• " />

     

    অনূর্ধ্ব-১৬ সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপঃ অর্জন, প্রাপ্তি, প্রত্যাশা

    একবার কল্পনা করুন তো বাংলাদেশের কোন ফুটবলার ইউরোপ মাতিয়ে বেড়াচ্ছে পায়ের জাদুতে! ক’দিন আগেও যাদের স্বপ্নের পরিধি ইউরোপ পর্যন্ত যাবার সাহস দেয়নি- সেই আশার পালেই নতুন হাওয়া বইছে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৬ দলের সাফ চ্যাম্পিয়নশীপ জয়ে। সারারাত জেগে ইপিএল, লা লীগার পয়েন্ট তালিকার হিসাব রাখেন যারা তাদের কয়জন দেশীয় ফুটবলের খবর রাখেন তা নিঃসন্দেহে জরিপের দাবি রাখে! দেশের ফুটবলকে যাদুঘরে পাঠানোর সময় এসে গিয়েছে - একথা বলে বলে নিয়তই যারা মুখে ফ্যানা তুলতেন, তাদেরকেও টিভি সেটের সামনে ফিরিয়ে এনেছিলো বাংলার কিশোরেরা। দেশের ফুটবলে কি তবে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো?



    দেশের ফুটবলে আশার সঞ্চার হয়েছে ঠিকই তবে নিয়মিত ফুটবলের খবর রাখেন যারা তাদের জন্য অবশ্য এ খবর নতুন নয়। এমন করে তো কতই হাওয়া লাগলো আশার পালে, তাতে দেশের ফুটবলের মান বৃদ্ধি হলো কই?! তাহলে কি এই সাফল্য আবারো মিলিয়ে যাবে সঠিক পদক্ষেপের অভাবে?



    জাতীয় বা বয়সভিত্তিক যে কোন ফুটবলেই ৬ মাস আগেও অর্জনের খাতা একরকম শুন্যই ছিল। গত কয়েক সাফে তেমন সাফল্য নেই বললেই চলে। বঙ্গবন্ধু গোল্ড কাপের শিরোপাও অধরাই রয়ে গেলো। ভারতকে ফাইনালে হারিয়ে বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-১৬ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে জয় তাই বহুদিন পর কোন টুর্ণামেন্টে জয়ী না হতে পারার হতাশার হাত থেকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দিয়েছে বাংলাদেশের ফুটবলকে।

     

    আর এই জয়েই বদলে গেছে দৃশ্যপট! একটি দল হিসেবে খেলা, মাঠে টেম্পারমেন্ট ধরে রেখে সময়ের কাজটা সময়ে করা, গোল হজম করেও ম্যাচে ফিরে আসা, হার না মানা মনোভাব -- এসব কিছুই যে মাত্র দু’সপ্তাহের ক্যাম্পিং এর ফসল তা অনেকের কাছেই এখন অবিশ্বাস্য লাগার কথা।

     

    সৈয়দ গোলাম জিলানীর শিষ্যরা সেই অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখালেন! টুর্ণামেন্ট শুরুর আগে প্রায় ৪ মাস ক্যাম্পে থাকা আফগান দলকে যে সেমিফাইনালে একদমই পাত্তা দিলো না বাংলাদেশ! আফগানিস্থানের সাথে সেমিফাইনালের জয়টা ১-০ গোলের। স্কোরলাইন মাঠে সেদিনের বাংলাদেশের আধিপত্যের কথা না বললেও জাতীয় দলে নতুন এক খেলোয়াড়ের আগমনী বার্তা ঠিকই দিচ্ছে। সাদ উদ্দিন; সিলেটের ছেলে, খেলের অ্যাটাকিং মিডফিল্ড পজিশনে। গতি, ড্রিবলিং, শারীরিক সক্ষমতা সব দিক দিয়েই এই টুর্ণামেন্টে বাংলাদেশের পাওয়া সোনার হরিণ।

     

    মাঝমাঠের খেলোয়াড় ফাহিমের কথাও বলতে হবে আলাদা করে। দলকে সাফ জেতানোয় অনবদ্য ভূমিকা যার। ফাইনালে গোলও করলেন তিনিই। মাঝমাঠ ধরে রেখে খেলেন, মাঠে মুভমেন্টও অসাধারণ, দলের প্রায় প্রতিটি অ্যাটাকেও সরব উপস্থিতি ছিল তাঁর।

     

    সাদ, ফাহিমরা মাঝমাঠ থেকে যাকে বল পাঠিয়ে গোল করতে সাহায্য সেই নিপু নির্বাচিত হলেন টুর্ণামেন্টের সেরা খেলোয়াড়। খেলেন আক্রমণভাগে, এবারের সাফে দুই গোল তাঁর। তার মধ্যে গ্রুপ পর্বে ভারতের বিরুদ্ধে একটি। ফাইনাল খেলতে না পারার আক্ষেপ হয়তো পোড়াবে অনেকদিন। তাতে কি! জাতীয় দলের ৯ নম্বর জার্সি গায়ে চড়াতে পারলে হয়তো সেই আক্ষেপ অনেকটাই মুছে যাবে কিশোরগঞ্জের এই ছেলের।

     

    দলীয় অধিনায়ক শাওন টুর্ণামেন্ট জুড়ে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন অধিনায়কের মতই। নারায়ণগঞ্জের ছেলে এরই মধ্যে জাতীয় দলের অধিনায়কত্বের আর্মব্যান্ড পড়ার স্বপ্ন তো দেখতেই পারেন!

     

    গোলরক্ষক ফয়সাল ২০১২ সালের রাইজিং স্টার ওল্ড ট্রাফোর্ডে ঘুরে আসার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েছেন শতভাগ। ফাইনালে তাঁর হাত ধরেই জয় আসলো টাইব্রেকারে। তাছাড়াও সেমিফাইনালে তাঁর দারুণ কিছু সেভ পরিপক্ক বয়সে একজন ভালো গোলরক্ষক হবার সংকেতই দেয়।



    সব মিলিয়ে অনেক প্রাপ্তির এক টুর্ণামেন্ট। সিলেটের দর্শক যেমন দু’হাত ভরে দিয়েছে ফুটবলকে, বাংলার ছেলেরাও নিরাশ করেনি তাদের, বাংলাদেশের প্রতিটি খেলায়ই গ্যালারি কানায় কানায় পূর্ণ ছিল। সিলেটের মাটিতে নিয়মিত ফুটবল আয়োজন এখন সময়ের দাবি মাত্র।



    যে দলকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হবার গৌরব অর্জন করলো বাংলাদেশ, সে দেশেই ২০১৭ সালে বসছে অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপের আসর, কখনো মূল বিশ্বকাপ না খেললেও স্বাগতিক দেশ হিসেবে এই টুর্ণামেন্টে অংশ নেবে ভারতও। এবারের অনূর্ধ্ব-১৬ ভারতীয় দলের ৩/৪ জন খেলোয়াড় সে মঞ্চে ভারতের হয়ে খেলবেন সে কথা বলাই যায়। এখন পর্যন্ত ৩ বার অনুষ্ঠিত সাফ অনূর্ধ্ব-১৬ টুর্ণামেন্টের একবারের চ্যাম্পিয়ন আর দুইবারের রানার্স-আপ ভারত। এমন শক্তিশালী দলকে একই টুর্ণামেন্টে দুইবার হারানো বাংলাদেশ দলের কাছে আমাদের প্রত্যাশা বেড়ে না গেলে তাই হবে অবাক করার মত! 



    এতো গেলো খেলোয়াড়দের মাঠে খেলার কৌশল। শুধু কৌশল দিয়ে পুরো সাফে বাংলাদেশের এই দলের কৃতিত্ব বর্ণনা করটা একপেশে হয়ে যাবে। মাঠে বুক চিতিয়ে লড়াই করার পেছনে দেশপ্রেমও কি উদ্বুদ্ধ করেনি? প্রায় প্রতি ম্যাচেই জাতীয় সঙ্গীতের সময় রাইট ব্যাক খলিলের চোখের জল গড়িয়ে পড়েছে বুকের ব্যাজে। এতেই প্রমাণ হয়, এ শুধু একটা দল না, আগামী দিনের কান্ডারিও, হারিয়ে যেতে আসেনি এরা। শুধু দরকার সঠিক পরিচর্যা ও পর্যবেক্ষণ। কে জানে হয়তো এই দলই কোন একদিন বিশ্ব দরবারে ফুটবল খেলুড়ে দেশ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেবে বাংলাদেশের নাম!                 

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন