• চ্যাম্পিয়নস লিগ
  • " />

     

    'মিরাকল' ইস্তাম্বুল বা 'ব্লাডি হেল' ন্যু ক্যাম্প

    স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন তখনও অবিশ্বাসের ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারেননি। খানিক আগে যা দেখেছেন, সেটার রেশ লেগে আছে তার চোখমুখে। বিস্ময়ের ধাক্কা সামলে উঠে যে কথাটা বললেন, সেটি ঢুকে গেছে ফুটবল পুরাণে, ‘আই কান্ট বিলিভ ইট, আই কান্ট বিলিভ ইট। ফুটবল ব্লাডি হেল!'

     


    ফুটবলের ভক্ত হয়ে থাকলে এই বাক্যটা হয়তো ফেসবুক স্ট্যাটাসে আপনি কখনো না কখনো ব্যবহার করেছেন। তবে যে রাতে এমন বিহবল হয়ে পড়েছিলেন ফার্গি, সেই রাতটা এই প্রজন্মের কেউই হয়তো দেখেনি। ১৯৯৯ সালে আজকের এই দিনেই যে লেখা হয়েছিল ঘুরে দাঁড়ানোর অবিশ্বাস্য এক গল্প, যেটি পরে লিখে দিয়েছে ২০০৫ ইস্তাম্বুল, ২০১৯ অ্যানফিল্ডসহ আরও অনেক অলৌকিকের।

    তা ২১ বছর আগে আজকের এই দিনে কী হয়েছিল ন্যু ক্যাম্পে? চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে সেদিন মুখোমুখি হয়েছিল ম্যান ইউনাইটেড ও বায়ার্ন মিউনিখ। ইউনাইটেড সেবার লিগ জিতেছে আগেই, বেকহাম-গিগসরা সেদিন ছিলেন ট্রেবলের অপেক্ষায়। বায়ার্নের সঙ্গে জমজমাট একটা ফাইনালের অপেক্ষায় ছিল ন্যু ক্যাম্প। ম্যাচের ৬ মিনিটেই মারিও বাসলারের ফ্রিকিকটা ইউনাইটেডের মানব দেয়ালের পাশ ঘেঁষে বেরিয়ে জড়িয়ে যায় জালে। প্রথমার্ধে খানিকটা ছন্নছাড়া ইউনাইটেড ফিরে আসার চেষ্টা করে দ্বিতীয়ার্ধে। তবে আক্রমণাত্মক হতে গিয়ে দুইবার বেঁচে যায় একটুর জন্য। পোস্টের জন্য দুইবার গোলবঞ্চিত হয় বায়ার্ন। গোলের জন্য মরিয়া স্যার অ্যালেক্স ৬৭ মিনিটে নামিয়ে দেন টেডি শেরিংহামকে। আর খেলা শেষের ১০ মিনিট আগে সুপারসাব হিসেবে নামেন ওলে গানার সোলশার। কিন্তু গোলটা আসি আসি করেও আসছিল না। ডুইট ইয়র্ক কয়েক গজ দূর থেকে যখন বাইরে মেরে দেন, মনে হচ্ছিল রাতটা বায়ার্নের।

    সময় প্রায় ফুরিয়ে এসেছে তখন। কর্নার পায় ইউনাইটেড, গোল করার জন্য ওপরে চলে আসেন গোলরক্ষক স্মাইকেল। ডাগআউটে তখন স্যার অ্যালেক্স চুইংগাম চিবুচ্ছেন একটার পর একটা, আর বার বার ঘড়ি দেখছেন। কর্নার হলো, সেখান থেকে গিগসের পা হয়ে শেরিংহামের কাছে চলে গেল বল। পা লাগিয়েই ফেটে পড়লেন উল্লাসে, বল জড়িয়ে গেল জালে। তবে নাটকের বাকি ছিল আরও। আরেকটি কর্নার পেয়ে যায় ইউনাইটেড। আবার বেকহামের কর্নার, এবার শেরিংহামের হেড খুঁজে নিল সোলশারকে। অত কাছ থেকে মিস করেননি,  ফার্গুসন তখন ফেটে পড়েছেন উল্লাসে। শেষ মুহূর্তের দুই গোলে অবিশ্বাস্য এক ফেরার গল্প লিখল ইউনাইটেড।

    অথচ সেই ম্যাচটা কোনোভাবেই জেতার কথা ছিল না ইউনাইটেডের। আসলে তো খেলারই কথা ছিল না। ১৯৯৭ সাল পর্যন্তও লিগ চ্যাম্পিয়ন ছাড়া কারও খেলার নিয়ম ছিল না চ্যাম্পিয়নস লিগে। পরের বছর থেকে এ নিয়ম চালু হয়। যার সুবিধা পায় ইউনাইটেড, আর্সেনালের পর লিগে দ্বিতীয় হয়েও সুযোগ পায় চ্যাম্পিয়নস লিগে। অবশ্য বায়ার্নও একই রকম সুবিধা কাজে লাগিয়েছিল, লিগে দ্বিতীয় হয়েই এসেছিল ইউরোপের ক্লাব-কুরুক্ষেত্রে। তবে সেই বছর ইউনাইটেড লিগ ও কাপ জিতেই ফাইনালে এসেছিল। সেখানে পল স্কোলস আর রয় কিনের মতো তুরুপের দুই তাসকে ছাড়া দল সাজাতে হয়েছিল স্যার অ্যালেক্সকে। দুজনেই সাসপেনশনের খাড়ায় নামতে পারেননি ফাইনালে, তাই ডেভিড বেকহামকে সরে আসতে হয়েছিল সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে। ইউনাইটেড সেই মৌসুমেই ফিরে দেখার আরও দারুণ গল্প লিখেছিল, তবে ফাইনালে এক গোলে পিছিয়ে থাকার পরও সেরকম কিছু মনে হচ্ছিল না। সম্ভবত পুরো মৌসুমের সবচেয়ে হতচ্ছাড়া পারফরম্যান্সের একটি ছিল সেদিন। ম্যাচ শেষেও ফার্গুসন যখন বায়ার্ন কোচ ওটমার হিটফফেল্ডের সঙ্গে হাত মেলালেন, তখনও বায়ার্নকেই দুর্ভাগা বলেছিলেন। ওই শেষ ৫ মিনিটই তো আসলে ব্যবধান গড়ে দিয়েছে!

    তবে ঠিক আজকের দিনে না হলেও গতকাল ১৫ বছর পূর্তি হয়েছে সম্ভবত ইউরোপিয়ান ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় রাতের। আপনি হয়তো ন্যু ক্যাম্পে বার্সার ফেরা বা গত বছর অ্যানফিল্ডে লিভারপুলের বার্সা-জয়ের কথা বলতে পারেন, তবে ফুটবলানুরাগীদের অনেকের কাছে ইস্তাম্বুল ‘মাদার অব অল কামব্যাক’ হয়ে থাকবে। যেদিন প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার পর গ্যালারির অনেক লিভারপুল সমর্থক মাঠ ছেড়ে গিয়েছিলেন, টিভিসেটের সামনে থেকে অনেকে উঠে গিয়েছিলেন। প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখা যায়, এই লেখকও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার সময় প্রথমার্ধ দেখে ‘ম্যাচ তো শেষ’ ভেবে টিভি অফ করে দিয়েছিলেন। পরের দিন সকালবেলায় ফল দেখে অবশ্য হাতটা কামড়াতেই বাকি রেখেছিলেন তিনি।

    সে যাকগে, ইস্তাম্বুলের সেই রাতে যা হয়েছিল সেটার জন্য এরকম অনেকেই আফসোস করেন। ভাবুন তো, যে ম্যাচের প্রথমার্ধ শেষে লিভারপুলের বিপক্ষে এসি মিলান ৩-০ গোলে এগিয়ে সে ম্যাচ নিয়ে বলার আর কী থাকতে পারে? কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুরুতে পাওলো মালদিনির গোলে এগিয়ে যায় মিলান। লিভারপুল এরপর ফিরে আসার চেষ্টা করে, কিন্তু প্রথমার্ধের শেষ দিকে হার্নান ক্রেসপো দুই গোল করে হতভম্ব করে দেন ইস্তাম্বুলকে। বিরতির পর কোচ রাফায়েল বেনিতেজ যখন বলছিলেন, এখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর সামর্থ্য আছে লিভারপুলের, ড্রেসিংরুমে অনেকেই সেটা বিশ্বাস করেননি। কেউ আসলে তার কথা ঠিকমতো মনযোগ দিয়ে শোনেইনি। কাকাকে আটকাতে হিমশিম খাচ্ছিল লিভারপুল। বেনিতেজ ঠিক করলেন, ডিডি হামানকে নামাবেন শুধু কাকাকে পাহারা দেওয়ার জন্য। বিরতির সময় হামানকে যখন বলছিলেন, তিনি নিজেও বেশ অবাক হয়ে গিয়েছিলেন।


    কিন্তু এরপর ভোজবাজির মতো পালটে যায় সব। কাকাকে আসলেই বোতলবন্দি করে রেখেছিলেন হামান, জেরার্ড এরপর সুযোগ পান ওপরে ওঠার। চোট পেয়ে হ্যারি কিউয়েল উঠে যাওয়ায় ভ্লাদিমির স্মাইসার বদলি হিসেবে নেমেছিলেন। সেটাও হয়ে যায় শাপেবর। ছয় মিনিটের একটা ঝড়েই আসলেই লন্ডভণ্ড হয়ে যায় মিলান। ৫৪ মিনিটে জেরার্ড করেন প্রথম গোল, দুই মিনিট পর বদলি স্মাইসার দ্বিতীয়টি। ৬০ মিনিতে পেনাল্টি পেয়ে যায় লিভারপুল। মিস করেও রিবাউন্ড থেকে গোল করে সমতা ফেরান জাবি আলোনসো। এরপর নির্ধারিত সময়ে আর গোল হয়নি। অতিরিক্ত সময়ও যখন শেষের দিকে, মিলান জিতেই যাচ্ছিল। কিন্তু জার্জি দুদেক কীভাবে যেন শেভচেংকোকে গোলবঞ্চিত করেন দুইবার। ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। সার্জিনহো ও পিরলো মিলানের হয়ে মিস করেন প্রথম দুইটিই। লিভারপুলের রিসেও মিস করলে শেভচেংকো মিলানের হয়ে নেন পঞ্চম পেনাল্টি। কিন্তু গোল করতে পারেননি, সেটা ঠেকিয়ে মহাকাব্যিক এক রাতের নায়ক হয়ে যান দুদেক। ক্যারিয়ারে খুব বড় কিছু করতে পারেননি তার আগে পরে, কিন্তু সেই রাতটাই তাকে বানিয়ে দিয়েছিল রূপকথার নায়ক।

    ইস্তাম্বুল হোক বা ন্যু ক্যাম্প, সারাজীবন গল্প করার জন্য আসলে ওরকম একটা রাতই যথেষ্ট!  

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন