• ক্রিকেট

ঈশ্বরের ক্রিকেট, শয়তানের অ্যাশেজ : পর্ব ২

পোস্টটি ২৮৫৭৫ বার পঠিত হয়েছে

জর্জ রবার্ট ক্যানিং হ্যারিস বা শুধু লর্ড হ্যারিস দুর্বল শৌখিন একটা দল পেলেন সেবার। দুইজন পেশাদার নিয়েই গেলেন দুনিয়ার অন্য প্রান্তে। এমসিজিতে একটা টেস্ট, স্পফোর্থ করলেন হ্যাটট্রিক। অস্ট্রেলিয়ার সহজ জয়। এরপর আরেকটা টেস্ট হওয়ার কথা। তবে তার আগে, নিউ সাউথ ওয়েলসের সঙ্গে একটা ম্যাচ। যে দলের অধিনায়ক ডেভ গ্রেগরি। প্রত্যেক দলকে একজন করে আম্পায়ার ঠিক করে দিতে হলো। 

নিউ সাউথ ওয়েলস ব্যাপারটা নিল বেশ গুরুত্ব দিয়ে। এডমুন্ড বার্টনকে বাছলো তারা, তখন তিনি ব্যারিস্টার, উঠতি রাজনীতিবিদ। ২২ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার প্রথম প্রধানমন্ত্রীও ছিলেন তিনিই। মেলবোর্ন ক্রিকেট ক্লাবের সুপারিশে ইংল্যান্ড বেছে নিল জর্জ কোল্টহার্ডকে। ২২ বছর বয়সী অস্ট্রেলিয়ান রুলস ফুটবলার, এ ভিক্টোরিয়ান আবার নেটে বোলিং-ও করতেন। 

ম্যাচটা সিডনিতে, এখনকার এসসিজিতে। সে সময় ভিক্টোরিয়ার সঙ্গে নিউ সাউথ ওয়েলসের রেষারেষি তুঙ্গে। আম্পায়ারিংয়ের সম্মান নিতে এসে কোল্টহার্ড তাই বিপাকেই পড়ে গেলেন।


(ঈশ্বরের ক্রিকেট, শয়তানের অ্যাশেজ : পর্ব ১)


প্রথম দিন। ইংল্যান্ডের ব্যাটিং চলছিল ভালই। কোল্টহার্ড লর্ড হ্যারিসকে নট আউট দিলেন, কট বিহাইন্ডের আবেদনে। দর্শকরা খেপে উঠলো। কোল্টহার্ডকে যিনি নিয়োগ করেছিলেন, তার বিরুদ্ধেই আউট দেননি, দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে সেটা ছড়িয়ে পড়লো সংবাদপত্রময়। ভেসে এলো ফিসফাস, কোল্টহার্ড ইংল্যান্ডের পক্ষে বাজি লাগিয়েছিলেন! 

পরদিন দর্শকরা আবার হাজির। নিউ সাউথ ওয়েলসই শুধু ধ্বসে পড়লো ব্যাটিংয়ে। এক বিলি মারডোখ ছাড়া। ৮২ রানে ব্যাট ক্যারি করলেন, বাকিদের অবস্থা ছিল যাচ্ছেতাই। ফলো-অনে আবার ব্যাটিংয়ে এনএসডব্লিউ। এবার মারডোখ হলেন রান-আউট। দর্শকদের মতে, যেটা খুবই বাজে সিদ্ধান্ত। গ্রেগরি পরের ব্যাটম্যান পাঠাতে আপত্তি করলেন, কোল্টহার্ডকে আম্পায়ারিং থেকে সরিয়ে নিতে বললেন এর আগে।

গ্রেগরি অবশ্য আগে থেকেই এমন, আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত তার পছন্দ হয় না। লর্ড হ্যারিসও তার প্রস্তাব মানলেন না। দাঙ্গা লেগে গেল। হ্যারিস পরে দেশে একটা চিঠি পাঠিয়েছিলেন, ‘মাঠে জনতার ভিড়, আমাদের দল ঘিরে রেখেছে তারা। আমি সঙ্গে সঙ্গেই উইকেটে গিয়ে কোল্টহার্ডকে বাঁচাতে চাইলাম, যাকে এক ‘ল্যারিকিন’(অস্ট্রেলিয়ায় মাস্তান) লাঠি দিয়ে মারতে আসছিল।’ 

হ্যারিস ও ইংল্যান্ড মাঠেই থাকলো, মাঠ ছেড়ে যেতে তাদের সাহসে কুলাচ্ছিল না। খেলা ওখানেই শেষ। 

 

 

কোল্টহার্ডের সহকারি এডমুন্ড বার্টন অবশ্য বলেছিলেন, সিদ্ধান্তটা ভালই ছিল। তবে তাদের নায়ক মারডোখের প্রতি অবিচারের কারণে, এত বেশি ঘৃণা আর দ্বেষ ছড়িয়ে পড়েছিল ইংল্যান্ড আর ভিক্টোরিয়ান কোল্টহার্ডের প্রতি, দাঙ্গা ফুলে ফেঁপে উঠছিল শুধুই। 

পরদিন খেলা শুরু হলো আবার। তবে ‘রেস্ট ডে’-র পর রবিবাবের খেলা ভেসে গেল বৃষ্টিতে। হতাশ হ্যারিস অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে দ্বিতীয় টেস্টটা খেললেনই না! 

লর্ড হ্যারিস পরে বম্বের খুবই অজনপ্রিয় এক গভর্নর হয়েছিলেন। তবে অস্ট্রেলিয়া থেকে তার পাঠানো সেই চিঠি আর গল্প বলার ধাঁচটা ইংল্যান্ডে গুরুত্ব পেয়েছিল বেশ। দুই দেশের মধ্যে দ্বন্দ্বটাও তাই উঠলো আরেকটু উঁচুতে। 

লর্ডের চিঠির কারণে বিপাকে পড়লো অস্ট্রেলিয়া। ১৮৮০ সালে ইংল্যান্ডে এসে তারা দলই খুঁজে পায়না! যারা রাজি হলেন, তারাও কেউ লন্ডনের না। অস্ট্রেলিয়াকে প্রতিপক্ষ চেয়ে বিজ্ঞাপন পর্যন্ত দিতে হলো! 

এগিয়ে এলো ওভাল। হ্যারিসকেই বলা হলো একটা দল জোগাড় করতে। স্পফোর্থ চোটের কারণে খেলবেন না, হ্যারিস তো অনেকখানি ম্যাচ জিতে গেলেন তখনোই!

তবে ইংল্যান্ড দলটা ছিল বেশ শক্তিশালী। এক-দুই জন না, সে ম্যাচে খেলেছিলেন তিনজন গ্রেস! পেশাদার ক্রিকেটারও ছিল সে দলে। ইংল্যান্ডের মাটিতে সেটাই প্রথম টেস্ট, তখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি দর্শক হয়েছিল সেবারই। ডব্লিউজিরও সেটা প্রথম টেস্ট, প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিও। 

ম্যাচের আগে কে বেশি রান করবেন, এ নিয়ে মারডোখের সঙ্গে একটা স্বর্ণমুদ্রা বাজি ধরলেন গ্রেস। গ্রেস ১৫২ করলেন তার প্রথম ইনিংসে, ইংল্যান্ড করলো ৪২০। অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংসে করলো ১৪০, মারডোখ করলেন শূন্য। অস্ট্রেলিয়াকে ফলো-অন করালো ইংল্যান্ড। ১৮৭ রানেই নেই ৮ উইকেট, অস্ট্রেলিয়া তখন হাপিত্যেশ করছে রীতিমতো। তবে মারডোখ ছিলেন অবিচল। শেষ ২ উইকেটে আরও ১৪০ রান যোগ করলো অস্ট্রেলিয়া। মারডোখ বাজি জিতলেন এক রানে। 

 

 

সে স্বর্ণমুদ্রাটা বাকিটা জীবন গলায় ঝুলিয়ে রেখেছিলেন মারডোখ। ঈশ্বরের সঙ্গে বাজিতে সবাই রোজ জেতে নাকি! গ্রেসও বলেছিলেন, মারডোখ সেবার খেলেছিলেন সর্বকালের সেরা ইনিংসগুলোর একটি। অস্ট্রেলিয়া হারলো, তবে সিডনির সেই দাঙ্গার ক্ষতটা যেন শুকিয়ে গেল এরপর। অস্ট্রেলিয়া দেশের মাটিতে পরের সিরিজটা জিতলো ২-০ তে। এবার সে দলে ছিলেন সেই আম্পায়ার কোল্টহার্ড। ১১ নম্বরের নেমে ৬ রান করেছিলেন, বল করারও সুযোগ পাননি তার একমাত্র টেস্টে। 

১৮৮২ সালে ইংল্যান্ডে পরের সিরিজটা খেলতে দুই দলই ফিরলো একই জাহাজে। সঙ্গে এলো ক্রিকেটের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দ্বৈরথের উপলক্ষ্যও। 

অস্ট্রেলিয়ার শুরুটা ভাল হলো, হিউজ ম্যাসি অক্সফোর্ডের সঙ্গে করলেন ২০৬। অক্সফোর্ড তখন ইংল্যান্ডের অন্যতম শক্তিশালী দল। অস্ট্রেলিয়া প্রায় সবাইকেই হারিয়ে দিল, শুধু ক্যামব্রিজ ছাড়া। সে দলে ছিলেন ‘স্টাড’ ভাতৃদ্বয়। তবে ল্যাঙ্কাশায়ারের সঙ্গে স্বরুপে ফিরলো অস্ট্রেলিয়া, স্পফোর্থ নিলেন ১৬ উইকেট। 

পুরো শক্তির ইংল্যান্ডের দেখা অস্ট্রেলিয়া পেয়েছিল এর আগে একবারই, তাদের আগের সফরে ওভালে।  এবার অবশ্য ইংল্যান্ডের দলটা কাগজে কলমে বেশ শক্তিশালি। অস্ট্রেলিয়ার ছিল বিলি মারডোখ, তবে তিনি ছাড়া বাকি ব্যাটসম্যানরা বেশ নড়বড়ে। বোলিংয়ে স্পফোর্থ ও বয়েল ছিলেন, তবে বিপক্ষ দলে ছিলেন প্রথম শ্রেণিতে দশ হাজারের ওপরে রান করা গ্রেস ও তার সঙ্গীরা।

অস্ট্রেলিয়া টসে জিতলো। ৪ বলের ওভারেও টিকলো ৮০ ওভার। রান ৬৩। বিকেল সাড়ে তিনটার মাঝেই ব্যাটিংয়ে ইংল্যান্ড। নিজেদের ব্যাটসম্যানের ওপর বিরক্ত হয়েই কিনা কে জানে, স্পফোর্থ প্রথমেই সরিয়ে দিলেন গ্রেসকে। শুধু গ্রেস না, আসলে প্রায় সবাইকেই। দিনের শেষভাগে ইংল্যান্ডও অল-আউট ১০১ রানে, স্পফোর্থ নিলেন ৪৬ রানে ৭ উইকেট। ৩৬.৩ ওভার বোলিং করে অর্ধেকই দিলেন মেইডেন।

হিউজ ম্যাসি অস্ট্রেলিয়ার হয়ে সব মিলিয়ে নয়টি টেস্ট খেলেছিলেন। গড় ১৫, পঞ্চাশের ওপরে ইনিংস ছিল একটিই। ম্যাসির ব্যাটিংয়ে লক্ষ্মী ভর করেছিল ওই একদিনই। 

অস্ট্রেলিয়া যেন মিনিটের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রান তুলছিল এরপর। ব্যানারম্যান স্কয়ার দিয়ে মারছিলেন খুবই কম, তবে ম্যাসি চূর্ণ করছিলেন। ৯ চারে করলেন ৫৫। ম্যাসির ভাল শুরুটা হেলায় হারালেন বাকি ব্যাটসম্যানরা। মারডোখ চেষ্টা করলেন ধরে রাখতে। আট নম্বরে এলেন অলরাউন্ডার জোনস। দুজন মিলে অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে গেলেন ১১৪ পর্যন্ত। 

মারডোখ এরপর লেগসাইডে একটা মারলেন। কিপার গিয়ে ফিল্ডিং করে থ্রো পাঠালেন, এর আগে সিঙ্গেলটা হলো অনায়াসেই। ব্যাক-আপে গিয়েছিলেন গ্রেস। জোকস তার দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে উইকেটের দিকে মনোযোগ দিলেন। পেছনে গ্রেসের কান্ড খেয়াল করেননি মোটেও। 

 

 

জোনস এগিয়ে গিয়ে টোকা মারছেন পিচে, গ্রেস এদিকে ফেলে দিলেন বেইলস। তার আবেদনে স্কয়ার লেগ আম্পায়ার আঙ্গুল তুললেন। ঈশ্বরের দাবি, মানতেই হবে! মারডোখ ক্ষেপলেন, ঈশ্বরের কাছে নালিশও করলেন। এমনকি অন্য ইংলিশ ক্রিকেটারও অনুযোগ করলেন। কিন্তু ঈশ্বর বা আম্পায়ার, মত বদলালেন না কেউই। ক্রিকেটের আইন অনুযায়ী আউট জোনস। বছর পঞ্চাশেক পর জানা গিয়েছিল, জোনস গ্রেসকে তখনও ক্ষমা করেননি। 

এলবিডাব্লিউ দেওয়ার পরও গ্রেস যেবার উঠতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন, তিনি করেছিলেন অপরাজিত ৪০০ রান। দিনশেষে স্কোরকার্ড দেখাচ্ছিল ৩৯৯, স্কোরারকে গ্রেস বলেছিলেন সেটা পুরিয়ে দিতে। গ্রেস তার ক্যারিয়ারজুড়েই লোকদের নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছেন, ‘ভদ্রলোক’ কথাটাকে নিয়ে গেছেন ভদ্রতার শেষ সীমা পর্যন্ত! ক্রিকেটে পায়ের ব্যবহার থেকে শুরু করে এই খেলাকে অন্য পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া ঈশ্বর সবই করেছেন নিজের মতো করে। যেটা নিজের মতো ছিল না, বানিয়ে নিয়েছেন সেভাবে। তা স্কোরারকে দিয়ে স্কোর বদলিয়েই হোক, আর গোবেচারা জোনসকে রান-আউট করেই হোক! 

কিন্তু এটা তো আর শৌখিন কোনো ম্যাচ নয়। রীতিমতো জাতীয় পর্যায়ের ম্যাচ। ক্রিকেট ম্যাচের ব্যাপারগুলোই ততোদিনে বদলাতে শুরু করেছে। শুধু দল বা অঞ্চলের জন্য না খেলে ক্রিকেটাররা তখন খেলছেন আরও বেশি কিছুর জন্য। সেদিন সেই একটা রান-আউটের ব্যাপারই যেন অস্ট্রেলিয়ানদের জান্তব সত্ত্বাটা জাগিয়ে দিল। বিশেষ করে একজন অস্ট্রেলিয়ানের। 

যিনি নামলেন স্যামি জোনস মাঠ ছাড়ার পর। সাক্ষাত শয়তান। 

সাধারণ দিনেই স্পফোর্থ রাগী আর উন্মত্ত একজন। এমন গন্ডগোলে আরও ক্ষীপ্র কেউ। হয়তো গ্রেস তাকে কিছু বলেছিলেন, হয়তো ভেংচি কেটেছিলেন, অথবা কিছুই করেননি। স্পফোর্থ তাতেই হয়ে উঠেছেন উন্মত্ত। ব্যাটিংয়ে স্পফোর্থ করলেন শূন্য। তবে ইংল্যান্ড ফিল্ডাররা যদি কোনও আওয়াজও করে থাকেন এরপর, তাহলে তারা ভুল করেছিলেন। 

