• ক্রিকেট

বাংলাদেশ ক্রিকেট: জানুয়ারি থেকে মে

পোস্টটি ৬৫৫ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

মোটামুটি এক বছর পর ক্রিকেট নিয়ে আবার একটু লিখতে ইচ্ছা করছে। লাসিথ মালিঙ্গাকে নিয়ে গতবছরের মে মাসে প্যাভিলিয়নেই শেষ লিখেছিলাম। এরপর আর ক্রিকেট নিয়ে সেরকম কোনো লেখালেখি করা হয়নি। সত্যি বলতে, প্যাভিলিয়নের এই সবুজ আউটফিল্ডের কথা মনে করেই আবার একটু লিখতে বসা।


আমরা বাংলাদেশের খেলা দেখি মোটামুটি ভারসাম্যহীন একটা মন নিয়ে। যে মনে আনন্দ এবং দুঃখ এমনভাবে ওজন করা থাকে, যা খুব ভালো ব্যালেন্স করতে পারেনা। আপনি যখন খুব আনন্দিত হবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করবেন, তখনই বাংলাদেশ দল আপনাকে নিয়ে দুঃখের সাগরে ডুব দিবে। আবার যখন দুঃখের সাগরে ডুবতে ডুবতে ভাসছেন, তখন হঠাৎ করে কেউ আশার প্রদীপ জ্বেলে দিবে। তখন দুঃখের সাগরে আশার প্রদীপ সুখের মতো বোধ হবে। এভাবেই দিনের পর দিন যাচ্ছে। আমরা সমর্থকরা ব্যালেন্স করতে পারছিনা। এখন ২০২১ সাল। বছরের পঞ্চম মাস যাচ্ছে। কতটুকু ক্রিকেট খেললাম, কতটুকু অর্জন করলাম এই কয়েক মাসে সেটা নিয়েই কথা হোক। এরমধ্যে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল কতটুকু আনন্দের উপলক্ষ করে দিতে পারলো, কতটুকু দুঃখই বা দিল, সেটা নিয়েও একটু আলাপ হোক।
 

গতবছর মার্চে কোভিড পরিস্থিতির পর বাংলাদেশ দল ক্রিকেটে ফেরে অক্টোবর মাসে। বিসিবি থেকে আয়োজন করা হয় প্রেসিডেন্টস কাপের, ৫০ ওভারের ফরম্যাটে ৩ টি দল মোট ৭ ম্যাচের শিডিউল। অক্টোবরের ১১ তারিখ শুরু হয়ে ২৫ তারিখ ফাইনাল হয়ে শেষ হয় এই টুর্নামেন্ট। চ্যাম্পিয়ন দল- মাহমুদউল্লাহ একাদশ। রানার্স আপ দল- নাজমুল শান্ত একাদশ। অন্য দলটি ছিল তামিমের নেতৃত্বে। এরপর নভেম্বর-ডিসেম্বর মাস জুড়ে বঙ্গবন্ধু টি-টুয়েন্টি কাপ। বিপিএলের আদলে করা পুরোপুরি স্বদেশী খেলোয়াড় দিয়ে গঠিত ৭ টি দল অংশ নেয় এতে। সাকিব আল হাসানের জন্য এই সময়টা একটু আলাদাই ছিল। কারণ নিষেধাজ্ঞা থেকে ক্রিকেটে ফেরার আনন্দটা একটু আলাদা তো বটেই।

bcb-Dhaka Tribune                                            

জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসঃ

এতদিন পর ক্রিকেটে ফিরছে দেশ, বিসিবি প্রস্ততির কমতি কিছু রাখেনি। পরপর দুইটা ঘরোয়া টুর্নামেন্ট কম তো নয়। আমরা ভাবলাম ভালো কম্বিনেশনের দল তবে একটা গঠন হোক এ বেলা। ওয়েস্ট ইন্ডিজ এলো দেশে জানুয়ারি মাসে। তিন ওডিআই আর দুইটা টেস্ট ছিল সূচীতে। প্রথম দুই ওয়ানডে ঢাকায় এবং শেষ ওয়ানডে চট্টগ্রাম। ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল ঘোষণা করবার পর আমরা এদেশী সমর্থকরা খুব রাগ করলাম। রাগ না বলে অপমানিত বোধ করলাম বলা ভালো। এই রাগ বা অপমানের কারণ, উইন্ডিজরা তাদের খর্ব শক্তির দল পাঠাচ্ছে আমাদের জন্য। যেটা আমাদের অপমানের কারণ। সে যাহোক, ঢাকায় হওয়া প্রথম দুটি ওয়ানডেতে উইন্ডিজ দলের দলীয় সংগ্রহ ছিল যথাক্রমে ১২২ এবং ১৪৮। সেই দুই ম্যাচ যথাক্রমে ৬ এবং ৭ উইকেটে খুব সহজভাবেই জিতে যায় বাংলাদেশ। চট্টগ্রামে হওয়া তৃতীয় ওয়ানডেতে শুরুতে ব্যাট করবার সুযোগ পেয়ে বাংলাদেশ দলের দলীয় সংগ্রহ দাঁড়ায় ২৯৭ রান। সেই ম্যাচও ১২০ রানের রাজসিক জয় পায় বাংলাদেশ। অর্থাৎ তিন ওডিআইয়ের তিনটিতেই বাংলাদেশ বেশ ভালো করে। এবং আমরা সমর্থকরাসহ সকলেই আনন্দে ভেসে যেতে থাকি।

Espn cricinfo

ঝামেলাটা হয় টেস্ট সিরিজে গিয়ে। সেই 'খর্বশক্তি' উইন্ডিজ দলের সাথে আমাদের প্রথম টেস্ট ছিল চট্টগ্রামে। প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ ব্যাট করে। আমরা দেখি মিরাজের মেইডেন টেস্ট সেঞ্চুরি। বল হাতে মিরাজের চার উইকেট। দ্বিতীয় ইনিংসে আসে মুমিনুলের শতক। আমরা টার্গেট রাখি ৩৯৫ রানের। উইন্ডিজদের দ্বিতীয় ইনিংসে কাইল মেয়ার্স নামক একজন, নিজের ডেব্যু ম্যাচে ২১০ রানের অতিমানবীয় ইনিংস খেলে দলকে জয়ী করে ফেরে। সাথে ছিল আরেক ডেব্যুট্যান্ট নকরুমা বোনার। যার দায়িত্বশীল ৮৬ রানের ইনিংসের কথাও বলতে হয়। যার ফলে উইন্ডিজদের সাথে প্রথম টেস্ট আমরা হেরে যাই। দ্বিতীয় টেস্ট ভেন্যু ঢাকা। প্রথম ইনিংসে উইন্ডিজরা ব্যাটিংয়ে ৪০৯ রান তোলে। যেখানে আবারো বোনার, জসুয়া ডা সিলভা তারা ভালো ইনিংস খেলে। শেষে আলজারি জোসেফের কাছ থেকেও ৮২ রানের ইনিংস পায় উইন্ডিজ দল। ব্যাটিংয়ে আমাদের বলার মত কোন স্কোর ছিল না। দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ২৩১ রানের টার্গেট নিয়ে বাংলাদেশ নামলেও, উন্ডিজ বোলারদের সামনে সেরকম কোন সুযোগ তৈরি করতে পারেনা। ফলাফল, উইন্ডিজ মাত্র ১৭ রানে ম্যাচ জিতে নেয়। অর্থাৎ ঘরের মাঠে হওয়া দুইটি টেস্ট আমরা আয়োজন করে হেরে গেলাম। এরপর সমালোচনা হয়েছে, কথা হয়েছে অনেক। কিন্ত এই টেস্ট ক্রিকেটে মানসিকভাবে শক্ত আর ধৈর্য্যশীল হবার যে স্বভাব অন্য দলে দেখা যায়, সেটা আমরা আর কবে, কখন কিভাবে পাব, তা জানা যায়নি।

 

মার্চ মাসঃ

ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে টেস্টে এহেন কাণ্ডের পর আমরা উড়াল দিলাম নিউজিল্যান্ডের উদ্দেশ্যে। সাকিব আল হাসান নিজের ব্যক্তিগত কারণে এই সিরিজ থেকে ছুটি নেন। উড়াল দেওয়া হলো তাই সাকিবকে ছাড়াই। সিরিজ সূচীতে তিন ওডিআই, তিন টি-টুয়েন্টি। সময় হিসেবে বাংলাদেশ দলের জন্য এই সফর ছিল বেশ লম্বা। সাথে নিউজিল্যান্ডের কোয়ারেন্টাইনের নানারকম বিধিনিষেধ। ২০, ২৩, ২৬ মার্চ ছিল তিন ওয়ানডের সূচী। বাংলাদেশ দল কোন ম্যাচেই সেরকম সুবিধা অর্জন করতে পারেনি। না ব্যাটে, না বলে , কোথাও থেকেই আশানুরূপ কিছু পায় না দল, পাই না আমরা সমর্থকরাও। যার ফলে, তিনটি ওয়ানডেই খুব বাজেভাবে হেরে যেতে হয়। ২৮, ৩০ মার্চ এবং ১ এপ্রিলে হওয়া তিন টি-টুয়েন্টিতেও একই দশা। বলার মত কোন পারফর্মেন্স বাংলাদেশ দল করতে পারেনি। ফলাফল, তিন টি-টুয়েন্টির তিনটিতেই পরাজয়। যতটা দৈন্যদশা একটা ক্রিকেট দলের হতে পারে, কিউইদের সাথে এই ফলাফল করে দল হিসেবে বাংলাদেশের সেসময় ততটা দৈন্যদশাই চলছিল। আগের মাসে উইন্ডিজদের সাথে টেস্ট হার, আর এ সময়ে নিউজিল্যান্ডে গিয়ে এই পরিস্থিতি। সমালোচনা করতে দেরি করেনি বাংলাদেশ সমর্থকগোষ্ঠীরা। যাহোক, ঘোরের মত একটি সিরিজ শেষ করে দেশে ফেরে বাংলাদেশ দল।

inside sport                                       

এপ্রিল-মে মাসঃ

দল যাবে এবার শ্রীলংকায়। উদ্দেশ্য দুইটি টেস্ট ম্যাচ। এরমধ্যে সাকিবকে নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। টেস্ট সিরিজ থেকে ছুটি চেয়েছেন তিনি। সেটার সাথে যুক্ত হয়েছে বিসিবির প্রতি করা সাকিবের অভিযোগ। শেষমেশ সাকিব ইন্ডিয়াতে ছুটলো আইপিএল খেলতে। মুস্তাফিজও তাই। আর এই দুইজনকে ছাড়া বাকি দল ১২-ই এপ্রিল রওনা দিল শ্রীলংকার উদ্দেশ্যে। ২১ এপ্রিল শুরু হওয়া প্রথম টেস্টে বাংলাদেশ ভালো ব্যাটিং শৈলীর জানান দিল। সমালোচকদের প্রাণ- নাজমুল শান্ত নিজের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি করে, নিজের রান দেড়শ ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। অন্যদিকে অধিনায়ক মুমিনুলের সেঞ্চুরি আর তামিমের ৯০। ৫৪১-৭ স্কোরে ডিক্লেয়ার দেয় দল। ওদিকে শ্রীলঙ্কা নিজেদের ইনিংসে এসে ৬৪৮ রান তোলে। যেন একে অন্যকে ছাড়িয়ে যাবার চেষ্টা। যেখানে অধিনায়ক করুনারত্নের ২৪৪ এবং ডি সিলভার ১৬৬ রান। ব্যাট আর রানেই শেষ হয় প্রথম টেস্ট। অনেকে বলছিল, ৭ দিন গেলেও এই টেস্ট শেষ হতো না। যাহোক, প্রথম টেস্টের ফলাফল ড্র।

getty image

 

দ্বিতীয় টেস্ট শুরু হয় ২৯ এপ্রিল। একই ভেন্যু, পাল্লেকেলে। এই টেস্টে বাংলাদেশের বলার মতো কোন ব্যাটিং চোখে পড়ে না। শুধু প্রথম ইনিংসে তামিমের ৯২ রানের কথা বলা যায়। অন্যদিকে শ্রীলংকার বলার মত ব্যাটিং এবং বেশ করে বোলিং দুটিই চোখে পড়ে। যেমন, দুই ইনিংস মিলে ডেব্যুট্যান্ট স্পিনার প্রভীন জয়াবিক্রমা নেন ১১ উইকেট। অন্যদিকে রমেশ মেন্ডিসের কথাও বলতে হয়। দুইজন মিলেই বাংলাদেশের ১৭ উইকেট নিয়ে নেন। আর এখানেই বাংলাদেশ হেরে যায়। সামলানো যায় না শ্রীলংকার স্পিন। টসের কথাও আসে। টস জেতাই নাকি ছিল এই টেস্টের মূল ব্যাপার। তাসকিন, তাইজুল দুজনেই এই টেস্টে বেশ ভালো করেন বোলিংয়ে। ইনফ্যাক্ট তাসকিন দুই টেস্টেই ভালো করেন। টেস্টে নিজ দেশের ফাস্ট বোলিং এগ্রেসন দেখবার যে তীব্র ইচ্ছা আমাদের, এই সিরিজে তাসকিন তা অনেকটাই পূরণ করে দেন। শেষ পর্যন্ত দুই টেস্টের একটিতে ড্র এবং একটিতে পরাজয় মেনে নিয়ে গত চার মে দেশে ফেরে বাংলাদেশ দল। এখন অপেক্ষা দেশের মাটিতে শ্রীলংকার সাথে তিন ম্যাচের ওডিআই সিরিজের। সিরিজ শুরু হচ্ছে আগামী ২৩ মে। যার প্রতিটি ম্যাচ হবে ঢাকায়। ঘরের মাঠে ওডিআই, ভাবলেই নির্ভার থাকার চর্চা বাংলাদেশ ক্রিকেটে শুরু হয়েছে আরো বেশ কিছুদিন আগেই। সেই নির্ভাবনার কার্যকরণটাই এখন দেখার আশা।

 

বাংলাদেশ দল নিয়ে বরাবরই আমাদের প্রত্যাশার পারদ আকাশচুম্বী। সে কারণেই হয়তো আমাদের ব্যালেন্সটা হয়না, যা শুরুতে বলছিলাম। ২০১৫ এর পর হয়তো পারদ আকাশ ছাড়িয়ে মহাকাশ ছুঁয়েছে। এই পারদকে নামিয়ে আনা প্রয়োজন। একটা সীমারেখায় রাখা প্রয়োজন। আমাদের দলের সামর্থ্যের জায়গাটুকু যেমন আমাদের জানা দরকার, দলকেও জানা দরকার আন্তজার্তিক মানের হতে হলে নিজেদের আরো কি কি করা প্রয়োজন। অন্যান্য দলের প্রফেশনালিজম, তাদের মেন্টাল স্ট্রেংথ, আমাদের দলের প্রফেশনালিজম, আমাদের মেন্টাল স্ট্রেংথ এসব নিয়েও ভাবা দরকার। উন্নতি তো থেমে থাকেনা। আমরা এখানে ক্রিকেটে যা উন্নতি করছি, উন্নত দলগুলির কথা যদি বলি, তারাও তো প্রতিদিন নিজেদের উন্নত করে চলছে। তাই এই উন্নতির কোন সীমানা থাকা উচিত না। হওয়া উচিত নিজেদের প্রতি যত্নবান আর একজন খেলোয়াড় হিসেবে দলের জন্য কতটা পথ পাড়ি দিব, সেটার বিশদ পরিকল্পনা বা রোডম্যাপ।