• ক্রিকেট

শান্তকে নিয়ে ট্রল হয়, আর নির্বাচকরা আরামে ঘুমায়

পোস্টটি ২৫১ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

ক্রিকেট আমাদের দেশের মানুষের কাছে একটি আবেগের নাম। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে এই খেলাটির জনপ্রিয়তা একটু বেশিই বলা যায়। বাংলাদেশের মনুষের কাছে বেশি জনপ্রিয় হওয়ার কারণও আছে। বাংলাদেশ বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম পরিচিত একটি দল। একসময় এই খেলায় বাংলাদেশের অবস্থান নড়বড়ে থাকলেও বর্তমানে বিশ্বের সকল দলের কাছে বাংলাদেশ একটি আতংকের নাম বলা যায়। 

 

যদিও সেই আতংক বছরে এক-দুবার আসে। মানে ফরম্যাট ভিত্তিতে আতংক ছড়ায় বাংলাদেশ। আর সেটা একমাত্র ওয়ানডে ক্রিকেটে। খুব সাহস করেই আমরা বলতে পারি ওয়ানডে ফরম্যাটে বাংলাদেশ বেশ ভয়ংকর। ২০১৫ সাল থেকে বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ ক্রিকেটের যে উন্নতি হয়েছে তার অন্যতম কারণ এই ওয়ানডে ক্রিকেট।

 

তবে টেস্ট আর টি-টুয়েন্টিতে হরহামেশাই হারতে থাকে। মাঝে মাঝে মরুর বুকে এক পশলা বৃষ্টির মতো জয় নিয়ে আনন্দ দেয় সমর্থকদের। যাইহোক আজ আলোচনা সেদিকে নিয়ে যাচ্ছি না। সামপ্রতিক সময়ে বাংলাদেশের টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের জন্য দল ঘোষণা করা হয়েছে। ১৫ সদস্যের এই স্কোয়াড থেকে বাদ পড়েছেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। রিয়াদের বাদ পড়াটা ধারণা করা গেলেও শান্তর দলে ঢুকাটা ধারণার বাইরে। ক্রিকেট বিশ্লেষক, গবেষক, সমর্থক, সাংবাদকর্মীরা সবাই এটা নিয়ে বেশ আলোচনা করেছেন। বলা যায় শান্তকে যা ইচ্ছে তা-ই ক্রিটিসাইজ করেছে। আর সমর্থকরা থাকে নিয়ে যে পরিমাণ ট্রল করেছেন সেটা শান্ত যদি নজরে রাখতেন এতোদিনে মানসিক অবসাদে ভুল কোনো সিদ্ধান্তও নিয়ে নিতে পারতেন। এতে অবাক হওয়ারও কিছু নাই। তবে এটা ক্রিকেট। এখানে সমালোচনাও হবে, ট্রলও হবে। এসব পাশ কাটিয়েই এগুতে হবে। 

shanto

মনে আছে লিটন কুমার দাসের কথা? যাকে নিয়ে গত বছরের টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে সমালোচনার ঝড় বইছিলো। তাকে নিয়ে ট্রলের সীমাটাও ছাড়িয়ে গিয়েছিলো। প্রতি ম্যাচে সে যত রান করবে বিভিন্ন ব্যবসায় প্রতিষ্টান তাদের পণ্যে তত পার্সেন্ট ডিসকাউন্ট দিবে বলেও ঘোষণা দেয়। আপনি আমিও হয়তো এই তালিকায় আছি। অথচ ভাগ্যের কি পরিহাস। ঠিক পরের বছরের বিশ্বকাপে তাকেই সবাই দলে চেয়েছেন। দলে আছেনও তিনি। শুধু তা-ই নয়, এইযে এশিয়া কাপ শেষ হলো সেখানেও তাকে সবাই মিস করেছেন। তাহলে আমরা ট্রল কেন করি?

 

আমি শান্তকে দলে নিয়েছে এটাকে সমর্থন জানাচ্ছি না। শান্ত কখনওই এই স্কোয়াডে থাকতে পারে না। কিন্তু এই পারা না পারাটা আমার আপনার হাতে নেই। যাদের হাতে আছে তারা দিব্যি স্কোয়াড দিয়ে ঘুমোচ্ছেন। কথা সেখানেও না, কথা হচ্ছে শান্ত কি নিজে নিজে স্কোয়াডে অর্ন্তভুক্ত হয়েছেন? না-কি তাকে কেউ অর্ন্তভুক্ত করেছেন? 

 

প্রতিটি খেলোয়াড়ই চায় বাদ পরলে দলে ঢুকতে। সৌম্য বাদ পড়েছে, সেও চেষ্টা করছে দলে ঢুকার। সাব্বিরও অলৌকিক ভাবে দলে প্রবেশ করেছে। অন্যদিকে ওয়ানডেতে ভালো করে এতোদিন টি-টুয়েন্টিতে দলে ঢুকা এনামুল হকও বাদ পড়েছেন। সবাইতো দলে ঢুকতে পারলে খুশি। সেটা হোক টেস্ট, ওয়ানডে, টি-টুয়েন্টি। কিন্তু যে কেউ চাইলেই তো দলে কিংবা স্কোয়াডে জায়গা পেতে পারে না। মাসের পর মাস বিসিবির বেতন ভোগ করে এই দায়িত্ব পালন করছেন জাতীয় দলের তিন সিলেক্টর। সহজ কথায় বলতে গেলে মিনহাজুল আবেদিন নান্নু, হাবিবুল বাশার সুমন আর আব্দুর রাজ্জাক এই তিন নির্বাচক স্কোয়াড নির্বাচন করেন। খোলোয়াড়ও সিলেক্ট করেন। 

 

তাহলে আমরা কেন শান্তকে নিয়ে ট্রল করছি? দলে জায়গা পাওয়াটা কি শান্তর অপরাধ? অপরাধ করলে সেটা করেছেন সিলেক্টররা। সেই দায় কেন শান্তর উপর গিয়ে পড়বে? ট্রল করলে সিলেক্টরদের নিয়ে করুন। বাশার, রাজ্জাক, নান্নুদের নিয়ে করুন। কিন্তু আমরা বারবার সেটা খেলোয়াড়দের উপর প্রয়োগ করছি। এতে করে এই খেলোয়াড়রা মানসিক ভাবে বির্পযস্ত হবে, যতটা ভালো খেলার সামর্থ্য থাকবে সেটাও হারিয়ে ফেলবে। প্রতিটি ম্যাচেই মাঠে নামবে বাড়তি এটা চাপ নিয়ে। সেই চাপটা হচ্ছে ট্রলের, সমালোচনার।

 selectors

অথচ নির্বাচকদের মনগড়া স্কোয়াড় আর বিসিবির উদাসীনতায় এই জায়গায় বড় সমস্যা। ফেসবুক আর টেলিভিশনের বক্তব্যই হচ্ছে বিসিবির প্রধান কাজ। কাজের চাইতে বোর্ড কর্তাদের কথার লড়াই বেশ চলে বাংলাদেশে। আর সিলেক্টররা চলে উল্টো পন্থায়। যত কম কথা বলা যায়, তত দায় এড়িয়ে বাঁচা যায়।

 

এছাড়াও আমাদের উচিৎ প্রতিটি ফ্যরমেটের জন্য কিছু ভালো খেলোয়াড় তৈরী করা। অথচ সেটার কোনো নমুনাই দেখা যায় না। অন্যান্য দেশে বিভিন্ন ফরম্যাটে বেশকিছু ঘরোয়া লিগ চলে। এছাড়াও টি-টুয়েন্টির জনপ্রিয়তার কথা বিচেনা করে প্রায় সবদেশে আর্ন্তজাতিক মানের বিভিন্ন ফ্রানসাইজি ভিত্তিক দলের মাধ্যমে লিগ খেলানো হয়। যেমন আইপিএল, সিপিএল, বিগব্যাশ, পিএসএল, এলপিএল, কাউন্টি সহ আরো অনেক লিগ রয়েছে। এছাড়াও সাউথ আফ্রিকা, আরবম আমিরাতেও শুরু হচ্ছে এসব লিগ। বাংলাদেশেও চলে এই লিগ। বিপিএল নামক এই লিগটাই বোধহয় সবচেয়ে নি¤œ মানের লিগ হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্তমানে। বিপিএলে কখনও পিচ, কখনও আম্পায়ারিং, কখনও প্রযুক্তি থাকে নি¤œমানের। এছাড়াও দেশী খেলোয়াড়দের তেমন পাত্তাই দেওয়া হয় না। একবার তো  বিপিএলে ৫ জন বিদেশী খেলোয়াড়ও খেলানোর অনুমতি দিয়েছে। এভাবে দেশের খেলোয়াড়দের প্রতিভা বের করে আনা সম্ভব নয়।

 

বিসিবি যদি এই বিষয়টি গুরুত্বের সাথে না নেয় তাহলে হয়তো একসময় আমাদের ক্রিকেট কেনিয়া, কানাডার মতো হয়ে যাবে। সিনিয়র ক্রিকেটারদের মধ্যে মুশফিকুর রহিম, তামিম ইকবাল খান, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ একটা একটা ফরম্যাটে খেলছেন না। অন্যদিকে রিয়াদকে টি-টুয়েন্টি থেকে বাদও দেয়া হয়েছে। সর্বশেষ ওয়ানডে ক্রিকেটের দরজা খোলা আছে রিয়াদের। হয়তো রিয়াদের ক্রিকেট যাত্রাটা খুব সহসাই শেষ হয়ে যাচ্ছে। একমাত্র সাকিব আল হাসান তিনটা খেলছেন। মাশরাফি বিন মুর্তজা সেই কবেই নেই ক্রিকেটে। একসময় সব সিনিয়র ক্রিকেটারাই বিদায় নিয়ে নিবে। তাহলে পরবর্তী সময়ে আমাদের ক্রিকেটের হাল ধরবে কারা? এটা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়। অথচ আমরা এসব নিয়ে বিন্দু মাত্র ভাবছি না। আমাদের পাইপ লাইনে কতটা খোলোয়াড় আছে, আর তারা সাকিব, মুশি, রিয়াদ, তামিমের রিপ্লেস হতে পারবে কি-না সেটা আমরা নিজেরাই দেখছি। তাহলে এসব নিয়ে ভাববে কারা? ডবসিবি প্রধানেরই বা কাজ কি?

 

পরিশেষে বলতে চাই, খেলোয়াড়দের নিয়ে ট্রল করা বন্ধ করুন। ট্রল করুন, সমালোচনা করুন নীতি-নির্ধারকদের। যারা চেয়ারে বসে আছে কিন্তু কাজের কাজ কিছুই করছেন না। বছরের পর বছর চেয়ার আকঁড়ে ধরে রাখলেও কোনো ধরনের রেজাল্ট তারা দিতে পারছে না। অন্যদিকে বাংলাদেশে অপরাধ করলে, ব্যার্থ হলে পদত্যাগ করার সংস্কৃতিও নেই। সবাই দিব্যি চোখ-কান বন্ধ রেখে নাক ডেকে ঘুমোতে পারে। যতদিন এই সংস্কৃতি পরিবর্তন হবে না, উন্নতি হবে না বাংলাদেশের ক্রিকেট।

 

 

লেখক : আজহার মাহমুদ

প্রাবন্ধিক এবং কলাম লেখক