• ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ
  • " />

     

    'রানা ভাইকে মিস করি'

    রবি তখন খুলনার বয়সভিত্তিক দলে খেলেন। মানজারুল ইসলাম রানা ও জিয়াউর রহমান সেই রবিকে নিয়ে এলেন ঢাকায়। খেলাঘর সমাজ কল্যাণ সমিতিতে। এই দলের হয়েই প্রথম বিভাগে অভিষেক হয়ে গেল। ঘরোয়া ক্রিকেটে এরপর খেলেছেন বেশ কয়েকটি দলে। লিস্ট এ, প্রথম শ্রেণি। অবশেষে ফিরেছেন নিজের দল খেলাঘরে, এই ২০১৭ সালে এসে। ৮ মে পর্যন্ত লিগের সর্বোচ্চ রান তাঁরই, ৩৯৬। আছে পরপর দুই ম্যাচে সেঞ্চুরি, সঙ্গে দুইটা ফিফটি। সবচেয়ে বেশী ৫০টি চারও মেরেছেন তিনিই। সঙ্গে আছে অফস্পিনে ছয়টি উইকেটও। 
     

    রবিউল ইসলাম রবির আরাধ্য সময়টা এসেছে ব্যাটিংয়েই! 


    ****

     

    লিজেন্ডস অব রুপগঞ্জের ফিল্ডাররা নেমে গেছেন। নেমে গেছেন দুই আম্পায়ার মাসুদুর রহমান ও মোর্শেদ আলী খানও। দেখা নেই শুধু খেলাঘরের দুই ওপেনারের। রবিউল ইসলাম রবি ঠিকঠাকই নামলেন, হেলমেটটা নাগালে ছিল না সালাহউদ্দীন পাপ্পুর। সব নিয়ে নামলেন দুজন অবশেষে।

     

    আগের দুই ম্যাচেই সেঞ্চুরি। রবির ওপর বাড়তি একটু নজর থাকাই স্বাভাবিক। মোহাম্মদ শরীফের মোটামুটি গুড লেংথের বলটা পিচে পড়ার পর যেন একটু ধীর হয়ে গেল। ফতুল্লার এ উইকেটের আচরণটাই এমন। বল ধরছিল সেখানে বেশ। সঙ্গে একটু সুইং। রবি ড্রাইভ করতে গেলেন, গড়বড় করে ফেললেন টাইমিংয়েই। ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে গেল ক্যাচ। রবির প্রাপ্তি গোল্ডেন ডাক। ৭ ম্যাচে ৩৯৬ রান নিয়ে প্রিমিয়ার লিগের সর্বোচ্চ স্কোরার এ ম্যাচে নেমেছিলেন। আটকে রইলেন ওই ৩৯৬-তেই।

     

    ‘একটু তাড়াহুড়া হয়ে গেছে। আর আমি ঢোকার আগেই দেখি আম্পায়ার ঢুকে গেছে। সোজাই খেলেছিলাম, ধীরেই খেলেছিলাম, তবে বলটাও একটু দেরিতে এসেছিল। একটু সুইং-ও ছিল। “হার্ড লাক”। প্রথম বলে আউট হওয়াটা আসলে এমনই। এমন না যে লক্ষ্য বেশি, জোর করে শট খেলতে গেছি।’

     

    তবে কি একটা মানসিক চাপ ছিল বাড়তি? এ প্রশ্নের জবাব যখন দিচ্ছেন, পাশ থেকে একজন বলে উঠলেন, ‘আমি বললাম, ওইটাই হয়েছে!’ চাপ শুধু ওই বিলম্বে নয়, চাপ আরও কিছুর।

     

    ‘মানসিক চাপ না শুধু, আসলে সবদিক দিয়েই চাপ। আমরা পরশুদিন (৬ মে) খেলেছি  বিকেএসপিতে। সেখান থেকে ম্যাচের পর আসতে সময় লাগে। তারপর আজ আবার এখানে খেলা, শুরুতে আবার ফিল্ডিং করেছি পঞ্চাশ ওভার। আবার নয় ওভার বোলিং-ও করেছি। শরীরের ওপর একটু ধকল তো আছেই। তবে সবই তো আসলে খেলারই অংশ। আত্মবিশ্বাসও ছিল, হয়নি আসলে। ‘পার্ট অব দ্য গেম’।’


    এই খেলার অংশের পরও কথা আছে তাঁর। আসলে এই ‘গোল্ডেন ডাক’ নিয়ে তাঁর আফসোসই নেই!

     

    ‘এটা নিয়ে আসলে আমার মন খারাপ না। পনেরো-বিশ-ত্রিশ করে আউট হলে আসলে খুব খারাপ লাগবে। আজ তো থিতুও হতে পারলাম না। যেদিন হবো, সেদিন যাতে লম্বা ইনিংস খেলতে পারি, যেমন এই মৌসুমে খেলেছি।’

     

    এই ‘শূন্য’ বাদ দিলে রবি আর দুইবার আউট হয়েছেন ১৬ ও ৩৪ রানে। সেদিন নিশ্চয়ই খারাপই লেগেছে তাঁর!

     

    খারাপ লাগে বোলিংটা খারাপ হলেও। শেখ জামালের সঙ্গে সেঞ্চুরির ম্যাচে দুই ওভারে ২১ রান দিয়ে থেকেছেন উইকেটশূন্য। আর ভিক্টোরিয়ার সাথে ১০ ওভারে ৫০ দিয়ে নিয়েছেন একটি উইকেট। দুই ম্যাচেই প্রথম ইনিংসে ব্যাট করেছেন, আউট হয়েছেন চল্লিশ (৪৩, ৪১) ওভারের পর।

     

    ‘বোলিং শেষ দুই ম্যাচে খারাপ হয়ে গেছে। ব্যাটিং করেছি চল্লিশ ওভারের মতো। আবার দশ ওভার বোলিং করা আসলে শরীরের জন্য একটু কষ্ট হয়ে যাচ্ছে, এই গরমের মাঝে। এর ওপর ভ্রমণক্লান্তি আছে। ঢাকার মধ্যে ম্যাচ হলে ভাল হয় আসলে। তবে যদি দুই ম্যাচের মধ্যে বিরতি পাওয়া যায় ভাল, শরীর ঠিক হয়ে যায় আবার।’

     

    ****

     

    ২০০৯ সালে প্রথম প্রিমিয়ার লিগ খেলেছিল খেলাঘর সমাজ কল্যাণ সমিতি। এরপর অবনমন হয়েছে, উত্থানও হয়েছে। খেলাঘরের গায়ে প্রিমিয়ার লিগের ‘ছোট’ দলের তকমা। তবে সুপার লিগে খেলার আশাটা ছাড়ছেন না তাঁরা।

     

    ‘খেলাঘর দলটা একেবারে খারাপ হয়নি এবার। আমাদের অমিত মজুমদারের কথাই ধরুন, তিন নম্বরে খেলছে। নাজমুস সাদাত, জাতীয় দলে খেলেছে(জাতীয় দলের প্রথম টি-টোয়েন্টিতেই শুধু খেলেছিলেন সাদাত)। নাফিস ইকবাল, নাজিমউদ্দিনের মতো সিনিয়ররা আছেন। তাঁরা দুজনই আমাদের অনেক সাহায্য করছেন।’  

     

    ‘আমাদের সামর্থ্য আছে। আমি, অমিত, সাদাত যদি ভাল খেলতে পারি, বাংলাদেশের ঘরোয়া যে কোনো দলকে আমরা হারাতে পারবো। এই আত্মবিশ্বাসও আছে আমাদের। (ইনশাআল্লাহ) ফল তো পাচ্ছি।

     

    ‘(সালাহউদ্দিন) পাপ্পু ভাইয়ের সাথে ব্যাটিংটা খুবই উপভোগ করি। যেরকম শটগুলো খেলে, দেখার মতো। তিনি আসলে প্রথমবার প্রিমিয়ার লিগ খেলছেন, তবে তার হাতে শট আছে। আমিও সবসময় মোটিভেট (প্রেরণা) করার চেষ্টা করি, যাতে আরও ভাল খেলেন।’

     

    পাপ্পু এদিনও শট খেললেন। ছয় চার ও দুই ছয়ে করলেন ২৭ বলে ৩৮ রান।

     

    ****

     

    সেই ২০০৯ সালে খুলনা বিভাগের হয়ে লিস্ট এ-তে অভিষেক রবির। সে দলে তখনও তাঁর সাথে ছিলেন সাদাত, অমিত, ডলার, মুরাদ খানরা। আট বছর পর যেন নিজেকে খুঁজে পেলেন রবিউল, ‘পরিশ্রম সবসময়ই করে গেছি। ফল পাইনি। এখন ভাল সময়টা এসেছে। আমি আজকেই প্রথম বলে আউট হলাম, এর আগে একবার হয়েছি মনে হয়। পরিশ্রম অনেক করেছি, এখন ফল পাচ্ছি ইনশা’আল্লাহ। তবে এটা ধরে রাখতে হবে।’

     

    সেই ধরে রাখার মাধ্যমেই তো আসবে পরবর্তী সব অধ্যায়।  

     

    ‘পরবর্তী লক্ষ্য, যে সুযোগই আসুক, ভাল করার চেষ্টা করা। নিজের সেরা পারফরম্যান্সটা দেয়ার চেষ্টা করা। বিপিএল আসছে, যদি কোনো দল আমাকে নেয়, আমি সেরাটা দেয়ারই চেষ্টা করবো। ব্যাটিং-বোলিংয়ের সঙ্গে আমার ফিল্ডিংটাও ভাল। বিপিএলে তো এ ধরনের ক্রিকেটারদেরই চায় সবাই!’

     

    আর জাতীয় দল?

     

    ‘লক্ষ্য সবগুলোরই আছে। সেজন্য আরও ভাল পারফর্ম করতে হবে। এই পারফরম্যান্স দিয়েই আমাকে সব জায়গায় ডাকুক, আমি সেটা চাইও না। আমি যদি আরও ভাল পারফর্ম করি, আমার ভিত্তি যদি ভাল হয়, তবেই আমার সুযোগটা প্রাপ্য হয়ে যাবে।’

     

    আপাতত প্রিমিয়ার লিগের বাকি তিন রাউন্ডের ম্যাচগুলোর দিকে নজর তাঁর। সুপার লিগে খেলাঘর গেলে, ভাল করার ইচ্ছা সেখানেও।  

     

    ****

     

    খুলনার হয়েই প্রথম শ্রেণিতে অভিষেক লিস্ট এ অভিষেকেরও এক বছর আগে। ক্রিকেটের দীর্ঘ সংস্করণ নিয়ে তাঁর ভাবনাটা জটিল না। সহজ।

     

    ‘আমার ব্যাটিং-স্টাইলের কারণে দীর্ঘ সংস্করণে খেলতেও ভাল লাগে। শুধু ভাল লাগে না, ব্যাটসম্যান হিসেবে তো ওটিই আসল। যাদের ভিতটা ভাল, যাদের টেকনিকে ‘গলদ’ নেই খুব একটা, তাদের যে কাউকেই বলবেন, তারা দীর্ঘ সংস্করণে খেলাটা উপভোগই করে।’

     

    ****

     

    শেখ জামালের সঙ্গে নিজের ক্যারিয়ার ও এই মৌসুমের দ্বিতীয় সেঞ্চুরিটা পেয়ে গেলেন রবি। জিতলো খেলাঘরও। প্রতিপক্ষ দল, শেখ জামাল। জিয়াউর রহমানের ৭৫ রানের ইনিংসও সেদিন রবিদের জয় আটকাতে পারেনি। যে জিয়া ঢাকার ক্রিকেটে এনেছিলেন রবিকে, রানার সঙ্গে, সেই জিয়াই এখন রবির প্রতিপক্ষ। কিন্তু রানা?

     

    ‘রানা ভাইকে অবশ্যই মিস করি। খুলনার বড় ভাইদের মধ্যে তিনি ছিলেন ‘ওয়ান অব দ্য বেস্ট’। অনেক ভাল মানুষ ছিলেন। অনেক সাহায্য করতেন। আমাদের সাথে বন্ধুর মতো ছিলেন। রানা ভাই, সেতু(সাজ্জাদুল হাসান) ভাই, দুজনই আসলে অনেক কাছের মানুষ ছিলেন আমার’।

    অন্যলোক থেকে সেই কাছের ছোট ভাইয়ের এমন পারফরম্যান্স কি দেখছেন না রানা-সেতু? 

     

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন