• ফুটবল, অন্যান্য
  • " />

     

    তাই স্বপ্ন দেখবো বলে...

    ইয়ুর্গেন ক্লপ- লিভারপুলকে চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতানোর পর এবার জিতেছেন ফিফার বর্ষসেরা ছেলেদের কোচের পুরস্কার। সেই ক্লপের কাছে ফুটবল আদতে সিরিয়াস কোনও বিষয় নয়। তবে তিনি স্বপ্ন দেখেন- ফুটবলটা একদিন বদলে দেবে মানুষের জীবন। তার সেই স্বপ্নের কথা তিনি জানিয়েছেন দ্য প্লেয়ারস ট্রিবিউনে প্রকাশিত এক লেখায়। প্যাভিলিয়ন পাঠকদের জন্য অনুবাদ করা হয়েছে সেটি। 


    একটা বিব্রতকর কাহিনী দিয়েই শুরু করি। কারণ আমার কেন জানি মনে হয়, সাধারণ মানুষরা ফুটবলার আর ম্যানেজারদের ঈশ্বরজাতীয় কিছু মনে করেন - যারা কখনো ভুল করে না, হোঁচট খেয়ে পড়েন না। একজন খ্রিষ্টান হিসেবে আমি কেবল একজন ঈশ্বরকেই জানি, আর তার সাথে ফুটবলের কোন যোগাযোগ আছে বলে আমার জানা নেই। সত্যটা কী জানেন, আপনাদের মত আমরাও ব্যর্থ হই, মুখ থুবড়ে পড়ি প্রতিনিয়তই। আর একজন তরুণ ম্যানেজার হিসেবে ব্যর্থ হওয়াটা ছিল আমার নিত্যকার ব্যাপার।

    এটাও তেমনই এক গল্প।

    ২০১১ সাল। ডর্টমুন্ডের খেলা বায়ার্ন মিউনিখের সাথে, তাদের মাঠেই। লিগের খুব গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ ছিল সেটা। মিউনিখের মাঠে আমরা শেষ তাদেরকে হারিয়েছিলাম কবে, বোধহয় বছর বিশেক আগে। স্বাভাবিকভাবেই আমরা সকলেই ম্যাচটার আগে সাঙ্ঘাতিক চাপে ছিলাম। অনেকে হয়তো জানেন না, আমি একজন বিশাল সিনেমা ভক্ত। সিনেমার পর্দা থেকে আমি প্রায়ই অনুপ্রেরণা নেই এবং আমার ছেলেদের প্রেরণা দেওয়ার জন্য আমার প্রথম পছন্দ ছিল অবশ্যই রকি ব্যালবোয়া। আমি মনে করি, রকি ওয়ান, টু, থ্রি, ফোর সিনেমাগুলো সারা বিশ্বের সকল পাবলিক স্কুলগুলোতে দেখানো উচিত, বর্ণপরিচয়ের পাশাপাশি। এই সিনেমাগুলো দেখার পরেও যদি আপনার মনে পাহাড়-পর্বত জয় করার জোশ না জাগে তবে আপনার নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা আছে।

    যাহোক, বায়ার্নের খেলার আগেরদিন আমি আমার সব খেলোয়াড়দের হোটেলে ডাকলাম। পুরো ঘর অন্ধকার। ছেলেরা সব চেয়ারে বসে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি শুরু করলাম সত্যটা দিয়েই, “দেখ, শেষবার যখন ডর্টমুন্ড এখানে এসে মিউনিখের মাঠে জিতেছিল তখন তোমাদের সবার পরণে ডায়াপার ছিল।”

    তারপর আমি রকি ফোর এর কিছু দৃশ্য তাদেরকে দেখানো শুরু করলাম। আইভান ড্রাগোর অনুশীলনের দৃশ্যগুলি আমার খুব পছন্দের। 

    ড্রাগো ট্রেডমিলে দৌড়াচ্ছে, তার শরীরে বিভিন্ন মনিটর লাগানো। বিজ্ঞানীরা কম্পিউটারের স্ক্রিন থেকে সেগুলো দেখে পর্যালোচনা করছেন। “দেখেছ? আইভান ড্রাগো হল বায়ার্ন মিউনিখ। সেরা প্রযুক্তি তাদের দখলে, সেরা সুযোগ সুবিধা তাদের হাতের মুঠোয়! তারা অপ্রতিরোধ্য!”

    এরপর সাইবেরিয়ায় রকির অনুশীলন এর দৃশ্য। রকি তার কেবিনে থেকে পাইন গাছে কুঠার চালাচ্ছে, বরফের মাঝে গাছের গুঁড়ি টেনে নিয়ে যাচ্ছে, পাহাড়ে চড়ছে। “দেখেছ? এই হলাম আমরা, আমরা রকি। আমরা ছোট হতে পারি কিন্তু আমাদের ইচ্ছাশক্তি সবকিছুকে জয় করতে পারে! আমরা অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারি!”

    আমি ছেলেদের দিকে ভালভাবে লক্ষ্য না করে বকেই যাচ্ছিলাম, হঠাৎ আমার টনক নড়ল। কী ব্যাপার? ওদের দিক থেকে কোন প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে না কেন? এতক্ষণে তো ব্যাটাদের জোশে চেয়ারের উপর উঠে বসার কথা, ক্ষ্যাপাটে হয়ে দৌড়ে সাইবেরিয়া চলে যাওয়ার কথা! 

    কিন্তু সবাই চুপচাপ বসে আছে। এবং সবার চোখে একটা শূন্য দৃষ্টি। যেন তাদের মাথায় ঝিঁঝিঁ ডাকছে। 

    তাদের হাবভাব এমন, “এই পাগলটা কী বকছে এসব?” 

    তখন হঠাৎ আমার মনে পড়ল, আরে রকি ফোর কবে মুক্তি পেয়েছিল? ১৯৮০-র দিকে? তখন এদের বয়স কত? 

    আমি একটু ইতস্তত করে শেষমেশ জিজ্ঞাসা করেই বসলাম, “এই, তোমাদের কয়জন রকি ব্যালবোয়াকে চেন, হাত তোল দেখি।”

    দুটো হাত উঠল, সেবাশ্চিয়ান কেল এবং প্যাট্রিক ওমোয়েলা। বাকিরা? উঁহু, না, “স্যরি বস।”

    হাহাহা... চিন্তা করতে পারেন বিষয়টা? আমার পুরো বয়ানটাই ছিল অর্থহীন! আমার খেলোয়াড়দের কেমনটা লেগেছে চিন্তা করে দেখুন, মৌসুমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ, কারো কারো হয়তো তার ক্যারিয়ারেরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলা পরদিন। আর এই পাগলা ম্যানেজার কিনা মিনিট দশেক ধরে সোভিয়েত প্রযুক্তি আর সাইবেরিয়ায় গাছ কাটা নিয়ে বকে যাচ্ছে! কী বিব্রতকর একটা অবস্থা! সেদিন আবার গোড়া থেকে বয়ান শুরু করতে হয়েছিল আমার, এবার রকি-টকি বাদ দিয়ে। 

    আদতে এটাই আসল গল্প, মানুষের জীবনটা এমনই। আমরা প্রায়ই ভুল করি, নিজেদের বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দেই। আপনি হয়ত মনে করছেন, আপনি ইতিহাসের সেরা মোটিভেশনাল স্পিচ দিয়ে আপনার খেলোয়াড়দের তুঙ্গে তুলে দিচ্ছেন, আসলে গোটা বক্তৃতাটাই ছিল হয়ত অর্থহীন। তাতে কী? পরদিন সকালে তবুও আপনার ঘুম থেকে উঠে কাজে যেতে হবে ঠিকই। 

    তবে গল্পটার সবচেয়ে মজার দিকটা কি জানেন? আমার আসলেও মনে নেই ঐ ম্যাচটা আমরা জিতেছিলাম কী হেরেছিলাম। আমার কেবল মনে আছে ২০১১ সালে বায়ার্নকে ৩-১ গোলে হারানোর আগেই হয়ত আমি এই কান্ডটা ঘটিয়েছিলাম, তবে আমি নিশ্চিত নই। ধরে নিচ্ছি অমনই, তাতে হয় কী- গল্পটা বেশ জমে। 

     


    মিউনিখের মাঠে আমরা শেষ তাদেরকে হারিয়েছিলাম কবে, বোধহয় বছর বিশেক হবে


    তবে ফুটবলের এ ব্যাপারটা অনেকেই বোঝেন না। খেলার ফল কেউ মনে রাখে না। আরেক ম্যাচের সঙ্গে সেটা গুলিয়ে যায়। যেটা মনে থাকে সেটা হলো আমার ছেলেরা, আমার জীবনের ঐ সময়টা আর এরকম ছোট ছোট কিছু গল্প, এগুলো আজীবন মনে থাকবে।

    গত রাতে ফিফা আমাকে বর্ষসেরা ছেলেদের কোচের পুরষ্কার দিয়ে বিশাল সম্মান দিয়েছে। তবে মঞ্চে একা একটা ট্রফি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার ব্যাপারটা আমার কখনোই পছন্দের নয়। আমার জীবনে আমার যা কিছু অর্জন সেটা সম্ভব হয়েছে আমার আশেপাশের মানুষদের কারণে। শুধু আমার খেলোয়াড়রা নয়, আমার পরিবার, স্ত্রী-সন্তান আর যারা শুরু থেকে আমার সাথে ছিল সবারই এখানে সমান অবদান। সেই শুরু থেকে, যখন আমি খুবই সাদামাটা একজন সাধারণ লোক ছিলাম। 

    সত্যি বলতে কী, ২০ বছর বয়সী এই আমাকে তখন যদি কেউ বলত যে আমি ক্যারিয়ারে এই অবস্থানে আসবো, আমি হেসেই উড়িয়ে দিতাম। এমনকি ডিলোরিয়েনে চেপে ব্যাক টু দ্য ফিউচার-এর মার্টি ম্যাকফ্লাই এসে বললেও আমি বিশ্বাস করতাম না। 

    ২০ বছর বয়সে হওয়া একটা অভিজ্ঞতা আমার গোটা জীবনটাই বদলে দিয়েছিল। আমি নিজেই তখন বাচ্চা, কিন্তু আবার বাবা হয়ে বসেছি! ওই সময় বাবা হওয়াটা আমার জন্য খুব একটা স্বস্তিকর ছিল না। তখন আমি 'শৌখিন' ফুটবল খেলি আবার দিনের বেলা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করি। টিউশন ফি’র টাকার জন্য তখন আম্যাকে এক মুভি কোম্পানির গুদামে কাজ নিতে হয়েছিল। আজকালকার ছেলেমেয়েরা হয়তো জানে না, তখন কিন্তু এই হালের ডিভিডি ছিল না। আশির দশকে সিনেমা মানেই বড় বড় প্রজেক্টর রিল। ভোর ৬টার দিকে নতুন রিল নেওয়ার জন্য গুদামে ট্রাক আসতো। আমরা বড় বড় মেটাল ক্যানিস্টারে রিলগুলো ভরে ট্রাকে চাপিয়ে দিতাম। মনে মনে চাইতাম যেন সেগুলো বেন হুর বা লরেন্স অফ এরাবিয়া-র মত ৩-৪ ঘন্টার সিনেমার রিল না হয়। কারণ অমন হলেই কাঁধের বারোটা বেজে যেত। 

    প্রতি রাতে ৫ ঘন্টা ঘুমাতে পারতাম তখন। ভোরে উঠে গুদামের কাজ, সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস। ক্লাস শেষে মাঠে অনুশীলন। রাতে বাসায় ফিরে স্ত্রী-সন্তানদের সময় দেওয়ার চেষ্টা করতে করতে ঘুমিয়ে যেতাম। সময়টা সহজ ছিল না। 
     


    সত্যি বলতে কী, ২০ বছর বয়সী এই আমাকে তখন যদি কেউ বলত যে আমি ক্যারিয়ারে এই অবস্থানে আসবো, আমি হেসেই উড়িয়ে দিতাম।


    ওই ছেলেবেলাতেই আমাকে বড় হয়ে যেতে হয়েছিল। বন্ধুরা অনুশীলনের পর বারে যেতে ডাকত, তখন আমার প্রতিটি রক্তকণা যেন জেগে উঠে বলত, "হ্যাঁ, হ্যাঁ আমিও তোমাদের সাথে যেতে চাই!” কিন্তু কোনো উপায় ছিল না। আমার জীবনটা তখন কেবল আমার একার নয়। আপনি ক্লান্ত কিনা, নাকি ফূর্তি করতে চান- সেসব নিয়ে একটা ক্ষুধার্ত বাচ্চা কোন পরোয়া করে না। একটা শিশুকে আপনি পৃথিবীতে এনেছেন, তার চিন্তাটাই তখন আপনার জীবনে প্রধান। ফুটবল-টুটবল তখন কোনো বিষয় নয়।

    প্রায়ই লোকে আমাকে জিজ্ঞাসা করে আমি সবসময় হাসিমুখে কীভাবে থাকি, এমনকি ম্যাচ হেরে গেলেও আমার মুখে কেন হাসি দেখা যায়। ব্যাপারটা হল, আমার প্রথম সন্তানের জন্মের পর আমি বুঝতে পেরেছি- ফুটবল জীবন-মরণ কোনো বিষয় না। আমরা কোনো মহৎ কাজ করছি না, কারো জীবন বাঁচাচ্ছি না। দুঃখ, দুর্দশা আর ঘৃণার জন্ম দেওয়ার জন্য ফুটবল নয়, ফুটবল হল আনন্দ আর অনুপ্রেরণার- বিশেষ করে বাচ্চাদের জন্য।

    আমার খেলোয়াড়দের দেখে আমি শিখেছি এই ছোট্ট গোল বলটা কীভাবে মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে। মো সালাহ, সাদিও মানে, ববি ফিরমিনোর মত আমার অসংখ্য খেলোয়াড়দের জীবনকাহিনীর সবগুলিই অবিশ্বাস্য। তরুণ বয়সে আমি জার্মানিতে যে কঠিন সময় পার করেছি সেটা তাদের জীবন সংগ্রামের কাছে কিছুই না। তাদের জীবনে অনেকবারই এমন মুহূর্ত এসেছে যখন তারা হাল ছেড়ে দিতে পারতো, কিন্তু দেয়নি। তারা কেউ ঈশ্বর নয়, তারা সাধারণ মানুষ, যারা নিজেদের স্বপ্নের ওপর কখনো আস্থা হারায়নি।

    আমার মনে হয় এই খেলাটার ৯৮ শতাংশই হল ব্যর্থতাকে মেনে নিয়ে ফুটবল থেকে আনন্দকে খুঁজে নিতে শেখা, ব্যর্থতার পরও পরদিন আবার ফুটবল নিয়ে মাঠে নামা। 

    ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার ব্যাপারটা শুরু থেকেই আমার ভেতর ছিল। আমার প্রথম ভুলটার কথা তাই আমি কখনোই ভুলব না।

    বাকি অংশ পড়ুন