• ক্রিকেট

উইমেন্স প্রিমিয়ার লিগ: আশা জাগানিয়া প্রথম মৌসুম

পোস্টটি ৬৯৭ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

 

গত হয়েছে ২৬ মার্চ। সেদিনই শেষ হলো নারীদের ফ্র্যাঞ্চাইজি ভিত্তিক ক্রিকেট আসর ‘Womens Premier League’- এর প্রথম মৌসুম। ভারতের ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের যুগান্তকারী একটা পদক্ষেপ বলা যেতে পারে উক্ত আসরটিকে। অনেকদিনের ফিল্ড রিসার্চ, মার্কেট এনালাইসিস করে নারী ক্রিকেটারদের নিয়ে ফ্রাঞ্চাইজি ভিত্তিক টুর্নামেন্ট শুরু করবার ব্যাপারে বেশ অগ্রসরমান ছিল ভারতের ক্রিকেট বোর্ড। তবে তা যে ২০২৩ সালের মার্চ থেকেই শুরু হয়ে যাবে, তা হয়তো সেভাবে কেউ ভাবেনি। তবুও পুরো ব্যাপারটা যখন শুরু হলো গত ৪ মার্চ থেকে, তা প্রশংসার দাবি নিয়েই গত ২৬ মার্চ শেষ হয়।

 

শুরুর কথা

খুব কম সময়ের ভেতর অনেক বেশি সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে ভারতের ক্রিকেট বোর্ড এবং টুর্নামেন্ট সংশ্লিষ্ট গভর্নিং কাউন্সিল। ভারতের ‘ভিয়াকম১৮’ এর সাথে ৫ বছরের জন্য বিশাল অঙ্কের মিডিয়া চুক্তি ঘটে। টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া ৫ টি দলকে ফ্রাঞ্চাইজিগুলি কিনে নেয় ৪,৬৯৯.৯৯ কোটি রুপিতে। মুম্বাইয়ের জিও ওয়ার্ল্ড কনভেনশন সেন্টারে হওয়া নিলাম অনুষ্ঠানে ৫৯.৫০ কোটি রুপিতে দল পাঁচটি বড় বড় নামগুলি নিজেদের তালিকায় নিয়ে নেয়। টুর্নামেন্টের সাথে সংশ্লিষ্ট সবাই এটা স্বীকার করেন যে, নারীদের এই ফ্রাঞ্চাইজি লীগের জন্য দীর্ঘ সময়ের বিনিয়োগ রয়েছে। তারা আরো মনে করেন, বিশ্বে খেলাধুলায় যেভাবে নারীদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ছে, তাতে এই টুর্নামেন্ট সেখানে বাড়তি মাত্রা যোগ করবে। বাড়তি মাত্রা যোগ যে হয়েছে, তা আসলে বলাই বাহুল্য।

 

আয়োজকদের সার্থকতা যেখানে

ভারতে নারীদের ক্রিকেট নিয়ে আগ্রহ অবশ্যই আছে, এবং তা দিন দিন বাড়ছে। তবে তাদের ঘরোয়া সংস্করণ এখনো কিছুটা পুরোনো ধাঁচের, খুব গতানুগতিক। উপমহাদেশীয় সংস্কৃতির প্রভাবের দায় তো আছেই, পরিবার, সুযোগ- সকল কিছু মিলিয়েই এত বড় রাষ্ট্রে নারীদের জন্য ক্রিকেটে এসে সহজভাবে অনেক পদক্ষেপ নেওয়াই হয়ত কঠিন, তা কিছুটা হলেও। উইমেন্স প্রিমিয়ার লিগ সেক্ষেত্রে বড় একটা ভূমিকা রেখে গেল- যা ভারতের নারী ক্রিকেটারদের অভিজ্ঞতার কথা শুনতে গিয়ে বোঝা যায়।

ইউপি ওয়ারিওর্সের অঞ্জলি সারভানি বলছিলেন তার অভিজ্ঞতার কথা। তিনি বলেন, এশলে নফকে (বোলিং কোচ) আমার বোলিং অ্যাকশন সম্পর্কে সলিড টিপস দিয়েছেন। একটা ছোট্ট জিনিস, যা খেলার মধ্যে বিশাল পার্থক্য সৃষ্টি করে। তিনি আরো বলেন, এই টুর্নামেন্ট নতুনভাবে তার নিজেকে আবিষ্কারের একটি ধাপ। এরকম মনে করছেন ভারতের আরো অনেক নারী ক্রিকেটার।

২০ বছর বয়সী শ্রীয়াংকা পাতিল একজন অলরাউন্ডার, করেন অফ স্পিন, তিনি বলছিলেন, রয়েল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাংগালোরে খেলার আগে তার ফিল্ড পজিশন সাজানোর কোন স্বাধীনতাই ছিল না। আরো যোগ করেন, ঘরোয়া ক্রিকেটে স্পিনারদের বলা হয় শুধু উইকেটের এক পাশেই বল করে যেতে এবং ফ্লাইট দিতে। সেখানে শর্ট থার্ড বা শর্ট ফাইনে ফিল্ডার নেওয়ার ধারণা ছিল না বলা চলে। শ্রীয়াংকা পাতিল নিজেকে অনেক বেশি আনন্দিত মনে করছেন টুর্নামেন্টে অংশ নিয়ে, কারণ তিনি এখানে তার কোচের সাথে কথা বলে নিজের পরিকল্পনাগুলি প্রয়োগ করবার সুযোগ পাচ্ছেন।

এরকম কথা বলছেন ভারতে নারী ক্রিকেট খেলছেন এমন অনেকেই, যারা হয়ত ঘরোয়া লিগ খেলছেন, সম্ভাবনাময়- তাদের অভিজ্ঞতার বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, এই টুর্নামেন্টের মাধ্যমে তারা উপকৃত হয়েছেন। তারা তাদের মাঠের স্বাধীনতা, ড্রেসিং রুমের পরিবেশ এবং পরিকল্পনা সকল কিছুই খুব চমৎকারভাবে সাজানোর সুযোগ পেয়েছেন। আর এই সমস্ত কিছুর জন্য ভারতের ক্রিকেট বোর্ড প্রশংসার দাবি রাখে। তারা তাদের মেয়েদের জন্য তথা বিশ্ব ক্রিকেটে যে নারীরা ক্রিকেট খেলছেন, তাদের জন্য একটা সুযোগ তৈরি করতে পেরেছেন । 

 

মাঠের খেলার অর্জন

উইমেন্স প্রিমিয়ার লীগের প্রথম আসরের চ্যাম্পিয়ন মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স উইমেন। পুরো টুর্নামেন্ট জুড়েই দলটির খেলা ছিল দেখার মতো। অর্থাৎ সেরা হয়ে শুরু করে সেরা হয়েই শেষ করবার গৌরব অনেকটা মুম্বাইয়ের। যদিও মুম্বাই টুর্নামেন্টের প্রথম দুই ম্যাচ শুরু করে হার দিয়ে, সে পর্যন্তই- তারপরে টানা তিন ম্যাচ জিতে চ্যাম্পিয়নশীপও তাদের কাছেই। আরেকটি সেরা দলের কথা বলতে হয়, যারা রানারআপ, দিল্লী ক্যাপিটালস উইমেন। মুম্বাইয়ের সাথে ভাগাভাগি করে ৮ ম্যাচের ৬ জয় তাদের। ফাইনাল ম্যাচটা জেতা হলে সংখ্যাটা হতো সাত। সে হয় নি। শিরোপার অন্যতম দাবিদার তারা ছিলো, পরিসংখ্যানই তা বলে। বাকি তিনটি দলের মধ্যে ইউপি ওয়ারিওর্স ৪ টি ম্যাচ জিততে পারে। ব্যাংগালোর ও গুজরাটের নারীরা দুটি করে ম্যাচ জিতে নেয়।

টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ রান সংগ্রহকারীর তালিকায় প্রথমেই আছেন দিল্লী ক্যাপিটালসে খেলা অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার মেগ ল্যানিং, তিনি ৯ ইনিংসে ব্যাট করে ৩৪৫ রান সংগ্রহ করেন। অন্যদিকে দ্বিতীয় সংগ্রহকারী হিসেবে আছেন ন্যাট শিভার ব্রান্ট, যিনি মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের হয়ে খেলেছেন। ইংল্যান্ডের এই ক্রিকেটার ১০ ইনিংস ব্যাট করে সংগ্রহ করেন ৩৩২ রান। সেরা ব্যাটারদের ৫ জনের তালিকায় আছেন মুম্বাই অধিনায়ক হারমানপ্রীত কৌর, আছেন টুর্নামেন্ট সেরা খেলোয়াড় এবং বোলার হেইলি ম্যাথিউস। মুম্বাইয়ের হয়ে খেলা হেইলি ম্যাথিউসের উইকেট সংখ্যা ১৬, যা টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ। ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান নারী দলের এই সদস্যের সংগ্রহকৃত মোট রান ২৭১, সর্বোচ্চ উইকেটের সাথে এই রানই তাকে টুর্নামেন্ট সেরার মর্যাদা এনে দেয়।

এছাড়াও আরো অনেক ভারতীয় ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্স ছিল দেখার মতো, পাশাপাশি অতিথি খেলোয়াড়রা তো ছিলোই।

 

সবশেষে

সবশেষে এ সিদ্ধান্তে আসাই যায় যে, একটি সফল টুর্নামেন্টের সমাপ্তি ঘটল। নারী ক্রিকেটাররা যেমন আনন্দিত এমন আয়োজনে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে পেরে, আনন্দিত তারাও যারা টুর্নামেন্টের আয়োজনের সাথে জড়িত, জড়িত ফ্রাঞ্চাইজির সাথে, মিডিয়ার সাথে এবং যারা বিনিয়োগকারী- কেউ হতাশ নন। সফল প্রথম আসর শেষে এই যাত্রা ক্রিকেটের উন্নয়নে, তথা নারী ক্রিকেটের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে- এমনটাই প্রত্যাশা সকলের।