• ফুটবল

'পেলাডা'

পোস্টটি ২৬৪৮ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

ব্রাজিলে বল কখনোই থামেনা ! তুলতুলে ঘাসের গালিচা থেকে বালুকাময় সৈকত কিংবা খোঁয়ার রাস্তা, সবখানেই চোখে পড়ে  গোলাকার বস্তুটি। এমনকি, জল থৈ থৈ বর্ষাতেও বলটার রেহাই নেই!

বাইশজন মিলে সামান্য চর্মগোলককে ধাওয়া করার এ খেলা, সর্বপ্রথম গ্রীক ও রোমানদের মস্তিস্কপ্রসুত ধারনা। তখন হাত-পা দুটোই চলতো। শতাব্দির পর শতাব্দি পেরিয়ে হাল আমলে বিচ্ছিন্ন হাত-পা । রাগবি বয়ে চলে হাতে,  এসোসিয়েশন ফুটবল পায়ে। প্রয়োজনে মাথাও চলে। এ ‘ফুটবল’কেই ব্রাজিলিয়ানরা বলে- ‘ফুতবল’(futeball)। চোস্ত পর্তুগিজে-‘ফুউউ-চিইই-বল’(fuu-chii-ball)।' আদতে তা ফুটবল।

রসিকতার কথা হলো, ব্রাজিলের ‘ফ্যাভেলা’গুলোর (বস্তি) গলি-ঘুপচি থেকে অভিজাত শহরের রাস্তা পর্যন্ত বিশ্বের জনপ্রিয়তম খেলা অতটা চোখে পড়েনা, যতটা নজর কাড়ে ‘পেলাডা’ !

ব্রাজিলে 'পেলাডা' মানে-‌‌'নগ্ন যুবতী'। ব্যাখ্যা করলেন এক হোটেল দারোয়ান। সাক্ষাৎ রাত্রি দ্বিপ্রহরে গদাইলষ্করি চালে পায়চারি করছিলেন ফ্ল্যামেঙ্গার রাস্তায়। হোটেল মালিকের লাভের গুঁড় খোঁজায় বরাদ্দ কর্মক্লান্ত শরীরের খাদ্য, রাতের ঘুম থেকে সময় চুরি করে নিশ্চিন্তে ঢেলে যাচ্ছেন পেলাডা'র তরে । অপেক্ষা করতেই জুটে যায় আরও কয়েকজন। সোডিয়াম বাতির তলে সবাই মিলে ভাগ হয় দুটি দলে। এক পক্ষের পরনে টি-শার্ট এবং শর্টস। আরেকদল বলতে গেলে অর্ধ-উলঙ্গ ! পরনে শুধুই শর্টস। কোন দর্শক নেই। পাশেই মধ্যরাতের উন্মত্ত সৈকতের হল্কা। রাস্তায় ভ্রমজাগানিয়া নির্জনতা।মাঝের এক চিলতে জায়গায় বলের গড়িয়ে চলা। প্রথম গোলটি হওয়ার আগ পর্যন্ত কেউই রণে ভঙ্গ দিলনা। মাত্র ১০ মিনিটব্যাপি ম্যাচটা জেতার পর পেশায় দারোয়ান অগাস্তো কুইন্তেল দ্য লিমা জানালেন-

 'বেঁচে থাকতে
ব্রাজিলিয়ানদের চাই
শুধু নারী এবং পেলাডা।’

প্রমান মিললো তক্ষণাৎ। অগাস্তোদের ম্যাচ শেষ হতেই শুরু হলো আরেকটি ম্যাচ। তার যবনিকাও ঘটলো কোন দল প্রথম গোল করার পর। এভাবে চলতেই থাকলো একটার পর একটা.....। ফ্ল্যামেঙ্গোর পর্তুগিজ গির্জায় তখন ভোরের ঘন্টা বাজার অপেক্ষা।

রাতের প্রথম প্রহরে নেমে পড়ে ছাত্র-চাকুরীজিবি কিংবা একটু অভিজাত শ্রেনী। রাত গাঢ় হওয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জমায়েত হয় ভিখিরি, হোটেল বয়,ভবঘুরে থেকে ছিঁচকে অপরাধীও। একটার পর একটা ম্যাচ গড়িয়ে চলে সকাল পর্যন্ত। জুতোর সংখ্যা হাতে গোনা। বেশিরভাগেরই নগ্ন পা। তলায় চাপা পড়ে অসংখ্য সূচালো খোঁয়া । রক্তপাত ব্যতীত কোন ম্যাচই শেষ হয়না।

