• সিরি আ
  • " />

     

    জুভেন্টাস মানেই ফিরে আসা

    ২০১৪/১৫ মৌসুমের শেষটা হয়েছিল চ্যাম্পিয়নস লিগে বার্সেলোনার কাছে হেরে। সিরি আ আর কোপা ইতালিয়া জিতে ঐ মৌসুমে "ডাবল" নিশ্চিত করা জুভেন্টাসের চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের জন্য ২০ বছরের অপেক্ষাটা দীর্ঘায়িত হয়েছিল আরও। চ্যাম্পিয়নস লিগ না জিততে পারার আক্ষেপটা থাকলেও সিরি আ আর কোপা ইতালিয়া জিতে নিজেদের ইতিহাসের অন্যতম সফল এক মৌসুম শেষ করে তুরিনের ওল্ড লেডিরা। এরপর নতুন মৌসুম শুরুর আগে একে একে দল থেকে বিদায় নিলেন পিরলো, তেভেজ, ভিদালরা।
     

     


    গত মৌসুমের শেষ হয়েছিলো বিষাদে, ঠিক সেখান থেকেই নতুন মৌসুম শুরু রেকর্ড ৩১ বার সিরি আ জয়ীদের! লিগের প্রথম দুই ম্যাচেই হার। প্রথম ৬ ম্যাচে জয় মাত্র একটিতে। গত মৌসুমের জয়ীরা তখন পয়েন্ট তালিকার ১৫ তে। জুভেন্টাসের দুর্গতির শেষ সেখানেও না। সিরি আ তে প্রথম ১০ ম্যাচের ৩টিতে হার, ৪টি ড্র আর জয় মাত্র ৩ টিতে। যে তিনজনের ওপর ভর করে জুভেন্টাসের আগের মৌসুমে এতো সাফল্য, সেই মাঝমাঠের জাদুকর পিরলো তখন নিউইয়র্ক সিটিতে, গত মৌসুমে ২৯ গোল করা তেভেজ বোকা জুনিয়র্সে, আর ভিদাল সামলাচ্ছেন বায়ার্নের মাঝ মাঠ। জুভেন্টাসের ঘোরতর বিপদে সাহায্য করবেন কে? অবনমন এলাকার আশেপাশে ঘুরঘুর করা জুভেন্টাস পরের মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে, সে আশাও তখন একটু-একটু করে ম্লান হতে শুরু করেছিলো রেকর্ড ৩১ বার সিরি আ জয়ী সমর্থকদের মন থেকে।


     

     

    দলবদলের মৌসুমে নামী-দামী সব খেলোয়াড় ছেড়ে জুভেন্টাস দলে ভিড়িয়েছিল কিছু নতুন মুখ। হারনানেস, কুয়াদ্রাদো আর মাঞ্জুকিচের মতো খেলোয়াড়েরাও ছিলেন সে তালিকায়। আর ছিলেন নতুন মুখ দিবালা! নতুন মুখ না 'নতুন মেসি' তা নিয়ে আবার জল্পনার কল্পনার শেষ ছিল না ইতালিয়ান মিডিয়ায়। দলের আমূল এই পরিবর্তন যে খেলায় প্রভাব ফেলবে তা অনুমিতই ছিল। তবু শুরুর ধাক্কাটা যে এতো ভয়াবহ হবে তা অনুমান করেনি কেউই।

    তবে ক্লাবের নামটা যখন জুভেন্টাস, তখন ঝড়-ঝঞ্ঝা তাকে বন্দী করে কীভাবে! ঘুরে দাঁড়ানোই যে দলের মূলমন্ত্র, তাদের জন্য 'অসম্ভব' বলে কোন শব্দ নেই। এক অর্থে অলৌকিক এক কীর্তিই করে দেখিয়েছে অ্যালেগ্রির জুভেন্টাস। সিরি আ'তে টানা ১৪ ম্যাচ জিতে নতুন রেকর্ড গড়েছে জুভে। নিজেদের ক্লাবের ইতিহাসে এটিই একটানা ম্যাচ জয়ের সর্বোচ্চ রেকর্ড। গত সপ্তাহেই নিজেদের আগের টানা ১২ ম্যাচ জয়ের রেকর্ড ভেঙেছে তুরিনের ওল্ড লেডিরা। এরপর জেনোয়াকে হারিয়ে করেছে নতুন রেকর্ড। সবশেষ গত রবিবার ফ্রসিনোনকে হারিয়ে এখন পর্যন্ত টানা ১৪ ম্যাচ জিতেছে জুভেন্টাস। সামনে এখন শুধু ২০০৬-০৭ সালে ইন্টার মিলানের একটানা ১৭ ম্যাচ জয়ের রেকর্ড। সিরি আ'র সবচেয়ে বেশী ধারাবাহিক ম্যাচ জয়ের রেকর্ডটা ইন্টার মিলানেরই। শনিবার নাপোলিকে হারাতে পারলে ইন্টারের রেকর্ড ভাঙার পথে বড় এক ধাপ পেরুবে বিয়াঙ্কোনেরিরা। শুধু চ্যাম্পিয়নস লিগের টিকেট কেটেই শান্ত না থেকে এক নম্বরে থাকা নাপোলিকেও চোখ রাঙাচ্ছে জুভেন্টাস। নাপোলির সঙ্গে ব্যবধানটা মাত্র ২ পয়েন্টের। 

     

    আমি জানি জুভেন্টাস ফিরে আসবে, পয়েন্ট তালিকার শীর্ষে থাকতে লড়াইও চালিয়ে যাবে। স্কুডেট্টো জিতবে কিনা বলতে পারছি না, তবে আমাদের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।  ”  
     

    -সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে নাপোলির কাছে ২-১ এ হারার পর  কথা গুলো বলেছিলেন অ্যালেগ্রি। লিগে ষষ্ঠ ম্যাচে এটি ছিল জুভেন্টাসের ৩য় হার। আগের মৌসুমে  জুভেন্টাসকে এনে দিয়েছিলেন 'ডাবল', নিয়ে গিয়েছিলেন চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে। নাপোলির বিপক্ষে হারের পর থেকে ক্রমেই চাপ বাড়ছিল অ্যালেগ্রির উপর। 
     

    “ খেলাটি ভালোই হবে, যদিও স্কুডেট্টো নির্ধারনী ম্যাচ হবে বলে আমার মনে হয় না, কিন্তু আমার খেলোয়াড়রা প্রস্তুত। আমাদের কিছু ভালো খেলোয়াড় আছে যাদের নিয়ে নাপোলির দুশ্চিন্তাই হবার কথা। ”
     

    -  গত রবিবার ফ্রসিনোনকে ২-০ তে হারিয়ে সিরি আ'তে টানা ১৪ জয়ের পর আগামী শনিবার নাপোলির বিপক্ষে  পরের ম্যাচটা কেমন হবে প্রশ্নের জবাবে বলছিলেন মাসিমিলয়ানো অ্যালেগ্রি।   

     

     

    এই মৌসুমে আরেকবার নাপোলির মুখোমুখি হবার আগেই নিজের দেয়া কথাগুলো রেখেছেন অ্যালেগ্রি। শীর্ষে থাকা নাপোলির চেয়ে মাত্র ২ পয়েন্ট পিছিয়ে থেকে শনিবার পয়েন্ট তালিকার শীর্ষে ওঠার লড়াইয়ে নামছে জুভেন্টাস। টানা ১৫ ম্যাচ জয়ের রেকর্ডটাও কি হাতছানি দিচ্ছে না অ্যালেগ্রির শিষ্যদের?

    ২৮ অক্টোবরে সাসুওলোর কাছে শেষবার সিরি আ’তে হেরেছিল জুভেন্টাস। তারপর থেকেই ছুটে চলছে জয়রথ। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে কোন জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় ডুবতে বসা একদলকে এমন সাফল্য এনে দেয়া যায়? আর যাই হোক, সৌভাগ্যের ছোঁয়ায় টানা ১৪ ম্যাচ জেতা বোধ হয় সিনেমার পান্ডুলিপিতেও সম্ভব নয়।



     

    জুভেন্টাসের এই সাফল্যের কৃতিত্ব আসলে পুরোটাই দিতে হবে ম্যানেজার মাসিমিলিয়ানো অ্যালেগ্রিকে। প্রথম দশ ম্যাচের মাত্র ৩ টিতে জিতে আত্মবিশ্বাসের তলানীতে চলে যাওয়া একটা দলকে শিরোপা স্বপ্ন দেখাচ্ছেন এই ইতালিয়ান। নিজের সিদ্ধান্তে দৃঢ় থেকে অ্যালেগ্রির দূরদর্শী চিন্তা-ভাবনাই জুভেন্টাসের সাফল্যের রহস্য।   

     
    মৌসুমের শুরুতে আর্জেন্টাইন ‘বিস্ময় বালক’ দিবালাকে কম সময় খেলানোর জন্য গণম্যাধ্যমের কটাক্ষ শুনতে হয়েছে তাঁকে। তবু নিজের যায়গায় দৃঢ় ছিলেন অ্যালেগ্রি। পালের্মো থেকে হুট করে জুভেন্টাসের মতো বড় এক ক্লাবে আসা তরুণ এক খেলোয়াড়ের যে মানিয়ে নিতে সময় লাগবে তা জানা ছিল তাঁর। সঠিক সময়ের অপেক্ষাতেই ছিলেন হয়তো। দিবালাও হতাশ করেননি কোচকে। প্রথম একাদশে সুযোগ পাবার পর থেকেই জুভেন্টাসের গোল দেবার দায়িত্ব যেন নিজের কাঁধেই তুলে নিয়েছেন এই ২২ বছর বয়সী স্ট্রাইকার। ১৯ ম্যাচে ১৩ গোল করেছেন। সিরি আ’র সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় আছেন স্বদেশী হিগুয়েনের ঠিক পেছনে, দুইয়ে। গোল করার পাশাপাশি গোল করাতেও সমান পটু এই আর্জেন্টাইন। ১৩ গোলের সাথে ৮ অ্যাসিস্টে তেভেজের না থাকাটাও ভুলিয়ে দিচ্ছেন জুভেন্টাস সমর্থকদের।

     



     

    মৌসুমের শুরুতে জুভেন্টাস সমর্থকদের চোখের কাঁটা হয়ে গিয়েছিলো যে ৩-৫-২ ফরমেশন, সেটিই এখন তুরুপের তাস হয়ে দাঁড়িয়েছে তুরিনের ক্লাবটির! ৪-৩-২-১ ফরমেশনের এই যুগেও ৩-৫-২ এর মতো সেকেলে ফরমেশনে খেলছে জুভেন্টাস। শুধু কি খেলছে? এই ফরমেশনেই এক-এক করে ম্যাচ জিতে এখন পয়েন্ট টেবিলের দুইয়ে তারাই। অবশ্য শুরুটা এতোটা সহজ ছিল অ্যালেগ্রির জন্য। মৌসুম শুরুর দুই ম্যাচ ৩-৫-২ ফরমেশনে খেলে খালি হাতে ফেরার পর বদলাতে হয়েছিলো তাও।

     

    প্রথম দশ ম্যাচেই ৩/৪ ধরনের ফরমেশনে খেলিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষাটা ভালোই চালিয়েছিলেন অ্যালেগ্রি। তাতে কয়েকটি জয় আসলেও পুরোনো সেই জুভেন্টাসকে যেন কিছুতেই ফিরিয়ে আনা যাচ্ছিল না। সাসুলোর বিপক্ষে ঐ হারের পর টানা দুই ম্যাচ জিতে তখন একটু-একটু করে খেলোয়াড়দের মধ্যে ফিরে আসছিল হারানো আত্মবিশ্বাসটা। এরপরই থেকেই পুরোনো ৩-৫-২ এ ফিরে যান অ্যালেগ্রি। দুই উইংব্যাক কাজে লাগিয়ে আক্রমণে ধার বাড়ায় জুভেন্টাস। কখনও এভ্রা-লিচস্টেইনার জুটি, আবার কখনও সান্দ্রো-কুয়াদ্রাদো জুটি সামলেছেন জুভেন্টাসের দুই উইং। মাঝমাঠে নতুনদের সাথে বোঝাপড়াটাও তখন ভালো পগবার। গোল করছেন দিবালা-মোরাতারা। ধীরে-ধীরে ফিরে আসে চিরচেনা সেই জুভেন্টাসও!

     

    নতুন এই ফরমেশনের সাথে কুয়াদ্রাদোর মানিয়ে  নিতে প্রথম দিকে সমস্যা হলেও, কিছুদিন পরই রাইট উইংগার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন অ্যালেগ্রির একাদশে। ৮ ম্যাচে ২ গোল আর ৩টি অ্যাসিস্ট করে সান্দ্রোও নিজের জায়গাটা পাকা করেছেন দলে।  তবে বড় ম্যাচ গুলোয় বরাবরই অ্যালেগ্রি ভরসা রেখেছেন অভিজ্ঞ দুই উইংব্যাক এভ্রা ও লিচস্টেইনারের উপর। দুই উইং দিয়ে আক্রমণের সাথে, রক্ষণের কাজটাও সাফল্যের সাথেই করেছেন এই জুটি। ফলাফল- রোমা, মিলান, ইন্টারের মতো দলের বিপক্ষে জুভেন্টাসকে গোল হজম করতে হয়নি একটিও!



    দিবালা তো আছেনই, সাথে গোল করছেন মাঞ্জুকিচ, মোরাতাও। মাঝমাঠের সবচেয়ে বড় ভরসা পগবাও প্রতিপক্ষের ভীতির কারণ হয়েই আছেন। সাথে আছেন বনুচ্চি, মারকিসিও। দলকে পেছন থেকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য বুফন, কিয়েলিনিরা তো আছেনই। আর এই দলটা নিয়েই আবারো সিরি-আ জয়ের স্বপ্ন দেখছেন অ্যালেগ্রি।



    পরের সপ্তাহে নাপোলিকে হারাতে পারলে সে লক্ষ্যে বড় এক ধাপ এগিয়ে যাবে জুভেন্টাস। আর সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে শেষ টানা পাঁচবার স্কুডেট্টো জিতেছিল তুরিনের ওল্ড লেডিরা। এই মৌসুমে অমন বাজে শুরুর পরও যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে বিয়াঙ্কোনেরিরা, এবার সেই রেকর্ডেও ভাগ বসালে অবাক হবার কিছু থাকবে না। জুভেন্টাস তো এমনই!                                                   

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন