• ফুটবল

চলে যাওয়ার আগে বাঁচতে শিখিয়ে গেলেন আস্তোরি

১.
জেনোয়ায় সিরি আ-র ‘আর্লি কিক অফ’, দুপুরের আগেই খেলা শুরু। সকাল থেকেই ভরতে শুরু করেছে স্টেডিয়াম, জেনোয়ার সাথে ক্যালিয়ারির ম্যাচ। দুই দলের সাথে অনুশীলনে যোগ দিয়েছেন রেফারিরাও। মাঠে হঠাৎ কেমন একটা জটলা। খেলোয়াড়দের চোখে-মুখে বিস্ময়, কেউ কেউ হাঁটা দিয়েছেন টানেলের দিকে। রেফারিদের আবেগ বোঝা যায় না, তারাই কিছু একটা বর্ণনা করছেন। আধ-ফাঁকা গ্যালারিতে তখনও খবর পৌঁছায়নি। কিছুক্ষণ পর জেনোয়ার লুইজি ফেরারিস স্টেডিয়ামের জায়ান্ট স্ক্রিনে ভেসে উঠল একট ছবি। জানান দিয়ে গেল, ৩১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছেন ফিওরেন্টিনা অধিনায়ক ডাভিডে আস্তোরি। জেনোয়ার সম্মতিতে সবার আগে খেলা বাতিল করল ক্যালিয়ারি। এই ক্লাবেই ৮ বছর কাটিয়েছেন আস্তোরি। ওই ম্যাচের পর একে একে পরিত্যক্ত হল সিরি আ-র সব ম্যাচ।

 

সেই আকস্মিক বার্তা 

 

২.
অ্যাওয়ে ম্যাচের দূরত্ব খুব বেশি না হলে সাধারণত শুক্রবারের আগে নিজেদের ডেরা ছেড়ে অন্যের এলাকায় ক্যাম্প করতে যায় না কোনো ক্লাব। খেলা রবিবারে হলে অনেক সময় আরেক শহরে যাওয়ার যাত্রাটা শনিবারেও হয়। সবমিলিয়ে বড়জোর দেড় দিনের একটা সফর, ৯০ মিনিটের ম্যাচ। কাঁধের ব্যাগ, আর একটা লাগেজ- এই নিয়েই চলে যাওয়া যায়। পেশাদার ফুটবলার, প্রতি মাসে এমন সফর কম না হলেও দুইটি তো করতেই হয় তাদের! ঘটা করে তাই পরিবারের কাছ থেকে বিদায় নেওয়াটাও হয় না সব ফুটবলারের। দুইদিন পরই ফিরে আসবেন, পেশাদার ফুটবলারের কাছে তো অফিস করার মতোই। 

আস্তোরিও এরকম একটা ম্যাচ খেলতেই গিয়েছিলেন উদিনেতে। দলের অধিনায়ক তিনি। ফিওরেন্টিনা যেখানেই যায়, হোটেলে তার জন্য বরাদ্দ থাকে আলাদা একটা রুম। ম্যাচের আগেরদিন নিয়ম করে কোচের বৈঠকেও গেলেন। নিজে ডিফেন্ডার, তার ওপর অধিনায়ক। একটা দলকে এক সুতোয় গাঁথার কাজটা তার চেয়ে ভালো আর কেইবা পারেন! টিম মিটিং শেষে রাতের খাবার খেয়ে সোজা চলে গেলেন নিজের রুমে। আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়েও হয়তো ছক কষছিলেন- পরদিন উদিনেসেকে হারানোর ছক।

 

 

আগের রাতে সবার শেষে তার রুম থেকে বেরিয়েছিলেন গোলরক্ষক মার্কো স্পর্তিয়েলো। সকালের নাস্তা খেতে গিয়ে হোটেলের লবিতে ডাক পড়ল তার। সবার প্রশ্ন শুনে খানিকটা চমকেই গেলেন স্পর্তিয়েলো, আস্তোরির খোঁজ তার কাছে জানতে চাইছে কেন সবাই? ‘কাপিতানো’ তো এতো দেরি করেন না! সেটা তো তার সতীর্থরাও জানেন। বরং ঘড়ির কাঁটা গুণে সকাল সাড়ে নয়টায় বেশিরভাগ দিনই সবার আগে হাজির হন তিনি। কারও কাছে খোঁজ না পেয়ে ফোন করা হলো, নিশ্চয়ই এবার ঘুম ভাঙবে আস্তোরির। আর নিচে নেমে কিছুটা লজ্জিত হবেন ঘুম ভাঙতে দেরি হওয়ায়, সেটা দেখে হাসির খোরাক জুটবে ক্লাবের তরুণদের!

বিদায়, আস্তোরি! 