বেপরোয়া খেলতে গিয়ে লুকাস ড্যানিয়েল পা ছিলে নিয়েছে। বয়সে কিশোর। পরনে শতচ্ছিন্ন প্যান্ট। তার এক কোনা দাঁত দিয়ে কেটে নিয়ে সে মুছে ফেলে ক্ষতস্থান থেকে গড়িয়ে পড়া রক্ত প্রবাহ। ড্যানিয়েলের দল এইমাত্র হেরে গেছে। বিপক্ষ দলের অধিনায়ক দিয়াগো তার ইয়ার। সম্পর্কেও কাজিন। শিষ দিতেই সে ছুটে আসে। দিয়াগোকে নিজের ক্ষতস্থানটি দেখিয়ে জ্ঞান বিতরনের ভঙ্গিতে ড্যানিয়েল বয়ান করে-‘আমার পায়ের আঙ্গুল একবার সরে যায়। বলটা এত জোরে লেগেছিল যে হাড় জায়গাচ্যুত হয়। খুব কেঁদেছিলাম।’ এটুকু বলেই ড্যানিয়েল লম্বা একটা দম নেয়। মুখে বিজয়ীর হাসি ফুটিয়ে বলে-‘ আঙ্গুলটি আমি নিজের চেষ্টাতেই সঠিক জায়গায় জোড়া লাগাই। এখন আরো ভাল খেলতে পারছি।’

আলাপচারিতার ফাঁকে ফাঁকে দুই ভাই নজর রাখছিল মোবাইলের ঘড়িতে। নিজেদের পালা এলেই মাঠে নেমে পড়তে হবে। কিন্তু সহসাই গোল হয়না। ড্যানিয়েল বক বক করেই চলে। তার নিবাসের কথা। জায়গাটার নাম ফুগোওতেরিও। রিও ডি জেনিরোর মাঝে পাহাড় কেটে বানানো বস্তি। সেখানে নাকি সকালে একবার পেলাডা শুরু হলে শেষ হয় পরদিন সকালে !

'আমরা যখন খুশি তখন খেলি'-দিয়াগোর উক্তি।

''তোমার ওই ছেলেটার কথা মনে আছে,যে সবসময় পেলাডায় পড়ে থাকতো। আমরা তাকে নেইমার বলে ডাকতাম?' ড্যানিয়েলের জিজ্ঞাসা।

ঘাড় কুঁচকে দিয়াগোর পাল্টা প্রশ্ন -' ও এখন কোথায়?'

'জানিনা। একটা বড় দল লুফে নিয়েছে। তারপর এখানে আর দেখিনি'- জবাব দিয়েই চুপ হয়ে যায় ড্যানিয়েল। দিয়াগোর মুখেও কুঁলুপ। এই হলো তাদের স্বপ্ন। ফ্যান্টাসির জগৎ। ক্ষত সৃষ্টিকারি এই ষ্ট্রিট ফুটবল খেলেই উঠে এসেছেন রোমারিও। রিভালদো। রোনালদো। আদ্রিয়ানো এবং আরও অনেকে....।

ইউরোপের বড় ক্লা্বগুলোর স্কাউটদের নজর সবচেয়ে বেশি পড়ে থাকে ব্রাজিলের 'ফ্যাভেলা'গুলোর প্রতি। মাঝে-মধ্যে তারা নিজেরাই ম্যাচের আয়োজন করে। স্কাউটদের মন জিততে পারলেই কেবল আটলান্টিককে কাঁচকলা দেখানোর সুযোগ। তারপর সামর্থ্য অনুযায়ী শাসন করো ইউরোপ !

দিয়াগোই প্রথমে মুখ খুললো-‌'আমি ফ্ল্যামেঙ্গার (স্থানীয় ক্লাব) জুনিয়র দলে ট্রেনিং করেছি। কিন্তু স্কাউটরা নেয়নি। কারণ, আমার বয়স বেশি।' হঠাৎ গোওওওল। গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে দুই ভাই। 'আসল ষ্ট্রিট ফুটবল দেখতে চাও? আমাদের ফ্যাভেলাতে এসো। তখন দেখবে '-চোখ টিপে বলেই ষোল বছর বয়সি ভাইকে নিয়ে ছুট লাগায় ড্যানিয়েল।

ব্রাজিলের প্রতিটি রাজ্যের বলের গতিপথ অন্যটির চেয়ে আলাদা। রিওতে কি সমুদ্রতট, কি বস্তির অন্ধকারময় রাস্তা-ঘাট। সবখানেই পেলাডা। প্রকোপটা অ্যাত্তেরো'য় বেশি দেখা দেয় বর্ষাকালে। আর মিনাস গেরেইসের জনগন তো বল বানাতে বেছে নেয় যে কোন কিছু !

'আমি মোজা দিয়ে বল বানাতাম। কার্ডবোর্ড দিয়েও বানিয়েছি। তারপর প্লাষ্টিক ব্যাগ। অনেক সময় দেখা যেত বলটা গোলাকার হয়নি। কিন্তু তাতে আমাদের কোন সমস্যা হতো না'-বলেন মিনাস গেরাসের বাসিন্দা ফ্রেড। ফিফা কনফেডারেশন্স কাপেই পাঁচ গোল করা ষ্ট্রাইকারটি  বলেই চলেন-‌'আমরা গোলপোষ্ট বানাতাম পাথর কিংবা স্যান্ডেল দিয়ে। কখনো কখনো পাহাড়ে খেলতাম।দুইজন-দুইজন কিংবা তিনজন-তিনজন করে ম্যাচ খেলা হতো। তবে ছিল গোলপোষ্ট একটাই। তাও সবচেয়ে উঁচু জায়গাতে। খুব মজা হতো। কিন্তু বলটা একবার পড়ে গেলে গোটা পাহাড় ঘুরতে হতো।'

দেশের রং পাল্টে যাওয়ার সঙ্গে টিকে থাকার পথটাও পাল্টে নিয়েছে ব্রাজিলিয়ান সংস্কৃতির অংশ বনে যাওয়া পেলাডা। সাও পাওলোর কথাই ধরুন, সেখানে একসময় খেলাটা হতো দুই নদী পিনহেইরো এবং তিয়েতের তীরে। খেলোয়াড়েরা ছুটে গিয়ে আঁজলা ভরে পানি খেতে পারতো। নদীর কিনারের এই 'ফুটবল'কে থুক্কি, ফুতবলকে ব্রাজিলিয়ানরা বলে-'ফুতবল ডি ভারর্জেয়া।' অর্থাৎ নীচু ভূমির খেলা।

সাও পাওলো দক্ষিন আমেরিকার অন্যতম প্রধান ব্যবসাকেন্দ্রে পরিণত হওয়ার পর থেকে পেলাডার চেহারাও পাল্টাতে শুরু করে। ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠে দালান-কোঠা। খালি জায়গা খুঁজে পাওয়া সৌভাগ্যের ব্যাপার। পেলেও ভাড়ার অংকটা আশাহত করবে। পেলাডার ব্যাপ্তিটাও তাই ক্রমশ ছোট হয়ে আসে। ছাঁটাই হতে হতে এখন তা ঢুকে পড়েছে অল্প একটু জায়গায় স্টিল কিংবা লোহার খাঁচার মধ্যে। যার আরেক নাম 'কোয়াদ্রাস'।

সাও পাওলোরই ভিলা মারিয়াস এলাকার এমন একটি কোয়াদ্রাস। ঘাস মরে হলদেটে। খটখটে শুকনো মাঠটিতে পড়ে গেলে নির্ঘাৎ ছিলে যাবে। কিন্তু খেলার অপেক্ষায় খাঁচার বাইরে চলছে ঠ্যালা-ঠেলি। উত্তেজনা। হুল্লোর। কোলাহল। ভেতরে চলছে লড়াই। প্রতি দলে পাঁচজন করে। ম্যাচ শেষের সময়সীমা তিন গোল। ঘড়ির প্রয়োজন নেই।

প্রথম দিকে শুধু ছেলেরাই ভিড় জমাতো খেলার জন্য। ভিলা মারিয়াসের ওই কোয়াদ্রাসটিতে বয়সের কোন সীমাবদ্ধতা নেই। পেলাডায় যে সবসময় জোগো বনিতোর সুবাস পাওয়া যায়, তা কিন্তু নয়। মাঝে-মধ্যেই সংর্ঘষে জড়িয়ে পড়ে দুই দল। নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে গেলে খুনোখুনিও ঘটে ! ভিলা মারিয়াসে তেমন কিছু না ঘটলেও হাতাহাতির জন্য কারণের অভাব নেই। শুধু দিনের একটা সময় বাদে। যখন পানি খাওয়ার ছলে বিরতি নিয়ে পেলাডায়  নেমে পড়ে পাশেরই গ্যাস স্টেশনের সুন্দরী তন্বি কর্মচারী ক্লারা চাভেস। বয়স মাত্র ১৪ বছর।

ক্লারার পরনে আজ পালমেইরাসের জার্সি। বাড়ন্ত শরীরটায় দারুণ মানিয়েছে। সে স্থানীয় একটি ক্লাবের মহিলা দলের খেলোয়াড়। দেশের ফুটবলে নিজেদের হাল পরিস্থিতিটা জানিয়ে দিল মুখে খৈ ফুটিয়ে। ব্রাজিলে মহিলা ফুটবল লিগ এখনো দোলনা থেকে উঠে দাঁড়াতে পারেনি। জাতীয় লিগের বালাই নেই। খেলোয়াড়দের উপার্জনের প্রধান অলম্বন তাই ভিনদেশি লিগ। যেখানে রাজত্ব করছেন পাঁচবারের ফিফা বর্ষসেরা মার্তা। উত্তর আমেরিকা কাত করে আরো উত্তরের সুইডিশ লিগ মাতিয়ে চলছেন 'স্কার্ট পরা পেলে।'

ক্লারার মনেও স্বপ্নের বীজ পোঁতা। কমনীয় নারীত্বের লেবাসকে খুলে রেখেই ও নেমে থাকে পেলাডার কোর্টে। ছুটতে পারে বটে! পাসিংয়ে তীক্ষ্ম। রেশমী ড্রিবলিং। পাঁচ মিনিটেই বাগিয়ে নেয় দুই গোল !

পেলাডার সঙ্গে ক্লারার মিতালী নয় বছর বয়স থেকে। শুরু থেকেই সবার আর্কষণের কেন্দ্রবিন্দু। শরীরে বিপরীত লিঙ্গ ধারন করায় শক্তিতে পেরে উঠতো না। তাই কপালে জুটতো রাশি রাশি ল্যাং কিংবা কনুইয়ের গুঁতো । স্বপ্নে পানি ঢালতে থাকায় তার সয়ে যায়। কিন্তু গালি সহ্য হতো না। তখন চোখ বেয়ে টপটপ করে ঝরে পরতো ব্যর্থ আক্রোশ। এভাবেই কেটে গেল পাঁচটি রোদনভরা বসন্ত। ভিলাস মারিয়াসের ওই খাঁচার ভেতর কত এলো-গেল, কিন্তু ক্লারা নিজেকে শান দিয়ে টিকে রইল। এখন সে ইটের জবাবে পাটকেল ছুঁড়ছে। কোর্টের সেরা ফুটবলার বলে কথা! আরো একটি গোও-ও-ও-ল। ক্লারার দল জিতে গেল। এভাবে একঘন্টা ধরে তারা জিতে চললো ম্যাচের পর ম্যাচ। কোয়াদ্রাসের ভেতর সে-ই একমাত্র মেয়ে যে কখনো হার মেনে পেলাডার কোর্ট ছাড়েনি।

'শুরুতে ছেলেরা আমার সঙ্গে বাজে ব্যবহার করতো। তারা মনে করতো খেলার অধিকার শুধু্ তাদেরই আছে। অনেকটা এরকম যে জায়গাটা তাদের বিধায় সেখানে শুধু তারাই থাকতে পারবে'-ক্লারা বলে চলে। 'অনেক মানুষই এমন মনে করে। হয়তো একদিন সব পাল্টে যাবে'-তার চোখে জিজ্ঞাসা।

ব্রাজিলিয়ানরা বিশ্বাস করে, মাঠের ভেতর গড়িয়ে চলা বলটা সবসময়ই অর্থবহ। যার ব্যাপ্তিটা শুধু একটি গোল কিংবা ম্যাচে সীমাবদ্ধ নয়। একটা উদাহরণ দেই- ব্রাজিলের অনেকেরই বিশ্বাস 'জোগো বনিতো' অর্থাৎ 'প্লে বিউটিফুলি' আপ্তবাক্যটা সবার মনে ধারন করার নেপথ্যে রয়েছে বর্ণবাদের এক দীর্ঘ কলংকময় ইতিহাস!

একটা সময় ছিল যখন ব্রাজিলে সবাই মনে করতো, কৃঞ্চাঙ্গরা শাস্তি কিংবা পারিশ্রমিক গ্রহণ ব্যতীত একজন শ্বেতাঙ্গকে কখনোই ছুঁতে পারবেনা। শুধু এই কারণে অনেকে্ই বিশ্বাস করে, পেলাডা খেলার সময় ব্রাজিলিয়ানদের পায়ে যে রেশমি মসৃণ মসলিনের মতোই পেলব কারুকার্য ফুটে ওঠে, তা শুধুই বেঁচে থাকার একটা কৌশল মাত্র। প্রতিপক্ষের গায়ে সামান্যতম আঁচড়টুকু না কেটে তাকে শেষ করে দেয়া ! গোল করা। পাছে সমাজের নিয়ম-নীতি ভঙ্গ হয়, তাই!

সেই পেলাডা এখন ব্রাজিলের বস্তিতে বেড়ে ওঠা একটি ছেলের খ্যাতি এবং কাড়ি কাড়ি অর্থ উপার্জনের 'আশ্চর্যপ্রদীপ।' ২০১১ সালে ব্রাজিল একাই ইউরোপিয়ান লিগে রপ্তানি করেছে ৩০০ ফুটবলার। আর হাজারো খেলছে দেশের ঘরোয়া লিগগুলোতে মোটা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে।

ব্রাজিলের এককোণের শহর মানাউস। এখানে কোন কিংবদন্তি জন্ম নেয়নি। কিন্তু প্রতিবছর অনেকেই ঘর ছাড়ে ফুটবলের জন্য। নিশ্চয়তা শুন্য। তবুও স্বপ্নকে তাড়া নেশায় মানাউস বন্দর থেকে জাহাজে ওঠে অসংখ্য কচি-কাঁচা। পরবর্তী বন্দরে না থামা পর্যন্ত দিনের বেলাটা তারা ঘুমিয়ে কাটায় সিলিংয়ের 'হ্যামক'-এ (দোলনা)। রাত্রে পায়চারী করে ডেকে। কারো ভাগ্যে শিঁকে ছেড়ে। কেউবা ফেরে খালি হাতে। অনেকে তাও পারেনা!

গতবছর সাও পাওলোর স্টেট ক্লাব পর্তুগিজা স্যানতিয়েস্তার এক স্কাউট আমাজনের ভেতরকার শহর পারা থেকে ১২ জন কিশোর ফুটবলারকে নিয়ে ওঠেন জাহাজে। গন্তব্য সান্তোস। সেখানকার যুব টুর্নামেন্টে খেলার স্বপ্নে বুঁদ কচি প্রাণগুলো। কিন্তু পৌঁছানোর পর একটি কক্ষে তাদের আটক করে রাখা হয়। সম্বল বলতে ছিল মাত্র তিনটি কম্বল। তাই দিয়ে কেটে যায় কয়েকরাত। খাবারটুকু পর্যন্ত দেয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত এক সাংবাদিকের কল্যাণে চিত্রগুপ্তের খাতায় নাম লেখানো থেকে তারা বেঁচেও যায় । কিন্তু এসব জেনেও মানাউসের কিশোর প্রতিভা কালেব ক্যাম্পেলো নাছোড়বান্দা। তাঁর যুক্তি-' এমন কোন বিখ্যাত খেলোয়াড় জন্মেনি যে তাকে দেখে গোটা বিশ্বের সবাই মানাউসকে একনামে চিনবে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে কখনোই জন্মাবে না।'

টানা খরায় ফসলি জমি ফেটে চৌচির। মাটি শুকিয়ে পাথর। জায়গাটার নাম সান্তো অগাস্থিনো। মানাউসের প্রতিবেশী শহরটিই এখন ক্যাম্পেলোর ঠিকানা। কুঁজো পাহাড়ের শ্রেনী এবং ফসলি জমির মধ্যে বিভাজন টেনে দিয়েছে কলোনিয়াল আমলে তৈরি একটি বিশালাকার প্রাচীর। বুকে অসংখ্য ক্ষত সৃষ্টি করেছে সময়ের ঘুণপোকা। ক্যাম্পেলোর কাজ ভগ্নস্তুপের ফুটোগুলোর ভেতর দিয়ে বল পাঠানো। এভাবেই সে শ্যুটিংয়ের আদর্শ লিপি শিখে নিচ্ছে। পাশেই আবর্জনার ভাগাড়। প্লাষ্টিকের বোতল এবং ইনজেকশনের সূচে ভর্তি। ড্রাগ চোরাচালানির জন্য সান্তো অগাস্থিনোর একটা আলাদা খ্যাতি আছে ব্রাজিলে।

মানাউসকে বলা হয় পেলাডার আঁতুর ঘর। প্রতিবছর এখানে আয়োজিত হয় খেলাটার সেরা টুর্নামেন্ট ‌'পেলাডাও'। সৌকর্যই আসরটির মুল আকর্ষণ নয়। ম্যাচ শুরুর আগে টু-পিস পরিহিত সুন্দরীদের সৌন্দর্য প্রতিযোগিতাও টানে ব্রাজিলিয়ানদের। তাই টুর্নামেন্টটির টিকিট পাওয়া আর চাঁদকে রশি দিয়ে টেনে মর্ত্যলোকে নামিয়ে আনা- প্রায় এক কথা !

কিন্ত এবার সম্পুর্ন ভিন্ন খেলা।দুটি দল মাঠে নামলো। সবার পরনেই একই জার্সি ! মাঠে রেফারিকে দেখা গেল ঠিকই কিন্তু হাতে বাঁশির বদলে খড়িমাটি । তা মাটিতে ফেলতেই শুরু হলো খেলা। থ্রো-ইন বিহীন! কোন সীমানাই যে নেই ! দলদুটোর কোচেরাও ঠুঁটো জগন্নাথ। সমানে চেঁচাচ্ছেন। খেলোয়াড়েরা শুনলে তো ! তারা খেলে চললো নিজেদের ক্যানভাসে মনের মতো। ব্যক্তিগত দক্ষতার পসরা সাজিয়ে কয়েকজন গোল করলো। খানিকক্ষন বাদে থালায় হাতুড়ি পিটিয়ে একজন জানিয়ে দিল হাফটাইম।

মাথার ওপর সুর্যটা রুদ্ররুপ ধারন করায় অনেকেরই খুব তেষ্টা পায়। কিন্তু একবার যদি কেউ পানির বোতলে চুমুক দিয়েছে তো তার ঠোঁটের ওপর জমে থাকা ধূলোর আস্তরন দেখায় কালচে গোঁফের মতো। বিকেল নাগাদ সবার মুখেই সেই গোঁফ ফুটে উঠলো।

ক্যাম্পেলো নিজেও একটা গোল করলো। কে জানে সেও একদিন হয়তো পারি জমাবে ইউরোপে। কিন্তু না যেতে পারলেও সমস্যা নেই। ‌''সে ব্যর্থ হলে আরেকজন সফল হবে। যদিও মুল উদ্দেশ্য এটা নয়। ম্যাচটিতে মোট ৫০ জন খেলোয়াড় আছে যারা ড্রাগ চোরাচালানির হোতা। গতবার সংখ্যাটা ছিল দ্বিগুনেরও বেশি''-জানান বার্গ ডি সউজা। সরকারি চাকুরীজীবি। তার দায়িত্ব পেলাডা আয়োজন করে ড্রাগ চোরাচালানির জাল থেকে কিশোর-যুবকদের বের করে আনা।

গত বছর নাকি এমন একটি ম্যাচের মাঝপথেই শুরু হয়ে যায় বন্দুকযুদ্ধ। দুই প্রতিবেশি মাফিয়া দলের ম্যাচ বলে কথা ! যদিও ডি সউজার বিশ্বাস, অবস্থার উত্তরন ঘটেছে। ‌‌'এবার তেমন কোনকিছুই ঘটেনি। আমার সঙ্গে কিছু ড্রাগ চোরাকারবারির পরিচয় আছে। তারা পেলাডা আয়োজনে প্রায়ই অর্থ দিয়ে সাহায্য করে থাকে-' স্বীকার করেন তিনি।

জীবন যদি জন্ম থেকেই হয়ে ওঠে রুঢ়, তাহলে মুক্তির উপায় কি ? প্রশ্নটা মানাউসের যে কাউকে জিজ্ঞেস করলে জবাব আসবে-‌'বোকা ছেলে! সে তো পেলাডা।'

আমাজানের হৃদয়ে গেঁড়ে বসা শহরটি প্রকৃতপক্ষে একটি শিল্পনগরী। দিনরাত মেশিনের আওয়াজে ভারী থাকে এলাকাটির বাতাস। সকাল থেকে রাত্রি পর্যন্ত উদয়াস্ত খেটে চলে এখানকার মানুষ। কেউ সারাদিন আটার বস্তা টানছে, কেউবা চিনির। বাকিরা কাজ করে ইলেকট্রনিক কারখানায় কিংবা নৌকায়। কিন্তু আমাজানের বুকের ভেতর এঁকে-বেঁকে চলা নদীগুলো যেমন একই মোহনায় মিলিত হয়ে মিশে গেছে মহাসাগরে, তেমনি রাত হলে ওইসব শ্রমজীবি মানুষগুলোও ভিড় করে থাকে পেলাডার কোর্টে। মর্ত্যলোকে স্বর্গ বলে যদি কিছু অনুভব করে থাকে তারা, তা ওই খাঁচাবন্দী মুক্তির খেলা।

মানাউসের পুর্বঞ্চলীয় শহর সান জোসে ওপেরারিও। বালুকাময় সৈকতের পাশেই মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে আছে শতশত গাছ। প্রচুর টিকটিকি দেখা যায় এখানে। বাহারী রংয়ের লেজ। কিংবদন্তি বলে, একসময় এই টিকটিকিরা নাকি মানুষখেকো ছিল! বিবর্তনের খাঁজে তারা ক্রমশ ছোট হয়ে দেছে। সে বহু আগের কথা। এখন আর টিকটিকিদের আর ভয় পাননা ক্লেসন কোরেইরা। গাছের কান্ডকে ডিফেন্ডার ভেবে নিয়ে তার মাঝে তিনি কসরত করছিলেন ড্রিবলিংয়ের। শেকড়ের সঙ্গে নিয়মবহির্ভুত ধাক্কা খেলেই দাঁড়িয়ে পড়ছেন। নিজেই বাজাচ্ছেন ফাউলের বাঁশি। গাছের হলেদেটে মরা পাতা তার হলুদ কার্ড ! জিজ্ঞাসার দৃষ্টিতে তাকাতেই বুঝতে পারলেন। কোরেইরা জানালেন-'ফুটবলটা আমরা হৃদয় দিয়ে খেলি। তাই নিয়মবর্হিভূত কিছু করলে নিজ থেকেই দাঁড়িয়ে যাই। ব্রাজিলে সবার মানসিকতাই এমন।'

ড্যানিয়েলের কথায় ফিরে আসি। সকাল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত খেলার পর সে বাড়ি ফিরে যায়। কয়েকঘন্টা ঘুমিয়ে নিতে। উঠে আবারও খেলতে যায়। দুপুর নাগাদ সে খুব উত্তেজিত। রিও ডি জেনিরোর পোড় খাওয়া বস্তিটিতে কারা যেন তাকে খুঁজে হয়রান। শহরটার মধ্যে ওই একটা বস্তিতেই পুলিশের আনা-গোনা থাকে সবচেয়ে বেশি। ড্যানিয়েল তাই কিছুটা শঙ্কিত। প্রতিবেশিরা তাকে আশ্বস্ত করে। জানায়, গতরাতে সে যাদের সঙ্গে খেলেছে তারা তাকে ভাড়া করতে চায়। ড্যানিয়েলে মুখে ক্ষীণপ্রভা। জীবিকার ব্যাপারটাও তো ভাবতে হবে! বিশ্বকাপ আয়োজন করতে গিয়ে রউসেফ সরকার এখন গৌরি সেন। পাবলিক ফান্ড গড়ের মাঠ !

ড্যানিয়েলদের কুঁড়েঘর থেকে রাস্তার উল্টো পাশে ছোট্ট একটা পতিত জায়গা। কয়েকজন খেলছে । এখানে শুধু গোল করাই মুল লক্ষ্য নয়। পাশাপাশি নিজের দক্ষতাটুকুও দেখাতে হয় প্রতিপক্ষের কাছে। ড্যানিয়েল জানায়-'একসময় এখানে খেলতাম। বলটা একবার এক বুড়ো মহিলায় গায়ে লাগে। খুব বকেছিল। খেলতে বারণ করেছিল ডাইনিটা।'

'কিন্তু এখানে খেলা কখনো থামেনা। কখনোই না'-বলতে বলতে ড্যানিয়েল উঠে দাঁড়ায়। গন্তব্য পাশের কোয়াদ্রা। এই এলাকার মধ্যে সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দিতামুলক ম্যাচ হয় ওখানটায়। ঘর থেকে বেরিয়ে সিড়ি ভাঙ্গে ড্যানিয়েল। কোন রেলিং নেই। এলাকাটিতে বাসা-বাড়ির সদর দরজা নাকি বন্ধ হয়না ! ড্যানিয়েলের ঘরে মোট দুটি কামরা । কিন্তু সবমিলিয়ে সদস্য ১৫ জন। লুকাসের বাবা স্থানীয় স্যানিটেশন ক্লিনার। তারা এক ভাই-এক বোন। নিজে স্কুলে না গিয়ে সে পাঠিয়েছে বোনকে। ড্যানিয়েল ব্যাখ্যা করে-'লেখাপড়াটা আসলে মেয়েদের প্রয়োজন। আমাদের ফুটবল থাকলেই চলবে।'

সাও পাওলোর কোয়াদ্রাসগুলোর মতো এখানে খাঁচা নেই। দেখে মনে হবে পরিত্যক্ত গ্যারেজ। এদের অলংকার কিছু সস্তা ষোড়শি। তারপরও ড্যানিয়েল হতাশ। খেলোয়াড়েরা এখনও এসে পৌঁছায়নি, তাই। গ্যারেজের ভাঙ্গা দেয়ালে ফুটো দিয়ে তাকালেই চোখে পড়ে কুঁজো পাহাড়ের যীশুকে। সভ্যতা তাকে গালভরা নাম দিয়েছে-‌'ক্রিষ্ট ডি রিডিমার।' নিচে মারকানা স্টেডিয়াম। ড্যানিয়েল তাকিয়ে থাকে। চোখে তরতাজা স্বপ্ন। নিজেকে গ্লাডিয়েটর এবং মারকানাকে কলোসিয়াম ভাবাটা তার মতো কিশোরের জন্য দোষের কিছু নয়।রিওতে প্রতিদিন অসংখ্য স্বপ্ন জন্মানোর সঙ্গে সমাহিতও হচ্ছে এন্তার। সে এই চক্রটারই একটা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ। 'এই হলো রিও। হয়তো ওরা একটু পরে এসে পৌঁছাবে'- ড্যানিয়েলের কন্ঠে ক্ষোভ।

সে দাঁড়িয়ে থাকে। দ্বিধাভ্রমের দোলাচলে অনেকক্ষন ভুগে নেমে পড়ে পেলাডার কোর্টে। বাচ্চাগুলো তাকিয়ে থাকে। ড্যানিয়েল গা করেনা। একসময় তাকেও সহ্য করতে হয়েছে। কবে থেকে এমন শুরু হয়েছে কেউ জানেনা। সবাই শুধু বলে, ব্রাজিলে বল কখনোই থামেনা !

(গত বিশ্বকাপ ফুটবল আসর শুরুর প্রাক্কালে নিউ ইয়র্ক টাইমস অবলম্বনে লেখা)