অস্ট্রেলিয়ার সম্বল ৮৫। ইনিংস বিরতিতে স্পফোর্থ ইংল্যান্ড ড্রেসিংরুমে গিয়ে গ্রেসকে অপমান করে এলেন। গ্রেস বোধহয় খুশিই হয়েছিলেন, তার কৌশল কাজে লেগেছে! তবে আসার আগে গ্রেসকে বলে এসেছিলেন, ‘এটা তোমাকে ম্যাচটা হারিয়ে দিবে, দেখো’। এরপর নিজ সতীর্থদেরকে বলেছিলেন, ‘আমি ওই বুড়োকে বল করবো। ভিমড়ি খাইয়ে ছাড়বো’। এরপর একটা চিৎকার। যে চিৎকারে আজও বিশ্বাস করে অস্ট্রেলিয়ানরা, ‘দিস থিং ক্যান বি ডান!’ 

 

 


জর্জ বোনার ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার বিগ হিটিং ব্যাটসম্যান। দেখে মনে হতো, সদ্যই কাদামাটি থেকে উঠে আসলেন। গ্রেসের কাছে এগিয়ে গিয়ে ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি উচ্চতা থেকে নিচে তাকিয়ে বললেন, ‘তুমি আমাদের সঙ্গে যা করেছো ডব্লিউজি, এরপরও যদি আমরা ম্যাচটা না জিতি, তাহলে স্বর্গে কোনও ঈশ্বর নেই’। ক্রিকেটের ঈশ্বর নিশ্চিতভাবেই ছিলেন অবশ্য সেখানে।  

ইংল্যান্ড অধিনায়ক মানকি হর্নবি ব্যাটিং অর্ডারের খোলনচলে পালটে দিলেন। নিজেকে দশ নম্বর থেকে আনলেন ওপেনিংয়ে। তার ব্যাট দেখলো ৯, তার সর্বোচ্চ টেস্ট স্কোর। স্পফোর্থ হর্নবি আর বারলোকে আউট করলেন পরপর দুই বলে। ইংল্যান্ডের রান তখন মাত্র ১৫। এরপরই একটা জুটি। ৮৫ রান তাড়ায় যেরকম জুটি ম্যাচ জেতাতে পারে, তেমন। গ্রেস ছিলেন উইকেটে। ২ উইকেটেই ইংল্যান্ড পেরিয়ে গেল ৫০। বাজির দর অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে একের বিপরীতে ছয়। শয়তান এরপর প্রান্ত বদল করলেন।  

ভক্সহল প্রান্তে স্পফোর্থের কিছু একটা হলো। নেভিল কার্ডাস লিখেছিলেন, ‘তার হাবভাবে এরপর একটা বৈরিভাব এলো। আধাঘন্টা আগেও যেমন ছিল, মনে হলো উচ্চতা বেড়ে গেছে তার। ডান হাতটা যেন আরও বেশি সর্পিল হয়ে গেছে। তার মাঝে কোনও উত্তেজনা ছিল না। আদতে সে ছিল ঠান্ডা মাথার খুনিদের মতো।’ 

লোকে অনেক সময়ই বলে থাকে, স্পফোর্থ সেদিন ক্রুদ্ধ হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। আদতে তা নয়। তিনি যা করেছিলেন, সেটা ছিল আরও ভয়ঙ্কর। ক্রোধ তাকে পেয়ে বসেছিল। এরপর তিনি সেটাকে বশে এনে কাজে লাগিয়েছিলেন। নিবদ্ধ করেছিলেন একদিকে।

জাহাজে আসার সময় স্পফোর্থকে পরিচয় করে দেয়া হয়েছিল ‘মেফিস্টোফিলিস’ বা ‘দানব’ হিসেবে। সেদিন তিনি আদতেই ‘মেফিস্টোফিলিস’ হয়ে উঠেছিলেন ওভালে। 

স্পফোর্থ শুধু গ্রেসের ব্যাটিং সঙ্গীর স্টাম্প ধ্বংসই করে দিলেন না, তাকেই আরেকটু হলে ধ্বংস করেছিলেন। ওপাশে দাঁড়িয়ে যেন ঈশ্বর নিজেই ভূত দেখলেন। হয়তো শয়তানের চোখের দিকে তাকিয়েছিলেন। তবে দুই রান পরই বয়েলের বলে আউট হলেন তিনি। 

গ্রেস যেমন প্রতাপশালি ছিলেন, তার বিদায়ে তার দল পড়তো তেমনই দুর্দশাই। তবে ৬ উইকেট হাতে ৩২ রান, ব্যাপারটা গ্রেসহীন অবস্থাতেও সাঁতরে সমুদ্র পার হওয়ার মতো কঠিন না। 

একজন ভাল বোলার রক্তের গন্ধ পান। একটা ব্রেকথ্রুর পর তাদের চিৎকার শুনলেই বোঝা যায় তা। শেন ওয়ার্ন যখন হার্শেল গিবসের উইকেটটা নিয়েছিলেন ১৯৯৯ সালে, ওয়ার্নের চোখে এটা ছিল। কার্টলি অ্যামব্রোস বা ফ্রেড ট্রুম্যান ক্যারিয়ারজুড়েই এটা করে গেছেন। শুধু একটা উইকেট নিয়ে তারা যে ক্ষতটা করতেন, সেটাই পুরো ইনিংসকে লাশ বানিয়ে দিতো।  

অস্ট্রেলিয়ার হয়ে সেদিন এ কাজটা করেছিলেন তাদের দেবদূত। ইংল্যান্ডের জন্য যিনি এনেছিলেন দুঃস্বপ্ন। দুঃস্বপ্নের দেবদূত, আদতে যিনি শয়তান। 

মেইডেন। মেইডেন। মেইডেন। মেইডেন। মেইডেন। মেইডেন। মেইডেন। মেইডেন। মেইডেন। মেইডেন। মেইডেন। মেইডেন।

গ্রেস আউট হওয়ার পর মেইডেন হলো ১২টা। রান না করে থাকতে পারলেন না ইংলিশ ব্যাটসম্যানরা, আউট হওয়াটাই শ্রেয় মনে করলেন। স্পফোর্থ আলফ্রেড লিটেলটনকে করলেন বোল্ড। ৫ উইকেট শেষ, হর্নবি ব্যাটিং অর্ডার অদল বদল করলেন আবার। 

 

 


চার্লস স্টাডের আগে এলেন অ্যালান স্টিল। স্পফোর্থ পরিকল্পনা ধরতে পারছিলেন। স্টিল ব্যাট করতে পারেন ঠিকই, তবে স্টাডের সেই গ্রীষ্মে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে তিনটি সেঞ্চুরি আছে। চার্লস আবার স্টাড ভাতৃদ্বয়ের মাঝে ছিলেন বেশি ক্যারিশমাটিক। সেই তাকেই নামিয়ে দেওয়া হলো নিচে। 

স্পফোর্থ মাখনের মতো স্টিলের ভেতর দিয়ে চলে গেলেন। এরপর রিড। এরপর লুকাস। কেউ টিকলেন না। তবুও স্টাডের দেখা নেই। 

উত্তেজনা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল, গল্প প্রচলিত আছে, একজন নাকি মারাই গিয়েছিলেন। আরেকটা গল্প এমন, একজন ছাতার হাতল চিবুচ্ছিলেন। আর মাঠে নামা স্টাডকে দেখাচ্ছিল ভূতের মতো। 

স্টাডের শুরুটা হলো নন-স্ট্রাইকিং প্রান্তে। বয়েল এদিকে বার্নসের উইকেটটা নিলেন। এলেন টেড পিট, স্টাডের দিকে তাকিয়েই বুঝলেন, তিনি কোনোমতেই রান নেওয়ার অবস্থাতে নেই। পিট ছিলেন বাঁহাতি স্পিনার, টেস্টে কোনোবারই ১৩ এর বেশি রান করেননি। ইংল্যান্ডের দরকার ছিল ৯। 

পিটের খুব নিরীহগোছের একজোড়া গোঁফ ছিল। স্পফোর্থের গোঁফের পুরো উলটো। স্বাভাবিক দিনেই পিট স্পফোর্থের মোকাবিলা করার মতো কেউ নন। আর সেদিন স্টাডকে মনে হচ্ছিল, তার পক্ষে সেটা আরও অসম্ভব। পিট বয়েলের বলে ব্যাট চালাতে লাগলেন। মিস করলেন। ব্যাটে লাগলো একটা। আবার মিস করলেন। এবার ভাঙলো স্টাম্প। 

ঔপনিবেশিকরা হারিয়ে দিল সাম্রাজ্যের সেরাদের। শয়তান পরাজিত করলো ঈশ্বরকে।

তিন দিন পর 'স্পোর্টিং টাইমস' প্রকাশ করলো সেই এপিটাফ :  

ইংলিশ ক্রিকেটের পূন্যস্মৃতির উদ্দেশ্যে
ওভালে যার মৃত্যু হয়েছে, ২৯ আগস্ট ১৮৮২ সালে
শোকাবহ বেশ কিছু বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের আর্তনাদের মাঝে
আর.আই.পি.
দ্রষ্টব্য- শবটা দাহ করে ভস্মটা (অ্যাশেজ) নিয়ে যাওয়া হবে অস্ট্রেলিয়ায়

 

 

‘অ্যাশেজ’ শব্দটা শোনা গেল। তবে তখনও সেটা শুধুই স্পোর্টিং টাইমসের একটা শব্দ। দ্বৈরথটা তৈরি হয়ে গেল অবশ্য। 

ইংল্যান্ডের পরবর্তী অস্ট্রেলিয়া সফরে অধিনায়ক ছিলেন আইভো ব্লাই। ক্যাঙ্গারুর রাজত্ব থেকে তার অ্যাশেজ পুনরুদ্ধার করার কথা। তিনি অ্যাশেজ পুনরুদ্ধার করলেন, একজন স্ত্রী খুঁজে পেলেন, আর তাকে দেওয়া হলো একটা ভস্মাধার। 

আইভোর সফর নিয়ে গল্পের অভাব নেই। এর অনেকগুলোই পড়বার মতো। মেলবোর্নের স্যাটেলাইট সিটি সানবিউরিতে ফাস্ট ফুডের দোকানের পাশে একটা জায়গা আছে, রুপার্টস্টুড ম্যানর নামে। ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যাবে সেখানেই। 

তবে অ্যাশেজ তখনও আলাদা একটা শব্দ নয়। ভস্মাধার বা আর্নও নয়। এটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল আরও ২০ বছর পর। আর্ন প্রতিষ্ঠিত হতে লেগেছিল আরও অনেক বছর। 

অযাচারী উপনিবেশের সঙ্গে সাম্রাজ্যের শেষ না হওয়া এই লড়াইয়ে প্রথম আটবার জিতেছিল ইংল্যান্ড। যে লড়াইয়ের ভিতটা গড়েছিলেন দুইজন।  

গ্রেস গড়েছিলেন ক্রিকেট। স্পফোর্থ গড়েছিলেন অ্যাশেজ। 
 


(জ্যারর্ড কিম্বার : টেস্ট ক্রিকেট, দ্য আন-অথোরাইজড বায়োগ্রাফি অবলম্বনে)

তথ্যসূত্রঃ

১। ইএসপিএন ক্রিকইনফো

২। অলআউট ক্রিকেট

৩। উইজডেন