• ওয়েস্ট ইন্ডিজ-ইংল্যান্ড সিরিজ
  • " />

     

    • ওয়েস্ট ইন্ডিজ-ইংল্যান্ড সিরিজ

    পুরোনো উইন্ডিজ সুরে নতুন গান

     

    আলজারি জোসেফ নির্লিপ্ত। 

    জো রুটের উইকেট, সেটার আবেদন। উইকেটকিপার ও স্লিপ কর্ডন বেশ উৎসাহী, জোসেফের তাতে কিছু যায় আসে না যেন। তিনি পেছন ফিরে হাঁটা ধরেছেন প্রায়। জ্যাসন হোল্ডার রিভিউ নিলেন। থাই-প্যাডে লাগার আগে বল ছুঁয়ে গেছে রুটের গ্লাভস। রুট আউট। উল্লাসে মত্ত ওয়েস্ট ইন্ডিজ। তবে জোসেফ নির্লিপ্ত। 

     

     

    তারও আগে। 

     

    মুখোমুখি হওয়া ৬২তম বলে এসে জোসেফের তৈরি করা অ্যাঙ্গেলটা বুঝতে ভুল করে ফেললেন জো ডেনলি। স্টাম্প ভাঙলো। উল্লাসে মাতলো উইন্ডিজ। তবে জোসেফ নির্লিপ্ত। তাকে কিছু ছুঁয়ে যাচ্ছে না যেন। 

    এদিন খেলা শুরুর আগেই খবর এসেছে, মারা গেছেন জোসেফের মা শ্যারন। সে শোককে ছাপিয়ে জোসেফ মাঠে নেমেছেন, তার আগে ওয়ার্ম-আপ করেছেন। বোলিংয়ের আগে ব্যাটিং করেছেন। জোসেফের ক্রিকেটে জীবনটা মিশে গেছে, আক্ষরিক অর্থেই। 

    দিন শুরুর আগে উইন্ডিজের প্রথম চেষ্টা ছিল লিডটা বাড়িয়ে নেওয়ার। জোসেফের মায়ের সংবাদটা এলো ঝড় হয়ে। যে ঝড় দৃশ্যমান নয়, তবে মন-মানসিকতার বসতবাড়ি বিধ্বস্ত করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তবে এরপরই হাজির তাড়না। একজন জোসেফের মানসিক দৃঢ়তায় ভর করে উইন্ডিজ নামলো একজন মায়ের জন্য। 

    জোসেফ নির্লিপ্ত থাকলেও শ্যারন এদিন তার সঙ্গে ছিলেন। শ্যারন এদিন উইন্ডিজ দলের সঙ্গে ছিলেন। শ্যারন এদিন ক্যারিবীয় ক্রিকেটের সঙ্গে ছিলেন। 


    ****

    ইংল্যান্ড ওয়েস্ট ইন্ডিজ এসেছিল প্রত্যাশার পারদ অনেক উঁচুতে নিয়ে। শ্রীলঙ্কাকে তাদের মাটিতে হোয়াইটওয়াশ করে আসার দারুণ সাফল্যের স্বাদটা ছিল তরতাজাই। অবশ্য ওয়েস্ট ইন্ডিজ বরাবরই তাদের কাছে এক রহস্যের নাম- গত ৫০ বছরে ক্যারিবীয়তে এসে ক্যারিবীয়দের তারা সিরিজে হারিয়েছে শুধু একবার, সেটা প্রায় ১৫ বছর আগে, ২০০৪ সালে। 

    তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের আত্মবিশ্বাস ‘প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড’ কথাটা বাদ দিলে ছিল অনেক নিচুতে। বাংলাদেশে গিয়ে প্রথমবারের মতো হোয়াইটওয়াশ হয়েছে তারা। বাংলাদেশ ও জিম্বাবুয়ে ছাড়া শেষ উইন্ডিজ জিতেছিল ২০১২ সালে, তারও আগে ২০০৯ সালে। র‍্যাঙ্কিংয়ে উইন্ডিজ ছিল আটে, ইংল্যান্ড তিনে।

    বার্বাডোজে ২১২ রানের প্রথম ইনিংস লিড নিয়েও দ্বিতীয় ইনিংসে ১২০ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে ধুঁকছিল উইন্ডিজ। এলেন হোল্ডার। সঙ্গী শেন ডওরিচ। দুজন একাডেমি থেকেই বন্ধু। দুই বন্ধুতে মিলে অনেক বড় এক প্রশ্নবোধক চিহ্ন বসিয়ে দিলেন ইংল্যান্ডের নির্বাচকদের সামনে। 

    ইতিহাসে মাত্র তৃতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে আট বা এর পর নেমে হোল্ডার করলেন ডাবল সেঞ্চুরি। ঘরের মাটিতে জ্বলে উঠলেন হোল্ডার, তার ব্যাটে ধীরে ধীরে নিষ্পেষিত হতে লাগলো ইংল্যান্ড। সেই ইংল্যান্ড, একসময় যারা বার্বাডোজকে বানিয়েছিল ‘আফ্রিকান দাস বাণিজ্যের’ কেন্দ্রবিন্দু। 

    শ্রীলঙ্কার স্পিনিং কন্ডিশনে স্পিনজয় করে আসা ইংল্যান্ড রসটন চেজকেই দিল আট উইকেট। উইন্ডিজ ১, ইংল্যান্ড ০। 

    এরপর অ্যান্টিগা। ভিভ রিচার্ডস ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে যখন খেলা শুরু করেন, তখনও স্বাধীন হয়নি তার দেশ অ্যান্টিগা। ক্যারিবীয়রা এই একটি জায়গায় সুযোগ পেয়েছিল তাদের ‘প্রভু’দের সঙ্গে লড়াইয়ের, যেখানে দুই পক্ষই থাকবে সমান- ক্রিকেট। 

    ইংল্যান্ডে ফিরলেন ব্রড, গতির অভাব ব্রিজটাউনেই টের পেয়েছিল তারা। তবে ব্রড পার্থক্য গড়তে পারলেন না কিছুই। যা গড়লেন কেমার রোচ। যা গড়লেন শ্যানন গ্যাব্রিয়েল, জ্যাসন হোল্ডার বা ‘অ্যান্টিগান’ আলজারি জোসেফ। 

    ইংল্যান্ড ক্যারিবীয় অঞ্চল ছেড়ে গেছে অনেকদিন আগেই। বৃটিশ কলোনি নেই, থাকলে আছে শুধু স্মৃতি। বৃটিশরা সেখানে ছুটি কাটাতে যান, ইংল্যান্ড ক্রিকেট দলের সঙ্গে বার্মি আর্মির সঙ্গে যায় বিশাল এক বহর। ক্যারিবীয়রা তাদের আথিতেয়তা দেন। 

    শুধু ক্রিকেটেই যেন ঠিক আথিতেয়তাটা পায় না ইংল্যান্ড। 

    ****

    জ্যাসন হোল্ডারকে যখন নেতৃত্ব দেওয়া হয়, তখনও তিনি মিডিয়াম পেসটা জুত করে উঠতে চাইছেন, আর লোয়ার অর্ডারে ব্যাটিংয়ে দলকে দিতে চাইছেন সহায়তা। তবে বিশ্বকাপজয়ী সাবেক অধিনায়ক ক্লাইভ লয়েডের নির্বাচক প্যানেলের অনেক উচ্চাশা ছিল তাকে নিয়ে। তার মাঝে তারা দেখেছিলেন অমিত সম্ভাবনা, দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে। হোল্ডার এর আগে ঝলক দেখিয়েছেনও। ইংল্যান্ডের সঙ্গে আগের সিরিজেই বাঁচিয়েছিলেন টেস্ট, সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে। 

    তবে চোট নিয়ে দেশ থেকেই দেখতে হলো তার, বাংলাদেশে গিয়ে কিভাবে নাকানিচুবানি খেয়ে এলো তার দল। 

    সেই হোল্ডারই দুই হাত উঁচুতে তুলে চিৎকার করছিলেন। এমনিতেই দেহাবয়বে বিশাল তিনি, টিভি ক্যামেরা জুম করাতে যেন পুরো স্ক্রিন জুড়েই তিনি। ইংল্যান্ডের দেওয়া ১৪ রানের লক্ষ্যটা জন ক্যাম্পবেলের এক ছয়ে পেরিয়ে গেছে উইন্ডিজ। জেমস অ্যান্ডারসনের শর্ট অফ লেংথের বলটা মিডউইকেট দিয়ে তুলে মেরেছিলেন ক্যাম্পবেল, খাঁটি ক্যারিবীয় স্টাইলে। তার সেই ছয় যেন ফিরিয়ে আনলো সেই পুরোনো সব স্মৃতি। 

    হোল্ডারের উল্লাস ছড়িয়ে গেলে অ্যান্টিগা জুড়ে। একজন বার্বাডিয়ানের উল্লাসে মাতলো অ্যান্টিগা। পুরো উইন্ডিজ। 

    হোল্ডাররা এদিন খেলেছিলেন জোসেফের মায়ের জন্য। হোল্ডাররা বার্বাডোজ বা অ্যান্টিগা ছাপিয়ে যান উইন্ডিজের হয়ে নেমে। হোল্ডাররা ফিরিয়ে আনতে চান বিস্মৃত কোনও সুর। 

    জোসেফের নির্লিপ্ততা সেই সুর তোলে। হোল্ডারের উল্লাস সেই সুর তোলে। সেই সুরে উঠতে চায় নতুন কোনও গান।