• সিরি আ
  • " />

     

    নাপোলির নতুন ম্যারাডোনা

    “ অ্যান্ড হি মিসেস, দ্যা গেম, দ্যা গোল, দ্যা কাপ... অ্যাজ আর্জেন্টিনা কলাপসেস, উই আর গোয়িং টু দা এক্সট্রা টাইম ”

    ৯০ মিনিটের খেলা শেষের বাঁশি বাঁজার আগে আর্জেন্টিনার শেষ আক্রমণটি এভাবেই বর্ণনা করেছিলেন ধারাভাষ্যকার। লাভেজ্জির ক্রসটা শুধু পায়ে লাগানোই বাকি ছিল! ফাঁকা বারেও গোল দিতে ব্যর্থ হিগুয়েন। মারলেন সাইডনেটে। সেই এক্সট্রা টাইমও গোলশূন্য থাকলে পরে টাইব্রেকারে চিলির কাছে হেরে কোপা আমেরিকার ঘরে তোলার স্বপ্নটাও বিসর্জন দিয়ে আসতে হয়েছিল মেসিদের।   

    আর ঠিক তাঁর এক বছর আগে, জুলাই ১৩ এর রিও ডি জেনিরোতে ভঙ্গ হয়েছিলো ২৮ বছর পর বিশ্বকাপ ঘরে তোলার স্বপ্ন। ক্রুসের দেয়া ভুল ব্যাক পাস পেয়েও নয়ারের সাথে ওয়ান-অ্যান্ড-ওয়ান সিচুয়েশনে গোল করতে সেবারও ব্যর্থ হয়েছিলেন হিগুয়েন। ফাইনালে টনি ক্রুস হয়ে যেতে পারতেন খলনায়ক। অথচ তিনিই চুমু খেলেন বিশ্বকাপে! আর হিগুয়েনের গোল করতে না পারাটা আজন্ম আফসোস হয়ে থাকলো আর্জেন্টাইনদের জন্য।

    দলে মেসির মতো খেলোয়াড় থাকায় হিগুয়েন অবশ্য নিজেকে ভাগ্যবান ভাবতে পারেন। দুই ফাইনালে হারের আঁচ মেসিকে অতিক্রম করে হিগুয়েনের গায়ে লেগেছে কমই। পর-পর দুই ফাইনালে এমন ট্র্যাজিক ঘটনার জন্ম দিয়ে আর্জেন্টিনা দল থেকেও বাদ পড়েছিলেন। অথচ সেই ‘অপয়া’ হিগুয়েনই এখন জবাব দিচ্ছেন মাঠের খেলা দিয়ে। একের পর এক গোল করে এরই মধ্যে সবার আগে ২০ গোলের দাগ ছাড়িয়েছেন এই আর্জেন্টাইন।  

     

    হিগুয়েনের কীর্তিটা সিরি-আ তে বলেই সেটি আরও বেশি অবিশ্বাস্য লাগছে। এমনিতেই ইতালিয়ান লিগে গোল মুড়িমুড়কির মতো পাওয়া যায় না। গত দুই মৌসুমে যে তিন জন সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন,  মাউরো ইইকার্দি, লুকা টনি ও কার্লোস তেভেজ, তারা করেছিলেন ২২ গোল করে। অথচ জানুয়ারির মধ্যেই হিগুয়েনের ২১ গোল হয়ে গেছে। সিরি-আ তে সর্বশেষ এক মৌসুমে ৩০ গোলের বেশি করেছিলেন লুকা টনি, সেই ২০০৬ সালে। সেবার তার হাতে গোল্ডেন বুট উঠেছিল। এবার সেটি দেখতে পাচ্ছেন হিগুয়েন। এমনকি এবার ৮৬ বছরের পুরনো একটি রেকর্ডও ভেঙে দিতে পারেন। ১৯২৮-২৯ মৌসুমে ৩৬ গোল করেছিলেন জিনো রসেত্তি, সেটিই হয়ে আছে সিরি-আ তে এক মৌসুমে সবচেয়ে বেশি গোলের রেকর্ড। হিগুয়েনের কাছে সেটিও এখন মোটেই নিরাপদ মনে হচ্ছে না!

     



     

    সিরি আ’তে তো বটেই, মেসি-রোনালদো সবাইকে ছাপিয়ে এই মূহুর্তে ইউরোপের যেকোনো লীগের সর্বোচ্চ গোল স্কোরার গঞ্জালো হিগুয়েন! লীগে ২১ ম্যাচে ২১ গোল করে গোল্ডেন শু ট্রফি জেতার দৌড়েও সবার চেয়ে এগিয়ে আছেন সাবেক এই রিয়াল মাদ্রিদ স্ট্রাইকার! ১৮ গোল নিয়ে ডর্টমুন্ডের অবেমিয়াং আছেন দ্বিতীয়তে। আর সিরি আ’তে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় হিগুয়েনের ধারেকাছেও নেই অন্য কেউ। আরেক আর্জেন্টাইন পাবলো দিবালা ১২ গোল করে সিরি আ'র সর্বোচ্চ গোলদাতা হবার তালিকায় হিগুয়েনের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী।

    মাত্র ক’দিন আগে হারিয়ে যেতে বসা হিগুয়েন নিজেকে ফিরে পেয়েছেন দারুণ ছন্দে। সব প্রতিযোগিতায় ২৬ ম্যাচে ২৩ গোলের মালিকের ওপর এরই মধ্যে নজর পড়েছে ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোরও। এদের মধ্যে শোনা যাচ্ছে বায়ার্ন মিউনিখের নামও। হিগুয়েনের সাফল্যে তাঁর ক্লাব নাপোলিও উঠে এসেছে সিরি আ’র পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে। নিজের ক্যারিয়ারের শ্রী তো বদলাচ্ছেনই , সাথে গত মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লীগের টিকেট কাটতে ব্যর্থ হওয়া নাপোলির চেহারাও বদলে দিয়েছেন হিগুয়েন!

     

    অথচ গত মৌসুমেই মুদ্রার একেবারে উলটো দিকটা দেখতে হয়েছে হিগুয়েনকে। লাৎসিওর সঙ্গে সিরি আ'র ম্যাচটা ছিল চ্যাম্পিয়নস লিগে টিকিট পাওয়ার জন্য এক অর্থে ফাইনাল। গতবছর মে মাসের ওই ম্যাচে ২-২ গোলে খেলা যখন সমতায়, পেনাল্টি থেকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল নাপোলি। কিন্তু হিগুয়েন সেটা মেরে দেন বারের ওপর দিয়ে। তার আগে নাপোলির হয়ে দুইটি গোল তিনিই করেছিলেন, ওই গোলটা করলে হ্যাটট্রিক হয়ে যেত। পরে ওই ম্যাচটা ৪-২ গোলে জিতে যায় লাৎসিও, নাপোলি থেকে খালি হাতেই বিদায় নেন রাফায়েল বেনিতেজ। শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়নস লিগেও আর খেলা হয়নি। দায়টা যে তাঁর, সেটা বোধ হয় হিগুয়েন মনে রেখেছিলেন। সেজন্যই কি এবার সব "সুদে আসলে" শোধ করতে উঠেপড়ে লেগেছেন ? 


    ১৯৮৭ ও ১৯৯০ সালে যে দু’বার লীগ জিতেছিলো নাপোলি, ম্যারাডোনাই ছিলেন তার নেপথ্যের নায়ক। ম্যারাডোনার সাথে হিগুয়েনের তুলনা বাড়াবাড়ি হয়ে গেলেও, ২৫ বছর পর আরো এক আর্জেন্টাইনে ভর করেই স্কুডেট্টো ঘরে তোলার স্বপ্ন দেখছে নাপোলি। ম্যারাডোনার বিদায়ের পর একসময় হারিয়েই গিয়েছিলো দলটি। ২০০৬-২০০৭ মৌসুমে আবারো সিরি আ’তে ফিরেই নাপোলি সেবার দলে ভিড়িয়েছিলো আরেক আর্জেন্টাইন লাভেজ্জিকে। এরপর থেকে নিয়মিতই সিরি আ’তে খেলতে থাকা নাপোলির পুনর্জন্মও তারপর থেকেই। আর্জেন্টাইনদের সাথে নাপোলির সম্পর্কটাকে তাই তাৎপর্যপূর্ণই বলা চলে।

     

      

     

    খারাপ সময় পেছনে ফেলে সময়মতোই হিগুয়েনের ফর্মে ফেরা নাপোলির জন্য সুংসবাদ তো বটেই। আর্জেন্টিনায় বরাবরই মেসি-আগুয়েরোর ছায়ায় ঢাকা পড়া এই স্ট্রাইকারের জাতীয় দলের হয়ে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ারও এক সুযোগ।

    রিয়াল মাদ্রিদের মতো ক্লাব থেকে নাপোলিতে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্তে ম্যারাডোনার পরামর্শের ভূমিকা বলার অপেক্ষা রাখে না। নাপোলির হয়ে প্রথম মৌসুমেই চ্যাম্পিয়ন্স লীগের গ্রুপ পর্ব থেকে বাদ পড়ে চোখের জলে ভেসেছিলেন হিগুয়েন। নেপলসের এই ক্লাবের প্রতি হিগুয়েনের অন্যরকম টানটা সেদিনই প্রমাণ হয়েছিল। নাপোলির সমর্থকেরাও ভালোবেসেছে তাঁদের এল পিপিতাকে। নিজের ক্যারিয়ারের প্রায় পুরোটা সময় মেসি-রোনালদোতে ঢাকা পরা হিগুয়েন এই ফর্ম ধরে রেখে ২৫ বছর পর নাপোলিকে সিরি আ’র ট্রফিটা এনে দিতে পারলে নাপোলির নতুন যুগের ম্যারাডোনা হবেন তিনিই।

     

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন