• ক্রিকেট

ক্রিকেট, নগর, সমাজ – ১কঃ আধুনিক স্পোর্টসের ঊষালগ্ন (১ম অংশ)

পোস্টটি ২১০ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

১।

কেবলমাত্র হাটার অপরাধে কাউকে গ্রেফতার হতে শুনেছেন?

১৮১৫ সালের ইংল্যান্ডে জর্জ উইলসন নামের বছর পঞ্চাশেকের এক ব্যক্তিকে পুলিশ জনসম্মুখে গ্রেফতার করে হাটার ‘অপরাধে’। আপনারা সিনেমাতে ফরেস্ট গাম্পকে হাটতে দেখেছেন, বাস্তবে দশরথ মাঝি (একা পাহাড় কেটে রাস্তা বানানো সেই ‘বোকাবুড়ো’) হেটেছেন; তাদের হাটা জনপ্রিয় হতে হতে একসময় রাজনৈতিক এক বক্তব্যে পরিণত হয়েছে। ফলে তাদের বাধা পেতে হয়েছে এ ধরনের হস্তক্ষেপে।

জর্জ উইলসনের হন্টনের একদমই কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিলো না। ছিল ‘নিরপরাধ’ ভিন্ন এক উদ্দেশ্য। খেলার গ্রুপে দেয়ার কারণে হয়তো অনুমান করতে পারছেন সেটা ছিল খেলাসংক্রান্ত। বলা যেতে পারে জর্জ উইলসনের এই কেসটি আমাদেরকে নিয়ে যাবে আধুনিক খেলাধুলার একদম কিছু মূলসূত্রের সাথে। এই লেখা কিংবা এর পেছনে পেছনে আসা বাকি পর্বগুলোর উদ্দেশ্যও তাই। চলুন ঘুরে আসা যাক সেই উনিশ শতকের ইংল্যান্ডে।

.

২।

এ যুগে ‘পেডিস্ট্রিয়ানিজম’ বলে গুগল সার্চ দিলে পাবেন শহর নগর প্ল্যানিং ও ডিজাইন সংক্রান্ত একটা নির্দিস্ট কনসেপ্টের। যারা এ লাইনে কাজ করেন তারা আপনাকে বলবেন এই কনসেপ্টটি শহরকে হাটাবান্ধব কিভাবে করা যায় সেটার তত্ত্ব-কৌশল। তারা আপনাকে বোঝাতে চেষ্টা করবেন যে তারা কেমন মনে প্রাণে চান শহর তার ডিজাইন আর দৈনিক জীবনে হাটাবান্ধব হয়ে উঠুক। যাতে অসহ্য যানজট, না হাটার স্বাস্থ্যঝুকি, আর ক্ষয়ে আসা সামাজিক বন্ধন এসবের কিছু হলেও সুরাহা হয়। উনিশ শতকের শুরুর দিকে সেই জর্জিয়ান ইংল্যান্ডে ‘পেডিস্ট্রিয়ানিজম’ বলতে কিন্তু বোঝাতো সম্পূর্ণ ভিন্ন এক প্র্যাকটিস! সেই প্র্যাকটিসের শহর নগর নিয়ে কোন মাথাব্যথা ছিলো না, বরং সেটা ছিলো বদলাতে থাকা একটা সমাজে নতুন জনপ্রিয় এক বিনোদন মাধ্যম।

.

ব্যাপারটা আর কিছুই নয়, কিছু লোক টাকার জন্য ম্যারাথন (বা ওয়াকাথন) এর মতো দূরপাল্লার হাটা শুরু করলো। ধরুন একটা পুরস্কার ঘোষণা করা হলো যে, নির্দিস্ট কিছু দিনের মধ্যে একটা নির্দিষ্ট ট্র্যাকে এক হাজার মাইল হাটা শেষ করতে পারলে পুরস্কারের টাকাটা পাবে, তখন কেউ এসে নাম লিখিয়ে চ্যালেঞ্জটা নিলো। উইলসনের চুক্তিটাও ছিল এরকমই। লন্ডনের অদূরে গ্রীনইউচ এর ব্ল্যাকহিথ কমন বলে একটা মেঠো এলাকায় নির্দিষ্ট একটা পথ তার জন্য ঠিক করা হয়েছিল। সেখানে বিশ দিনে এক হাজার মাইল হাটা শেষ করতে পারলে একশত পাউন্ড পাবেন।

.

Photo source: Welcome Images

কাজটা বেশ কঠিনই। তবে সে সময়ে জর্জ উইলসনের মত কিছু খেটে খাওয়া মানুষ আয় রোজগারের সুযোগ হিসেবে প্রফেশনাল ‘হাটিয়ে’ বনে গিয়েছিলেন। অর্থলাভের আশায় তারা এই চ্যালেঞ্জগুলো নিতেন। আগের ছোটখাটো সাফল্যও তাদের ছিল। তবে এর আগে কেউ এতোবড় চ্যালেঞ্জ নেয়নি। কাজটা যেমন কঠিন পুরস্কারটাও লোভনীয়; সেযুগে ১০০ পাউন্ড মানে ছিলো একজন কৃষিশ্রমিকের দুই বছরের আয়ের সমান। তো এই ‘প্রফেশনাল’ হাটিয়েরা যখন সাধারণ মানুষের জন্য বেশ কঠিন চ্যালেঞ্জগুলো নিতেন, সবার আগ্রহের কেন্দ্রে তারা চলে আসতেন। স্থানীয় খবরের পাতায় এদের চ্যালেঞ্জের আপডেট ছাপা হতো। এদের নাম দেয়া হল ‘পেডিস্ট্রিয়ান’। খবরের কাগজ উইলসনকেও ‘ব্ল্যাকহিথ পেডিস্ট্রিয়ান’ বলে ডাকা শুরু করলো।

.

জর্জ উইলসনের এর আগে এধরনের চ্যালেঞ্জ নেয়ায় নামডাক ছিল। তবে তার প্রফেশনাল চ্যালেঞ্জে আসাটা নেহায়েতই ভাগ্যক্রম। উইলসনের বাবা ছিলেন শিপবিল্ডার, কিন্তু একসময় তাদের পুরো পরিবার দেউলিয়া হয়ে পড়ে। উইলসন বাড়ি বাড়ি কাগজ ডেলিভারি, ট্যাক্স কালেকশনের মতো ছুটকো কাজ করতেন। কিন্তু তাকেও ধারদেনায় জর্জরিত হয়ে জেল খাটতে হয়। জেলে থাকতে একবার সে অন্য কয়েদীদের সাথে বাজি ধরে হেটে বেশ কিছু রোজগার করে। ছাড়া পাওয়ার পর তাই এদিকেই ঝোকে, ইংল্যান্ডে তখন এধরনের প্রতিযোগিতা বেশ জনপ্রিয় হচ্ছিলো। (তবে আয় যে খুব বেশি হত তা নয়, উইলসন বা অন্য সবাইকেই অন্য অনেক টুকটাক রোজগারের ধান্দা করতে হত)।

যাহোক, সেই ১০০ পাউন্ডের কঠিন চ্যালঞ্জেও উইলসন বেশ ভালোই এগোচ্ছিলেন। গ্রেফতার হওয়ার দিন পর্যন্ত তাক লাগানো ৭৫১ মাইল হেটে ফেলেছিলেন। দৈনিক পঞ্চাশ মাইলের ওপর শেষ করার রেটে বোঝাই যাচ্ছিলো পুরস্কার জেতাটাও হয়ে যাবে। কিন্তু বিধিবাম!

Photo source: Welcome Images

৩।

তো যা হয়েছিল তা বেশ ‘সাদামাটা’।

এমন প্রায়-অসম্ভব চ্যালেঞ্জ, সাধারণের কাছে শুনতে ভাল শোনায় মানের একটা পুরস্কার, আর এ কাজে খ্যাত একজন প্রতিযোগী। প্রথম দিন থেকেই বেশ কিছু জনসমাগম হয়ে যায় মাঠের আশেপাশে। বেশ কিছু পাবলিক সারাদিন মাঠে পড়ে রইলো, একজন হেটেই যাচ্ছে এমন নিরস দৃশ্য দেখার জন্য। আরো আশ্চর্য, পরের দিন আরো মানুষ, তারপর আরো। মানুষজনের যেন খেয়েদেয়ে কাজকর্ম নেই। জেরোম কে জেরোমের লেখায় অবশ্য পাবেন অই সময়ে ইংল্যান্ডে এটিই ছিল স্বাভাবিক।

এরা এলো, দেখলো, তা নয়। এরা আস্তানা গাড়লো পিকনিক মুডে, হাতে পানীয় নিয়ে। মানুষের জমায়েত, আমাদের বাদাম চানাচুরওয়ালার মতোই এদের বিয়ারওয়ালা এসে হাজির হলো, বিয়ার-স্পিরিটের বুথ বসলো। এরপর এলো সার্কাসের লোকজন, গানওয়ালা, ডগফাইট আর পনি-রেসের আয়োজন। লন্ডন থেকে ব্রোথেলও নিয়ে আসা হল। কয়েকদিনেই জায়গাটায় জমজমাট মেলা বসে গেল। এবার চিন্তা করে দেখুন একজন মাত্র মানুষ হেটে চলেছে, তাকে উপলক্ষ্য করে বিশাল মেলা বসে গিয়েছে, এবং নিশ্চিত থাকুন মেলায় আসা বেশিরভাগ মানুষের মনোযোগ আর তার দিকেও নেই। আমাদের দেশে ধানক্ষেতে প্লেন পড়ার পর তাকে ঘিরে মেলা বসে যেতে দেখাকে তাই আর দোষ দিতে পারবেন না। পাবলিক সাইকোলজি সব জায়গায়ই যেন একইরকম।

এই মেলার সাথে আসা পিকনিক মুড, ইয়ার দোস্তদের মৌতাত আর দিন শেষ হতে হতে মাতাল, অর্ধমাতালদের হৈ হট্টগোল, মারামারি, মাতলামিতে গ্রামবাসী ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে উঠলো। তারা অভিযোগ করলেও কতৃপক্ষ খুব নড়েচড়ে বসেনি, কারণ এসব দৃশ্যই স্বাভাবিক ছিল জর্জিয়ান আমলের ইংল্যান্ডে। তবে ঘটনায় ভিন্ন মাত্রা নিয়ে এলো বাজিকরেরা।

 

না, আকসুর হস্তক্ষেপের আশায় খুব বেশি উৎসুক হবেন না। ইংল্যান্ডে তখন বাজি খুবই স্বাভাবিক ও বৈধ ব্যাপার ছিল (এখনো তা-ই আছে)। আর্চি জেনকিনস নামের একজন স্পোর্টস হিস্টোরিয়ান তো বলেই বসেছেন “এরা (ব্রিটোন/ব্রিটেনবাসী) যেকোন কিছুর ওপরেই বাজি ধরে – যে কোন কিছু – খালি সেটা নড়তে পারলেই হলো ব্যাস”

যথারীতি এখানেও বাজির আয়োজন বসে গেল, লোকজন কতদূর হাটতে পারবে ইত্যাদি নিয়ে বাজি ধরে ফেললো। গোল বাধলো যারা পারবে না বলে বাজি ধরেছিলো, উইলসনের দারুণ অগ্রগতিতে তাদের মাথায় হাত। এরা চেষ্টা করে যেতে লাগলো প্রতিযোগীকে আটকে দিতে। উইলসন ছোটখাটো মানুষ, নিজে রা-শব্দ করেনি, কিন্তু বাজির আরেকপক্ষ জেতার সুযোগ ছাড়বে কেন! শেষমেশ অবস্থা দাড়ালো সেই আরেকদল (‘জিতমু বাজি’ দল) লাঠিসোটা (এমনকি একটা বেয়োনেটও ছিল) হাতে নিয়ে উইলসনের আগে আগে চলতো পথ পরিস্কারের জন্য। স্থানীয় প্রশাসন নার্ভাসভাবে নড়েচড়ে বসলো এবার। বড় দাঙ্গা হাঙ্গামা লাগার টইটুম্বর পরিস্থিতি যে!

 

অতঃপর প্রশাসন মনস্থ করলো আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুকে গ্রেফতার করে নিয়ে এলে এই ভিড়বাট্টা, হাঙ্গামা এম্নিতেই ঝিমিয়ে যাবে। উইলসন, রেস শুরুর দুই সপ্তাহের মাথায় ‘জনসাধারণ্যের মূল্যবোধ আর শান্তি নস্ট করা’র অভিযোগে গ্রেফতার হলেন। তাকে যখন কোর্টে নিয়ে আসা হল, ইতোমধ্যে জনপ্রতিক্রিয়া বেশ দেখা গেল। তার এই ‘হাস্যকর’ গ্রেফতারকে পচিয়ে যাত্রাপালা তৈরি হয়ে গেল, পত্রিকায় তুখোড় সমালোচনা চললো, এমনকি নাকি লন্ডন স্টক মার্কেটে ১০০ পাউন্ড চাদা উঠে গেল তাকে রক্ষার্থে। তবে এতো কিছুর পরেও সাজা এড়ানো গেল না।

(পরের পর্ব ১-ক তে সমাপ্যঃ https://pavilion.com.bd/user/feeds/6671/details)

#SamiHasan #CricketCitySociety #ক্রিকেটনগরওসমাজ

———————-

[লিন্ডা রড্রিগাজ ম্যাকরবি (LINDA RODRIGUEZ MCROBBIE)-র এটলাস অবসকিউরা ব্লগের আর্টিকেল থেকে ভাবানূদিত। মূল লেখাটিঃ How Competitive Walking Captivated Georgian Britain (JUNE 29, 2017)-র লিংক এখানে। ছবির উৎস/ Picture Credit: Cover photo: BBC, Photo-1,2: Welcome Images, Photo-3: Culture24, Photo-4: Study.com ]