• বিশ্বকাপ বাছাই
  • " />

     

    ক্ষ্যাপাটে স্কালোনি, মেসির দায়মুক্তি : লা পাজে 'আনাড়ি' আর্জেন্টিনার প্রাপ্তি

    লাউতারো মার্টিনেজ গোল করেছেন, সমতায় ফিরিয়ে এনেছেন আর্জেন্টিনাকে। গোলটা অবশ্য যত না মার্টিনেজের তার চেয়ে বেশি বলিভিয়া ডিফেন্ডার হুয়ান কারাস্কোর। বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে মার্টিনেজের গায়েই মেরেছিলেন তিনি, সেটাই ঢুকেছে বলিভিয়ার জালে। ম্যাচের তখনও প্রথমার্ধও শেষ হয়নি। অথচ মার্টিনেজের ওই গোলের পর লিওনেল স্কালোনি ডাগ আউট ছেড়ে ঢুকে পড়লেন মাঠে। মার্টিনেজকে এমনভাবে জড়িয়ে ধরলেন যেন ম্যাচ জিতে গেছে তার দল। এস্তাদিও হের্নান্দো সিলেসে ম্যাচের বয়স তখন মোটে ৪৫ মিনিট।

     

    বিরতির সময় সমতায় ফিরে আর্জেন্টিনার কাঁধ থেকে চাপ নেমেছিল। পরের অর্ধে তার সুফল ভোগ করেছে আর্জেন্টিনা। লিওনেল মেসি প্রথমার্ধে বলের দেখা পেয়েছিলেন হাতে গোণা কয়েকবার। বেশিরভাগ সময়ই হেঁটে বেড়িয়েছেন উদভ্রান্তের মতো। দ্বিতীয়ার্ধেও খুব একটা দৌড়-ঝাঁপ করেননি। কিন্তু যা করার তিনিই করেছেন, তবে অন্য রূপে। ৭৯ মিনিটে ডান প্রান্ত থেকে নিখুঁত এক পাসে খুঁজে নিয়েছেন মার্টিনেজকে। তিনি ফাঁকা জায়গাতেই ছিলেন, কিন্তু শট না করে মার্টিনেজ বল বাড়ালেন বক্সের ভেতর বাম পাশে। বদলি হোয়াকেন কোরেয়া পছন্দের বাম পায়ে মারলেন আড়াআড়ি শট, সেটা গিয়ে জড়াল বলিভিয়ার জালে। ওই গোলে আর্জেন্টিনা ভুলল ১৫ বছরের আক্ষেপ


    সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সাড়ে তিন হাজার মিটারেরর বেশি উচ্চতায় অবস্থিত লা পাজে টানা তিন বিশ্বকাপ বাছাইয়ে, ৬-১, ১-১ আর সবশেষ ২-০ গোলে হারের পর জিতে ফিরল আর্জেন্টিনা। ১৫ বছর আগে আর্জেন্টিনার সেই দলে ছিলেন স্কালোনি। এবার তিনি ডাগ আউটে, তার ধরেই এলো কাঙ্খিত জয়। সেবারও একই ব্যবধানে জিতেছিল আর্জেন্টিনা।  লা পাজে জয়ের অনুভূতি এক স্কালোনি ছাড়া আর কারই জানা ছিল না। শেষ বাঁশি বাজার পর স্কালোনি মাঠে ঢোকার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেললেন, অ্যাথলেটিক ট্রাকেই বসে পড়লেন দারুণ স্বস্তিতে। আর্জেটিনার জন্য এই জয়ের মাহাত্ম্য ওই এক দৃশ্যই ভালোমতো বুঝিয়ে দিয়েছে।

    আর্জেন্টিনার জন্য যেটা পরম শান্তির ফল, বলিভিয়ার জন্য সেটা রাজত্ব হারানোর মতো করুণ গল্প। ম্যাচ শেষে দুই দলের খেলোয়াড়রা এক চোট ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েছিলেন। হলুদ কার্ড দেখতে হয়েছে বলিভিয়া অধিনায়ক মার্সেলো মার্টিনসকেও। অথচ লা পাজে শুরুটা বলিভিয়া করেছিল আগের তিন ম্যাচের মতোই! ব্রাজিলের কাছে ৫-০ গোলে হারের পর বলিভিয়া কোচ সিজার ফারিয়াস একাদশে বড়সড় পরিবর্তন এনেছিলেন। ৪১ বছর বয়সী কার্লোস কায়সেদো আর ৩৩ বছর বয়সী মার্টিনস ছিলেন আক্রমণভাগে। অভিজ্ঞ দুইজনের কাছে আর্জেন্টিনার রক্ষণ শুরু থেকেই মনে হলো বিবর্ণ। মার্টিনস ম্যাচের ৩ মিনিটে দারুণ এক সুযোগ পেয়ে হেড মারলেন সাইডনেটে। আর্জেন্টিনার বুকে  কাঁপনই ধরে দিয়ে বলিভিয়া ততোক্ষণে ঘোষণা করে দিয়েছে, এই মাঠে তাদের সমীহ করতেই হবে।

    ২৫ মিনিটে  মার্টিনস আর সুযোগ হাতছাড়া করলেন না। বাম দিক থেকে আসা ক্রসে গোলের সামনে থেকে লাফিয়ে উঠে হেডেই বল জড়ালেন ফ্রাঙ্কো আর্মানির জালে। আর্জেন্টিনার রক্ষণ তখন মুহুর্তের জন্য মূর্তি হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকল।

    বলিভিয়া তখন আর্জেন্টিনার অর্ধে ত্রাস ছড়াচ্ছে, আর্জেন্টিনা তখন একপ্রান্তে রক্ষণে ব্যস্ত আর অন্যপ্রান্তে আক্রমণে ব্যর্থ। লুকাস ওকাম্পোস বাম প্রান্তে যাও একটু বল পাচ্ছিলেন, কিন্তু তাতে লাভ হচ্ছিল না। দূর থেকে লিয়ান্দ্রো পারেদেসে দিক-নিশানাহীন শটে সৌভাগ্য হাতড়ে বেড়াচ্ছিলেন। ৪০ মিনিটে তৃতীয় চেষ্টায় পারেদেস খানিকটা সফল। তাও সেই শট গিয়ে লাগল বারপোস্টে।  মিনিট পাঁচেক পর ভাগ্য মুখ তাকাল মার্টিনেজের দিকে। বল নিয়ে  ডান প্রান্ত থেকে বক্সের ভেতর বাইলাইনের কাছে চলে গিয়েছিলেন তিনি, কিন্তু সময়মতো সেটা আবার হারিয়েও ফেলেছিলেন। অবশ্য অধ্যাবসায়ী ছিলেন মার্টিনেজ, কারাস্কো বল ক্লিয়ার করার আগেই তাকে চাপে ফেলে জাতীয় দলের হয়ে দশম গোল আদায় করে নেন ইন্টার ফরোয়ার্ড।


    ওই গোলে একটা বড় দায় থেকে রেহাই মিলেছে আর্জেন্টিনার। গত চার বছরে বিশ্বকাপ বাছাইয়ে মেসি বাদে আর্জেন্টিনার হয়ে একটি গোলও করতে পারেননি কেউ। ২০১৬ এর নভেম্বরে কলম্বিয়ার বিপক্ষে সবশেষ আনহেল ডি মারিয়া বিশ্বকাপ বাছাইয়ে গোল করেছিলেন। এরপর থেকেই বিশ্বকাপ বাছাইয়ে হয় মেসি গোল করেন, নইলে ফাঁকা যায় আর্জেন্টিনার স্কোরশিট। মার্টিনেজ সেই ধারায় ছেদ টেনেছেন। তাতে বোধ হয় চাপমুক্ত হয়েছেন মেসি নিজেও। দ্বিতীয়ার্ধে মেসির খেলা অন্তত তেমন কিছুই ইঙ্গিত করে। গোল করার বাধ্যবাধকতা নেই, মূলত প্লে-মেকারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। দ্বিতীয়ার্ধেও ‘হাঁটাহাঁটি’ করেই খেলেছেন তিনি, কিন্তু তার বেশ কয়েকটি মুভমেন্ট মার্টিনেজ, কোরেয়াদের গোলের সামনে দারুণ কিছু সুযোগ এনে দিচ্ছিল। ২২ বছর বয়সে যা পারেননি, ২৬ যা হয়নি, ২৯ এও যখন ব্যর্থ- ৩৩ বছর বয়সে সেটা পেলেন মেসি। অমন উচ্চতার সঙ্গে দ্বিতীয়ার্ধে মানিয়ে নিতে মাথা খাটালেন। সম্ভবত মার্টিনেজের ওই গোলটাই সাহায্য করেছিল তাকে। অন্তত ততোক্ষণে মেসি বুঝে গেছেন তিনি গোল না করলেও অন্য কেউ এই ঘানি টানতে পারবেন। সেটাই বোধ হয় চিরচেনা মেসির রূপ বের আনলো লা পাজে।

    না, বলিভিয়ার মাঠে দ্বিতীয়ার্ধেও যে আর্জেন্টিনাকে দেখা গেছে তা দারুণ কোনো দলের খেলা নয়। বেশিরভাগ সময় ছন্নছাড়া ফুটবলই খেলেছে আর্জেন্টিনা। দুই-একবার সেই খেলা দেখে পাড়ার ফুটবলের কথাও মনে পড়ে গেছে। হাস্যকর সব মিসপাস, একই বলের নিয়ন্ত্রণ নিতে দুই সতীর্থের সংঘর্ষ, মুড়ি-মুড়কির মতো বলের নিয়ন্ত্রণ হারানো, গোলের সামনে গিয়ে আকাশে বল তুলে মারা- সবই দেখেছে এই ম্যাচ। কোরেয়ার গোলের সূচনাটাও ছিল ছন্নছাড়া। বলিভিয়া একটা থ্রো-ইন আটকাতে চেয়েছিল। সেই বলটাই মেসি উদ্ধার করেছিলেন। একই বলের দখল নিতে মেসির সঙ্গে নিকোলাস ডমিঙ্গুয়েজও জায়গামতো হাজির হয়ে গিয়েছিলেন। মেসির সঙ্গে ছোটখাটো একটা ধাক্কাও খেয়েছেন তিনি। মেসি মার্টিনেজকে পাস দেওয়ার আগে নিজের সতীর্থের সঙ্গেও একটা কারিকুরি করেছেন! এরপর দেখিয়েছেন জাদুমন্ত্র।

    ওই উচ্চতায় শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারা একটা বড় সমস্যা। বলিভিয়াতে আর্জেন্টিনা পা রেখেছিল অক্সিজেন সিলিন্ডার হাতে নিয়ে। সেই সমস্যা কিছুটা সামাল দেওয়া গেলেও বলের মুভমেন্ট তো আর আয়ত্ত্বে আনা যায় না! ওই উচ্চতায় বলও তো ভিন্ন আচরণ করে। মোটা দাগে ইকুয়েডরের পর বলিভিয়ার বিপক্ষেও বিবর্ণ ছিল আর্জেন্টিনা। কিন্তু পারিপার্শ্বিকতার বিচারে ওই ছন্নছাড়া ফুটবলের পরও তাই জয়টাই মুখ্য।

    স্কালোনি আগের ম্যাচের একাদশ থেকে পরিবর্তন এনেছিলেন একটি। মার্কোস আকুনিয়ার জায়গায় নেমেছিলেন এক্সিকুয়েল পালাসিওস। তরুণ মিডফিল্ডার বলিভিয়ায় খেলেছেন জাতীয় দলের হয়ে নিজের সেরা ম্যাচটি। তার দুই সঙ্গী পারেদেস আর ডি পলকে বদলি করালেও স্কালোনি পালাসিওসকে খেলিয়েছেন পুরোটা সময়। তবে ম্যাচের ভাগ্যটা বদলেছে স্কালোনির প্রথম বদলির সময়। ওকাম্পোসকে তুলে কোরেয়াকে নামিয়েছিলেন আর্জেন্টিনা কোচ। আলবিসেলেস্তেদের হয়ে নিজের দ্বিতীয় গোলে কোরেয়া সম্ভবত নিজের ক্যারিয়ারটাই আরেকবার জাগিয়ে তোলার কাজ করলেন।

    কোরেয়ার গোলের বিল্ড আপে মার্টিনেজ অফসাইডে ছিলেন কি না তা দেখতেই ভিএআর সময় লাগিয়ে দিয়েছিল প্রায় মিনিট পাঁচেক। রেফারির চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পরে মেসির মুখে হাসি ফুটেছে। কিন্তু যোগ করা সময়ে ৭ মিনিট মেসিদের মনে হয়েছে অনন্তকাল। শেষ বাঁশির পর ডাগ আউটে আর্জেন্টিনার কয়েকজন স্টাফ লাফ দিয়েও উঠেছিলেন। অথচ বলিভিয়া ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ের ৭৫-তম দল। ১৯৯৪ সালের পর আর বিশ্বকাপ খেলার ধারেকাছেও যেতে পারেনি তারা। লা পাজ না হলে বলিভিয়াকে হরহামেশাই গোলবন্যায় ভাসায় আর্জেন্টিনা। এই উদযাপন কি অতিরঞ্জিত?

    ম্যাচ শেষে হাভিয়ের মাসচেরানোর ‘ভামোস আর্জেন্টিনা’ টুইট দেখে আপনার মনে হতে পারে আর্জেন্টিনা বোধ হয় শিরোপাখরা কাটিয়ে ফেলল! চোটের কারণে দলের সঙ্গে থাকতে না পারা সার্জিও আগুয়েরোও দলকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। এই জয়ে আর্জেন্টিনার এমন লাভ হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে কি না তাও অজানা। আর্জেন্টিনার এই খেলায় শিরোপা স্বপ্ন দেখারমতো ইঙ্গিত খুঁজতে চাইলে সেই ঝুঁকি নিতে হবে নিজ দায়িত্বে। কিন্তু এই জয়ের মর্মটা আসলে আর্জেন্টাইনদের কাছে আলাদা কিছুই। সেটা চাইলেই কেড়ে নেওয়া যাবে না। বলিভিয়া এতোদিন ভুতুড়ে এক নাম হয়ে ছিল আর্জেন্টাইনদের জন্য। আর্জেন্টিনার মতো দল হলে যে কোনো ম্যাচের আগেই আপনাকে জয়ের কথা বলতে হবে। সে আপনার দলের অবস্থা যতই নাজুক হোক। এই দলকে ঘিরে মানুষের স্বপ্ন আর প্রত্যাশার যে বহর তাতে লড়াইয়ের আগে হেরে যাওয়ার সুযোগ আর্জেন্টিনার নেই। সেই দলের কোচ হয়েও বলিভিয়ার মাঠে ম্যাচের আগে স্কালোনিকে বলতে হয় উলটো কথা- ড্র করলেও নাকি তার জন্য ফলটা মন্দ হবে না! স্কালোনিরা এখন অন্তত সেই স্বাধীনতাটুকু পাবেন। বলিভিয়ার মাঠে খেলতে গেলেও গলা ছেড়ে ‘উচ্চাশার’ কথা জানাতে পারবেন।

     সেই সামর্থ্যটুকু লা পাজে প্রতিষ্ঠা করে গেলেন এবার মেসিরা। 

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন