• বিসিবি প্রেসিডেন্টস কাপ ২০২০
  • " />

     

    'দ্য কিউরিয়াস কেস অফ (মেহেদি, মাহেদি, মাহাদি) হাসান'

    খুবই সাধাসিধে অথবা বোকাসোকা ধরনের একটা প্রশ্ন। তার নামের ‘যথার্থ’ বাংলা উচ্চারণ এবং বানানটা কী? মেহেদি? মাহেদি? মাহাদি?* তার নামের তিন ধরনের বানান লেখার দায়ে দুষ্ট প্যাভিলিয়নও। জাতীয় লিগে তিনি মেহেদি হাসান, বিপিএলে মাহেদি, শেষ প্রেসিডেন্টস কাপে লেখা হয়েছে মাহাদি। তাকে কী নামে ডাকা হবে, অথবা লেখা হবে, সেটা বিবেচনা করার ভার নেবেন নাকি? সেটি আপনি নিন অথবা না, বাংলাদেশ জাতীয় দলকে কিন্তু একটা ভার নিতে হবে তাকে নিয়ে। 


    ****

    মেহেদি হাসান খোঁড়াচ্ছেন কিছুটা। ক্রিজ ছেড়ে ড্রেসিংরুমের দিকে আসতে যতোটা সময় লাগছে, এ সময়ের ব্যবধানেই যেন খুলনা তাদের ৬, ৭ বা ৮টি উইকেট হারিয়ে ফেলেছে। আদতে ৫১ রানে ৬ উইকেট যাওয়ার পর নেমেছিলেন তিনি। রংপুরকে ২২৪ রানে অল-আউট করার পর খুলনার ব্যাটসম্যানদের ওপর আলস্যই ভর করলো কিনা, কে জানে। মেহেদি ক্রিজে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর ৬১ রানে ৭ম, ৮০ রানে ৮ম উইকেট পড়লো খুলনার। মেহেদি ছাড়া বাকি দুই ব্যাটসম্যান-- রুবেল হোসেন ও আব্দুল হালিম। 

    মেহেদি যখন মুকিদুল ইসলাম মুগ্ধর বলে ক্যাচ দিয়ে ফিরে আসছেন, খুলনার রান ২১৩। দশ নম্বর রুবেলের সঙ্গে তার জুটি ১১৩ রানের। তার রান ১১৫। প্রথম শ্রেণিতে ক্যারিয়ারের ৫ম সেঞ্চুরি মেহেদির। এর আগের চারটি সেঞ্চুরিই তিনি করেছিলেন হয় ওপেনিং অথবা তিন নম্বরে নেমে। মেহেদি টপ-অর্ডার ব্যাটসম্যান। পরিসংখ্যানের বিচারে এমন বললে আপত্তি করবেন না আপনি। 

    ২০১৪-১৫ মৌসুমে খুলনার হয়ে রাজশাহীর বিপক্ষে অভিষেক তার প্রথম শ্রেণিতে, এক ইনিংস ব্যাটিংয়ের সুযোগ পেয়ে করেছিলেন ফিফটি। প্রথম সেঞ্চুরি তৃতীয় ম্যাচে গিয়ে। সেবার জাতীয় লিগে ৪ ম্যাচে ব্যাটিং করেছিলেন ৬২.৪০ গড়ে, প্রতিবারই নেমেছিলেন ওপেনিংয়ে। ১৪.৬৬ গড়ে নিয়েছিলেন ৬ উইকেট। 
     


    পরের মৌসুমে জাতীয় লিগে আরেকটি সেঞ্চুরি পেলেন, ব্যাটিং গড় ৩৫.১৪। বোলিংয়ে ১ উইকেট। বিসিএলে সাউথ জোনের হয়ে প্রথম ম্যাচে শাহরিয়ার নাফীসের সঙ্গে ওপেনিং-ই করেছিলেন, তবে ২য় ম্যাচ থেকে নেমে গেলেন ৭ নম্বরে। ৩ ম্যাচে ৩১ রান, বোলিংয়ে ১ উইকেট। 

    এর পরের মৌসুমে জাতীয় লিগে আবারও খুলনার হয়ে ওপেনিংয়ে ফিরলেন। বরিশালের বিপক্ষে নামলেন তিনে, এখন পর্যন্ত ক্যারিয়ারসর্বোচ্চ ১৭৭ রান করলেন সেখানে। মেহেদি এরপর তিনে খেললেন এক ইনিংস বাদ দিয়ে বাকি মৌসুম। ৪ ম্যাচ, ২ সেঞ্চুরি, ৮৩.৫০ গড়; বোলিংয়ে ৮ উইকেট। 

    ২০১৮-১৯ মৌসুমে ওপেনিং, তিন নম্বর থেকে শুরু করে খেললেন ছয়, এমনকি আট নম্বরেও। ব্যাটিং, বোলিংয়ে সাদামাটা। তবে বিসিএলে নিচের দিকে খেলে ৬ ম্যাচে ব্যাটিং করলেন প্রায় ৯২ গড়ে, বোলিংয়ে নিলেন ২৩ উইকেট। 

    এরপর আবার জাতীয় লিগ, তবে মেহেদি থেকে গেলেন নিচের দিকেই। সেখানেই ৮ নম্বরে দাঁড়িয়ে মিরপুরে ওই সেঞ্চুরি, পরের ইনিংসেও ফিফটি। খুলনা জিতলো ১ উইকেটের থ্রিলার। এরপর বিসিএলেও নিচের দিকে খেললেন, ৫০-এর ওপর গড়ে ব্যাটিংয়ের সঙ্গে নিলেন ১৭ উইকেট। 

    ****

    রোশান আবিসিঙ্গে তার নাম জানেন না। ক্যাচ নেওয়ার পর বললেন, ‘সিম্পল চান্স টু দ্য ম্যান অ্যাট স্কয়ার লেগ’। 

    কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানসের হয়ে নিজের প্রথম ম্যাচ খেলতে নেমেছেন মাহেদি হাসান, রংপুর রাইডার্সের বিপক্ষে। কুমিল্লা আটকে গেছে ১৫৪ রানেই। ক্রিস গেইল-ব্রেন্ডন ম্যাককালামের বিস্ফোরক জুটির অপেক্ষায় রংপুর। কুমিল্লা অধিনায়ক তামিম ইকবাল প্রথম ওভার দিলেন মাহেদিকে। চতুর্থ বলেই গেইলের উইকেটটা পেতে পারতেন তিনি, আম্পায়ার আউট দিলেন না। পরের ওভারে গেইল-ম্যাককালামকে দিলেন ১ রান। এর পরের ওভারের প্রথম বলে ম্যাককালাম, তৃতীয় বলে শাহরিয়ার নাফীসের উইকেট-- প্রথমজন স্টাম্পড, পরেরজন বোল্ড। ৩ ওভার, ৪ রান, ২ উইকেট। শেষ ওভারে ১১ দিলেন, তবে হলেন ম্যাচসেরা। 

     

    মাহেদি হাসানের বিপিএল অভিষেক ২০১৬ সালে, বরিশাল বুলসের হয়ে। সেবার খেলেছিলেন ২ ম্যাচ। ১ ইনিংসে ব্যাটিং করে ২ রান, ১ ওভার বোলিং। তবে বিপিএলে মাহেদির আগমণীবার্তা ছিল পরের মৌসুমে কুমিল্লার হয়ে ওই প্রথম ম্যাচ। মাহেদি ১০ ম্যাচ খেলে নিলেন সমানসংখ্যক উইকেট, ৭.০৩ ইকোনমিতে। ব্যাটিং? সে মৌসুমে অন্তত তাকে ব্যাটসম্যান ভাবেননি কেউ। 

    তবে সে মৌসুমের পারফরম্যান্স তাকে প্রথমবার সুযোগ করে দিল জাতীয় দলে। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিলেটে অভিষেক হয়ে গেল তার, ২ ওভারে ২৫ রান দিলেন, ক্যাচ নিলেন একটি। আট নম্বরে নেমে সমানসংখ্যক বলে করেছিলেন ১১ রান। 

    ****

    ২০১৮-১৯ বিপিএলে কুমিল্লার হয়ে মাহেদি খেললেন ১৩টি ম্যাচ। এবার উইকেট নিলেন ১৩টি, ৭.০৪ ইকোনমিতে। আগের মৌসুমের মতোই ধারাবাহিক। ব্যাটিং করলেন ৩ ইনিংস। 

    বঙ্গবন্ধু বিপিএলে তামিম-মাশরাফি (বিন মুর্তজা)- (মোহাম্মদ) সালাউদ্দিন(কোচ)ত্রয়ীর ঢাকা প্লাটুনে মাহেদি। ২য় ম্যাচে তিন নম্বরে পাঠানো হলো, ১৭ বলে করলেন ১২। এরপর আবার ‘প্রোমোশন’ পেলেন ৫ম ম্যাচে গিয়ে, কুমিল্লা ওয়ারিয়র্সের বিপক্ষে। এবার যেন রাগ ঝাড়লেন। ২৯ বলে করলেন ৫৯, ২টি চার, ৭টি ছয়। সঙ্গে নিয়েছিলেন ২ উইকেট, মাত্র ৯ রান দিয়ে। 

    পরের ম্যাচে আবারও তিনে, এবার ২৮ বলে ৫৬। আবারও ম্যাচসেরা। খুলনার বিপক্ষে করলেন ৩৬ বলে ৬৮। ইলিমিনেটরে গিয়ে বাদ পড়া ঢাকার হয়ে খেললেন ১৩ ম্যাচ, ১২ উইকেট নিলেন ৬.৭৬ ইকোনমিতে। তবে এবার সঙ্গে যোগ হলো ১৩৬ স্ট্রাইক রেটে ২৫৩ রান, তামিমের সমান ৩টি ফিফটি। 

    মাহেদির আবারও ডাক পড়লো জাতীয় দলে। এক বছর পর ফিরলেন তিনি পাকিস্তান সফরে। তিনে ব্যাটিং করলেন, বোলিংয়ে ওপেন। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দুই ম্যাচের সিরিজেও জায়গা ধরে রাখলেন, তবে টপ অর্ডারের সাফল্যে ব্যাটিংয়ের সুযোগ পেলেন না। 

    ****

    ২০১৬ সালে মিরপুরে প্রাইম ব্যাংকের বিপক্ষে গাজী গ্রুপের হয়ে লিস্ট ‘এ’ অভিষেক হয়েছিল মাহেদি হাসানের। তিনে নেমে করেছিলেন সেঞ্চুরি। পরে ২২ রানে ১ উইকেট নিয়ে হয়েছিলেন ম্যাচসেরা। 

    ২০২০ সালে প্রিমিয়ার লিগে নিজের শেষ ম্যাচটা মাহেদি খেলেছিলেন মিরপুরেই। গাজী গ্রুপের হয়ে, ওই প্রাইম ব্যাঙ্কের বিপক্ষেই। এবার নামলেন আটে, ২৫২ রানতাড়ায়, ১৬১ রানে ৬ষ্ঠ উইকেট যাওয়ার পর। তার আগেই নেমেছেন আকবর আলি, অ-১৯ বিশ্বকাপ জিতে আসার পর বাংলাদেশ অধিনায়কের সেটি ছিল প্রথম লিস্ট ‘এ’। 

    মাহেদির সঙ্গে ভুল বুঝাবুঝির পর রান-আউট হলেন আকবর। তবে গাজী গ্রুপের আশা টিকে ছিল, মাহেদি ছিলেন বলে। তিনি পারলেন না, জয় থেকে ৯ রান দূরে থামলো গাজী গ্রুপ। 

    এরপর থমকে গেল সবকিছু। থমকে গেল প্রিমিয়ার লিগ। থমকে গেল জীবন। 

    ****

    প্রেসিডেন্টস কাপে ব্যাটসম্যানরাও যেন থমকে গিয়েছিলেন। কোনো উত্তাপ নেই, চারদিক শুনশান। 

    নাজমুল একাদশের বিপক্ষে তামিম একাদশের ব্যাটসম্যানরাও তাই। আগেরদিন ৬৮ রানে ৬ উইকেট যাওয়ার পর নেমেছিলেন, এদিন ১০৮ রানে ৭ উইকেট যাওয়ার পর নামলেন মাহাদি হাসান। ব্যাটিংয়ের বিশেষণ ততক্ষণে বাজে থেকে বীভৎসে চলে যাচ্ছে এ টুর্নামেন্টে।  
     


    তখনও বৃষ্টি নামেনি। লাইভস্ট্রিমে কমেন্ট্রিতে হাবিবুল বাশার, জাতীয় দলের নির্বাচক। মাহাদির ভবিষ্যত নিয়ে জানতে চাওয়া হলো তার কাছে।

    “মাহাদি হাসান………”, বাশারের কথা শেষ হলো না। আল-আমিনকে কাভার ড্রাইভে সেই মুহুর্তেই চার মারলেন মাহাদি। বাশার একটু হেসে নিলেন, কেন হাসলেন, সেটি অনুমান করুন। আবার বলতে লাগলেন, “খুব কার্যকরী ক্রিকেটার কিন্তু। ওর পারফরম্যান্স যদি দেখে থাকেন, বিপিএলের শেষ কয়েক মৌসুমে কিন্তু ধারাবাহিক পারফর্মার সে। ওর সবচেয়ে ভাল দিক, ওকে নতুন বলে বোলিং করানো যায়, পুরোনো বলে বোলিং করানো যায়। খুব ভাল রিড করতে পারে ব্যাটসম্যানকে। আমাদের অফস্পিনে কিন্তু বেশ ভাল অপশন তৈরি হয়েছে। এবং ও কিন্তু খুব ভাল ব্যাটসম্যান। আমরা বিপিএলে কিন্তু দেখেছি ওকে টপ অর্ডারে ব্যবহার করা যায়। প্রথম শ্রেণিতে খুলনার হয়ে ওপেন করে থাকেন। বেশ কয়েকটি সেঞ্চুরি আছে। 

    “খুবই কার্যকরী। শেষ ইমার্জিং কাপে আমাদের হয়ে খুবই ভাল করেছিল। এসএ গেমসে যেখানে সোনা জিতলাম, সেখানে খুবই ভাল বোলিং করেছিল। আমাদের অফস্পিনে এতো অপশন বেড়েছে, সে কারণে হয়তো সুযোগটা হচ্ছে না। অবশ্যই (মেহেদি হাসান, আরেক মেহেদি, তাতে আর আশ্চর্য কী!) মিরাজ ও নাঈম (হাসান) আগে চলে আসে, তবে সে ভবিষ্যতের জন্য খুবই ভাল একটা অপশন আমাদের জন্য।”

    বাশার চলে গেলেন একটু পর। বৃষ্টি নামলো। বৃষ্টি থামলো। মাহাদি ঝড় তুললেন। তামিম বললেন, অবিশ্বাস্য ব্যাটিং। মাহাদি কৃতিত্ব দিলেন তাইজুলকে, তাইজুল না থাকলে অমন ইনিংস খেলা হতো না তার, “পরিস্থিতি যেটাই হোক, পরিকল্পনা ছিল ৪৫-৪৬ ওভার পর্যন্ত নরমাল ব্যাটিং করব, শেষের দুই ওভারে সুযোগ নেব। দিনশেষে সেটাই হয়েছে। ক্যারি করতে করতে সুযোগ নিয়েছি, লেগে গেছে, বড় রান হয়ে গেছে। তাইজুল ভাই আমার খেলা পুরো বদলে দিয়েছে পুরোপুরি।”

    মাহাদি এতদিনে আর যাই করুন না কেন, টেইল-এন্ডারদের সঙ্গে ব্যাটিংয়ের কোডটা নিশ্চয়ই ব্রেক করেছেন।

     
    ****

    তো? 

    মেহেদি? মাহেদি? নাকি মাহাদি?* কী নামে ডাকার সিদ্ধান্ত হলো? 

    মুশফিক যখন ব্যাটিং করছিলেন, তখন সমীকরণ ছিল এমন-- মুশফিক ম্যাচ জিতলে তিনি ম্যাচসেরা, সেরা ব্যাটসম্যান মাহাদি। আর হারলে উল্টোটা। মাহাদির দল হারলে তিনি অনেকটাই ম্লান হয়ে যাবেন। মাহাদি ম্যাচসেরা হয়েছেন, মুশফিক সেরা ব্যাটসম্যান। 

    তাহলে? মেহেদি/মাহেদি/মাহাদি টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান/লোয়ার অর্ডার ব্যাটসম্যান, নতুন বলের বোলার/পুরোনো বলের বোলার-- কোনটি বা কোন জোড়া? এ সমীকরণে কোন চলকটা সবচেয়ে কার্যকরী? 

    খুব কঠিন প্রশ্ন হয়তো নয়, তবে কৌতুহলজাগানিয়া তো বটেই। সে কৌতুহল মেটাতে হলে আগে ওই সমীকরণটা মেলাতে হবে। অথবা সমীকরণটা মিললেই মিটবে কৌতুহল।

     

    *আরও জটিলতা এড়াতে ই-কার, ঈ-কারের চিরায়ত লড়াই আপাতত না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বাংলা নামের বানানের ক্ষেত্রে।
     

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন