• বাংলাদেশের নিউজিল্যান্ড সফর
  • " />

     

    • বাংলাদেশের নিউজিল্যান্ড সফর

    ইতিহাসের শিক্ষা এবং সৌম্য-মাহমুদউল্লাহর দুই রকম 'উত্তর'

    ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হচ্ছে, ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না।

    অন্তত বাংলাদেশ দল টেস্টে (আরও নির্দিষ্ট করে বললে বিদেশের মাটিতে) ব্যাটিংয়ে নামলে কথাটা কেন যেন অমোঘ নিয়তির মতো ঘুরে ঘুরে আসে। বাংলাদেশের দলের ব্যাটসম্যানরা বিলক্ষণ জানেন, কোন ফর্মুলায় তাদের বধের ছক কষা হচ্ছে। জেনেশুনেই তারা বিষপান করেন প্রায়ই। ব্যতিক্রম হলো কদাচিৎ, হ্যামিল্টন টেস্টে যেমন হলো তামিম ইকবাল-সৌম্য সরকার-মাহমুদউল্লাহর ব্যাটে। নিউজিল্যান্ডের বোলাররা শর্ট বলকেই ব্রহ্মাস্ত্র করবেন, সেটি জানা ছিল ভালোমতোই। কিন্তু বাকিরা সেই ফাঁদে জেনেশুনেই যখন পা দিলেন, এই তিন জন কোন কৌশলে তা সামলালেন?

    তার আগে একটু বছর দুয়েক আগের ওয়েলিংটন টেস্ট থেকে ঘুরে আসা যাক। সাকিব আল হাসান ও মুশফিকুর রহিম যখন জুটি বেঁধেছেন, প্রথম ইনিংসে ১৬০ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে ফেলেছে বাংলাদেশ। ঠিক এই বোলিং আক্রমণটাই ছিল কিউইদের, বোল্ট-সাউদি-ওয়াগনার-ডি গ্র্যান্ডোমদের সবাই ছিলেন। শুধু টড অ্যাস্টলের জায়গায় ছিলেন মিচেল স্যান্টনার। ওয়াগনার সেদিনও একের পর এক বাউন্সার ছুঁড়ে যাচ্ছিলেন সাকিব-মুশফিকদের, কখনো ওভার দ্য উইকেটে, কখনো রাউন্ড দ্য উইকেটে। তবে সাকিবরা খেলার খুব বেশি চেষ্টাই করেননি, ‘ডাক’ করে গেছেন একের পর এক। আর সুযোগ পেলেই বাজে বলের ফায়দা নিয়েছেন। ফলাফল? সাকিব-মুশফিকের পঞ্চম উইকেট জুটিতে ৩৫৯ রান, বাংলাদেশের যে কোনো উইকেটের জুটিতে যা রেকর্ড।

    কিন্তু ওই যে, ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না! পরের ইনিংসে ওয়াগনারের সেই শর্ট বলেই ক্যাচ দিয়ে এলেন মুমিনুল-মাহমুদউল্লাহ। ক্রাইস্টচার্চেও তার ব্যতিক্রম হলো না। তামিম-সাকিবরা আবারও পা দিলেন সেই ফাঁদে।

    আবার দুই বছর পর নিউজিল্যান্ডে এলো বাংলাদেশ, এবার সাকিবকে ছাড়াই। মুশফিক চোটের জন্য থেকেও নেই। তবে এই দলের এক মিঠুন আর লিটন ছাড়া বাকি স্পেশালিস্ট ব্যাটসম্যানরা সবাই ছিলেন আগের বার। শর্ট বল আসবে, সেটাও তারা জানতেন। কিন্তু লাভ কী হলো? প্রথম ইনিংসে আবার সেই ওয়াগনারই ঘাতক। একের পর এক শর্ট বল দিয়ে দিলেন, অন্য পাশ থেকে পেলেন সাউদিকে। দুজন একের পর এক শর্ট বল দিয়ে গিলেন, তামিম দেখলেন সতীর্থরা আগুনের দিকে উড়ে আসা আত্মঘাতী পতঙ্গের মতো একে একে ঝাঁপ দিচ্ছেন তাতে। ১২০টি বাউন্সার মেরেছেন প্রথম ইনিংসে কিউই পেসাররা, সেগুলোতে আউট হয়েছেন বাংলাদেশের সাতজন ।

    তবে তামিম ছিলেন ব্যতিক্রম। প্রথম দিনেই ওয়াগনারদের শর্ট বলের কঠিন প্রশ্নটি এড়িয়ে গেছেন চতুর ছাত্রের মতো, শাফল করে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছেন প্রতিপক্ষ বোলারদের। তৃতীয় দিনে আবারও সেই পরীক্ষায় পড়তে হয়েছে, এবারও সেটি এড়িয়েই যাচ্ছিলেন। এবার অবশ্য শেষ রক্ষা হয়নি, ডাক করতে গিয়েই পেরিস্কোপের মতো ব্যাটের আগায় লেগে ক্যাচ উঠে গেছে। আউট হওয়ার ধরনটা একটু অদ্ভুত বলে হয়তো শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন উঠবে তামিমের টেকনিক নিয়ে, তবে তামিমের সেই হতাশা খানিকটা হলেও কেটে যাওয়ার কথা দুই সতীর্থ সৌম্য-মাহমুদউল্লাহর ব্যাটিং দেখে।

    প্রথম দিনের সেঞ্চুরির শেষেই তামিম একটা কথা বলেছিলেন, টেস্টের প্রস্তুতিটা প্রতিটা ব্যাটসম্যানদের নিজের মতো করেই নিতে হবে। সৌম্য-মাহমুদউল্লাহ আজ দেখালেন, একই প্রশ্ন দুইভাবে উত্তর দিয়েই সফল হওয়া যায়। আজ সকাল থেকেই ওয়াগনার শর্ট বল করে যাচ্ছিলেন বোলিং মেশিনের মতো, সাউদিও কম যাচ্ছিলেন না। সৌম্য তামিমের কাছ থেকে দীক্ষা নিয়েই বার বার সরে শাফল করছিলেন, যেন গা বরাবর ধেয়ে আসা বলটা উইকেটের পেছনে খেলতে পারেন। একটু ঝুঁকি যে ছিল না তাও নয়, অন্তত দুবার উইকেটরক্ষক ওয়াটলিংয়ের খুব কাছ ঘেঁষে বেরিয়ে গেছে বল। আবার ঠিক লেংথে পেলে হুক করে ছয়ও মেরেছেন। ওয়াগনারও কিছুটা ক্লান্তি বা হতাশা থেকে বার বার স্লেজিং করে সৌম্যের মনযোগ নড়িয়ে দিতে চেয়েছেন, টিভি ক্যামেরায় বেশ কয়েক বার চোখে পড়েছে তা। তবে সৌম্য সেই প্রলোভনে বোকা বনেননি, বরং সুযোগ পেলেই ওয়াগনারকে সীমানাছাড়া করেছেন।

    আর মাহমুদউল্লাহ সেই প্রশ্ন সমাধান করলেন একটু ক্লাসিক্যাল ধরনে। ওয়াগনারদের শর্ট বলে ডাক করছিলেন বার বার, ঝুঁকি নিচ্ছিলেন না কোনো। তবে জায়গামতো পেলে নিজের প্রিয় পুল শট খেলছিলেন, আজ যেমন দিনের দ্বিতীয় ওভারেই ওয়াগনারকে পুল করে পেয়েছিলেন চার।    ‘ডাক’ করতে গিয়ে কখনো কখনো একটু বেসামালও হয়ে পড়ছিলেন, তার মধ্যে কয়েকটা এমনই কিম্ভুত যে ড্রেসিং রুম থেকে দেখে কোর্টনি ওয়ালশের নিশ্চয় নিজের ব্যাটিংয়ের কথা মনে পড়ে গেছে! তবে ঔষধ খেতে যতই তেতো হোক, তাতে কাজ হওয়া নিয়ে কথা। সৌম্য আর মাহমুদউল্লাহ সেটি সামলাচ্ছিলেন ভালোমতোই।

    তবে এই শর্ট বলেই যে ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারেন কতটা, মাহমুদউল্লাহ সেই প্রমাণ দিয়েছেন সৌম্যের আউটের পর। ওয়াগনারকে এক ওভারেই হুক করে স্কয়্যার লেগের ওপর দিয়ে মারলেন দুই ছয়। বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন, উল্টো দাওয়াই তিনিও দিতে জানেন ভালোমতো। তবে শর্ট বল সামলানোর জন্য অবশ্য ম্যাচ শেষে কৃতিত্ব দিলেন তামিমকেই, ‘তামিমের একটা পয়েন্ট মেনশন করতে চাই, ও খুব ভালো ব্যাট করেছে। একটা পর্যায়ে তামিমকে টানা বাউন্সার দিয়ে যাচ্ছিল ওয়াগনার। আমরা সবাই জানি, তামিম আমাদের মধ্যে পুল-হুক সবচেয়ে ভালো খেলে। কিন্তু ওই সময় ও ভালোভাবে টিকে গেছিল। আমিও ওই জিনিসটা মনে রাখার চেষ্টা করেছি যেন একই কাজ আমিও করতে পারি।’’

     মাহমুদউল্লাহ সৌম্যের চেয়ে তুলনামূলক ভালো প্রস্তুতি নিয়েই এসেছিলেন। এই হ্যামিল্টনেই তাঁর প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি, বিশ্বকাপেও এখানে পেয়েছেন তিন অঙ্কের দেখা। সর্বশেষ জিম্বাবুয়ে আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজেও পেয়েছেন সেঞ্চুরি, সাদা পোশাকে একটু হলেও বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়তো ছিলেন। কিন্তু সৌম্যের তো টেস্ট দলেই থাকার কথা ছিল না! আগের ১২ টেস্টে সেঞ্চুরি ছিল না একটিও, এই টেস্টেই মুশফিক-সাকিবের চোটে পাকেচক্রে সুযোগ পেয়ে যাওয়া। প্রথম ইনিংসে রান পাননি, সৌম্যের সামনে হয়তো এই ইনিংসটা হয়তো ছিল ‘এবার নয়তো কখনোই নয়।’ সেই সুযোগ এর চেয়ে ভালোভাবে বোধ হয় কাজে লাগাতে পারতেন না!

    তবে আপাতত দুজনের এই সেঞ্চুরির চেয়েও আরেকটি বড় বার্তা দিচ্ছে হ্যামিল্টন। পরীক্ষার প্রশ্ন যতো কঠিনই হোক, নিজের মতো প্রস্তুতি নিলে সেটার উত্তর দেওয়া কঠিন কিছু নয়। সেটার জন্য আগের নিজের ধৈর্যটা সবচেয়ে জরুরি, দরকার উইকেটের মূল্য বোঝা। নইলে এক টেস্টে তিন সেঞ্চুরির পরও এমন ইনিংসে ব্যবধানে হারের দাগ সাদা পোশাকে লাগতেই থাকবে!