• " />

     

    চমক জাগানো যত শিরোপাজয়: মালিকের মোহক আর ফন গালের পুনঃজাগরণ

    গতবারের প্রিমিয়ার লিগ জয়ী চেলসির মাঠে শিরোপা উল্লাস করছেন ভার্ডি, মাহরেজরা। দৌড়ে গিয়ে কেউ হয়ত শ্যাম্পনের ঝরনায় ভিজিয়ে দিচ্ছেন ক্লদিও র‍্যানিয়েরিকে। "চ্যাম্পিয়নে, চ্যাম্পিয়নে, ওলে ওলে ওলে" গানের সুরে তাল মেলাচ্ছে গোটা দল, আর স্ট্যামফোর্ড ব্রিজের এক কোণায় থাকা লেস্টার সমর্থকেরা।  লেস্টার যদি লিগ জিতেই যায়- তাহলে নিঃসন্দেহে সেটিই হবে ফুটবলের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঘটনগুলোর একটি! কিন্তু ফুটবলের ইতিহাসে সাড়া জাগান এমন লিগ জয়ের ঘটনা আছে আরও। সেসব নিয়েই 'চমক জাগান যত লিগ জয়' এর প্রথম পর্ব।   

    মপেলিয়ের ২০১১/১২

    লিগের শেষ ম্যাচে লরিয়েন্টকে হারিয়ে তড়িঘড়ি করে ড্রেসিংরুমে ফেরত আসল পিএসজির খেলোয়াড়েরা। দৃষ্টি সবার টেলিভিশন পর্দায়। অক্সেরের মাঠে মপেলিয়েরের ম্যাচের ফলের ওপর যে ঝুলে আছে পিএসজির ভাগ্য! ততক্ষণে অবশ্য অক্সের আর মপেলিয়েরের মাঝে ম্যাচটা শেষ হয়ে যাবার কথা ছিল। অক্সেরের দর্শকদের দাঙ্গা-হাঙ্গামায় আধ ঘন্টার মতো খেলা বন্ধ থাকায় উত্তেজনার বারুদটা বেড়েই চলছিল। মাঝে ম্যাচ পরিত্যক্ত হবার উপক্রমও হয়েছিল। অবনমন নিশ্চিত হয়ে যাওয়া অক্সেরের সমর্থকেরা রাগ ঝাড়ছিলেন গ্যালারি থেকে! টিস্যু পেপার থেকে শুরু করে পটকা কোনকিছুই বাদ রাখেননি তারা! ম্যাচের তখন মিনেট বিশেক। মপেলিয়ের বিরুদ্ধে ১-০ তে এগিয়ে অক্সের। মন্টপেলিয়ের হেরে গেলেই বহু বছর পর আবারও লিগ শিরোপাটা ঘরে তুলবে প্যারিসের ক্লাবটি। ৩২ আর ৭৬ মিনিটে জন উটাকার দুই গোলে লিগের শেষ ম্যাচে জিতেই লিগ ওয়ান শিরোপা জিতে যায় মপেলিয়ের।   

    অথচ এই ক্লাবটির গত ৮ মৌসুমের ৫টিই কেটেছে ফ্রান্সের দ্বিতীয় বিভাগের লিগে খেলে। ২০০৯ সালে লিগ ওয়ানে পদোন্নতি পাবার পর থেকে শীর্ষ পর্যায়ে টিকে থাকাই ছিল মপেলিয়েরের লক্ষ্য।

     

    খেলোয়াড়রা তো দূরেই থাক, লিগ জয়ের আশা দেখেননি খোদ ক্লাব মালিকও। ১৯৭৪ সালে এই ক্লাবের মালিকানা কিনে নেবার পর থেকে তো কম চেষ্টা চালাননি লুইস নিকোলিন! বহু টাকা খরচা করে এরিক ক্যান্টোনা, রজার মিলা, ভালদেরামাদের মতো তারকা খেলোয়াড় দলে ভিড়িয়েও তো খুব বেশি লাভ হয়নি!

    এমনকি ২০১১/১২ মৌসুমের মাঝামাঝি মপেলিয়ের যখন লিগের শীর্ষে তখনও বিশ্বাস হচ্ছিল না নিকোলিনের। আর হবেই বা কেন! মধ্যপ্রাচ্যের এক ধনকুবের কিনে নেবেন, কাড়ি-কাড়ি টাকা ঢালবেন, একজন অভিজ্ঞ ম্যানেজার নিয়োগ দেবেন দল সামলাতে...শিরোপা নিজেই পিছু পিছু হাঁটবে। ইউরোপের মাঝারি মানের ক্লাবগুলোর রাতারাতি সাফল্য অর্জনের সুত্রই হয়ে গিয়েছিল তখন এই রীতি। ইংল্যান্ডে ম্যানচেস্টার সিটির দাপটও তো তাই প্রমাণ করে! ততোদিনে আরব শেখদের ছোঁয়া লেগেছে ফ্রান্সের ফুটবলেও; বদলে গেছে পিএসজি! নতুন মৌসুমের আগে দল গোছাতে প্যারিসের ক্লাবটি ব্যয় করল প্রায় ৮২ মিলিয়ন পাউন্ড! এক পাস্তোরেকে পিএসজি দলে ভেড়াল ৩৭ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে। সেখানে ওই মৌসুমে মপেলিয়েরর পুরো দলের বাজেট ছিল ২৯ মিলিয়ন পাউন্ড! এমন দলকে টেক্কা দেয়ার কথা স্বপ্নে ভাবার আগেও তো চিন্তা করে নিতে হয়! শুধু পিএসজি কেন? লিও, অলিম্পিক মার্শেই, বোর্দোর মতো ফ্রান্সের ঐতিহ্যবাহী ক্লাবগুলোর কাতারে কখনই ঠাঁই হয়নি মপেলিয়েরের।  

    লিগ চলাকালীন মাঝামাঝি কোন একসময় নিকোলিনকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, “আপনার ক্লাব লিগ ওয়ান জিতলে কী করবেন?”। ঘুরেফিরে এই একই প্রশ্ন তাঁকে বেশ ক’বারই শুনতে হয়েছিল। প্রথম যেবার করা হয়েছিল প্রশ্নটি, লিগে পিএসজির পেছনে তখন দু’নম্বরে অবস্থান মপেলিয়েরের। মালিকের জবাবটা ছিল এরকম... “ মপেলিয়ের? চ্যাম্পিয়ন? অসম্ভব! আমি শুধু জানি যদি আমরা ইউরোপা কাপের জন্য কোয়ালিফাই করি, তাহলে আমি প্রচন্ড বিরক্ত হব!” নিকোলিনের কথা শুনে আপনি ধন্দে পড়ে যেতে পারেন! যে ক্লাব আগেরবার ১৪ তম হয়ে শেষ করেছিল লিগ, পরের মৌসুমে তাদের জন্য তো ইউরোপা লিগও বড় কিছুই হবার কথা ছিল! অথবা আপনি এটাও ভেবে নিতে পারেন যে নভেম্বরের শেষে দ্বিতীয়তে থাকা দলের তো শিরোপা লড়াইয়ের প্রস্তুতি নেবার কথা, চ্যাম্পিয়নস লিগের টিকেট তো তার সাথে ফ্রি! ইউরোপা কাপে খেলার শঙ্কায় ভুগবে কেন তাঁরা? নিকোলিনের অবিশ্বাসের গভীরতাটা নিশ্চয়ই আঁচ করতে পারছেন এতক্ষণে!  

    ডিসেম্বর না পেরোতেই লিগে শীর্ষে থাকা পিএসজি তাঁদের ম্যানেজার কম্বুয়ারেকে বিদায় করে দিয়ে দলে আনে কার্লো আনচেলোত্তিকে। ফেব্রুয়ারিতে যখন লিগ লিডার পিএসজি থেকে মাত্র ১ পয়েন্ট পিছিয়ে দ্বিতীয়তে মপেলিয়ের, তখন আবারও সে একই প্রশ্ন করা হয় নিকোলিনকে। এবার জবাব দিলেন, না খোঁচা দিলেন সেটা বিচারের দায়িত্ব আপনার ওপরই ছেড়ে দিলাম!

    “আমি যদি পিএসজি, লিলি, অথবা রেনেসের কেউ হতাম আর সামনে দিয়ে যদি মপেলিয়ের চ্যাম্পিয়ন হয়ে যেত, আমি সসেজকে চাকু বানিয়ে নিজেকে আঘাত করে মেরেই ফেলতাম”। নিজের শরীরের কোন স্থানে আঘাত করতেন, সে জায়গায়টিও নির্দিষ্ট করেই বলেছিলেন। বুদ্ধিমান পাঠকের সেটা বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়। 


    মার্চ গড়িয়ে এলে মপেলিয়েরের লিগ জয়টা আরও সম্ভব মনে হতে থাকল। ঠিক এখনকার লেস্টার সিটির মতোই। তবে নিকোলিনকে ছাড়ল না পুরনো সেই প্রশ্ন। ‘লিগ জিতলে কি করবেন?’। এবার নিকোলিন বললেন লিগটা যদি সত্যি সত্যিই জিতে যায় তাঁর দল, সেই খুশিতে তিনি রেমি কাবেলার মতো মোহক ছাট দেবেন মাথার চুলে!  

    এতো গেল মালিকের কথা। তখনকার রেকর্ড ৮২ পয়েন্ট অর্জন করে মপেলিয়েরের লিগ জয়ের রহস্যটা তবে কী? রহস্য আসলে কিছুই না। অলিভিয়ের জিরু! লিগে ২১ গোল করে সেবারের আসরের সর্বোচ্চ গোলদাতাই মপেলিয়েরের নায়ক। আর ৭৯ পয়েন্ট নিয়েও তাই দ্বিতীয়তে থেকে শেষ করতে হয়েছিল পিএসজিকে।
      
    প্যারিসের ক্লাবটিকে থামান গেলেও লুইস নিকোলিনের পাগলামোটা অবশ্য থামান যায়নি। ভদ্রলোক কথা রেখেছিলেন। রেমি কাবেলার মতো চুলে মোহক মেরেছিলেন! তাতেও ক্ষ্যান্ত দেননি ৬৭ বছরের বুড়ো! মপেলিয়েরের লোগোর রঙের সাথে মিল রেখে কমলা-নীল রঙে রাঙিয়ে নিয়েছিলেন নিজের চুলগুলোও!       

        

       

    এজেড আলকমার (২০০৮/০৯)

    মৌসুম শুরুর আগে ডাচ লিগের ১২ জন পন্ডিতের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল কোন দল জিততে পারে এবারের লিগ। দশ জন মত দিয়েছিলেন আয়াক্সের পক্ষে, আর বাকী দু’জন পিএসভি। তাঁদের বেশির ভাগের আন্দাজ করা পয়েন্ট টেবিলে ফল গালের এজেড আলকামারের স্থান ছিল ঘুরে-ফিরে পাঁচ কিংবা ছ’ নম্বরে। কারো কারোটায় তারও পরে।

    অমনটাই হওয়াই তো স্বাভাবিক ছিল। যে দল গতবার লিগে হয়েছিল ১১ তম, দলের খেলোয়াড়দের ওপর ‘অভিমান’ করে ক্লাব ছাড়তে চেয়েছিলেন ফন গালের মতোন ম্যানেজার; তাছাড়া নতুন মৌসুমের আগে দলে আসেনি তেমন কোনো পরিবর্তনও। সে দলের জন্য তো পাঁচ-ছয় বেশ মানানসই জায়গাই!

    লিগে এজেডের শুরুটাও ছিল অনুমিতই। প্রথম দু ম্যাচেই হার। তারপর পাল্টে গেলো এজেড, পাল্টালেন আসলে ফন গাল। আদর্শের চেয়ে অগ্রাধিকার দিলেন প্রয়োজনকে। ঐতিহ্যগত ডাচ প্রেসিং আর পজেশন ফুটবল থেকে বের হয়ে দলকে গড়ে তুললেন নতুন রূপে। কাউন্টার অ্যাটাকিং প্রধান একদলে পরিণত হল আলকমার। ফলটাও আসল দ্রুতই। প্রথম দু ম্যাচ হারের পর টানা ২৮ ম্যাচ অপরাজিত থাকল ফন গালের দল। আর তাতেই নিশ্চিত হয়ে গেল এজেডের লিগ জয়।  দ্বিতীয়তে থাকা এফসি টোয়েন্টির চেয়ে ১১ পয়েন্ট এগিয়ে ৮০ পয়েন্ট নিয়ে প্রতাপের সঙ্গেই লিগ ডাচ এরডিভিসির শিরোপা ঘরে তোলে ফন গালের এজেড। 



    ফন গাল অবশ্য নিজেকে ভাগ্যবান ভাবতে পারেন। আগের মৌসুমে ফল গালের ‘থেকে যাওয়ার’ ওই সিদ্ধান্তটাই নতুন করে পুনঃজাগরণ ঘটিয়েছিল তাঁর নিজের কোচিং ক্যারিয়ারেও।   

    ১৯৮১ সালে সবশেষ ডাচ এরডিভিসি ঘরে তুলেছিল এজেড। ওইবারই প্রথম। এর পরের ২৮ বছর নেদারল্যান্ডের লিগ শিরোপাগুলো নিজেদের মধ্যে ভাগ করেছে অ্যায়াক্স, পিএসভি আর ফেইনোর্ড। হাল যুগের ক্রিকেটে ৩ মোড়ল শব্দটার সাথে আমরা সবাই পরিচিত। ১৯৮১ এর পর থেকে ডাচ লিগটাও অনেকটাই ওই কায়দার কোন বস্তুতে পরিণত হয়েছিল, তবে সেটা শুধু লিগ জয়ের ক্ষেত্রেই।

    ফন গালের এজেড আলকমার ওই তিন দলের রাজত্বে হানা দিয়েছিল। হানা দিয়েছিল বললে ভুল হবে, জয় করেছিল।     

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন