• ফুটবল

জিরোনা ফুটবল ক্লাব- সিটি গ্রুপের কাতালুনিয়ান দৈত্য

পোস্টটি ৪২৬ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

লেস্টার সিটি যখন ২০১৫-১৬ মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা জিতেছিল, তখন অনেকে এটিকে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসাবে বর্ণনা করেছিল। আধুনিক ফুটবলে যার পুনরাবৃত্তি অনেকটা অসম্ভব বলেই মনে হচ্ছিল। এর পিছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে আধুনিক ফুটবলে জড়িত বিপুল পরিমাণ অর্থ যা ধনী স্তরের ক্যাটাগরিতে না থাকা কোনও ক্লাবের পক্ষে ৩৮ ম্যাচের দীর্ঘ মৌসুম জেতা প্রায় অসম্ভব।

তবে লা লিগায় জিরোনা সম্ভবত এই মৌসুমে স্বয়ং লেস্টার সিটির সেই ড্রিম জার্নিকেই মনে করিয়ে দিচ্ছে। স্প্যানিশ লিগে ১৫তম রাউন্ড শেষে কাতালোনিয়ার ক্লাবটি রিয়াল মাদ্রিদের সমান ৩৮ পয়েন্ট নিয়ে গোল ব্যবধানে পিছিয়ে থাকার কারণে পয়েন্ট টেবিলের দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। ১২ জয়, ২ ড্র এবং ১ পরাজয় নিয়ে কাতালোনিয়ার দলটি লিগ টেবিলের উপরের দিকে উঠে সবাইকে অবাক করে দিয়েছে এবং তারা যে এই মৌসুমে সুন্দর ফুটবলের পসরা সাজিয়ে বসছে তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। জিরোনার এই উত্থান বেশ গুরুত্বপূর্ণ কারণ রিয়াল মাদ্রিদ এবং বার্সেলোনা এই দুই জুটি মিলে এই শতাব্দীর বেশিরভাগ সময় লিগে আধিপত্য বিস্তার করেছে এবং তারা শেষ ২৩ টি শিরোপার মধ্যে ২০ টি জিতেছে। আরেকটি বিষয় হলো, জিরোনা এই মৌসুমে ১৫টি ম্যাচ খেলেছে যা  এক-তৃতীয়াংশেরের থেকে কিছুটা বেশি। এতেই তারা প্রমাণ করে যে তাদের এই উত্থান ফ্লুক নয় এবং বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদের মতো জায়ান্টদের সাথে টেক্কা দিতে নতুন উদীয়মান এই দলকে তাদের সেরাটাই দিতে হবে।

জিরোনার অ্যাটাকিং পরিসংখ্যান-
যখন একটি আন্ডারডগ টিম নিজেদেরকে ক্রমশ পয়েন্ট টেবিলের উপরের দিকে নিয়ে যায়, তখন সাধারণত এর পিছনে বেশকিছু কারণ লক্ষিত হয়। ভাগ্য, ডিফেন্সিভ স্ট্র্যাটেজি, দুই-তিনজন খেলোয়াড়রের অতিমানবীয় পরফরম্যান্সগুলো মূলত এক্স-ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচিত হয় এসবক্ষেত্রে। জিরোনা দলটা এই তিন জিনেসের উপর ভিত্তি করেই এখন পর্যন্ত লীগে ভালো অবস্থায় রয়েছে। উত্তর কাতালুনিয়ার এই দলটি চলতি মৌসুমে লীগে ৩৪ গোল করেছে। তাদের থেকে কেবল বায়ার্ন মিউনিখ, বায়ার্ন লেভারকুসেন এবং সিটি গ্রুপের আরেকদল ম্যানচেস্টার সিটি বেশি গোল করেছে। তাদের গোল কনভার্সন রেট বেশ চিত্তাকর্ষক- ১৭.৩২ শতাংশ, যা টপ ফাইভ লীগের মধ্যে পঞ্চম। সকারমেন্টের  পরিসংখ্যান অনুযায়ী জিরোনার প্রত্যাশিত গোল (xG) সংখ্যা ৪.৭২ যা স্প্যানিশ লীগের অন্যতম সেরা।

টিম ম্যানেজার মিশেল এমন একটি কৌশল  ব্যবহার করছেন যা খেলোয়াড়দের সৃজনশীলতার কারণে নিখুঁত আক্রমণ শানাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তার মূলমন্ত্রটি বেশ সহজ- অ্যাগ্রেসিভ হাই প্রেসিংয়ের দরুন বিরোধী দলের খেলোয়াড়দের দম বন্ধ করে দেয়া।  গেগেনপ্রেসিং ইন্টেন্সিটি পার্সেন্টেজে (GPI) এর প্রতিফলন বেশ ভালো ভাবেই দেখা যায়। এই জিপিআই একটি মেট্রিক পদ্ধতি যা কোনো ফুটবল খেলায় প্রেস করার পরিমাণ পরিমাপ করে। জিরোনার জিপিআই ৫৫.০৮, যা লীগের চতুর্থ সেরা।

গত সামার ট্রান্সফার উইন্ডোতে, জিরোনা সান্তিয়াগো বুয়েনো, ওরিওল রোমেউ এবং রামোন টেরাটসের মতো প্রথম একাদশের খেলোয়াড়দের হারিয়েছে। এখানেই তাদের এই খেলোয়াড়দের বদলি হিসেবে অন্যান্য সম্ভাবনাময় খেলোয়াড়দের নিয়ে স্কোয়াডকে আরও শক্তিশালী করতে বেশ সহায়তা করেছিল। প্রায় ২০ মিলিয়ন ইউরোর সামান্য বাজেট নিয়ে, জিরোনা কিছু স্মার্ট সাইনিং করে। প্রথমেই ফ্রি ট্রান্সফারে আসেন ডেলি ব্লিন্ড এবং পাওলো গাজ্জানিগা জুটি। এছাড়াও তারা আর্তেম ডভবিক, জন সোলিস, ইয়াঙ্গেল হেরেরা, ইভান মার্টিন এবং পোর্তুকে উড়িয়ে আনেন যা দলের গুণমান এবং বেঞ্চ শক্তি আরেকটু বাড়িয়ে দেয়। আরেকটি বিষয় যা তাদের পক্ষে এসেছিল সেটিও সিটি ফুটবল গ্রুপেরই (CFG) অংশ। তাদেরই সিস্টার্স ক্লাব ফ্রেঞ্চ লিগ ২-এ খেলা ট্রয়েসের কাছ থেকে ধারে নিয়ে আসে তরুন ব্রাজিলীয়ান লেফট উইঙ্গার স্যাভিওকে, যিনি এখন পর্যন্ত এই মৌসুমে জিরোনার সেরা পারফর্মার। এছাড়াও বার্সেলোনা থেকে এরিক গার্সিয়া, পাবলো তোরের মতো হাই ক্যালিবারের খেলোয়াড়কে ধারে নিয়ে আসে উত্তর কাতালুনিয়ার ক্লাবটি।

এই খেলোয়াড়দের পাওয়ার পরে, মিশেলের উদ্দেশ্যটা বেশ সহজ ছিল: প্রতিপক্ষের উপর চাপ তৈরি করা এবং অত্যন্ত আক্রমণাত্মক স্টাইলে খেলা। তিনি জানতেন যে দলটি লা লিগার কিছু বড় টিমের মতো রক্ষণভাগে ততটা শক্তিশালী নয়, তাই খেলোয়াড়দের গতি বজায় রাখার জন্য তাদের প্রতিপক্ষকে ছাড়িয়ে যেতে হবে এবং খুব দ্রুতই হাতেনাতে ফলাফল পায় মিশেল। চলতি মৌসুমে পাঁচটি ভিন্ন ম্যাচে তিন বা ততোধিক গোল করেছে জিরোনা। এছাড়াও তারা প্রতিটি খেলায় গোল করেছে, কেবল একটি ম্যাচ বাদে। ডেলি ব্লিন্ডের সংযোজন তাদের জন্য অন্যতম সেরা পদক্ষেপ। অভিজ্ঞ এই ডাচ ডিফেন্ডারের চমৎকার পাসিং রেঞ্জ রয়েছে, যা দলকে ব্যাপকভাবে সহায়তা করে।

জিরোনার কৌশল- ওভারলোড এবং ব্লিন্স-স্যাভিওর ডায়নামিক কম্বো

মিশেল জানতেন যে তার দলে প্রতিভাবান খেলোয়াড় খুব একটা নেই। এর অর্থ তাকে দলের শক্তির জায়গাগুলো খুঁজে বের করতে হবে এবং এমন একটি সিস্টেম তৈরি করতে হবে যা দলের দুর্বলতাগুলি প্রত্যাখ্যান করবে। জিরোনা সাধারণত ৩-৪-৩  ফর্মেশনে খেলে, তবে কেবল তখনই যখন তাদের দখলে বল থাকে না। যাইহোক, যখন ডেলি ব্লিন্ডের কাছে বলের দখল থাকে তখন তিনি বাম সেন্টার-ব্যাক থেকে সরে মিডফিল্ডে চলে আসেন। তখন ফর্মেশন ৩-৪-৩ থেকে বদলে অনেকটা ২-৫-৩ এ রূপ নেয়। মিডফিল্ডে থাকা অবস্থায় ব্লিন্ড তখন বল পায়ে জিরোনার অন্যতম সেরা পাসার এবং খেলা নিয়ন্ত্রকের রোল প্লে করেন। পরিসংখ্যানটাও তার সাথে বেশ মানানসই। ডেলি ব্লাইন্ডের প্রত্যাশিত থ্রেট (xT) রেটিং ১.৪৯, যা স্প্যানিশ লীগের সেরা। এক্সটি হ'ল একটি মেট্রিক পদ্ধতি যা সাধারণত যে কোনও খেলোয়াড় তার পাসিং বা বল বহন করার ক্ষমতার মাধ্যমে কোনও নির্দিষ্ট পিচ অঞ্চলে ঠিক কতটা হুমকি দেয় তা পরিমাপ করতে পারে।

এই মৌসুমে জিরোনা এতগুলো সুযোগ তৈরি করতে সক্ষম হওয়ার অন্যতম কারণ হলো ডেলি ব্লিন্ডের অনবদ্য পাস। সতীর্থ অ্যালেক্স গার্সিয়ার পাশাপাশি লিগের শীর্ষ পাঁচ পাসারদের মধ্যে রয়েছেন ব্লিন্ডও। আর যদি ব্লিন্ড মিডফিল্ড নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে আক্রমণের দায়িত্ব অনেকটা ১৯ বছর বয়সী ব্রাজিলীয়ান উইঙ্গার সাভিওর ওপরই বর্তায়। সিস্টার ক্লাব ট্রয়েসের কাছ থেকে ধারে চুক্তিবদ্ধ হওয়া এই কিশোর নতুন লিগের চাহিদার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে বিন্দুমাত্র সময় নেয়নি। লিগে দ্বিতীয় সেরা এক্সটি রেটিং রয়েছে সাভিওর। সর্বোপরি, তার প্রত্যাশিত অ্যাটাকিং ভ্যালু অ্যাডেড (xOVA) রেটিং ৪.৯৩ যা শীর্ষ পাঁচ লিগের খেলোয়াড়দের মধ্যে সেরা। মিশেল এই তরুণকে ফ্রি-রোল দিয়েছেন, যাতে তিনি সর্বোত্তম উপায় তার সৃজনশীলতাকে ব্যবহার করতে পারেন। সাভিও ৩০ টি সফল ড্রিবলও সম্পন্ন করেছেন, যা ভিনিশিয়াস জুনিয়রের পর লীগের দ্বিতীয় সেরা। ডেলি ব্লিন্ড এবং সাভিও বাদে দলের  অন্যান্য খেলোয়াড়রা বলের দখল নিশ্চিত করতে দারুণ ভূমিকা পালন করেছে এবং পিচ জুড়ে সর্বদা ওভারলোড তৈরি করেছে।

মিশেল জানেন, বিশ্বমানের বেঞ্চের খেলোয়াড়দের নিয়ে অথবা ১১ জন বিশ্বমানের খেলোয়াড়কে মাঠে নামানোর বিলাসিতা তার নেই। এইভাবে, তাদের আসল বাজিটাই হলো তারা তাদের শক্তির জায়গা থেকে খেলে প্রতিপক্ষকে হারানোর চেষ্টা করবে। আর এটাই একমাত্র পন্থা যা তারা অনুসরণ করতে পারে যদি তারা লেস্টার ২.০ পুনরায় ক্রিয়েট করতে চায়। এখন পর্যন্ত পারফরম্যান্স অনুযায়ী বেশ ভালোভাবেই তারা ফুটবল লোককাহিনীর সোনালী পৃষ্ঠায় তাদের নাম লেখার ক্ষমতা রাখে।