীতে আবারও দলে ফেরার লড়াই শুরু করলেন।

    ___________

    অভিষেকের ৫ বছর পর গিয়ে এক বছরে প্রথম দুই অঙ্কসমান টেস্ট খেলেছিলেন অ্যান্ডারসন। প্রথম ১০০ উইকেট নিতে অ্যান্ডারসনের লেগেছিল ৫ বছরেরও বেশি সময়। 

    অ্যান্ডারসন বিশেষ কিছু, সেটি হয়তো ভেবেছিলেন অনেকেই। তবে ইংল্যান্ডের বোলিং আক্রমণে নিয়মিত হতে হুসেইনকে পেরিয়ে আরও দুই অধিনায়ককে লেগেছিল তার। ২০০৮ সালে পিটার মুরস হেড কোচ ও কেভিন পিটারসেন অধিনায়কত্ব নেওয়ার পর নিয়মিত হলেন। কেপি-মুরসদের দ্বন্দ্ব এরপর তুঙ্গে উঠলো, মুরস বিদায় নিলেন, পিটারসেন অধিনায়কত্ব ছাড়লেন।

    ২০০৯ সালে পাকাপাকিভাবে দায়িত্ব পেলেন অ্যান্ড্রিউ স্ট্রাউস। অ্যান্ডারসন হলেন তার প্রধান অস্ত্র। অভিষেক হলো স্টুয়ার্ট ব্রডের। হার্মিসন, ফ্লিটনফরা বিদায় নিলেন। অ্যান্ডারসন-ব্রড জুটির যাত্রা শুরু হলো। 

    সে বছর ঘরের মাঠে অ্যাশেজ ফিরে পেলো ইংল্যান্ড। এবার মিশন অস্ট্রেলিয়া, যেখানে ২৪ বছর ধরে অ্যাশেজ জেতেনি তারা।
     


    বার্নলি ক্রিকেট ক্লাব থেকে ল্যাঙ্কাশায়ার... 


    অ্যান্ডারসন ততোদিনে ইনসুইং শিখে ফেলেছেন টিকে থাকতে। আউটসুইং, আউটসুইং, আউইসুইংয়ের পর ইনসুইং-- তাকে এনে দিয়েছে উইকেট। ২০১০-১১ অ্যাশেজের আগে শিখলেন ওয়োবল-সিম ডেলিভারি। যেটিতে বলের সিমটা কাঁপতে থাকে, বল পিচ করার পর ঘুরতে পারে যে কোনও দিকে। 

    সে সফরের আরও আগেই অ্যান্ডারসনের গায়ে সেঁটে গেছে ‘কন্ডিশনের সহায়তা না পেলে কিছু করতে পারেন না এমন বোলার’-এর তকমা। অস্ট্রেলিয়া গিয়ে অ্যান্ডারসন সে তকমার বিপক্ষে কথা বললেন। আগের সফরে ৩ টেস্টে তার গড় ছিল ৮৬। এবার ২৬। দুই দলের মধ্যে সর্বোচ্চ ২৪ উইকেট তার। ২৪ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অ্যাশেজ জিতল ইংল্যান্ড। 

    “হোয়াই আর ইউ চিরপিং নাউ মেট, নট গেটিং উইকেটস?” ব্যাটিং করতে করতে নন-স্ট্রাইক প্রান্ত থেকে অ্যান্ডারসনকে স্লেজ করেছিলেন মিচেল জনসন। সে বলে বোল্ড করে অ্যান্ডারসন দেখিয়েছিলেন, ‘হেই মিচ, হেই মিচ, চুপ!’

    ‘দ্য সুইঙ্গার’ অস্ট্রেলিয়ায় গিয়েও ইংল্যান্ডের ইতিহাসে ছিলেন প্রাসঙ্গিক।

    ___________

    নিউল্যান্ডস, কেপটাউন। 

    পাশে থাকা টেবল মাউন্টেইন এই মাঠটাকে ক্রিকেটের অন্যতম সুন্দর এক ভেন্যুতে রূপ দিয়েছে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে অ্যান্ডারসন ফিরলেন আবার। 

    কেপটাউনে বেন স্টোকস নিজের অভাবনীয় ফর্মটাকে আরেক ধাপে নিয়ে গেলেন, শেষ সেশনে বলতে গেলে একা হাতে হারিয়ে দিলেন দক্ষিণ আফ্রিকাকে। তবে প্রথম ইনিংসে ক্যারিয়ারে ২৮তম বার ৫ উইকেট নিয়ে, ইংল্যান্ডের শীত পেরিয়ে, সেডবার্গকে পেছনে ফেলে অ্যান্ডারসন টেবল মাউন্টেইনের কোলে জানান দিলেন- তিনিও আছেন। 

    কেপটাউনের আগে সেঞ্চুরিয়নে ১৫০তম টেস্ট ক্যাপটা পেয়েছিলেন অ্যান্ডারসন-- প্রথম আন্তর্জাতিক ক্যাপ যার হাত থেকে নিয়েছিলেন, সেই হুসেইনের কাছ থেকেই।
     


    কতোই রঙ্গ চুলে!


    ‘স্পেশালিস্ট’ পেসার হিসেবে আর কোনো ক্রিকেটার ইতিহাসে ১৫০ টেস্ট খেলেননি। তবে ১৫১টি খেলার পর আবারও বিরতি। এবার পাঁজরের চোট। আঘাত পাননি, ক্রমাগত বোলিংয়ের চাপেই ভেঙে গেছে হাড়। সিরিজের দুই টেস্ট বাকি থাকতেই দেশে ফিরলেন তিনি। 

    আবারও দলে ফেরার পালা। 

    ইংল্যান্ড যখন সীমিত ওভারে খেলছে, স্কাইয়ের স্টুডিওতে বসে অ্যান্ডারসনের খেলার প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আলোচনা করছিলেন কুক ও তিনি, নিক নাইটের সঙ্গে। কুকের মতে, কোথায় কীভাবে অ্যান্ডারসনকে ব্যবহার করলে দলের জন্য সবচেয়ে ভাল হবে, সেটি বের করতে হবে জো রুট, ক্রিস সিলভারউডদের। তার বন্ধুর বয়স হয়ে গেছে, তাকে এক সময় থামতে হবে। অ্যান্ডারসনের অবশ্য সরল ভাবনা-- ইংল্যান্ডের হয়ে খেলাটা উপভোগ করছেন তিনি, উপভোগ করছেন লম্বা স্পেল করার পরদিন সকালে উঠে টয়লেটে যেতে যে সংগ্রাম করতে হয়, সেই কষ্টটাও। 

    এখনও উঠতি বয়সের ক্রিকেটারের মতো চ্যালেঞ্জটা নিতে ভালবাসেন। তার বয়স ৩৮ হয়ে গেছে, সেটা জানেন। তবে ৩৮ হলেই থামার কথা ভাবতে হবে, সেটা মানেন না। 

    ___________

    জিমি অ্যান্ডারসন স্পোর্টসকারের মতো। তবে তাকে দিয়ে মালবহন করা হয়। স্ট্রাউস বা কুকের শেষ ভরসা ছিলেন তিনি। 

    ডেল স্টেইনের মতে, গ্রায়েম স্মিথ তাকে ব্যবহার করতেন সুযোগ বুঝে। কঠিন কঠিন কাজগুলি, ওভারের পর ওভার বোলিংয়ের মতো কাজগুলি করে রাখতেন পল হ্যারিস বা মরনি মরকেলরা। আর স্টেইন এসে নিতেন উইকেট। তবে অ্যান্ডারসনের সে ‘লাক্সারি’ ছিল না। স্টেইন অ্যান্ডারসনকে নিজের চেয়ে অনেক বেশি স্কিলসম্পন্ন বোলার মনে করেন। 

    অ্যান্ডারসন জানেন, টিকে থাকতে হলে তার স্কিলের উন্নতি করা ছাড়া উপায় নেই। আউটসুইংয়ের পর ইনসুইংটা শিখতে হয় তাই। একসময় বাঁহাতি ব্যাটসম্যান মানেই ছিল তার জন্য বিভীষিকা, ডানহাতি ব্যাটসম্যানের প্রায় দ্বিগুণ গড় ছিল তাদের তার বিপক্ষে। অ্যান্ডারসন ইনসুইং শিখলেন। এখন ডানহাতি ব্যাটসম্যানের বিপক্ষে তার গড় ২৩.৯০। বাঁহাতিদের বিপক্ষে ১৯.৬৬। 

    স্টুয়ার্ট ক্লার্ক আর মোহাম্মদ আসিফকে দেখেছিলেন ওয়োবল-সিম ব্যবহার করতে। রান চেক দেওয়ার জন্য শিখেছিলেন সেটি। উপমহাদেশের কন্ডিশনের জন্য শিখেছিলেন রিভার্স সুইং। তবে ভেতরের দিকে ঢোকা রিভার্স সুইং নয়, অ্যান্ডারসনের পছন্দ যেটি বাইরে যায়। শচীন টেন্ডুলকার বলেছিলেন, তিনি অ্যান্ডারসনকে ‘রিভার্স রিভার্স’ সুইং করাতে দেখেছেন। 

    ২০১২ সালে ২৮ বছর পর ইংল্যান্ড জিতেছিল ভারতে। গ্রায়েম সোয়ান ও মন্টি পানেসারের তোপে পড়েছিল ভারত। তবে এমএস ধোনি বলেছিলেন, দুই দলের বোলিংয়ের মাঝে ব্যবধান ছিলেন অ্যান্ডারসন, শেষ টেস্টে যিনি হয়েছিলেন ম্যাচসেরা। 

    ক্যারিয়ারে অ্যান্ডারসনের চেয়ে বেশি ডেলিভারি করেননি আর কোনও পেসার। মাল বহন করলেও তার স্পোর্টস কার একের পর এক ল্যাপ পাড়ি দিয়েই যায় শুধু। অ্যান্ডারসনের ৩০০ উইকেট হয়, বিশ্বকাপের পর ওয়েস্ট ইন্ডিজে গিয়ে স্যার ইয়ান বোথামকে ছাড়িয়ে ইংল্যান্ডের সফলতম বোলার হন। ৪০০ উইকেটের পর লর্ডসে দ্বিতীয় পেসার হিসেবে ৫০০ উইকেট হয়ে যায় তার। 

    এরপর কুকের শেষ টেস্টে ছাড়িয়ে যান গ্লেন ম্যাকগ্রাকে। জিমি অ্যান্ডারসন ইতিহাসের সফলতম পেসার।

    ___________

    অন্য সময় হলে “ওহ, জিমি, জিমি!” কোরাস উঠতো মাঠজুড়ে। এদিন তেমন কিছু হলো না। হ্যাম্পশায়ারের ঘরের মাঠ এজিয়েস বোউলে ২৫ আগস্ট আজহার আলির উইকেট দিয়ে ক্যারিয়ারে ৬০০তম উইকেট পূর্ণ হয়েছে অ্যান্ডারসনের, ইতিহাসে প্রথম পেসার হিসেবে। মুত্তিয়া মুরালিধরনের পর সবচেয়ে কম ডেলিভারি লেগেছে তার এই মাইলফলকে। 

    ৬০০ উইকেট অ্যান্ডারসন পেতে পারতেন আগেই, স্লিপে তার বলে মিস হয়েছিল ৪টি ক্যাচ। কেভিন পিটারসেন তার আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন, নিজের বোলিংয়ে ফিল্ডিং মিস করলে ফুঁসতেন অ্যান্ডারসন। এদিন অবশ্য চোখেমুখে হতাশা ছাড়া আর কিছু দেখা গেল না তার। 

    সিরিজের শেষ টেস্টে সে অর্থে সবটুকুই গেছে বৃষ্টির কবলে, প্রসঙ্গ শুধু অ্যান্ডারসনের ওই মাইলফলকই। অ্যান্ডারসন ভেবেছিলেন আর বোলিং-ই করা হবে না। 

    এরপর লেংথ থেকে লাফিয়ে উঠলো বলটা। আজহার ব্যাট সরিয়ে নেওয়ার সময় পেলেন না। অ্যান্ডারসন উদযাপনে মাতলেন। স্লিপে কুক নেই, তার অধিনায়ক এখন রুট। ক্যাচ গেল তার কাছেই।

    গত বছরের জুলাইয়ে সেডবার্গে চোট পেয়েছিলেন অ্যান্ডারসন, আগস্টে শুরু হওয়া অ্যাশেজ মিস করেছিলেন, ডিসেম্বরে ফিরে এসেছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের মাঝপথে। মার্চে শ্রীলঙ্কা সফরে তাকে নিয়ে যায়নি ইংল্যান্ড, এরপর বিশ্ব পড়েছে কোভিড-১৯ মহামারিতে। 


    ১১১৪ টেস্ট উইকেট এক ফ্রেমে।


    দর্শকশূন্য মাঠে ‘বায়ো-সিকিউর’ বলয়ে এ গ্রীষ্মের ৬টি টেস্ট খেলেছে ইংল্যান্ড, সাউদাম্পটনের সঙ্গে আরেকটি ভেন্যু ম্যানচেস্টারের ওল্ড ট্রাফোর্ড। জিমি অ্যান্ডারসনের ল্যাঙ্কাশায়ারের মাঠ, যেখানে তার নামে একটা প্রান্ত আছে। তার দীর্ঘদিনের বোলিং সঙ্গী ব্রড ৫০০ উইকেট পেয়েছেন সেখানেই। 

    অ্যান্ডারসনের ৬০০ উইকেটের পর সোশ্যাল মিডিয়া ভেসে গেল বন্দনায়। বার্নলিই এফসি ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করলো, “প্রাইড অফ বার্নলি। ৬০০।” 

    সে সময় এসেক্সের হয়ে বব উইলিস ট্রফির ম্যাচ খেলতে অ্যারানডেলে ছিলেন কুক। হ্যারি পটার ক্রিকেট খেললে সে সিনেমার শুটিং করার জন্য অ্যারানডেল ক্যাসল ক্রিকেট ক্লাব গ্রাউন্ড স্পেশাল ইফেক্ট ছাড়াই ব্যবহার করা যেতো। 

    বৃষ্টিতে এক ইনিংসও শেষ হতে পারেনি খেলা, তবে কুক করেছেন তার প্রথম শ্রেণির ক্যারিয়ারের ৬৬তম সেঞ্চুরি। ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ রান-স্কোরার এখন এসেক্সের শুধু। অ্যান্ডারসন এখনও ইংল্যান্ডের।

    কুক ভিডিওবার্তা রেকর্ড করছেন, তার বন্ধু জিমির মাইলফলকের অভিনন্দন হিসেবে। কুকের দুই হাত পকেটে, মুখে হাসি। 

    ___________

    ফেসবুকের লুকটা বদলে যাচ্ছে। নতুন লুক আসার পরও পুরোনোটা আঁকড়ে ধরে রাখার সুযোগ দিয়েছিল তারা কয়েকদিন, সেটি আর থাকছে না। সবকিছু বদলে যায়। হয়তো ওপরে ওপরে, অথবা ভেতর থেকেও আসে পরিবর্তন। 

    ইংল্যান্ড এরপরের টেস্ট কবে খেলবে, তা নিশ্চিত নয়। খেললেও আরব আমিরাত বা শ্রীলঙ্কা বা ভারতে অ্যান্ডারসনকে দলের ‘সেরা’ কম্বিনেশনের জন্য ভাবা হবে কিনা, নিশ্চিত নয় সেটাও। শেন ওয়ার্ন বুদ্ধি বাতলেছেন, ইংল্যান্ড এসব ‘কঠিন’ কন্ডিশনে অ্যান্ডারসনকে পেসারদের মেন্টর হিসেবে নিয়ে যেতে পারে, আর ইংল্যান্ডে খেলাতে পারে। তবে শুধু ‘কঠিন’ কাজ অন্যদের ওপর চাপিয়ে নিজে খেলবেন সহায়ক কন্ডিশনে, এমনটা ভাবতে রাজি নন অ্যান্ডারসন। তিনি খেলতে চান অন্তত সামনের অ্যাশেজ পর্যন্ত। 

    ক্যারিয়ারের পেছন ফিরে তাকালে তার নানা সময়ে চুলের স্টাইলের কথা মনে পড়ে আগে। তার মতে, বেশ কিছু বাজে লাইফস্টাইলের সিদ্ধান্ত বেছে নিয়েছিলেন তিনি চুলের ক্ষেত্রে। সেসব সময়ের সাথে প্রাসঙ্গিক মনে হোক বা না হোক। চুলের স্টাইল হয়তো আবারও বদলে যাবে, ডানহাতের রিস্টব্যান্ডটা বদলাবে। হয়তো লুকটা বদলাবে। তার ৬০০টি টেস্ট উইকেট হয়ে গেছে, আরও কয়েকটি উইকেটের খোঁজে নেমে পড়বেন-- ‘ফর এ ফিউ উইকেটস মোর’।

    ওল্ড ট্রাফোর্ড, টার্ফ মুর, সেডবার্গ, কেপটাউন, গ্যাবা, কিংবা লর্ডস--  অ্যান্ডারসন যেখানেই খেলুন, তিনি লেংথ থেকে টপ অফ অফ হিট করার চেষ্টা করবেন। সুইং না পেলে ওয়োবল-সিম বা এমন কিছু, রিভার্স সুইংয়ের চেষ্টা করে যাবেন। প্রয়োজনের রান চেক দেবেন। ব্যাটের দুই এজ বিট করার চেষ্টা করবেন। এরপর বলটা লেংথে পড়বে, ব্যাটসম্যান স্কয়ারড-আপ হবেন। অ্যান্ডারসন একটু পর এক হাত তুলে পরিচিত উদযাপনটা করবেন।  

    তিনি জিমি অ্যান্ডারসন। তিনি চলনসই, টেকসই। তিনি প্রাসঙ্গিক।

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন