X
GO11IPL2020
  • ফুটবল

একজন মেসুত ওজিল

পোস্টটি ৮৯৯ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

ক্যারিয়ারের পড়তির দিকে আছেন, আগের মত এসিস্টের ফুলঝুরিতে আর মুগ্ধ করে রাখেন না ফুটবলপ্রেমীদের। মাঠের চেয়ে বেঞ্চে বসে সময় কাটাতেই এখন বেশি দেখা যায়। কিন্তু মাঠের বাইরে তিনি বরাবরই অনন্য, এখনো বজায় রেখেছেন সেটা। এতক্ষণে হয়ত বুঝে ফেলেছেন কার কথা বলা হচ্ছে। হ্যাঁ, বলছিলাম মেসুত ওজিলের কথা।

অভিবাসী বাবা-মা মুস্তফা ওজিল আর গুলিজার ওজিলের ঘরের কনিষ্ঠ সন্তান মেসুত ওজিল। ১৯৮৮ সালের ১৫ ই অক্টোবর জার্মানির ছোট্ট শহর জেলসেনকির্সেনে জন্ম ওজিলের, জন্ম জার্মানিতে হলেও ওজিল তুর্কি বংশোদ্ভূত। মূলত ওজিলের দাদা-দাদি তুরস্ক ছেড়ে জার্মানিতে পাড়ি জমান সুন্দর জীবনযাপনের আশায়।

বেশ দরিদ্র এক পরিবারে জীবনের শুরু ওজিলের। ওজিল যেসময়টায় পৃথিবীতে এসেছিলেন তখন জার্মানিতে চলছিল শিল্পপতন, অভিবাসীদের বেকারত্বের হার ছিল ৭০% এরও বেশি। স্বাভাবিকভাবেই অর্থকষ্টে ভুগছিলেন ওজিলের পরিবার। অভিবাসীদের তখনকার সময়টা ছিল দুর্বিষহ।

এসমস্তকিছুর পরেও ওজিল বেশ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। যে কাজেই হাত দিয়েছেন সেটাতেই হয়েছেন সফল- একাডেমিক কার্যক্রম থেকে ফুটবল খেলার হাতেখড়ি - ওজিল যেন ফুটবলকেই ব্যবহার করেছেন কষ্টের জীবন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য। বাসার আশেপাশের মাঠে খেলতে খেলতেই ওজিলের ফুটবলের শুরু। অনেকসময় ঘুমাতে গেলেও ওজিলের সাথে থাকত ফুটবল। বড় ভাইয়ের কাছ থেকেও টুকটাক বল কন্ট্রোলের কৌশল শিখে নিয়েছিলেন। স্কুল-কলেজ ফুটবলে নিজের প্রতিভার জানান দিয়ে যাচ্ছিলেন প্রতিনিয়ত, বুঝতে পেরেছিলেন ফুটবলই হতে যাচ্ছে তার ভবিষ্যৎ ঠিকানা।

সিনিয়র ক্যারিয়ারের শুরুটা ২০০৬ সালে, নিজের শহরেরই ক্লাব শালকে ০৪ এ। দুই মৌসুম পর পাড়ি জমান বুন্দেসলিগার আরেক ক্লাব ওয়েরডার ব্রেমেনে। ২০১০ বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে নজর কাড়েন স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদের। ১৫ মিলিয়ন ইউরোতে ওজিলকে দলে নেয় রিয়াল, ওজিল নিজের ক্যারিয়ারের স্বর্ণালি সময়টা সম্ভবত কাটিয়েছেন সেখানেই।

নিজের প্রথম মৌসুমেই কোপা ডেল রে জেতেন ওজিল। পরবর্তী মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদের লিগ জয়ে বড় ভূমিকা রাখেন লিগ সর্বোচ্চ ১৭ টি এসিস্ট করে। শৈল্পিক ফুটবলের মাধ্যমে চিনিয়েছেন নিজের জাত। পরের মৌসুমটা রিয়ালে কাটানোর পর ৫০ মিলিয়ন ইউরো ট্রান্সফার ফি তে যোগ দেন আর্সেনালে। উল্লেখ্য যে, রিয়াল মাদ্রিদ ক্যারিয়ারে মাত্র ৩ মৌসুমেই ২৭ গোলের পাশাপাশি ওজিলের এসিস্ট ৮০ টা, ওজিলের সেরা সময়টা কেটেছে বার্নাব্যুতেই।

আর্সেনালের হয়ে ইতোমধ্যে ৩ টি এফএ কাপ জিতেছেন ওজিল, ২০১৫-১৬ মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগের ২য় সর্বোচ্চ এসিস্টও ছিল তার(১৯ টি)। এখনকার আর্সেনাল একাদশে ব্রাত্য হয়ে পড়েছেন ওজিল, বেশিরভাগ সময় বেঞ্চেই কাটান। কিন্তু এসিস্টের রাজা ওজিলের শৈল্পিক ফুটবলের কোনো তুলনাই হয় না.... এটা নিঃসন্দেহে বলে দেয়াই যায়।

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে জার্মানির হয়ে ২০১৪ বিশ্বকাপ জিতেছেন ওজিল। ২০১৮ বিশ্বকাপের পর একরকম হুট করেই বর্ণবাদী আচরণের কারণে জাতীয় দল থেকে অবসর নিয়ে নেন ওজিল।

মাঠের ওজিল মাঠের বাইরে দুর্দান্ত একজন মানুষ। বিভিন্ন সময়ে ওজিলের নানারকম মহৎ কাজ সৃষ্টি করেছে বহু দৃষ্টান্ত। '১৪ বিশ্বকাপ জয়ে প্রাপ্ত অর্থ তিনি দান করে দিয়েছিলেন ২৩ জন ব্রাজিলিয়ান শিশুর চিকিৎসার জন্য, এটা ছিল ওজিলের পক্ষ থেকে ব্রাজিলের অতিথিপরায়ণতার জন্য একটা বিশেষ ধন্যবাদ। ২০১৬ সালে জর্ডানের এক শরনার্থী শিবির ভ্রমণে গিয়েছিলেন ওজিল, সেখানকার শিশুদের সাথে খেলেছেন ফুটবল, দিয়ে এসেছেন নিজের অটোগ্রাফ দেওয়া কিছু জার্সিও। ২০১৭ সালে এক চ্যারিটির সহযোগিতায় ক্যান্সার আক্রান্ত এক শিশুকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন এমিরেটস স্টেডিয়ামে, ওজিল দেখা করেছিলেন সেই শিশুর সাথে। এ বছর রমযান মাসকে সামনে রেখে এক তুর্কি চ্যারিটিতে দান করেছেন প্রায় ৮০০০০ পাউন্ড। তাছাড়া নিজের বিয়ের অনুষ্ঠানের অর্থ দান করেছেন ১৬ টি শরণার্থী শিবিরের প্রায় ১ লক্ষ মানুষের মাঝে। সম্প্রতি করোনা পরিস্থিতিতে আর্থিক সংকটের কারণে আর্সেনালের মাসকট গানারর্সোরাসকে বেতন দিতে পারছে না জানানোর পর ওজিল যতদিন আর্সেনালের খেলোয়াড় হিসেবে থাকবেন ততদিন নিজের বেতন গানারর্সোরাসকে প্রদান করতে চেয়েছেন যেন সে তার চাকরিটা চালিয়ে যেতে পারে। মাঠের বাইরের এমন অনেক অসাধারণ কাজের মাধ্যমে মানুষ হিসেবে ওজিল নিজেকে নিয়ে গেছেন অন্য উচ্চতায়, পেয়েছেন অসংখ্য মানুষের শ্রদ্ধা, সম্মান।

 

ওজিলের ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য রইল অনেক শুভকামনা।