• ফুটবল

ম্যান সিটির উত্থান ও ফুটবলে এক নতুন বিপ্লব | পর্ব : ২

পোস্টটি ৪১৮ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

মানচিনির আন্ডারে সিটির ক্রমশ উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রা নির্বিঘ্নে অব্যাহত থাকে। ২০১১-১২ সিজনেই ম্যান সিটি হয়ে ওঠে প্রিমিয়ার লিগের সবচেয়ে ডমিন্যান্ট পাওয়ার। সেবার সামারে ৩৮ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে আতলেটিকো মাদ্রিদ থেকে নিয়ে আসে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত স্ট্রাইকার সার্জিও আগুয়েরো কে। এর পাশাপাশি সিটিতে আরও জয়েন করেন দুই জনপ্রিয় ফ্রেঞ্চ তারকা ফুটবলার সামির নাসরি ও গাইল ক্লিশি।

 

শুরু থেকেই সব প্রতিপক্ষের ওপর নিজেদের ডমিনেশন অব্যাহত রাখে সিটি। সব কম্পিটিশন মিলিয়ে সিজনের প্রথম ১৪ ম্যাচের ১২ টি তেই জয় ছিনিয়ে নেয়। নগর প্রতিদ্বন্দ্বী ও আগের প্রায় দেড় যুগ ধরে প্রিমিয়ার লিগে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করা ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড কে তাদেরই হোম গ্রাউন্ড ওল্ড ট্রাফোর্ডে ৬-১ গোলে নাকানি চুবানি খাওয়ায় সিটিজেনরা। ক্রমেই ইংলিশ ফুটবলের সবচেয়ে বড় পাওয়ার হাউজ হয়ে ওঠে ম্যানচেস্টার সিটি।

 

তবে এরপর গল্প কিছুটা অন্যদিকে মোড় নেয়। আকষ্মিকভাবেই সিটির ফর্ম ড্রপ করে। টানা একের পর এক ম্যাচে পয়েন্ট হারাতে শুরু করে তারা। আর এ সুযোগটা লুফে নেয় প্রতিবেশী ও প্রতিদ্বন্দ্বী ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। টেবিলের মাথায় বেশ শক্ত আসন গেড়ে বসে রেড ডেভিলসরা। ২০১২ এর এপ্রিলে, যখন লিগে প্রতি দলের ম্যাচ বাকি আর মাত্র ছয়টি করে, তখন লিগ লিডারদের সাথে সিটিজেনদের পয়েন্ট ব্যবধান গিয়ে দাঁড়ায় আট। ততদিনে প্রায় সবাই ধরেই নিয়েছে এবার আর হচ্ছেনা। এই কয়টা ম্যাচে এই ব্যবধান ঘোচানো আদতে সম্ভবপরও মনে হয়না।

 

তবে মিরাকল টা তখনো বাকি। কেউ ভাবতেই পারেনি ম্যান সিটির শিখরে আরোহনের গল্পটা এতটা রোমাঞ্চকর ভাবে পূর্ণতা পাবে। শেষ ছয় ম্যাচের সবকটি তে জয় নিয়ে পুরো আঠারো পয়েন্ট আদায় করে নেয় ম্যান সিটি। এর মাঝে ইউনাইটেড কেও নিজেদের মাঠে হারায় ১-০ গোলের ব্যবধানে। আর সিজনের শেষ ম্যাচে তো সৃষ্টি হয় প্রিমিয়ার লিগ ইতিহাসের অন্যতম সেরা ও আইকনিক মুহূর্ত।

 

image_search_1704403266553

 

সেদিন ম্যান সিটির প্রতিপক্ষ ছিলো রেলিগেশন জোনে যুঝতে থাকা কুইন পার্ক রেঞ্জার্স। আগের পাঁচ ম্যাচের জয়ে ততদিনে ইউনাইটেডের সাথে পয়েন্ট ব্যবধান পুরোপুরি ঘুচে গিয়ে গোল ব্যবধানে শীর্ষে চলে এসেছে সিটি। শিরোপা জয়ের জন্য তাই শেষ ম্যাচে ইউনাইটেডের সমান পয়েন্ট পেলেই চলতো। অল্প কথায়, দুর্বল কিউপিআর এর বিরুদ্ধে একটি জয়ই ম্যান সিটি কে এনে দিতে পারতো কাঙ্ক্ষিত প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা। 

 

ম্যাচের শুরু থেকেই সিটি বেশ ডমিনেট করছিলো। ফল পেতে খুব দেরি হয়নি। ৩৯ মিনিটের মাথায় পাবলো জাবালেতার গোলে ১-০ গোলে এগিয়ে থেকে প্রথমার্ধ শেষ করে সিটিজেনরা। ওদিকে আরেক ম্যাচে সান্ডারল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়েইন রুনির গোলে ১-০ গোলে এগিয়ে ছিলো ইউনাইটেড। তাই সমীকরণ দাঁড়ায় যদি শেষ অব্দি সিটি লিড ধরে রাখতে পারে, তবে তারাই চ্যাম্পিয়নের মুকুট অর্জন করতে যাচ্ছে।

 

তবে নাটক শুরু হয় দ্বিতীয়ার্ধে। কিক অফের মাত্র তিন মিনিটের মাথায় গোল করে কিউপিআর কে সমতায় ফেরান জিব্রিল সিসে। ম্যাচের ৫৫ মিনিটের মাথায় কার্লোস তেভেজের মুখে কনুই দিয়ে আঘাত করায় লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন কিউপিআর ক্যাপ্টেন জোয়ি বার্টন। তবে লাভের লাভ কিছুই হয়নি সিটির। বরং উল্টো ৬৬ মিনিটে আর্মান্দ ত্রাওরের দুর্দান্ত ক্রসে মাথা স্পর্শে করে বল জালে জড়িয়ে দেন কিউপিআর ফরওয়ার্ড জেমি ম্যাকি। ২-১ গোলের লিড নেয় তারা।

 

পিছিয়ে পড়ে ধারাবাহিক ভাবে প্রেশার দিতে শুরু করে ম্যান সিটি। তবে আইরিশ গোলরক্ষক প্যাডি কেনি শক্ত হাতে বারবার রুখে দিচ্ছিলেন সিটির সব আক্রমণ। অবশেষে শেষ সময় ঘনিয়ে আসে। ২-১ গোলে পিছিয়ে থেকেই ৯০ মিনিট শেষ করে সিটিজেনরা। মনে হচ্ছিলো আবারও এত লড়াই করে এত কাছে এসেও ফিরে যেতে হবে।

 

ঠিক তখনই শুরু হলো চমক। ৯০ মিনিটের পর অতিরিক্ত সময় যোগ করা হয়েছিলো ছয় মিনিট। এরই দুই মিনিটের মাথায় কর্নার থেকে সিলভার পাঠানো বলে মাথা ছুঁইয়ে বল জালে জড়িয়ে দেন এডিন জেকো। তখন সময় বাকি আর মাত্র তিন মিনিট। এই সময় সিটির হাফে আগুয়েরো বল পেয়ে এক দুর্দান্ত রান নিয়ে বল বাড়ান মারিও বালোতেল্লির দিকে। তিনি সেটা রিসিভ করে এগিয়ে গেলে অ্যান্টন ফার্ডিনান্ড দ্বারা চ্যালেঞ্জের শিকার হয়ে পড়ে যান, কিন্তু পড়ে গিয়েও পা থেকে বল হারাতে দেননি। এরপর সেভাবেই বল আবার ফেরত পাঠান আগুয়েরো কে। অতঃপর আগুয়েরো বল নিয়ে তাইয়ো কে পাশ কাটিয়ে দুর্দান্ত এক শটে কেনি কে পরাস্ত করে বল জড়িয়ে দেন জালে। জয় পায় ম্যান সিটি। সেই সাথে জয় করে বহুল আকাঙ্ক্ষিত প্রিমিয়ার লিগের চ্যাম্পিয়ন ট্রফি টা। রচিত হয় এক নতুন ইতিহাস। প্রিমিয়ার লিগে এক পরাক্রমশালী শক্তি হিসেবে নিজেদের পূর্ণ আবির্ভাব সম্পূর্ণ করে ম্যানচেস্টার সিটি।

 

image_search_1704403286508

 

তবে মানচিনির এমন সুসময় খুব বেশী দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। তাঁর অটোক্র্যাটিক লিডারশীপ দলের মধ্যে বেশ কিছু অভ্যন্তরীণ সমস্যা সৃষ্টি করে। তার পরের সিজন টা কে চুড়ান্ত ব্যর্থ সিজন হিসেবে গণ্য করা হয়। প্লেয়ারদের মধ্যে অসন্তুষ্টি তৈরি হয়। আর এটির প্রভাব খেলার ওপরও পড়তে শুরু করে। প্লেয়ারদের পারফর্মেন্সে ঘাটতি দেখা দেয়। সব মিলিয়ে ক্লাব ম্যানেজমেন্ট বেশ বিপাকে পড়ে যায়। 

 

যদিও সেবার দ্বিতীয় হয়েই সিজন শেষ করে সিটিজেনরা, তবে চ্যাম্পিয়ন ম্যান ইউনাইটেড কে একবারও তেমন শক্ত কোনো চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারেনি। হেসে খেলেই বড় ব্যবধান রেখে শিরোপা ঘরে তোলে রেড ডেভিলস রা। এমনকি সেবার এফএ কাপ ফাইনালে উইগ্যান অ্যাথলেটিকের কাছে হেরে যায় ম্যান সিটি, যারা কিনা সে সিজনেই প্রিমিয়ার লিগ থেকে রেলিগেটেড হয়েছিলো। 

 

সিজন শেষে প্রত্যাশিতভাবেই বরখাস্ত হন রবার্তো মানচিনি। তাঁর জায়গায় নতুন ম্যানেজার হিসেবে নিয়োগ পান চিলিয়ান মাস্টারমাইন্ড ম্যানুয়েল পেলেগ্রিনি। 

 

অভিজ্ঞ ম্যানেজার ম্যানুয়েল পেলেগ্রিনি তখন ইউরোপে নিজের বেশ পোক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছেন। দক্ষিণ আমেরিকায় গোটা আষ্টেক দল কে কোচিং করানোর পর ইউরোপে পা রাখেন। লা লিগায় মালাগা ও ভিয়ারিয়ালের পাশাপাশি জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদেও কিছুদিন প্রধান কোচের দায়িত্ব পালন করেন। সব মিলিয়ে তখন ইউরোপে পেলেগ্রিনির লিগ্যাসি প্রতিষ্ঠিত হয়ে বেশ শক্তপোক্ত ভাবেই। 

 

মানচিনির সাথে পেলেগ্রিনির বেশ কিছু স্বভাবগত পার্থক্য ছিলো। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানচিনি ছিলেন আবেগপ্রবণ, সহজেই উত্তেজিত হয়ে পড়তেন। আর এখানে মানচিনি ছিলেন সম্পূর্ণ বিপরীত। চিলিয়ান কোচ ছিলেন একদমই ঠান্ডা মেজাজের। উত্তেজনা তাঁকে তেমন স্পর্শই করতো না। যেকোনো মুহূর্তেই ধীরস্থির থাকতে পারতেন, যেকোনো পরিস্থিতি সামাল দিতে পারতেন শান্তভাবে, ঠান্ডা মাথায়। আর ম্যান সিটির তখন ঠিক এটাই দরকার ছিলো, যিনি সবসময় ঠান্ডা মাথায় ড্রেসিং রুম হ্যান্ডেল করতে পারবেন।

 

তাঁর আন্ডারে প্রথম সিজন টা ছিলো দুর্দান্ত। তর্কসাপেক্ষে সেবারের সিজন কে তখন অবধি ক্লাব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম সিজন বলা হয়। ক্লাব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সময় সেবার লিগ ও কাপের ডাবল জয় করে ম্যানচেস্টার সিটি। লিগ কাপের ফাইনালে সান্ডারল্যান্ড কে ৩-১ গোলের ব্যবধানে হারিয়ে শিরোপা জয় করে। অন্যদিকে লিগে পুরো সিজন জুড়ে দুর্দান্ত লড়াইয়ের পর লিভারপুল কে পেছনে ফেলে তিন বছরের মধ্যে দুটি লিগ টাইটেল জিতে নেয়। সে সিজনে ম্যান সিটির আক্রমণাত্মক খেলাটিও ছিলো দারুণ দৃষ্টি নন্দন। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে সেবার ১৫৬ টি গোল করে সিটিজেনরা।

 

image_search_1704403474290

 

পেলেগ্রিনির দ্বিতীয় সিজনও শুরু হয়েছিল বেশ ভালোভাবেই। ক্রিসমাসের পর সেবার লিগে চেলসির সাথে যৌথভাবে শীর্ষ পজিশন ধরে রাখে তারা। মনে হচ্ছিলো এবার লিগ টাইটেল রিটেইন করবে ম্যান সিটি। তবে সিজনের সেকেন্ড হাফ ঠিক আশানুরূপ ছিলোনা। বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে পয়েন্ট খুইয়ে শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় হয়ে সিজন শেষ করতে হয় তাদের।

 

ওদিকে আরবের মালিকপক্ষ ও ম্যানেজমেন্টের সামগ্রিক প্রচেষ্টায় পিচের বাইরেও ক্লাবের ধারাবাহিক অগ্রগতি অব্যাহত ছিলো। আবু ধাবি ইউনাইটেড গ্রুপ দেড়শ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করে ক্লাবের ট্রেইনিং সেন্টার ও একাডেমির উন্নয়ন সাধনের জন্য। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে আত্মপ্রকাশ করে সিটি ফুটবল একাডেমি এবং অতি দ্রুত ইংল্যান্ডের অন্যতম সেরা একাডেমিতে পরিণত হয়। একাডেমির ম্যানেজিং ডিরেক্টর সাবেক ইংলিশ ফুটবলার ব্রায়ান মারউড বিশেষ তত্বাবধানের মাধ্যমে একাডেমির প্রতিটি খেলোয়াড়ের পরিপূর্ণ উন্নয়ন সাধনের জন্য প্রয়োজনীয় সকল সাহায্য ও সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করেন। 

 

তবে সিটি ফুটবল গ্রুপের প্ল্যান ছিলো আরও বিস্তৃত ও দূরদর্শী। তারা ম্যানচেস্টার সিটি তে আর সীমাবদ্ধ থাকেনি। ম্যান সিটির পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন সিটি নামধারী ক্লাবের ওপর তারা ফোকাস করতে শুরু করে, পাশাপাশি সিটি নাম ব্যবহার করে বিশ্বের নানা স্থানে নতুন ক্লাব গঠন করতেও শুরু করে। এর মধ্যে ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় নিউ ইয়র্ক সিটি। এরপর ক্রমান্বয়ে যুক্ত হয় মেলবোর্ন সিটি, ইয়োকোহামা এফ ম্যারিনোস, ম্যান সিটি উইমেন ও মেলবোর্ন সিটি উইমেন, সবই ছিলো সিটি ফুটবল গ্রুপের দীর্ঘমেয়াদি প্ল্যানের অংশ। ক্লাব গুলো একটি আরেকটির পার্টনার ক্লাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, ফলে স্কাউটিং চলতে থাকে সারাবিশ্ব জুড়ে। অসংখ্য নতুন নতুন স্পন্সর যুক্ত হতে থাকে তাদের সাথে। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে "সিটি" নামটি। ক্রমেই ফুলে ফেঁপে উঠতে থাকে সিটি ফুটবল গ্রুপ।