• ফুটবল

১৯৯৭ সালে তারকাসমৃদ্ধ আর্জেন্টিনা যেভাবে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ জিতেছিল- প্রথম পর্ব

পোস্টটি ৫০০ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

যখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় আইকন মাদার থেরেসা এবং প্রিন্সেস ডায়ানা ১৯৯৭ সালে মারা যান, বিল ক্লিনটন তখনও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ছিলেন। প্রচুর ব্যান্ড সঙ্গীতের প্রচলনের ফলে জনপ্রিয় সংস্কৃতি ভুলতে বসেছে সবাই। ওয়েসিস, গ্রিন ডে, দ্য প্রোডিজি এবং রেডিওহেড নামে ক্র্যাকিং অ্যালবাম প্রকাশ করেছিল ক্রিস কর্নেল। ফেস অফ, দ্য সেন্ট এবং জেমস বন্ডের টুমরো নেভার ডাইস ছিল সেই বছরের সেরা কিছু সিনেমা।

কিন্তু আপনি যদি আমার মতো একজন আর্জেন্টাইন ফুটবলের ভক্ত হন, তবে সেই গুরুত্বপূর্ণ বছরটি আপনি অবশ্যই মনে রাখতে চাইবেন। কারণ মালয়েশিয়ায় সেবছর অনুষ্ঠিত হয়েছিল ফিফা ওয়ার্ল্ড ইয়ুথ চ্যাম্পিয়নশিপ (বর্তমানে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ)। মালয়েশিয়া কীভাবে এই টুর্নামেন্টের আয়োজক হয়েছিল তা নিয়ে আজও অনেক প্রশ্ন রয়েছে। তা সত্ত্বেও, পুরো টুর্নামেন্টটি সফল ছিল এবং অনেকে এটিকে সর্বকালের সেরা সংস্করণ হিসাবে বিবেচনা করে।

এই টুর্নামেন্টে থিয়েরি অঁরি, ডেভিড ত্রেজেগে, মাইকেল ওয়েন, জেমি ক্যারাগার, শুনসুকে নাকামুরা, ডেমিয়েন ডাফ, মার্সেলো জালায়েতা, নিকোলাস অলিভেরা এবং স্টিফেন আপিয়াহ সহ অনেক উজ্জ্বল প্রতিভারা খেলেছিল। তা সত্ত্বেও, যে দলটি তাদের স্টাইল, শর্ট পাসিং এবং আক্রমণাত্মক ফুটবল দিয়ে পুরো টুর্নামেন্টে সমর্থকদের মুগ্ধ করেছিল তারাই ছিল সেই আসরের চ্যাম্পিয়ন। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন সেই আসরের চ্যাম্পিয়ন ছিল আর্জেন্টিনা। যারা তাদের প্লেয়িং স্টাইলের কারণে ‘লা নুয়েস্ট্রা’ নামে পরিচিত ছিল।

আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের সাবেক কোচ হোসে পেকারম্যানের পরিচালনায় আর্জেন্টিনায় ছিল উদীয়মান প্লেমেকার হুয়ান রোমান রিকুয়েলমে, পাবলো আইমার, মিডফিল্ডার এস্তেবান ক্যাম্বিয়াসো, প্রতিশ্রুতিশীল ডিফেন্ডার ওয়াল্টার স্যামুয়েল এবং দিয়েগো প্লেসেন্তে, বার্নার্দো রোমিও ও লিওনেল স্কালোনির মতো তরুণ তারকারা। তারা সম্মিলিতভাবে ‘পেকারবয়েজ’ নামে পরিচিত ছিল। তারা ছিল আর্জেন্টিনার ঈর্ষান্বিত তৃণমূল পর্যায়ের সেই বিকশিত খেলোয়াড় যারা ট্যাঙ্গো ফুটবলের আদর্শ ব্রান্ড ছিল। তবে তাদের এই যাত্রা মোটেও মসৃণ ছিল না। 

মালয়েশিয়া এমন একটি দেশ যারা ইংল্যান্ড বা ব্রাজিলের খেলা নিয়ে সর্বদা এক্সাইটেড থাকতো। তাই আর্জেন্টিনার মতো একটি দলের খেলা খুব কম লোকই দেখেছিল। যারা এই ক্ষুদে তারকাদের খেলা দেখেতে এসেছিলো তারা ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে দিয়েগো ম্যারাডোনার পারফরম্যান্সে মুগ্ধ হয়েই মাঠে এসেছিল।

কেন ইংল্যান্ড? ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রাক্তন উপনিবেশ হওয়ায় থ্রি লায়ন্সের প্রতি সর্বদা কিছু নস্টালজিয়া থাকে এবং ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এবং লিভারপুলের মতো ফুটবল ক্লাবগুলির জনপ্রিয়তা, পাশাপাশি সাধারণভাবে প্রিমিয়ার লীগও একটি বিশাল ভূমিকা পালন করেছিল। আর কেনই বা ব্রাজিল? এর সুস্পষ্ট কারণ হলো পেলে, সাম্বা নৃত্য এবং বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে সুসজ্জিত দল।

আর্জেন্টিনার যুবদল ‘লস পিবস’ নামে পরিচিত। মালয়েশিয়ার সবচেয়ে উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্য পার্লিসের রাজধানী কাঙ্গারে তারা অবস্থান করেছিল। তাদের সাথে যোগ দিয়েছিল হাঙ্গেরি, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়া। পেকারম্যান দুই বছর আগে কাতারে আগের আসর জিতে তার দ্বিতীয় শিরোপা জয়ের লক্ষ্যে এই শহরের শান্ত পরিবেশে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তার ছেলেরা লক্ষ ঠিক রেখে সামনের দিকে মনোনিবেশ করার জন্য কঠোর পরিশ্রম করছিল।

হাঙ্গেরির বিপক্ষে তাদের প্রথম ম্যাচে রোমিও, স্কালোনি এবং উদীয়মান তারকা রিকুয়েলমের গোলে তারা তরুণ মাগিয়ার্সদের তুলনামূলক স্বাচ্ছন্দ্যে হারিয়েছিল। এটি সম্ভবত রোমানের বিশ্ব ফুটবলে প্রথম ঝলক ছিল (পরবর্তীতে তার নাম দেয়া হয় ‘ফুটবলের অলস যাদুকর’)। তার দর্শনীয় পাস দেখে কমেন্টেটর রে হাডসন তার বিখ্যাত এক উক্তিতে বলেছিলেন, "রিকেলমের পাস মায়ের চুম্বনের চেয়ে মিষ্টি।"

কানাডার বিপক্ষে পরের ম্যাচে রোমিও এবং রিকুয়েলমে গোল করে এবার আরও শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে ২-১ গোলে পরাস্ত করেছিলেন। এই ফলাফলে পরবর্তী রাউন্ডে যাওয়া অনেকটা নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল। তাই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচটি ছিল কেবল আনুষ্ঠানিকতা। সবাই ধরেই নিয়েছিল শেষ ম্যাচটি জিতে গ্রুপপর্বের শীর্ষে থেকে পরের রাউন্ডে যাবে আর্জেন্টিনা। তবে হলো তার ঠিক উল্টো।

ফর্মে থাকা রোমিওর গোলে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। ব্রেট এমারটন, লুকাস নিল এবং ভিন্স গ্রেলার মতো তরুণদের নিয়ে গড়া অস্ট্রেলীয় দলও ছেড়ে দেবার পাত্র নয়। বিরতি থেকে ফিরে ১৫ মিনিটের মাথায় হ্যাটট্রিক করে কোস্টাস সালাপাসিডিস খেলা দেখতে আসা সকল দর্শকদের চমকে দিয়েছিলেন। ৭০ মিনিটে ডিয়েগো প্লাসেন্তে এবং ৮৮ তম মিনিটে পেনাল্টি থেকে রিকুয়েলমে গোল করে আর্জেন্টিনাকে সমতায় ফেরান। কিন্তু মাঠে উপস্থিত থাকা ৮,০০০-এরও বেশি দর্শকের জন্য তখনও চমক অপেক্ষা করছিল। ৯০তম মিনিটে অস্ট্রেলিয়া পেনাল্টি পায় এবং সালাপাসিদিস কোনো ভুল না করে নিজের চতুর্থ গোল করে তরুণ সকারুদের পেকারম্যানের ছেলেদের বিপক্ষে বিস্ময়কর জয় এনে দেন। এই পরাজয়ের পরে আর্জেন্টিনা তাদের গ্রুপে রানার্সআপ হয়ে পরবর্তী রাউন্ডে যায় এবং এটি তাদের বাকি ফাইনালের পথ আরও কঠিন করে তোলে।