X
GO11IPL2020
  • ক্রিকেট

'প্রহর শেষের আলোয় রাঙা' ম্যাচটি

পোস্টটি ১০০০৮ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

১.

 

দু'গাল বেয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়াটা সেবারই প্রথম নয়। প্রথম নয়, গলা ফাটিয়ে, গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করাটাও, দূর থেকে শুনলে যাকে আর্তনাদ বলেই বোধ হতো অন্য যেকোনো সময়। যা প্রথম, বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকেট প্রাপ্তি, তারপরের মুহূর্তের ওই অনুভূতি।

 

অন্যদিন রাস্তার মোড়ে মোড়ে এমন চিৎকারে কয়েক মুহূর্তের জন্য হয়তো বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠতো অনেকের। কিন্তু, কি আশ্চর্য বলুন, এরকম আর্তচিৎকারে ভেসে যাচ্ছে চারিদিক, তবুও সেদিকে তাকানোর সময়ই যে কারোর নেই! আপনিও তো জানেন, এই ছোটখাটো শব্দ ভূকম্পন আর্তচিৎকারের নয়, আনন্দোল্লাসের

২. 

 

৯ই মার্চ, ২০১৫। শীতের জীর্ণতা কাটিয়ে বসন্তের রঙে প্রকৃতি নিজেকে রাঙিয়ে নেয়ার ক্ষণ গুনছে। বাংলাদেশের ক্রিকেটেও বসন্ত আসবে কি আসবে না, এমনই এক দোলাচলে দুলছে। মাশরাফিরা পারবেন বসন্ত আনতে, এমন বিশ্বাস যখনই মনের কোণে দানা বাঁধতে শুরু করে, পিঠেপিঠিই চলে আসছে এমন ভাবনা, ব্রিটিশ বধ হবে তো? বাড়ির কাছের 'শ্রীলঙ্কান সিংহ'দের কাছেই নাস্তানাবুদ হতে হলো, ওই অভিজাত 'ইংরেজ সিংহ'দের বধ করার কথা কেমন করে ভাবি!

 

সমীকরণ এমন ছিলো না যে ইংল্যান্ডকে হারাতে না পারলেই সব সম্ভাবনার সমাপ্তি ঘটবে। হোক না স্বাগতিক, সর্বশেষ সাত ম্যাচেই যেহেতু নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ের মুখ দেখা গিয়েছে, এবার নাহয় টানা অষ্টমবার কিউইদের হারানোর স্বাদ নেয়া হবে। তবুও, কে চায়, শেষ ম্যাচে চাপ বাড়াতে? ব্ল্যাক ক্যাপসদের ডেরায় নিজেদের ভাগ্য সঁপতে? নাহ, এই ম্যাচই সই।

 

এই দেখুন, এত কিছু বলে ফেললাম, অথচ বলাই হলো না সমীকরণটা কি ছিলো। অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে বিশ্বকাপের বিমানে চড়ার আগে দলপতি মাশরাফি বলে গিয়েছিলেন, 'কোয়ার্টার ফাইনাল খেলতে চাই।' এই সমীকরণের সমাধানের জন্যই এত উত্তেজনা, এত চাঞ্চল্য। আফগানিস্তান আর স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে সেই সমীকরণ মেলানোর পথ অনেকটাই মসৃণ হয়ে গিয়েছিলো। মাঝখানে বৃষ্টির বাগড়ায় অস্ট্রেলিয়ার সাথে ম্যাচে যখন ১টি পয়েন্ট পাওয়া গেলো, সমীকরণ তখন খুবই সোজা, 'ইংলিশদের বধ করো, ক্যাপ্টেনের মুখ রক্ষা করো।'

 

৩.

 

যেদিন বাংলাদেশ ম্যাচ জিতবে, সেদিন নাকি শুরু থেকেই বলে দেয়া যায়, দিনটা বাঘেদেরই। শরীরীভাষা, শট, রান সবকিছুতেই দেখা যায় বাঘের খুনে মানসিকতার ছাপ। তাই, যখন খবর আসে, ম্যাচের ভেন্যু এডিলেডে সকালেই একপশলা বৃষ্টি হয়ে গিয়েছে, এমনিতেই বুকের ভেতরটা ধক করে কেঁপে ওঠে। বাংলাদেশ যে এমন কন্ডিশনে সহজাত নয়। তখন তো আর জানার উপায় ছিলো না, এই বাংলাদেশ প্রকৃতির বাধা টপকাতে শিখে গিয়েছে।

 

কেবল বৃষ্টি হলেও কথা ছিলো, এর সাথে আকাশেরও মুখ কালো। বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের দুরাবস্থার কারণ হিসেবে ইংলিশ মিডিয়া এক নম্বরেই যাকে দায়ী করেছেন, ব্রড- এন্ডারসনের নিষ্প্রভতা। নতুন বলে সুইং না পাওয়া ছাড়া যার আর কোনো কারণ নেই। মুখ গোমড়া করা কালো আকাশের নিচে জেমস এন্ডারসন আর স্টুয়ার্ট ব্রড কতটা কি করতে পারেন, সেটা পরিসংখ্যানই সাক্ষ্য দেয়। পরিসংখ্যানে যদি লেখা থাকতো, সুইং বলে কোন দলের ব্যাটসম্যানরা কতরূপে বিপর্যয়ে পড়েছেন, বাংলাদেশের নামটি সর্বাগ্রেই পাওয়া যেত। টস হেরে ব্যাট পাওয়া বাংলাদেশ তাই যখন তামিম আর ইমরুল কায়েসকে মাত্র ৮ রানে হারিয়ে ফেলে, অবাক লাগে না মোটেই। আশার বেলুন শুধু চুপসেই যায় না, একেবারে ফুটোই হয়ে যায়। তখনো তো জানি না, সুইং বল, এন্ডারসন, ব্রডদের জুজু কাটানো এই বাংলাদেশ শিখে গিয়েছে। ২ উইকেট হারানো মানেই ম্যাচ শেষ নয়, এই ধারণাও বাংলাদেশ পেয়ে গিয়েছে। মাত্রই ৫ম ম্যাচ খেলতে নামা, সৌম্য সরকারের ব্যাটে প্রতিটি চার তাই সাক্ষ্য দেয়, 'নতুন বাংলাদেশ, লোডিং।' সাথী হন, মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ। 

 

দুজনের ৮৬ রানের জুটিতে যখন আশার পালে আবারো হাওয়া লাগতে শুরু করেছে, সৌম্য সরকারের বিদায় তখনই। এর আগে এমন পরিস্থিতিতে বহুবার যিনি দলকে উদ্ধার করেছিলেন, সেই সাকিব আল হাসান যখন বিদায় নেন পিছু পিছু, আশংকা তখন অসহায় আত্মসমর্পণের, আরো বহুবারের মতো।

 

তবে যে ম্যাচ হতে যাচ্ছে নবদিনের জয়গান, সে ম্যাচে আর এসব পুরনো ইতিহাস ভিড় করে কি করে! যাদের ব্যাটে জোড়া লাগে নতুন দিনের স্বপ্ন, সম্পর্কে তারা ভায়রা ভাই। মুশফিকের কৃপায় মাহমুদুল্লাহ দলে, এই কথা শুনতে শুনতে মাঠের বাইরের এই সম্পর্ককে যাদের কাছে ততদিনে বিষম বোঝা মনে হতে বাধ্য। আর এসব সমালোচনার জবাব দেয়ার জন্য বেছে নিলেন, নতুন দিনের জয়গান গাওয়ার এই মঞ্চকেই। দুজনের ১৪১ রানের জুটিতেই গড়ে উঠলো বাংলাদেশের স্বপ্নসৌধ। এর পেছনে বড় কৃতিত্ব মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের শতকের, বিশ্বকাপে বাংলাদেশের হয়ে যা প্রথম। ৫০ ওভার শেষে স্কোরবোর্ডে জমা পড়লো ২৭৫ রান।

Screenshot_2017-05-29-09-12-09-1

 

এডিলেডের ইতিহাস বলে রান কিঞ্চিৎ কম, উইকেট যে ব্যাটিং-স্বর্গ। আর উইকেটের আড়াআড়ি ছোট বাউন্ডারি বলে, ২০-২৫ রানের আক্ষেপে পুড়তেও হতে পারে দিনশেষে। বিশ্বাস- অবিশ্বাসের দোলাচলে কাটে প্রতিটি মিনিট, প্রতিটি সেকেন্ডও।

 

৪.

 

যে দল মানেই ছিলো বাঁহাতি স্পিনারদের সরাইখানা, সে দলে তিন পেসার। সারাবছর অবহেলিত থাকা সেই পেসাররা উগরে দিলেন ক্ষোভের আগুন, তাতে পুড়ে ছারখার ব্রিটিশ ইনিংস। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকা লাগে স্কোরকার্ডের দিকে, ১০ উইকেটের কোনটিই যায়নি স্পিনারদের দখলে। পেসারদের কল্যাণে এলো ১৫ রানের এক জয়, নিশ্চিত হলো কোয়ার্টার ফাইনালের টিকেটও।

 

বহু সরল এই স্কোরকার্ডের সাধ্য কি করে বোঝায়, ফলের আগে বহুবার বদলেছে এই ইনিংসের রঙ। ইংল্যান্ডের ২৬০ রানের ইনিংসেই খন্ডগল্পের অভাব নেই।

 

দলীয় ৪৩ রানে রানআউটে যখন উদ্বোধনী জুটি ভাঙল, বাংলাদেশের জয় তখনো দূরের বাতিঘর। ২০তম ওভারেই যখন ইংল্যান্ডের স্কোরবোর্ডে শতরান, জয় ক্রমেই সুদূরে মিলিয়ে যাওয়ার জোগাড়। ম্যাচের লাগাম তখন ব্রিটিশদের হাতে। ১২১ রানে ৩য় উইকেট পতনের পরের ৪২ রানে আরো ৩ উইকেট নিয়ে যখনই ব্রিটিশদের টুঁটি চেপে ধরার স্বপ্ন ডানা মেলা শুরু করেছে, বাটলার আর ওকসের ৭৫ রানের জুটি সেই স্বপ্নের ডানা কেটে দিয়েছেন মাত্র ৬১ বলেই। 

 

২৩৮ রানের মাথায় সেই জুটি ভাঙার পরও নাটকীয়তার কমতি ছিলো কি! ম্যাচ শেষের আগ পর্যন্ত যা স্নায়ুচাপ বাড়িয়েই গেলো। বাটলার তাসকিনের বলে ফিরে গেলেও পেন্ডুলাম তখন ইংল্যান্ডের দিকেই ঝুঁকে।

 

টি-২০ ক্রিকেটের এই যুগে ২৫ বলে ৩৮ রানের সমীকরণ তো খুবই সম্ভব। সেটিকে ১৮ বলে ৩১ রান বানিয়ে বাংলাদেশ যখন একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে যাবে, তখনই অস্বস্তির ঝোড়ো হাওয়া বয়ে গেল ইনিংসের ৪৮তম ওভারে। লং অনে ওকসের ক্যাচ ফেলে দিলেন তামিম ইকবাল। ম্যাচও ফেলে দিলেন, তামিমকে এই ভাবনায় শাপশাপান্ত করার চিন্তা ততক্ষণে শুরু হয়ে গিয়েছে। তাসকিনের ওই ওভারে রান এল ১৫। শেষ ২ ওভারে ইংল্যান্ডের দরকার ১৬ রান, হাতে ২ উইকেট। কী লেখা আছে স্নায়ুক্ষয়ী এই নাটকের অন্তিম দৃশ্যে?

 

৩ বলের মাঝে দুবার স্ট্যাম্পের এলইডি বাল্ব জ্বালিয়ে এধার-ওধারে উড়তে থাকা এই প্রশ্নের উত্তর এনে দিলেন রুবেল হোসেন। ইংল্যান্ড তখনো জয় থেকে ১৫ রানের দূরত্বে দাঁড়িয়ে।

 

Screenshot_2017-05-28-21-26-29-1 

 ৫.

 টিভিপর্দার ওপারে দেখা গেল, এডিলেডে রুবেল হোসেন তখন যুদ্ধজয়ী রোমান গ্ল্যাডিয়েটরের মতো পাগলাটে দৌড়ে মত্ত। ক্যাপ্টেন এডিলেডের সবুজ মখমলে শুয়ে পড়লেন তৎক্ষণাৎ। একে একে তাঁর উপর জড়ো হলেন সব খেলোয়াড়, যে ছবি বাংলাদেশের ইতিহাসেরই সেরা ছবি কিনা, সে প্রশ্ন যথেষ্টই যৌক্তিক।

 

Screenshot_2017-05-28-21-24-13-1

 

আর হাজারমাইল দূরের এপারে? সূর্যটা পশ্চিমাকাশে মুখ লুকানোর অপেক্ষায়। এরই মাঝে.....

 

আনন্দের আতিশয্যে ভাব প্রকাশের মাধ্যম কি আর্তচিৎকারে রূপ নেয়?

 

৬.

 

(পুনশ্চ: এই লিখা যখন লিখছি, সেদিনের পর পেরিয়ে গেছে পাক্কা ৮২০ দিন। পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করানোর স্বাদ পাওয়া গিয়েছে এরই মাঝে। ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকাকে সিরিজ হারানোর স্বাদও। তবু কানের কাছে নাসের হুসেইন এখনো যেন ধুনা তুলে চলেছেন, 'the Bangladesh tigers have knocked the English lions out of the world cup.)