 

আস্তোরির সেই ঘুম ফোনের রিংটোনেও ভাঙল না। হোটেল রুমের দরজা ভেঙে যখন সতীর্থরা ঢুকে পড়লেন ভেতরে, তখনও সাড়াশব্দ নেই তার। আস্তোরি ঘুমুচ্ছেন, নিথর এক দেহতে। এতক্ষণ অধিনায়কের বিব্রত চেহারা দেখার প্রস্তুতি নিচ্ছলেন যারা, তারাই তাড়াহুড়ো করে তাকে উঠিয়ে নিয়ে গেলেন অ্যাম্বুলেন্সে। ম্যাচ শেষে হোটেলেই ফেরার কথা ছিল আস্তোরির, সেখান থেকে ফ্লোরেন্সে। বাড়ি ফেরার তাড়া ছিল, দুই বছর বয়সী মেয়ে আর অনেক দিনের বান্ধবীর কাছে ফেরার তাড়া ছিল। কিন্তু আস্তোরি আর ফিরলেন না, ৩১ বছর বয়সে উদিনেসের ম্যাচের আগের রাতের ঘুমটা আর ভাঙলো না তার।

উদিনেসেকে হারানোর ছকটা বোধ হয় মনে মনে কেটেই ফেলেছিলেন সেই রাতে। দলকে নিয়ে টানেল দিয়ে ঢুকবেন মাঠে, পেছন থেকে নেতৃত্ব দেবেন, প্রতিপক্ষ স্ট্রাইকারদের ফাঁকি দিয়ে কেড়ে নেবেন বল, সেই বল যোগান দেবেন নিজের দলের স্ট্রাইকারদের। সবাইকে ফাঁকি দিতে পারলেন, কিন্তু অমোঘ সত্যটার কাছে ধরা পড়ে গেলেন! বড় অসময়েই। পেশাদার খেলোয়াড়ী ক্যারিয়ার চলার সময়ই মৃত্যুকে বরণ করা ফুটবলারদের অপ্রত্যাশিত তালিকায় ঢুকে গেলেন তিনি। 

৩.



অধিনায়ককে বিদায়ী বার্তা ফিওরেন্টিনার
 

যে কোনো মৃত্যুতেই শোকের ছায়া নেমে আসে ওই পরিবারে। কিন্তু খেলোয়াড়, বা সৃষ্টিশীল মানুষদের যাপিত জীবন তো আর দশটা সাধারণ মানুষের মতো নয়। তারা হাসাতে পারেন, শিহরণ জাগাতে পারেন, কাঁদাতে পারেন, কারও কারও গোটা জীবনটাও নাকি বদলে দিতে পারেন। অথচ তারাও  রক্ত মাংসে গড়া আমাদের মতোই মানুষ। আস্তোরি যেমন- দীর্ঘদেহী ডিফেন্ডার, একজন অ্যাথলেট, ডলসি অ্যান্ড গাবানার মডেলও হয়েছিলেন কয়দিন আগে। ইতালির জাতীয় দলে সুযোগ মেলে, দেশের প্রথম সারির একটি ক্লাবের অধিনায়কও তিনি। নিয়মিত থাকেন ডাক্তারদের নজরে। খাওয়া থেকে শুরু করে ঘুম- সবকিছুই তাদের মেনে চলতে হয় নির্দেশনা অনুযায়ী। কী অদ্ভুত তাই না? এতোকিছুর পরও একটা ভালো দিনের শেষে, বিছানায় গিয়ে, আরেকটা ভালো দিনের স্বপ্ন দেখতে দেখতে চলে যাওয়া যায়- না ফেরার দেশে, কাউকে কিছু না জানিয়েই।

 

 

মৃত্যুর কাছে ঋনী হয়েই জীবন শুরু হয় আমাদের- সেই সত্যটা আরেকবার মনে করিয়ে দিয়ে গেলেন আস্তোরি। এখান থেকে চাইলে ভীত হয়ে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করা যায়, নয়তো বেঁচে থাকার আনন্দ খোঁজা যায়। বেঁচে থাকার মুহুর্তগুলোতে আক্ষরিক অর্থেই বেঁচে ছিলেন তিনি। তাঁর মৃত্যুতে তাই থমকে গেছে ইতালি। থমকে গেছে ফুটবলের একটা বিশাল অংশ। তাঁর পরিবার, বন্ধুদের মাঝে তিনি বেঁচে থাকবেন চিরকাল। কিন্তু আমরা যারা তাঁকে শুধু টেলিভিশন পর্দায় দেখেছি, ফিফা গেমের ম্যানেজার মোডে কাড়ি কাড়ি ইউরো খরচ করে নিজের দলে ভিড়িয়েছি, তারা চাইলে তাঁর জীবন থেকেই খুঁজে নিতে পারি বেঁচে থাকার টোটকা। আস্তোরি একবার বলেছিলেন, 'আমি আমার কাজটা খুব ভালোবাসি। আমি আসলেই ফুটবলটা খুব বেশি ভালোবাসি। যখন আমার বয়স ১৮ ছিল, তখন যত না ভালোবাসতাম এখন তার চেয়েও বেশিই ভালোবাসি।'

নিজের কাজটা ভালোবাসতে পারলে বোধ হয় মরে গিয়েও বেঁচে থাকা যায়- আস্তোরির মতো। ফুটবল তো একটা 'খেলা'-ই মাত্র, কিন্তু এর চেয়েও বড় খেলার নাম তো জীবন! 

যে খেলার শেষ বাঁশিটা আস্তোরিকে শুনতে হলো বড্ড আগেই! সে খেলায় কে জিতলেন, কে হারলেন- সেই জটিল প্রশ্নটাই শুধু রয়ে গেল আরেকবার।