• বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ
  • " />

     

    বিপিএলে প্রাপ্তি দেশীদের দাপট

    বিপিএল মানেই একটা সময় ছিল বিদেশি ব্যাটসম্যানদের দাপট। কুড়ি ওভারের এই আনন্দযজ্ঞে দেশীয় ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর হয়ে অনেকবার দর্শক মাতিয়েছেন ক্রিস গেইল-আহমেদ শেহজাদ ও কুমার সাঙ্গাকারারা। কিন্তু এবার সে চেনা দৃশ্যপটে এসেছে পরিবর্তন। এবারের নিষ্প্রাণ বিপিএলে দেশি ব্যাটসম্যানরাই মাতাচ্ছেন। তাঁরা এতটাই ভালো খেলছেন যে রান সংগ্রহের দিক থেকে শীর্ষ পাঁচে জায়গাই পাননি কোনো বিদেশি খেলোয়াড়।

    বিপিএলের প্রথম আসর ছিল বিদেশি ব্যাটসম্যানদের জন্য সবচেয়ে পয়া। সেবার সর্বোচ্চ রান সংগ্রহকারী দশ ব্যাটসম্যানের নয় জনই ছিলেন বিদেশি। ১২ ম্যাচে ৪৮৬ রান নিয়ে সেবার বিপিএলে সর্বোচ্চ স্কোরারের তালিকায় শীর্ষে ছিলেন বরিশাল বার্নাসের পাকিস্তানি ব্যাটসম্যান আহমেদ শেহজাদ। ১১ ম্যাচে ৩৯০ রান করে ঢাকা গ্লাডিয়েটরসের আরেক পাকিস্তানি ব্যাটসম্যান ইমরান নাজির ছিলেন দ্বিতীয়। তালিকার শীর্ষ দশের বাকি অংশজুড়েও জয়জয়কার ছিল বিদেশিদের। একমাত্র ব্যতিক্রম সাকিব আল হাসান। খুলনা রয়েল বেঙ্গলসের হয়ে ১১ ম্যাচে ২৮০ রান করে দশম শীর্ষ রান সংগ্রাহক হন বিশ্বসেরা এই অলরাউন্ডার।

    সেখান থেকে বিপিএলের দ্বিতীয় আসরে বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের সাফল্য নিঃসন্দেহে প্রণিধানযোগ্য। শীর্ষ পাঁচ ব্যাটসম্যানের তিনজনই এবার বাংলাদেশি। ১৩ ম্যাচে ৪৪০ রান নিয়ে শীর্ষ রান সংগ্রাহক ছিলেন সিলেট রয়্যালসের মুশফিকুর রহিম। ১২ ম্যাচে ৪২১ রান নিয়ে রংপুর রাইডার্সের শামসুর রহমান ছিলেন তৃতীয় অবস্থানে। ১২ ম্যাচে ৩৯৫ রান নিয়ে পঞ্চম খুলনা রয়েল বেঙ্গলসের শাহরিয়ার নাফীস। সেবারেই প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটসম্যান হিসেবে বিপিএলে সেঞ্চুরি করেন এই বাঁহাতি ব্যাটসম্যান। দুরন্ত রাজশাহীর বিপক্ষে অপরাজিত ১০২ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলেছিলেন নাফীস।

    গত বছর অনুষ্ঠিত হয় বিপিএলের তৃতীয় আসর। তাতে অবশ্য আবারও শীর্ষে উঠে আসেন একজন বিদেশি ব্যাটসম্যান। তিনি শ্রীলঙ্কান কিংবদন্তি কুমার সাঙ্গাকারা। ১০ ম্যাচে ৩৪৯ রান নিয়ে শীর্ষ রান সংগ্রাহক ছিলেন ঢাকা ডায়নামাইটসের এই বাঁহাতি ওপেনার। তবে শীর্ষ পাঁচে ছিল বাংলাদেশিদেরই প্রাধান্য। বলা যায় বিপিএল দিয়ে ক্যারিয়ারের পুনর্জন্ম ঘটে ইমরুল কায়েসের। ১২ ম্যাচে ৩১২ রান করে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের ওপেনার ছিলেন টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক। ৯ ম্যাচে ২৯৮ রান নিয়ে চিটাগং ভাইকিংসের তামিম ইকবাল তৃতীয় ও ১৩ ম্যাচে ২৭৯ রান করে বরিশাল বুলসের মাহমুদউল্লাহ ছিলেন চতুর্থ অবস্থানে।

    এবার মাত্রই শেষ হয়েছে বিপিএলের প্রথম পর্ব। তাতেই শ্রেষ্ঠত্বের পতাকা উড়িয়েছেন দেশি ব্যাটসম্যানরা। শীর্ষ পাঁচ ব্যাটসম্যানের সবাই বাংলাদেশি। ৪ ম্যাচে ১৮৪ রান নিয়ে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক বরিশাল বুলসের শাহরিয়ার নাফীস। সমান ম্যাচে ১৭৪ রান নিয়ে দ্বিতীয় নাফীসেরই সতীর্থ মুশফিকুর রহিম। তিন নম্বরে আছেন এবারের বিপিএলে ‘সারপ্রাইজ প্যাকেজ’ হয়ে আসা ঢাকা ডায়নামাইটস ওপেনার মেহেদী মারুফ। চার ম্যাচে ১৭০ রান করেছেন এই ২৮ বছর বয়সী ব্যাটসম্যান। ১৫৭ রান নিয়ে রাজশাহী কিংসের সাব্বির রহমান চার ও ১৪৩ রান নিয়ে তামিম ইকবাল আছেন পাঁচ নম্বরে। মোসাদ্দেক ১১৭ রান করে সাতে থাকলেও একটা দিক দিয়ে সবার চেয়ে এগিয়ে। এখনো বিপিএলে তাঁকে আউট করতে পারেননি কেউ।


    অনুর্ধ্ব-১৯ দলে সাকিব-তামিম-মুশফিকদের সতীর্থ ছিলেন মেহেদী মারুফ। খেলেছেন ২০০৬ সালের অনুর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপেও। কিন্তু সতীর্থরা যেমন দ্রুতই নিজেদের জাত চিনিয়ে জায়গা পাকা করেছেন জাতীয় দলে, তেমনটি হয়নি মারুফের বেলায়। জায়গায় দাঁড়িয়ে বড় বড় ছক্কা মারায় তাঁর একটা খ্যাতি ছিল। কিন্তু বড় ইনিংস খেলার ব্যাপারে তিনি ছিলেন আশ্চর্য রকম ম্লান। সেজন্য ঘরোয়া ক্রিকেটের বৃত্তেই ঘুরপাক খেতে থাকে তাঁর ক্যারিয়ার। কিন্তু সেখান থেকে আস্তে আস্তে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ রাখতে শুরু করেন তিনি। ২০১৪-১৫ মৌসুমে প্রাইম দোলেশ্বরের হয়ে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে ৫৭৭ রান করেন মারুফ। এ বছর সে টুর্নামেন্টেই প্রাইম ব্যাংকের হয়ে ১৬ ম্যাচে ৫০০ রান করেন তিনি। এরপরই সুযোগ মেলে ঢাকা ডায়নামাইটসের তারকা শোভিত দলে।

    গতবারের বিপিএলে বরিশালের হয়ে খেলেছিলেন মেহেদী মারুফ। খুব একটা ভালো যায়নি সেটি। ১০ ম্যাচে ৮২.৮৯ স্ট্রাইক রেটে ১৩৭ রান করেছিলেন তিনি। সেখান থেকে এবারে প্রথম চার ম্যাচে অভাবনীয় উন্নতি করেছেন এই ওপেনার। এ পর্যন্ত তাঁর স্ট্রাইক রেট ১৫৪.৫৪। গতকাল কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের বিপক্ষে ৩৯ বলে ৬০ রান করে মাচ সেরা হয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসেছিলেন মারুফ। জানিয়েছেন তাঁর প্রিয় ব্যাটসম্যান ম্যাথু হেইডেন। ভালোবাসেন প্রিয় ব্যাটসম্যানের মতো উড়িয়ে মারতে। বলেছেন টিম ম্যানেজমেন্ট তাঁকে হাত খুলে খেলার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে। সেজন্যই মাঠে নেমেই প্রতিপক্ষ বোলারদের পর শুরু থেকেই চড়াও হয়ে খেলতে পারছেন। ছক্কা মারা তাঁর বৈশিষ্ট্য। বড় ইনিংস খেললে তাতে দুটির বেশি ছক্কা মেরেই থাকেন মারুফ।

     

    খেলোয়াড় দল  রান
    শাহরিয়ার নাফীস  বরিশাল বুলস ১৮৪
    মুশফিকুর রহিম  বরিশাল বুলস ১৭৪
    মেহেদী মারুফ  ঢাকা ডায়নামাইটস ১৭০
    সাব্বির রহমান  রাজশাহী কিংস ১৫৭
    তামিম ইকবাল  চট্টগ্রাম ভাইকিংস ১৪৩



    শুধু রানের দিক থেকেই নয়, ছক্কা মারার দিক থেকেও এবারে বিপিএলে এগিয়ে বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানরা। এ পর্যন্ত এবারের বিপিএলে সর্বোচ্চ ছক্কা মেরেছেন সেই মেহেদী মারুফ। ১০ ছক্কা নিয়ে তিনি আছেন শীর্ষে। ৯ ছক্কা নিয়ে দ্বিতীয় সাব্বির রহমান। মজার ব্যাপার হলো, চার ম্যাচের মাত্র একটিতেই এই ছয় গুলো মেরেছিলেন রাজশাহীর ব্যাটসম্যান। খুলনা টাইটানসের বিপক্ষে ৬১ বলে ১২২ রানের অনবদ্য ইনিংস খেলার পথে নয়টা ছক্কা মেরেছিলেন তিনি। বাকি তিন ম্যাচে মারেননি একটিও। আটটি করে ছক্কা মেরেছেন বরিশাল বুলসের মুশফিকুর রহিম ও ডেভিড ম্যালান। সব মিলিয়ে বিপিএলে সর্বোচ্চ ছক্কা মারার রেকর্ডটি অবশ্য ক্রিস গেইলের। বিপিএলে মাত্র ১০টি ম্যাচ খেলে ৫০টি ছক্কা হাকিয়েছেন এই বিধ্বংসী ব্যাটসম্যান।

    তবে সব মিলিয়ে বিপিএলের চার আসরে মোট রান সংগ্রহের দিক থেকে এগিয়ে বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানরা। ৩৮ ম্যাচে সর্বোচ্চ ১০০৫ রান করেছেন মুশফিকুর রহিম। সমান ম্যাচে ৭৯৯ রান করে দ্বিতীয় সাকিব আল হাসান। একই সংখ্যক ম্যাচে ৭৭০ রান করে তৃতীয় নাসির হোসেন। ৪০ ম্যাচে ৭৬২ রান করে চতুর্থ এনামুল হক বিজয়। ২৩ ম্যাচে ৭৫৬ রান নিয়ে তালিকায় পঞ্চম একমাত্র বিদেশি ব্যাটসম্যান ব্র্যাড হজ।  

    এ কথা সত্য যে বিপিএলের আগের আসরগুলোর মতো বিদেশি তারকার সমাগম এবার হয়নি। প্রথম পর্বের শেষের কয়েকটা ম্যাচ ছাড়া প্রকটভাবে দেখা গেছে রানখরা। কিন্তু তার মধ্যেও দারুণভাবে জ্বলে উঠেছেন বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানরা। কাল কুমিল্লার বিপক্ষে ম্যাচের পর স্থানীয় খেলোয়াড়দের ভূয়সী প্রশংসাও করেছেন ঢাকার ইংলিশ ব্যাটসম্যান রবি বোপারা। বিপিএলের এখনো অনেকটা বাকি। শেষ পর্যন্ত দেশীয় ব্যাটসম্যানরা ভালো করতে পারলেই সেটা হবে ভবিষ্যৎ আত্মবিশ্বাসের জ্বালানী।

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন