• ক্রিকেট

'ডাক' দিয়াছেন দয়াল আমারে

পোস্টটি ৫৪৭ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

সম্প্রতি আমাদের টাইগাররা শ্রীলংকার সাথে টেস্টে এক ইনিংসে ছয় ছয়টি ডাক মেরে বেশ হৈহৈ কাণ্ড রৈরৈ ব্যাপার ঘটিয়ে ফেলবার পাশাপাশি অপ্রিয় একটি বিশ্বরেকর্ড করে ফেলেছে অজান্তেই, ইতিহাসের প্রথম দল হিসেবে আমরা টেস্টে একই ইনিংসে দুই দুইবার ছয়টি ডাক মারার অনন্য কীর্তি করেছি। হ্যাঁ, এই ঘটনার আগেও টেস্টে একই ইনিংসে ছয়জন ডাক মারবার ঘটনা ঘটেছিল মোট পাঁচবার- পাকিস্তান, ভারত, দঃ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড আর বাংলাদেশ প্রত্যেকেইএকবার করে।

ডাক নিয়ে অনন্য কীর্তিতে টাইগাররা এবারই প্রথম নয় বরং ওডিআইতেও একমাত্র আমাদেরই রয়েছে ওভারের প্রথম তিন বলেই তিন তিনটি ডাক মেরে প্রতিপক্ষকে ইনিংসের শুরুতেই হ্যাট্রিক উপহার দেওয়া আর এই ঘটনা ঘটেছিল ২০০৩ সালের সেই দুঃস্বপ্নের বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কার সাথে চামিন্ডা ভাসের করা ম্যাচের প্রথম ওভারেই!

এই যে ব্যাটাররা শূন্য রানে ফিরে গেলেই ‘ডাক’ মারা বলা হয় এর পেছনের কারণ হল, ডাক তথা হাসের ডিমের সাথে শূন্য (০) এর অদ্ভুত মিল! সেই ১৮৬৬ সালের ১৬ জুলাই এক ম্যাচে প্রিন্স অফ ওয়েলস কোন রান না করেই সাজঘরে ফিরে গেলে পরদিন পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল, The Prince "retired to the royal pavilion on a 'duck's egg'এবং ইতিহাস অনুযায়ী সেই থেকে শূন্য রানে ব্যাটার আউট হলেই তাকে ‘ডাক’ বলে আখ্যায়িত করা শুরু।

টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রথম ডাক মেরেছিলেন Ned Gregory ইতিহাসের প্রথম টেস্টেই ১৮৭৭ সালে অস্ট্রেলিয়া বনাম ইংল্যান্ডের ম্যাচে আর ক্রিকেটের সবচেয়ে বিখ্যাত ডাক অবশ্যই স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের জীবনের শেষ ইনিংসের সেই ঐতিহাসিক ডাক অথচ সেদিন মাত্র চার রান করলেই এই কিংবদন্তীর টেস্ট  ব্যাটিং এভারেজ হত ঠিক একশ! কিন্তু ক্রিকেট বিধাতা ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত ডাক লিখে রাখবার জন্য ব্র্যাডম্যানের সেই শেষ ইনিংসটিকেই বেছে নিয়েছিলেন।

সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান স্যার ডন ব্র্যাডম্যান যার ব্যাটিংয়ে নিজের ছায়া খুঁজে পেতেন সেই শচীন টেন্ডুল্কার তাঁর প্রথম দুই ওডিআইতেই ডাক মেরেছিলেন, দুম্যাচেই দ্বিতীয় বলেই আউট হয়েছিলেন কোন রান না করেই। সেদিন নিশ্চয় কেউ কল্পনাও করেনি এই শচীনই একদিন ওয়ানডেতে সবচেয়ে বেশী রান আর সেঞ্চুরীর মালিক হবেন। ভারতের সবচেয়ে সফল অধিনায়ক ধনীও শচীনের মত তাঁর প্রথম ওডিআই ম্যাচে ডাক মেরেছিলেন আর প্রতিপক্ষ ছিল বাংলাদেশ।

আরেক গ্রেট শ্রীলংকার মারভান আতাপাত্তু্র শুরুটা ছিল আরও অনেক বেশী ডাকময় যিনি তাঁর প্রথম ছয় টেস্ট ইনিংসের পাঁচ ইনিংসেই ডাক মেরেছিলেন কিন্ত ধনী আর শচীনের মত তিনিও ‘মর্নিং শোস দি ডে’ কে ভুল প্রমাণ করেছিলেন পরবর্তীতে অনেক ম্যাচজয়ী ইনিংস খেলে।

ডাক নিয়ে আরও কিছু রেকর্ডের কথা বলবার আগে আপনাদের সাথে বরং নানারকমের ডাক এর সাথে পরিচয় করিয়ে দেই,

১) গোল্ডেন ডাক- ব্যাটার তার ইনিংসের প্রথম বলেই শূণ্যতে আউট হলে তাকে গোল্ডেন ডাক বলে

২) সিলভার ডাক- ব্যাটার তার ইনিংসের দ্বিতীয় বলেই শূণ্যতে আউট হলে তাকে সিলভার ডাক বলে

৩) ব্রোঞ্জ ডাক- ব্যাটার তার ইনিংসের তৃতীয় বলে শূণ্যতে আউট হলে তাকে ব্রোঞ্জ ডাক বলে

৪) ডায়মন্ড ডাক- ব্যাটার কোন বল না খেলেই শূণ্যতে আউট হলে তাকে ডায়মন্ড ডাক বলে, ডায়মন্ড ডাকই একজন ব্যাটারের জন্য সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক ডাক!

৫) রয়েল ডাক/প্লাটিনাম ডাক- ব্যাটার ম্যাচের কিংবা ইনিংসের প্রথম বলেই শূন্য রানে আউট হলে তাকে রয়েল ডাক কিংবা প্লাটিনাম ডাক বলে

৬) পেয়ার- ব্যাটার টেস্টের দুই ইনিংসেই ডাক মারলে তাকে পেয়ার বলে

৭) কিং পেয়ার- ব্যাটার টেস্টের দুই ইনিংসেই গোল্ডেন ডাক মারলে অর্থাৎ দুই ইনিংসেই প্রথম বলে শূন্য রানে আউট হলে তাকে কিং পেয়ার বলে

আবার ভারতের অজিত আগারকারকে ‘বোম্বাই ডাক’ বলা হয় ১৯৯৯ সালের অস্ট্রেলিয়া সফরে টানা সাতটি ডাক মারবার জন্য যার মধ্যে আবার চারটিই ছিল গোল্ডেন ডাক।

আমাদের দেশসেরা ওপেনার তামিম ইকবাল তাঁর বিশতম জন্মদিনের টিটুয়েন্টিতে ডাক মেরে আন্তর্জাতিক টিটুয়েন্টিতে প্রথম ব্যাটার হিসেবে জন্মদিনে ডাক মেরেছিলেন। তামিমের মত জ্যাক ক্যালিস, নাথান এস্টল, ইয়ান বেলেরও নিজ নিজ জন্মদিনে আন্তর্জাতিক ম্যাচে ডাক মারবার রেকর্ড আছে।

এই তামিম আবার একইসাথে ৩৬টি ডাক মেরে তিন ফরম্যাটের আন্তর্জাতিক ম্যাচ মিলিয়ে বাংলাদেশীদের মধ্যে সর্বোচ্চ ডাক মারবার রেকর্ডের অধিকারী আর ফরম্যাট অনুযায়ী বাংলাদেশীদের মধ্যে টেস্টে সর্বোচ্চ ডাক আশরাফুল (১৬টি), ওয়ানডেতে তামিম (১৯টি), টিটুয়েন্টিতে সৌম্য সরকার (১০টি)।

আবার সব দল মিলিয়ে টেস্টে সর্বোচ্চ ডাক লিজেন্ড কোর্টনী ওয়ালশের ৪৩টি আর সব ফরম্যাট মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ম্যাচে সর্বোচ্চ ডাক মুরালিধরনের ৫৯টি। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে ১৫৬ টি ডাক মেরে ডাক লিস্টে সবার উপরে আছেন ইংল্যান্ডের ক্রিকেটার রেজ পার্ক।

টেস্ট ক্রিকেটের মত ওয়ানডেতেও এক ইনিংসে সবচেয়ে বেশী ডাক ৬টি আর এক্ষেত্রে পাকিস্তান সবচেয়ে এগিয়ে কারণ তারাই একমাত্র একই ইনিংসে ডাকের ছক্কা ওডিআইতে হাকিয়েছে তিন তিনবার, আবার প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট ও আন্তর্জাতিক টিটুয়েন্টি দুইক্ষেত্রেই এক ইনিংসে সবচেয়ে বেশী ডাক ৮টি। মজার ব্যাপার হচ্ছে আন্তর্জাতিক টিটুয়েন্টিতে এক ইনিংসে সবচেয়ে বেশী ৮টি ডাক মারবার রেকর্ড তুরস্কের যারা ক্রিকেট জাতি হিসেবে আমাদের কাছে একেবারেই অপরিচিত।

হেটার্সদের কাছে ‘ডাক বাবা’ হিসেবে পরিচিত শাহীদ খান আফ্রিদির ডাক মারা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রায়ই নানারকম রম্য আলোচনা দেখা যায়, সেই আফ্রিদি তিন ফরম্যাট মিলিয়ে ৪৪টি ডাক মেরে সর্বাধিক ডাক মারার তালিকায় যৌথভাবে জহির খান ও সদ্য প্রয়াত শেন ওয়ার্নের সাথে অস্টম স্থানে আছেন।

ডাক নিয়ে এত গল্প শুনে পাঠকদের নিশ্চয় খুব জানতে ইচ্ছে করছে কোন সেই বোলার যিনি ব্যাটারদের সবচেয়ে বেশীবার ডাক মারতে বাধ্য করেছেন! এই তালিকায় প্রথম দশজনে যাদের নাম আছে তাঁরা সবাই ছিলেন ব্যাটারদের মূর্তিমান আতংক আর এই তালিকায় শীর্ষেআছেন ওয়াসিম আকরাম যিনি মোট ১৮৯ বার ব্যাটারদের ডাক উপহার দিয়েছেন। দ্বিতীয় স্থানে আছেন গ্লেন ম্যাকগ্রা-১৭৬ বার, তৃতীয় স্থানে মুরালিধরন ১৫৯ বার আর চতুর্থ স্থানে আছে ওয়াসিম আকরামেরই সতীর্থ টু ডাব্লিউ জুটির অন্যতম ওয়াকার ইউনুস- ১৪৮ বার!

শেষ করছি আন্তজার্তিক ক্রিকেটে টানা সবচেয়ে বেশী ইনিংস ডাক না মারার রেকর্ড দিয়ে, ভারতীয় ব্যাটার রাহুল দ্রাবিড় টানা ১২০ ওডিআই ইনিংসে ডাক না মেরে এই রেকর্ড গড়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন কেন তাঁকে দ্যা ওয়াল নামে ডাকা হত।

ইতিহাসের অনেক সেরা সেরা ব্যাটসম্যানই একাধিকবার ডাক মেরেছেন আবার নিজেদের দিনে তাঁরাই বোলারদের নিয়ে ছেলেখেলায় মেতেছেন তাই ডাক মারা নিয়ে খুব বেশী চিন্তিত হবার কিছু নেই কেননা ‘ডাক ইজ টেম্পরারি বাট ক্লাস ইজ পারমানেন্ট’!