• ফুটবল

বাতিগোল স্তুতি...

পোস্টটি ২৪৭২৮ বার পঠিত হয়েছে

১.

মিয়াগি স্টেডিয়াম, ২০০২।

সুইডেনের সাথে ম্যাচটা না জিতলে আর্জেন্টিনাকে বিদায় নিতে হবে বিশ্বকাপের গ্রুপপর্ব থেকেই। গোলশূন্য প্রথমার্ধ সেই চাপটা বাড়িয়ে দিয়েছে আরও। খেলার নিয়ন্ত্রণ আর্জেন্টিনার কাছে, কিন্তু বল তো আর জালে জড়ায় না! একটা গোলের জন্য বুভুক্ষ হয়ে মাঠের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত শুধু ছুটছেন গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা। বাতিস্তুতা যেন ছুটছেন আর্জেন্টিনার জার্সিটা আরও ক'দিন গায়ে চেপে রাখতে, কোরিয়া-জাপান বিশ্বকাপেই যে শেষ বলবেন তিনি!

প্রতি-আক্রমণে আর্জেন্টিনার ডিবক্সের খানিকটা বাইরে থেকে একটা ফ্রি-কিক পেল সুইডেন। ম্যাগনাস সভেনসন তখনও বল বসাননি। রেফারির বাঁশি শুনে ডান দিকের ডাগ আউটে চোখ ফেরালেন বাতিস্তুতা। সহকারি রেফারির বোর্ডে লাল রঙে জ্বলছে নাম্বার নাইন। মাথার কালো ব্যান্ডটা খুলে হাতে বাঁধলেন, অধিনায়কের বন্ধনীটাও খুলে ফেললেন, হার্নান ক্রেসপোর সাথে হাত মেলালেন, মাঠ ছাড়লেন। বাতিস্তুতার ক্যারিয়ার-ভাগ্য তখন আর তাঁর হাতে নেই!

বাতিস্তুতা সাইডবেঞ্চে বসতে না বসতেই সেই ফ্রি-কিক থেকে গোল খেয়ে বসল আর্জেন্টিনা। বাকিটা সময় বাতিস্তুতা পার করলেন অস্বস্তিতে, অস্থিরতায় আর উত্তেজনায়। বারবার মুখ দিয়ে নখ কামড়াচ্ছিলেন, কখনও হতাশায় মুখ ঢাকছিলেন নিজের হাত দিয়েই। সভেনসনের সেই গোল ছাপিয়ে আর ম্যাচ জেতা হয়নি লা আলবিসেলেস্তেদের। ম্যাচ শেষে সব আবেগ ঝরল বাতিস্তুতার চোখ দিয়ে। একবার মনে হল জার্সি খুলে ফেলতে চাইছেন, কিন্তু খুললেন না। হাতজোড়া দিয়ে হাঁটুর ওপর শরীরের ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে, একটা সময় মনে হচ্ছিল পড়েই যাবেন হয়ত! পড়লেন না। এরপর উঠে দাঁড়ালেন, হাঁটা ধরলেন। সবুজ মাঠ পেরিয়ে, স্টেডিয়ামের কংক্রিট ফ্লোরে পাতা সবুজ গালিচাও পার হয়ে ঢুকে গেলেন অন্ধকার টানেলে।


 

২.

সান্তা ফে-র ছোট শহর রেকনকিস্তা। বাবা-মা আর বড় তিন বোনের সাথে এই শহরেই বেড়ে ওঠা বাতিস্তুতার। আর্জেন্টিনায় তাঁর বয়সী ছেলেরা রাতে ঘুমুতে যায় ফুটবল নিয়ে। মারিও কেম্পেস আর্জেন্টিনাকে প্রথমবার বিশ্বকাপ জেতানোর পর সেই উন্মাদনা রূপ নিয়েছিল পাগলামিতে। পাড়ার ছেলেদের সাথে সেখানে ফুটবল খেলেন বাতিস্তুতাও। উচ্চতা আর শারীরিক গড়নের কারণে বাস্কেটবলটাই বরং ভালো খেলতেন তিনি। তবে খেলতেন নিছকই উপভোগের জন্য। বাকিদের মতো তার ফুটবলার হওয়ার ইচ্ছে নেই, বরং হতে চাইতেন ডাক্তার।

কিন্তু ভাগ্যটা তার সাদা অ্যাপ্রোনে নয়, লেখা ছিল আকাশি-সাদা জার্সিতে। যে স্বপ্ন দেখত লাখ-লাখ আর্জেন্টাইন কিশোর, সেটা সত্যি হয়ে ধরা দিয়েছিল বাতিস্তুতার কাছে। নিজ শহরে ফুটবল খেলতে গিয়েই নজর কেড়েছিলেন স্কাউটদের। কয়েকদিন পর পেলেন ফুটবলে ক্যারিয়ার গড়ার প্রস্তাব। তাও যেন তেন ক্লাব নয়, নিউয়েলস ওল্ড বয়েজ। আর্জেন্টিনার চ্যাম্পিয়ন তখন তারা, মেধাবী তরুণ খেলোয়াড়দের একেবারে পাড়া থেকে তুলে আনার কাজটা আর্জেন্টিনায় তাদের চেয়ে ভালো আর কেউ পারে না!

তবে বাতিস্তুতাকে প্রস্তাব দিয়ে একটু ভড়কেই গেলেন তারা। পরিবার ছেড়ে আরেক শহরে যাবেন না, পড়াশুনায় ব্যাঘাত ঘটতে দেবেন না বলে সে প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেন তিনি। কিন্তু নিউওয়েলসও নাছোড়বান্দা। নতুন প্রস্তাবে বাতিস্তুতার পড়াশুনার খরচ বহন করার আশ্বাস দিয়ে তাকে দলে ভেড়ানো হলো। বাতিস্তুতার ব্রুস ব্যানার থেকে হাল্ক হয়ে ওঠার গল্পের শুরু এরপর থেকেই।
 

 

 

৩.

‘কান্ট্রিবয়’ বাতিস্তুতা নিজ শহর ছেড়ে পাড়ি জমালেন ৪৬০ কিলোমিটার দক্ষিণের শহর রোজারিওতে। রেকনকিস্তা থেকে নতুন ঠিকানায় পৌঁছাতে বাতিস্তুতার সময় লাগল বেশ কিছুক্ষণ। ততদিনে অবশ্য তার প্রতিভার কথা জানাজানি হয়ে গেছে আর্জেন্টিনা জুড়ে। প্রতিভা সুপ্ত থাকে না, কারও কারও ক্ষেত্রে বোধ হয় সেটা প্রস্ফুটিত হতে সময়ও নেয় না! নতুন ঠিকানায়ও তাই থিতু হতে পারলেন না বেশিদিন। মাত্র এক বছর। ১৯৮৯ সালে নিউয়েলস থেকে তাকে কিনে নিল রিভার প্লেট। আর্জেন্টিনার সবচেয়ে ধনী ক্লাব! মৌসুমের প্রথমার্ধটা বাতিস্তুতার জন্য ভালো গেলেও রিভারের জন্য ‘যথেষ্ট’ ভালো হল না! 

মাঝ মৌসুমে দলের ম্যানেজার হয়ে এলেন ড্যানিয়েল প্যাসারেল্লা। ১৯৭৮-এ এই লোককে বিশ্বকাপ শিরোপা উঁচিয়ে ধরতে দেখেছেন বাতিস্তুতা। মারিও কেম্পেস, প্যাসারেল্লারা সেই থেকে বাতিস্তুতার ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নে বাগড়া বাধিয়েছেন! রিভারে যোগ দেওয়ার আগেই অবশ্য ডাক্তার হওয়ার ‘ভূত’ সরিয়ে ফেলেছেন মাথা থেকে! এবার ফুটবলারই হবেন তিনি। সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল। তারপরই ঘটল বিপত্তিটা। 

অল্প কয়েকদিনেই নতুন ম্যানেজার প্যাসারেল্লার সাথে সম্পর্কটা বিষিয়ে উঠল বাতিস্তুতার। কোনো কারণ ছাড়াই ম্যাচের পর ম্যাচ সাইডবেঞ্চে পার করলে কার মাথা ঠিক থাকে? বয়সটাও তো মাত্র ২০। প্যাসারেল্লার কারণেই পরের মৌসুমেই আবার নতুন ক্লাব খুঁজতে হল তাকে। সেটা অবশ্য আক্ষরিক অর্থে না। অন্য ক্লাবই খুঁজে নিল তাকে। সাবেক ম্যানেজারের ওপর ঝাল মেটাতে বা শৈশবের প্রিয় ক্লাবে খেলবেন বলে গেলেন বুয়েনস আইরেসের আরও দক্ষিণে, লা বোম্বোনেরায়। নাম লেখালেন রিভারের ‘চিরশত্রু’, বোকা জুনিয়র্সে। এবারের গল্পটা উলটো। মৌসুমের প্রথমার্ধে বাতিস্তুতা টেনে এনেছেন রিভারের শেষদিকের ফর্মটা। মাঝপথে এবার কোচ বদলালো বোকা। অস্কার তাবারেজ হয়ে গেলেন বাতিস্তুতার ক্যারিয়ারেরই টার্নিং পয়েন্ট। তিনি সাহস যোগালেন, আর মাঠে নেমে গোল করলেন বাতিস্তুতা। এতো সহজ? বাতিস্তুতার জন্য কাজটা ছিল তার চেয়েও সহজ। অমন বয়সে যা হয়, একজন 'গুরু' লাগে! বাকি কাজটা মেধা আর পরিশ্রমের ওপর দিয়ে চালিয়ে নেওয়া যায়। মৌসুমের সর্বোচ্চ গোলদাতা হলেন, সাথে বোকাও জিতল আর্জেন্টাইন লিগ।   

বাতিস্তুতাকে ক্লাব ছাড়া করার আগে প্যাসারেল্লা বলেছিলেন, ‘ও নিজের মতো একটা ক্লাব খুঁজে পেলে দারুণ স্ট্রাইকার হতে পারবে।’ বাতিস্তুতা নিজের মনের মতো একটা ক্লাবই খুঁজে নিয়েছিলেন। ক্যারিয়ারে এরপর সবসময়ই শুনেছেন মনের কথা!


৪.

বাঁ প্রান্ত থেকে উড়ে আসা বল ফার্স্ট টাচেই নিয়ে গেলেন নিজের সুবিধা মতো জায়গায়। পরের দফায় শ্যুট। মারলেন কাছের পোস্টে। রেনে হিগুইতা আন্দাজ করে লাফটা দিয়েছিলেন ঠিক দিকেই। কিন্তু হার মানলেন গতির কাছে। বাতিস্তুতার ‘আউট-সুইং’ শট জালে ঢুকল গোলার মতো করে। ঘাড় বেয়ে নেমে আসা সোনালি চুল বাতাসে উড়িয়ে, দুই হাত প্রশস্ত করে আরেকটু হলেই যেন উড়াল দিতেন বাতিস্তুতা! তার আগেই অবশ্য সতীর্থরা ধরে ফেলেছিলেন। ম্যাচ শেষে কোপা আমেরিকার শিরোপা নিয়েই বাতিস্তুতা উড়ে গিয়েছিলেন আর্জেন্টিনায়।     

১৯৭৮ আর ১৯৮৬-তে বিশ্বকাপ জেতা আর্জেন্টিনা ৩২ বছর পর জিতল কোপা আমেরিকা। ফাইনালে বাতিস্তুতার ওই গোলেই কলম্বিয়া হারল ২-১ ব্যবধানে। ২২ বছর বয়সী বাতিস্তুতা হলেন সে আসরের সর্বোচ্চ গোলদাতা।  

গোলবারের নিচে সার্জিও গোয়োচেয়া, মাঝমাঠে ডিয়েগো সিমিওনে, আক্রমণে ক্লদিও ক্যানিজিয়া- প্রতিপক্ষকে দুমড়ে মুচড়ে ফেলার মতো দল তখনও ছিল আর্জেন্টিনার। কিন্তু শিরোপা জিততে হলে দরকার অন্যকিছু। সময়-অসময়ে জ্বলে উঠতে পারার মতো একজন স্ট্রাইকার। হাফ চান্সকেও কাজে লাগাতে পারেন যিনি। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে যাকে ভরসা করা যায়। আগের আর্জেন্টাইন লিগের মৌসুমে সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার পুরস্কার হিসেবে ১৯৯১ সালের কোপা আমেরিকার দলে জায়গা পেয়েছিলেন। সেই ভরসার প্রতিদানটা প্রথমবারই দিয়েছিলেন বাতিস্তুতা।

তার আগ পর্যন্ত নামটা পরিচিত ছিল কেবল আর্জেন্টিনাতেই। এরপর লাতিন আমেরিকা ছাপিয়ে পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ল সেই নাম- গ্যাব্রিয়েল ওমর বাতিস্তুতা, বাতিগোল।
 

 

 

৫.

কোপা আমেরিকার খেলা দেখেই বাতিস্তুতাকে মনে ধরেছিল ফিওরেন্টিনার। বাতিস্তুতাও তখন দেশ ছেড়ে ইউরোপিয়ান ফুটবলে খেলার দিন গুণছিলেন। দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে চুক্তিটাও হয়ে গেল চোখের পলকেই। শেষ চার বছরে চতুর্থ বারের মতো ক্লাব বদলালেন বাতিস্তুতা। বুয়েনস আইরেস থেকে গন্তব্য এবার আরও দূর। ফ্লোরেন্স, ইতালি।

প্রথম মৌসুমটা ইতালিতে ভালোই গেল। ১৩ গোল করলেন। জীবনে প্রথম কোনো ক্লাবে দুই বছর কাটাতে গিয়ে বড়সড় একটা ধাক্কা খেলেন। ১৯৯২-৯৩ মৌসুমে সিরি-আ থেকে সিরি-বি তে নেমে গেল ফিওরেন্টিনা। আসলে ধাক্কাটা ছিল ফিওরেন্টিনার জন্যই। চাইলেই দুঃসময়ে দল ছেড়ে পাড়ি জমাতে পারতেন ইউরোপের নামকরা ক্লাবে। ২৪ বছর বয়সী আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার, এই পরিচয়টাই তো যথেষ্ট ছিল তার জন্য। সেই তিনিই থেকে গেলেন ফ্লোরেন্সেই। হয়ত মনের মতো ক্লাবের খোঁজ পেয়ে গিয়েছিলেন তখনই!


 

দ্বিতীয় বিভাগে খেলার আগে আরও একবার জাতীয় দলের ডাকে উড়ে গেলেন। ফিরলেন আরও একটি কোপা আমেরিকার শিরোপা ঝুলিতে পুরে। সাথে গোল্ডেন বুটটাও। ফাইনালে মেক্সিকোর বিপক্ষে জোড়া গোল করে আগের আসরকেও ছাপিয়ে গেলেন নিজের পারফরম্যান্স দিয়ে।

তার জন্ম এই শহরে না, তিনি এখানের বাসিন্দাও নন। অথচ এই ক্লাবটাকেই জীবনের সঙ্গী করে নিয়েছিলেন বাতিস্তুতা। এক মৌসুম পরই দলকে ফিরিয়ে এনেছিলেন সিরি আ-তে। তারপর সেখানেই কাটিয়েছিলেন আরও ৬ বছর।

ফিওরেন্টিনায় কাটানো ৯ মৌসুমে সিরি আ-র সর্বোচ্চ গোলদাতা অবশ্য হয়েছিলেন বেশ কয়েকবারই। মাঝারি মানের এই দলকে টেনে নিয়ে গেছেন চ্যাম্পিয়নস লিগেও। তবে ফিওরেন্টিনার হয়ে কোপা ইতালিয়া আর সুপার কোপা ইতালিয়া জেতাই বাতিস্তুতার সর্বোচ্চ সাফল্য।

অথচ তাকে দলে পেতে মরিয়া ছিল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, রিয়াল মাদ্রিদের মতো ক্লাব। বেশ কয়েকবার চেষ্টার পরও বাতিস্তুতা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তাদের। কারণটা পরে নিজেই জানিয়েছিলেন, ‘বড় দলের জন্য শিরোপা জেতা তো সহজ কাজ। তাতে চ্যালেঞ্জ নেই। ছোট দলের হয়ে একটা শিরোপা জেতা ওইসব দলের দশ শিরোপার সমান!’

চ্যালেঞ্জ নিতে গিয়ে ফিওরেন্টিনার প্রতিশব্দ হয়ে গিয়েছিলেন বাতিস্তুতা। ফ্লোরেন্সের মানুষ বাতিস্তুতাকে ভালোবাসেন আরও বেশি। আর্জেন্টাইনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে স্টেডিয়াম প্রাঙ্গনে একটা ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য স্থাপন করেছিল ফিওরেন্টিনার সমর্থকেরা। তাতে লেখা ছিল, ‘সে এমন এক যোদ্ধা যে হার মানে না। সে শক্ত হাতেই লড়বে কিন্তু তার ভেতরের মনটা নিষ্পাপ।’

খেলোয়াড় থাকা অবস্থায় নিজের ক্লাবের সামনে নিজের ভাস্কর্য দেখতে কেমন লাগে, সেটা কেবল বাতিস্তুতাই বলতে পারবেন! ফুটবলে এমন ঘটনা বিরল তো বটেই, খুব সম্ভবত দ্বিতীয়টিও নেই।

মাঠে তিনি বুভুক্ষু ছিলেন সাফল্যের জন্য। কোনো এক ম্যাচে হয়ত খুব একটা বলের নাগাল পেলেন না। কিন্তু হাল ছাড়তেন না। হয়তো ৮০ মিনিট পর বলটা যুতমতো পেলেন ডিবক্সের বাইরে। সেখান থেকেই শট। বল তার কাছে মুলেতা, স্প্যানিশ বুলফাইটের লাল পতাকা। আর তিনি  ষাঁড়ের মতো শক্তিশালী। সব রাগ ঝাড়তেন ওই বলের ওপর। তারপর সেই বল আছড়ে পড়ত জালে। মাঝেমধ্যে মনে হত জালটাই হয়ত ছিঁড়ে ফেলবেন বাতিস্তুতা। গোলের সাথে উদযাপনটা আরও মানানসই। কিছুদূর দৌড়ে গিয়ে থামতেন। হাঁটু গেড়ে, দুই হাত দিয়ে বন্দুক বানিয়ে গুলি করতেন। কিছুক্ষণ আগে ধ্বংস করে দিয়ে এসেছেন প্রতিপক্ষকে, তাই এই ক্যানন সেলিব্রেশন। তাকেই তো মানায়! নিজের খারাপ দিনেও প্রতিপক্ষকে দুমড়ে মুচড়ে দিতেন একাই। পাওয়ার শটে ছিল তার নিখুঁত দক্ষতা, বাতাসেও ছিলেন শক্তিশালী- ক্লাসিক নাম্বার নাইনের উজ্জ্বল উদাহরণ।  

ফিওরেন্টিনার বেগুনি জার্সিতে লম্বা চুলে ব্যান্ড পরা এক লোক গোল করবেন, তারপর মাঠের কোণায় দাঁড়িয়ে গুলি ছুঁড়বেন হাত দিয়ে; সিরি আ-র নিয়মিত চিত্রই ছিল এই ঘটনা। দেখতে দেখতে ৯ বছর কাটিয়ে দিয়েছিলেন এভাবেই।

বয়স ৩১ পার করে ফেলেছেন ততদিনে। এবার মতটা বদলালেন বাতিস্তুতা। লা ভিওলাদের হয়ে যে কখনও লিগ জেতা হবে না সেটা হয়ত আগে থেকেই জানতেন, তবে মানতে চাইতেন না ঠিক। ফুটবল মাঠে তাঁর চরিত্রই যে ছিল এমন! অবশ্য বয়স ত্রিশ পার করে বাতিস্তুতাকে মেনে নিতে হলো বাস্তবতা।      

 

 ৭.

রোমের দুই ক্লাব লাৎসিও আর এএস রোমা। দুই দলের লড়াই বিশ্বের নামকরা ডার্বি। আগের মৌসুমে লিগ জিতে ফেলেছে লাৎসিও। ফ্রানসেস্কো টট্টি, ভিনজেঞ্জো মন্তেল্লারা রোমার হয়ে গোল করছিলেন ঠিকই। কিন্তু কোথায় যেন কিছু একটার অভাব ছিল দলে। লাৎসিও লিগ জেতার পর সেই অভাবটা পূরণ করতে আরও উঠে পড়ে লাগল রোমা।

বাতিস্তুতার চেয়ে ভালো সমাধান আর কে হতে পারে? ক্যারিয়ারের শেষের শুরুতে পৌঁছে গিয়েছিলেন বাতিগোলও, খুঁজছিলেন নতুন চ্যালেঞ্জ। ফিওরেন্টিনা ছেড়ে রোমায় গেলেন। তার জন্য রোমাকে দিতে হল ৩৬.৫ মিলিয়ন ইউরো! ত্রিশোর্ধ ফুটবলারদের জন্য দলবদলের রেকর্ড। আজও যে রেকর্ড রয়ে গেছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।

নতুন ক্লাবে টট্টির সাথে জুটি গড়ে আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠলেন বাতিস্তুতা। ১৯৮৩ সালের পর স্কুডেট্টো জিতল রোমা। ২০ গোল করে রোমার কিংবদন্তির জায়গায় বসে গেলেন বাতিস্তুতা, প্রথম মৌসুমেই। পরেরবার ওই ২০ গোলের কথা মাথায় রেখে ১৮ বদলে ২০ নম্বর জার্সি পরে মাঠে নেমেছিলেন বাতিস্তুতা।
 

তবে ফিওরেন্টিনার জন্য ভালোবাসা সবসময়ই অটুটই ছিল ‘এল এঞ্জেল গ্যাব্রিয়েলের’। ক্লাব ছাড়ার আগে সমর্থকদের কাছে ক্ষমা চেয়ে গিয়েছিলেন। রোমার জার্সি গায়ে যখন ফিওরেন্টিনার বিপক্ষে গোল করলেন তখনও উদযাপন করেননি। সতীর্থরা ঘিরে ধরেছিল গোলের পর, আড়ালে চোখ মুছেছিলেন বাতিগোল।

রোমায় কাটানো তৃতীয় বছরে আবার বদলে ফেলেন জার্সি নম্বর। এবার বয়সের সাথে মিলিয়ে, ৩৩। ততোদিনে বুড়িয়ে গেছেন বাতিগোল, খেলায় ধারও কমে এসেছে। ইন্টারে কিছুদিন ধারে কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত ইউরোপই ছেড়ে গেলেন। ক্যারিয়ারের শেষটা করেছিলেন কাতারে।

 

৮.

একটা সিরি আ। দুইটা কোপা আমেরিকা। একটা করে কোপা ইতালিয়া ও সুপার কোপা- বাতিস্তুতার অর্জনের খেরোখাতায় আঁকিবুঁকি করেছে শুধু এসবই। তবে তিনি মারিও কেম্পেসের বিশ্বকাপ জয়ের সময়ের আর্জেন্টাইন ছেলে, নিশ্চয়ই সব অর্জন ছাপিয়ে যেতে পারত আকাশি-সাদা জার্সি গায়ে একটা সোনালি ট্রফিই! নিয়তি অবশ্য এখানেও খালি হাতে ফিরিয়েছে তাকে।

'৯৪-তে প্রথমবার বিশ্বকাপে খেলতে নেমেই হ্যাটট্রিক করলেন বাতিস্তুতা। ততদিনে ‘নতুন ম্যারাডোনা’-র খোঁজ পেয়ে গেছে আর্জেন্টাইন সমর্থকেরা। রোমানিয়ার কাছে দ্বিতীয় রাউন্ডেই বাদ পড়ার পর খুব একটা আশা হারালেন না তিনি। বয়স তো পড়েই আছে! পরের বিশ্বকাপে যখন আবার হ্যাটট্রিক করলেন তখন তো দলের কান্ডারিই তিনি। দুই বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করা প্রথম খেলোয়াড় তখন বাতিস্তুতা, এখনও হয়ে আছেন একমাত্র। কিন্তু সেবার বাতিস্তুতার স্বপ্নভঙ্গ করলেন ডেনিস বার্গক্যাম্প। পরাবাস্তব এক মুহুর্তের জন্ম দিয়ে। শেষ সুযোগটা ছিল ২০০২ সালে, কোরিয়া-জাপানে। সেবারও প্রথম ম্যাচেই গোল করলেন। কিন্তু এবার শেষটা হল আরও খারাপ। কাগজে কলমে সেরা দল নিয়েও গ্রুপ পর্বের বাধাই পেরুতে পারল না আর্জেন্টিনা, যার শেষটা হলো ওই মিয়াগি স্টেডিয়ামে। যার টানেলের ভেতর একসময় মিলিয়ে গেলেন তিনি, তার আগে রেখে গেলেন ছলছল চোখের এক ছবি। 

বাতিস্তুতার সে ছবি দেখে আমাদের ঢাকাতেও কতো মানুষ কেঁদেছিলেন তার ইয়ত্তা নেই। আর্জেন্টিনার ‘চিরশত্রু’ যারা, সেই ব্রাজিলিয়ান সমর্থকেরাও বাতিগোলের জন্য আফসোস করেন। নায়কের এ কেমন প্রস্থান, কী নির্মম! নব্বইয়ের দশকে জন্ম নেওয়া ছেলেরা খেলা দেখে কাঁদতে শেখেনি তখনও। বাতিস্তুতা শিখিয়েছিলেন- অজানা, অপরিচিত, ভিনদেশীর জন্যও চোখ ভেজানো যায়।