• অন্যান্য

চার্ম স্ট্রাইকারের গল্প | পর্ব : ১

পোস্টটি ৮৫৪ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

ফুটবল জগতে কিছু কিছু ফুটবলার এসেছে নির্মম দুর্ভাগ্য নিয়ে। তাদের খেলায় ঘাটতি ছিলোনা কখনো, পুরো ক্যারিয়ার জুড়ে ধারাবাহিক ভাবে পারফর্ম করে গেছেন, মুগ্ধ করেছেন কোটি কোটি ফুটবল ভক্তকে। কিন্তু ভাগ্যদেবতা বারবার তাদের হতাশ করেছে৷ তাদের বারবার ফিরে আসতে হয়েছে শিরোপা জেতার দ্বারপ্রান্ত থেকে, কিন্তু শিরোপা তাদের হাতে ওঠেনি।

এর বিপরীতে আবার কিছু কিছু ফুটবলার আছে, যারা ধারাবাহিক ভাবে পারফর্ম করলেও স্পটলাইটে আসতে পারেননি কখনোই, তৈরি হয়নি তাদের বিরাট ভক্তের দল। কিন্তু তাতে কি! শিরোপা যেন তাদের কাছে ছেলের হাতের মোয়া। যেখানেই গেছেন, সেখানেই শিরোপা তাদের ওপর মুখ থুবড়ে পড়েছে, ভাগ্যদেবতা তাদের দিয়েছেন মুঠো ভরে।

তবে তার মানে অবশ্য এই না যে শুধু ভাগ্যই তাদের সহায় ছিলো, কোনো পরিশ্রম সাধনা ছিলোনা। সাফল্যের মূল মন্ত্র সবসময়ই কঠোর পরিশ্রম, অধ্যাবসায় ও সাধনা। তবে ভাগ্য হয়তো কিছুটা তাদের পক্ষে ছিলো, যা হয়তো অনেক সময় অনেকেরই থাকেনা।

চলুন শুনে আসা যাক এমন একজনের গল্প, যিনি কখনো সেভাবে স্পটলাইটে আসতে পারেননি, যাকে ইনডিভিজুয়াল পারফরম্যান্স ও সাফল্যের বিচারে সবসময়ই অবমূল্যায়ন করা হয়েছে, কিন্তু দলীয় অর্জনের বেলায় ভাগ্যদেবতা তাঁকে ভরিয়ে দিয়েছেন। যেখানেই তিনি পা রেখেছেন, সব খানেই ধরা দিয়েছে শিরোপা ও সাফল্য।

image_search_1651352122731
১৯৮৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর। আল্পস পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত দক্ষিণ-পূর্ব ফ্রান্সের সমৃদ্ধ প্রদেশ রোন-আল্পসের ছোট্ট শহর শাম্বেরি তে জন্মগ্রহণ করেন ওলিভিয়ের জিরুদ। যখন তাঁর বয়স মাত্র ছয় বছর, তখন থেকেই ফুটবলের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ জন্মে। তাঁর ফুটবলের প্রতি এ ভালোবাসার পেছনে অবশ্য বিশেষ অবদান ছিলো তাঁর বড়ভাই এর। ওলিভিয়েরের থেকে দশ বছরের বড় রোমান জিরুদ তরুণ বয়সে ছিলেন একজন উঠতি ফুটবলের। তার হাত ধরেই ফুটবল জগতে পা রাখেন ওলিভিয়ের।

কিন্তু ফুটবল ক্যারিয়ার শুরুর আগেই একটি বড় আঘাত আসে তার ওপর। সেটাও তার সেই আইডল বড় ভাই এর দিক থেকেই। হঠাৎ করেই ফুটবল ক্যারিয়ারে ইতি ঘোষণা করেন রোমান। ফুটবল ছেড়ে রাতারাতি একজন পুষ্টিবিদ বনে যান। আর সেটার বিরাট ইফেক্ট পড়ে ছোট্ট ওলিভিয়েরের ওপর। যার হাত ধরে ফুটবলে হাতেখড়ি, সেই কিনা ছেড়ে দিলো ফুটবল!

তবে সেই আঘাত কাটিয়ে উঠতে খুব বেশি সময় লাগেনি তাঁর। শৈশবেই যোগ দিয়েছিলেন বাড়ির পাশের ছোট্ট ক্লাব অলিম্পিক ডি ফ্রজে। সেখানে ছয় বছর কাটিয়ে ১৩ বছর বয়সে তার প্রথম পেশাদার ক্লাব হিসেবে গ্রেনোবলে যোগ দেন।

গ্রেনোবলে বেশ কয়েক বছর জুনিয়র টিমে কাটান ওলিভিয়ের। পাঁচ বছর গ্রেনোবল যুব একাডেমিতে কাটানোর পর অবশেষে ২১ বছর বয়সে প্রথম গ্রেনোবলে পেশাদার কন্ট্র‍্যাক্ট সাইন করেন। এ কন্ট্র‍্যাক্ট সাইন তার ফুটবল ক্যারিয়ারে বিশেষ ভূমিকা রাখে যেটা তিনি নিজেই পরবর্তীতে স্বীকার করেছেন। কন্ট্র‍্যাক্ট সাইন করার মাধ্যমে ফুটবল ক্যারিয়ের পথে তিনি বেশ অনুপ্রাণিত হন এবং এটি তাঁকে তার দক্ষতা ও এবিলিটির সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়।

২০০৫-০৬ মৌসুমে গ্রেনোবলের রিজার্ভ টিমে সুযোগ পান ওলিভিয়ের জিরুদ। গ্রেনোবলের বি টিম তখন ফ্রান্স ফুটবলের পঞ্চম টায়ারে খেলছে। সেখানে সুযোগ পেয়েই দারুণ পারফর্ম করেন তিনি। ১৫ টি ম্যাচ খেলে ১৫ টি গোলের দেখা পান। সাত মাস সেখানেই খেলেন জিরুদ। তাঁর পারফর্মেন্সে মুগ্ধ হন গ্রেনোবল কোচ থিয়েরি গুদেত। ফলাফল, জিরুদ ডাক পান সিনিয়র টিমে।

image_search_1651349080170
২০০৬-০৭ সিজন থেকে স্থায়ীভাবেই সিনিয়র টিমে জায়গা পান জিরুদ। তবে শুরুর দিকে একাদশে জায়গা পাননি, বদলি হিসেবেই খেলতে হতো। অবশেষে নিওর্তের বিপক্ষে প্রথম একাদশে জায়গা পান তিনি। ২০০৭ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি লা হাভরের বিপক্ষে করেন তার প্রথম প্রোফেশনাল গোল। ইঞ্জুরি টাইমের সেই গোলেই সে ম্যাচে জয় পায় গ্রেনোবল। সেই মৌসুমে মোট ১৮ ম্যাচ খেলেন জিরুদ, করেন দুটি গোল। গ্রেনোবল সিজন শেষ করে লিগে পঞ্চম হয়ে।

পরের সিজনে আরও বেশি প্লেয়িং টাইমের জন্য ফ্রেঞ্চ থার্ড টায়ারের দল ইস্ত্রেসে লোনে যান জিরুদ। নতুন কোচ ফ্রেদেরিক আরপিনোনের আন্ডারে ভালোই উন্নতি করতে থাকেন। ইস্ত্রেসে বেশ ভালো সময় পার করেন। সেখানে থাকাবস্থায় ৩৩ ম্যাচ খেলে গোল করেন ১৪ টি।

লোন শেষে আবার গ্রেনোবলে ফিরে আসেন জিরুদ। ইস্ত্রেসে ভালো সময় পার করায় তিনি আশা করেছিলেন এবার হয়তো ভালোই সুযোগ পাবেন। কিন্তু হায়, ততদিনে বদলে গেছে ম্যানেজার। নতুন ম্যানেজার মেহমেদ বাজদারেভিচ লোন ফেরত জিরুদকে একদম সুযোগই দিলেন না। তিনি ঘোষণা দিলেন যে জিরুদের এলিটদের মাঝে খেলার যোগ্যতা নেই। ফলাফল, গ্রেনোবল ছাড়তে হলো তাঁকে।

২০০৮ সালে দুই বছরের চুক্তিতে ফ্রেঞ্চ লিগ টু এর দল তুর্সে যোগ দেন জিরুদ৷ তখন তুর্সের ম্যানেজার হিসেবে ছিলেন দানিয়েল সানচেজ, যিনি ছিলেন একজন সাবেক স্ট্রাইকার। তার আন্ডারে জিরুদ অতি দ্রুত উন্নতি করতে থাকেন। তার পজিশনিং ও ফিনিশিং স্কিল বেশ বৃদ্ধি পায়।

তুর্সে বেশ ভালো একটা মৌসুম কাটান জিরুদ, যদিও ইঞ্জুরির জন্য মিস করেন বেশ কিছু ম্যাচ। সে সিজনে ২৭ ম্যাচ খেলে ১৪ টি গোলের দেখা পান ওলিভিয়ের জিরুদ। পরের মৌসুমে তুর্সের প্রধান স্ট্রাইকার এনদিয়ে দল ছাড়লে সে জায়গা পান জিরুদ এবং হয়ে ওঠেন দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একজন খেলোয়াড়।

image_search_1651349130575
এবার শুরু থেকেই দুর্দান্ত ফর্মে ছিলেন জিরুদ। তার সে আগুনঝরা পারফর্মেন্স নজর কারে লিগ ওয়ানের এলিট ক্লাব মঁপেলিয়ের। তরুণ এ স্ট্রাইকার সাইন করাতে দেরি করলে হাত ছাড়া হয়ে যেতে পারে, এই ভয়ে সিজনের মাঝখানে ২০১০ সালের জানুয়ারিতেই ২ মিলিয়ন ইউরো দিয়ে জিরুদ কে সাইন করায় তারা। তবে তখনই মঁপেলিয়েতে যোগ দিতে হয়নি তাঁকে। সিজনের বাকিটা সময় তুর্সেই লোনে কাটান। সেই সিজনে ৪২ ম্যাচে ২৪ গোল করেন, যার মধ্যে ২১ টি ছিলো লিগ গোল। সেবার লিগ টু এর সর্বোচ্চ গোলদাতা নির্বাচিত হন তিনি, একই সাথে নির্বাচিত হন লিগ টু প্লেয়ার অব দ্য ইয়ার।

২০১০ সালের ২৯ জুলাই ইউরোপা লিগ কোয়ালিফাইং ম্যাচে মঁপেলিয়ের হয়ে জিরুদের ডেব্যু হয়। প্রথম ম্যাচের প্রথম ম্যাচেই অভিষেক গোলের দেখা পান। তারপর লিগেও তার ধারাবাহিক গোলের ধারা অব্যাহত রাখেন। কুপ ডি লা লিগের সেমি ফাইনালে পিএসজির বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ১১৭ মিনিটের মাথায় জয়সূচক গোল করেন জিরুদ। সবাইকে অবাক করে মঁপেলিয়ে পৌঁছে যায় ফাইনালে। তবে ফাইনালে অলিম্পিক ডি মার্সেই এর বিপক্ষে ১-০ গোলে হেরে সেবার আর ট্রফি উঁচিয়ে ধরা হয়নি।

মঁপেলিয়ের হয়ে প্রথম সিজনেই দলের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে সিজন শেষ করেন ওলিভিয়ের জিরুদ। দল তার সাথে চুক্তি বাড়িয়ে ২০১৪ পর্যন্ত নতুন চুক্তি সই করে।

২০১১-১২ মৌসুম দারুণভাবে শুরু করেন জিরুদ। প্রথম দুই ম্যাচেই গোল করেন ও জয় তুলে নেন। ব্রেস্তের বিপক্ষে জোড়া গোল করার পর ফ্রেঞ্চ পত্রিকা "লে পারিসিয়েন" তাকে নাম দেয় "লে বুত্যুর ডি শার্ম" বা "দ্য চার্ম স্ট্রাইকার"। তার স্কোরিং এবিলিটি, ব্যক্তিত্ব, চেহারা সব মিলিয়েই এ নাম দেয় তারা। পরের ১৮ ম্যাচে ১৩ গোল করেন জিরুদ। এর মধ্যে ছিলো দিহোন ও সোশোর বিপক্ষে হ্যাট্রিক, সেই সাথে ন্যান্সি, লিওন ও নিসের বিপক্ষে জয়সূচক গোল। তার ধারাবাহিক গোলে মঁপেলিয়েও ফর্মের তুঙ্গে উঠে যায়। ২০১১ এর নভেম্বরে লিগ টেবিলের মাথায় চড়ে বসে।

সিজনের দ্বিতীয়ার্ধেও তাঁর সে আগুনঝরা ফর্ম ধরে রাখেন জিরুদ। লিওন ও নিসের বিপক্ষে পরপর ম্যাচে গোল করেন। ২৪ মার্চ সেইন্ট এতিয়েনের বিপক্ষে তার গোলে ১-০ তে জয়লাভ করে মঁপেলিয়ে ও আবারও টেবিল টপার হিসেবে জায়গা করে নেয়। সিজনের বাকি সময়ে তাদের আর কেউ সেখান থেকে সরাতে পারেনি। সিজনের শেষ ম্যাচে ২-১ গোলে উসের কে হারিয়ে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো লিগ ওয়ান জয় করে মঁপেলিয়ে। জিরুদ ২১ গোল ও ৯ এসিস্ট করে সিজন শেষ করেন। সেই সাথে নির্বাচিত হন লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা।

image_search_1651349232971
লিগ ওয়ান জিতলেও মঁপেলিয়ে খুব বড় মাপের দল ছিলোনা। ট্রান্সফার মার্কেটে বড় বড় সব রাঘব বোয়ালদের মাঝে সে মৌসুমের অসাধারণ পারফরম্যান্সের পর জিরুদের মতো হাই পটেনশিয়াল একটা খেলোয়াড়কে ধরে রাখা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিলোনা। সিজন শেষ হতেই ইউরোপের বড় বড় সব জায়ান্ট রা জিরুদকে দলে ভেড়ানোর জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ে। অবশেষে সে প্রতিযোগিতায় জয়ী হয় আর্সেনাল। প্রায় সাড়ে বার মিলিয়ন ইউরো খরচ করে জিরুদকে দলে টানে গানার্সরা। ফ্রান্স ছেড়ে ইংল্যান্ডে নতুন করে জীবন শুরু করেন চার্ম স্ট্রাইকার।

ইংল্যান্ডের পরিবেশ ছিলো ফ্রান্সের থেকে আলাদা। তাই এখানে জিরুদের জন্য সবকিছু সহজ ছিলোনা একদমই। সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশে নতুন করে শুরু করতে হয় জীবন যাত্রা। কেমন ছিলো তাঁর ইংল্যান্ডের ক্যারিয়ার? এরপর কীই বা হলো তাঁর?

আসছে পরের পর্বে...