• বাংলাদেশ ক্রিকেটারদের ধর্মঘট
  • " />

     

    যে অপেক্ষা 'শেষ হইয়াও হইলো না শেষ'

    আগামীকাল নাকি কখনও আসে না। অর্থ হলো, আজ যেটি, সেটিই তো গতকাল ছিল আগামীকাল রূপে। আগামীকাল বলতে আলাদা কিছু নেই তাই। আবার কেউ বলেন, আগামীকাল আসে ঠিকই, তবে সেটি বড্ড দেরি করে। ততদিনে আগামীকালের তাৎপর্যটা আর থাকে না।  

    ****

    বৃষ্টি আর জ্যাম ঠেলে গন্তব্য মিরপুরের শের-ই-বাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়াম, বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ডের হেডকোয়ার্টার।  

    বৃষ্টিশেষে সোনালী আকাশ নেই, তবে টেকনিক্যাল থেকে মিরপুরে ১ নম্বরের দিকে রাস্তায় দুই রকমের চিত্র- একদিকে ভেজা, আরেকদিক একদম শুকনো। ওপাশের বৃষ্টি এপাশে আসেনি এখনও, শুধু যানগুলি তাদের চাকা করে বয়ে এনেছে বৃষ্টির সিক্ততা। বাংলাদেশ ক্রিকেটে এখন দুই পক্ষ- একদিকে বোর্ড, আরেকদিকে ক্রিকেটাররা। দুপুর ১২টা ছুঁইছুঁই। 

    এর আগেই বিসিবির প্রধান নির্বাহী মিরপুরে বলে গেছেন, তারা আলোচনা করতে চান ক্রিকেটারদের সঙ্গে। বিকেল ৫টার দিকে বোর্ডকে পাবেন ক্রিকেটাররা, সেটি বোর্ড বা যে কোনও জায়গায়। তামিম ইকবালের সঙ্গে কথা হয়েছে তার, তাকে সেটি জানিয়েও দিয়েছেন তারা। টেকনিক্যালের বৃষ্টিটা এরপর ঝুম করে নামে মিরপুরে। কিছু করার না থাকলে চা খেতে যান, নিজেদের মধ্যে আলোচনা করুন। সামনে এক দীর্ঘ দিন। 

    বিকাল ৩টা। বিসিবির হেডকোয়ার্টারে এলেন বোর্ড প্রেসিডেন্ট নাজমুল হাসান পাপন এবং বিসিবির পরিচালক ও কোয়াব সভাপতি নাইমুর রহমান দুর্জয়। গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন তারা। বিসিবি প্রেসিডেন্টের মুখাবয়ব দেখে অবশ্য বুঝার উপায় নেই- আদতে কী ঘটছে। অপেক্ষা বাড়ছে।  

    ৫টা কি তবে ডেডলাইন ক্রিকেটারদের? এর মাঝে যদি তারা না আসেন, তাহলে পদক্ষেপ কী হবে বোর্ডের? সঙ্কটই বা কাটবে কীভাবে? আরেক বোর্ড পরিচালক জালাল ইউনুস অবশ্য এমন টাইমফ্রেম বেঁধে দিলেন না। তারা সন্ধ্যার পরও অপেক্ষা করবেন বলে জানালেন। 
     


    ক্রিকেটারদের দাবির বেশিরভাগই ছিল ঘরোয়া ক্রিকেট-কেন্দ্রিক/ওয়ালটন


    দুপুর গড়িয়ে গেছে ততক্ষণে। মিরপুরের বৃষ্টি থেমেছে আগেই, ক্রিকেটারদের দিক থেকে কিছু শোনা যায়নি। কেউ আসেননিও। সাড়ে চারটার দিকে শোনা গেল, গুলশানের একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলনের জন্য ডেকেছেন তারা। সেদিকে তারা মিটিংয়ে বসেছেন, সেটা অবশ্য শোনা যাচ্ছিল আগে থেকেই। 

    এবার ব্যক্তিগত সঙ্কটের পালা। মিরপুর, নাকি গুলশান? দুই পক্ষের অবস্থান আগে থেকেই আলাদা ছিল, এবার সেটি বেশ একটা দূরত্ব দিয়ে ভাগ হলো। গুলশান থেকে ক্রিকেটাররা আদৌ কি আসবেন মিরপুরে? বোর্ডই বা কী ভাবছে? ঘটনা আদতে কোথায় ঘটবে, এখানে না ওখানে? সব ঝেড়ে গুলশানের দিকে যাত্রা। 

    ঢাকার সান্ধ্যকালীন জ্যাম ঠেলে গুলশান পৌঁছানো গেল যখন, নির্ধারিত সময়ের কয়েক মিনিট বাকি ক্রিকেটারদের সংবাদ সম্মেলনের। তবে শীঘ্রই তেমন কিছুর সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। আরেক দফা অপেক্ষা এবার। গুলশানের সেই হোটেলের সামনের রাস্তায় সারি সারি গাড়ি-- জটলাও বেড়ে যাচ্ছে উৎসাহী মানুষের।


    আরও পড়ুন- ক্রিকেটে অচলায়তনের তিন দিনের টাইমলাইন


    আধা ঘন্টা পর শুরু হলো সে সম্মেলন। হই-হট্টগোল পেরিয়ে সেখানে গিয়ে দেখা গেল, সামনে পেতে রাখা চেয়ারের সারিতে আগে থেকেই বসে আছেন অনেকেই। হুট করে অনেকে ধন্দে পড়ে গেলেন, তারা তো সাংবাদিক নন! আদতে তারা ক্রিকেটার। সোমবার একাডেমি মাঠে যারা ছিলেন, তাদের চেয়ে সংখ্যায় অনেক বেশি এবার তারা। সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম, মাহমুদউল্লাহরা মঞ্চে নেই, সেখানে দুজন ‘মুখপাত্র’-এর একপাশে আব্দুর রাজ্জাক, ইমরুল কায়েস, জুনাইদ সিদ্দিকীরা, অন্যপাশে তুষার ইমরান, অলক কাপালি, সোহরাওয়ার্দি শুভ, ইলিয়াস সানিরা। সে মুখপাত্র ক্রিকেট-সংশ্লিষ্ট কেউ নন, বরং আইনজীবী। 

    কয়েক দফা হট্টগোল, হই হই-এর পর নতুন দুই দফা দাবি এলো ক্রিকেটারদের পক্ষ থেকে। আগের দাবিগুলি ব্যাখ্যা করা হলো, এবার সাংবাদিকদের দেওয়া হলো তাদের ১৩ দফা দাবির লিখিত রূপও- ‘থারটিন রিজনস হোয়াই’। তবে তারা বিসিবিতে কখন যাবেন, সে ব্যাপারে নির্দিষ্ট করে কিছু বললেন না। 

     


    সাকিব সামনে এসে বললেন দুটি কথা। এক- বিসিবি প্রধান আগেরদিন তাদেরকে নিয়ে ‘যেভাবে’ কথা বলেছেন, তারা তেমন কিছু বলবেন না, তাদের প্রতি এখনও সম্মান আছে তাদের। দুই- বিসিবিতে কখন যাবেন, সেটি তারা জানাবেন। তবে এজন্য তাদেরকে ‘প্রাইভেসি’ দিতে হবে আবার। ক্রিকেটারদের সবার মোবাইল ফোন তখন এক জায়গায় স্তুপ করা, শুধু রুদ্ধদ্বার বৈঠকের চেয়েও বেশি কিছু করেছেন তারা। 

    তাদের আরেক দফা মিটিং চললো আধাঘন্টার মতো। এরপরই তারা রওনা দিলেন মিরপুরের দিকে। রাত ৮টা ছুঁইছুঁই তখন। শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে তারা এসে পৌঁছানো শুরু করলেন ৯টার দিক করে। একে একে এলেন সবাই। তামিম-সাকিব-মাহমুদউল্লাহ। কেউ নিজের গাড়িতে, কেউ মোটরবাইকে, কেউবা উবার বা অন্য কোনও রাইড-শেয়ারিংয়ে। একজন করে নামেন, আর ক্যামেরার ফ্ল্যাশ জ্বলজ্বল করে তাদের দিক তাক করে। 

    এবং অপেক্ষা। এ বৈঠক নির্ধারণ করে দিতে পারে বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভবিষ্যত গতিপথ। 

    প্রায় দেড় ঘন্টা চললো সে বৈঠক। এরপর জানানো হলো, তারা প্রস্তুত। বোর্ড পরিচালকদের কনফারেন্স রুম মুহুর্তেই ভরে উঠলো। আরেকদফা হট্টগোল দমিয়ে কথা বলা শুরু করলেন বোর্ড প্রেসিডেন্ট। রাত ১১টা পেরিয়ে গেছে তখন। 

    আপাতত দুইটি দফা ছাড়া বাকিগুলি ‘মেনে’ নিয়েছে বোর্ড। সাকিব ‘আলোচনায় খুশি’, তবে সন্তুষ্ট হবেন কিনা সেটা নির্ধারণ করবেন তাদের দাবিগুলির প্রয়োগ দেখে। এই মিডিয়া ব্রিফিংয়ের আগে-পরে বেরিয়ে আসতে শুরু করলেন ক্রিকেটাররা। তাদের চোখে-মুখে খুব বেশি স্বস্তি নেই, এই আলোচনার ফলাফল আদতে তাদের জন্য কতোখানি কী বয়ে আনবে, নিশ্চিত নন তারা। কেউ আছেন অপেক্ষায়। মেনে-তো-নিল-কিছু-দেখা-যাক-সামনে-কী-হয় ধরনের অপেক্ষা। যে অপেক্ষায় সারাদিন ছিলেন সবাই, সেটিই হাজির এবার আরেক রূপে।

    ক্রিকেটারদের ১৩ দফা দাবির বেশিরভাগই ছিল ঘরোয়া ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট, এদিন এসেছিলেন প্রথম বিভাগের বেশ কয়েকজন ক্রিকেটারও। প্রথম শ্রেণির ম্যাচ ফির দাবি ছিল তাদের ১ লাখ টাকা করার, সেটি আদতে কতখানি বাড়লো নিশ্চিত নয়। প্রাত্যহিক খরচ বা যাতায়াতের ক্ষেত্রে কী, নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি সেসব। বোর্ড প্রেসিডেন্ট বলেছেন, ‘সেসব দুই-তিন দিনের ভেতরই’ হয়ে যাবে। 

    সেই সংবাদ সম্মেলন থেকে বেরিয়ে ক্রিকেটাররা এরপর গেলেন শের-ই-বাংলার ড্রেসিংরুমে। সেখানেও প্রায় ঘন্টাখানেক চললো তাদের আলোচনা। এরপর যখন তারা বেরিয়ে আসতে শুরু করলেন, অফিশিয়ালি আরেকটি নতুন দিন শুরু হয়ে গেছে। সাকিব বের হলেন, মাহমুদউল্লাহ এলেন। নুরুল হাসান সোহান, তুষার ইমরান, আব্দুর রাজ্জাক, আরাফাত সানি, ইলিয়াস সানি-- সবাই। তিন দিনের অচলায়তন আপাতত কেটেছে, তবে এই তিন দিনে ক্রিকেটাররা কী পেলেন-- সে প্রশ্নের উত্তর পেতে সময় লাগবে আরও। প্রায় ১২ ঘন্টা পরও তাই অপেক্ষা কেটেও কাটলো না। আপাতত তারা পিছিয়ে যাওয়া জাতীয় লিগের তৃতীয় রাউন্ড খেলবেন। জাতীয় দলের ক্যাম্পে যোগ দেবেন। 

    আর হয়তো খুঁজবেন উত্তর, এই প্রশ্নটার-- বাংলাদেশের ক্রিকেটে সেই ‘আগামীকাল’ কি আসবে, বড্ড দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই?