• ক্রিকেট

যে জয় তাড়িয়েছে ভয়

পোস্টটি ৬৪৮৮ বার পঠিত হয়েছে


প্রকৃতি মাঝেমধ্যেই খেলতে পছন্দ করে। আমরা তখন সেই খেলার পুতুল মাত্র। কাল যখন মুস্তাফিজ বল করতে ছুটে আসছিলেন, শেষবলে দরকার ছিল ৪ রান, আমার মনের ক্যানভাসে বারবার নিদাহাস ট্রফি ফিরে ফিরে আসছিল। প্রিয় মানুষ সম্বন্ধে নাকি নেতিবাচক কথাই আগে মনে পড়ে, তাই বলেই কি ২০১০ এ রুবেলের করা শেষ ওভার ছাড়িয়ে আমার বারবার মনে ভাসছিল নিদাহাস ট্রফি?

সেখান থেকে মুস্তাফিজ যা করলেন তা অনন্য, অসাধারণ, ম্যাজিকময়! খুব সম্ভবত চাঁদের বুড়ি আর ম্যাজিকম্যান মিলেও এতটা জাদু দেখাতে পারতেন না। রূপকথার কোন জাদুকরও এমনভাবে এমন সময়ে ছড়ি ঘোরাতে পারতেন না।

আজকের ম্যাচটি আমাদের জন্যে ছিল 'ডু অর ডাই' সিচুয়েশনের। আগের ম্যাচে ক্লোজ কাউন্টারে হারায় আফগানিস্তানের আত্মবিশ্বাসের পারদ ছিল উঁচুতে, আমাদের চেয়ে বেশি কেননা আমরা আগের ম্যাচে একরকম বিধ্বস্ত হয়েছি।

ক্যাপ্টেন যখন টস করতে এলেন, বোঝাই যাচ্ছিল মাশরাফি আছেন বিষম চাপে। কলার উঁচু, সদা আক্রমণাত্মক সেই মাশরাফি কে এই মাশরাফির মধ্যে খুঁজে পাওয়া হয়ে যাচ্ছিল দুষ্কর। ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে, 'When you get, you will get full of bucket' স্রষ্টা কি তবে মুখ তুলে চাইলেন? ক্রিকেটে ভাগ্য ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ কেননা খেলাটা শুরুই হয় টস দিয়ে, আবু ধাবীর এই পিচে তো সেটা আরো বেশি। ভাগ্য শুরুতেই সুপ্রসন্ন হল। ক্যাপ্টেন টস জিতলেন, নিলেন ব্যাটিং।

তবে চমক তখনও শুরুই হয়নি। দেশ থেকে তড়িৎ গতিতে ইমরুল কায়েস কে যে উড়িয়ে আনা হল, মাশরাফি যখন বললেন কায়েস দলে আছে সৈকতের বদলে, আমরা ভেবে নিয়েছিলাম ইমরুল হয়তো ওপেন করবেন। '৩ নম্বরের ভবিষ্যৎ' ভাবা শান্তকে ঠেলে দেওয়া হবে ৩ নম্বরেই। কিন্তু এ কি! জাতীয় সংগীতের পর নেমে গেলেন লিটন দাস আর নাজমুল হোসেন শান্ত!

এটুকু তে যদিও বা 'ইমরুল তবে ৩ এ' ভেবে কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছিলাম, মিথুন কে প্যাড-আপ অবস্থায় দেখে চিন্তার ঘুরপাক শুধুই বেড়ে যাচ্ছিল। প্লেয়ার্স বেঞ্চ এ যখন ইমরুলকে কোথাও দেখতে পেলাম না, মনের কোণে তখন ছোট্ট একটা প্রশ্ন উকি দিয়েও গর্তে ফিরে যাচ্ছে, 'কায়েস কি তবে ৬ এ?' কিন্তু আর যাই হোক কায়েস তো ঐ পজিশনের খেলোয়াড় নন!

প্রতিভা বড্ড অদ্ভুত। এই প্রতিভার কথক উড়িয়ে উন্মুক্ত চাঁন্দ হারিয়ে গেছেন ক্রিকেট মানচিত্র থেকে যার কিনা বিরাট কোহলির চেয়েও সেরা হবার কথা ছিল। আবার এই প্রতিভার কথক না উড়িয়েই গ্লেন ম্যাকগ্রা কালজয়ী হয়ে উঠেছেন! প্রতিভা তবে নাজমুল শান্তর সাথেও এমন পাশা খেলবে কিনা এখনই বলা মুশকিল, বয়স তো সবে রশিদ খানের সমান-২০! পথ এখনও ঢের বাকি, পাঞ্জেরী এখন বহুদূর তবুও শেষ ৩ ম্যাচে তার শট সিলেকশন, উইকেটে নড়াচড়া ভাল কিছুর আশা করতে সাবধানই করে!

পঞ্চপান্ডবের সবাই একবাক্যে স্বীকার করবেন ক্লাস কম্প্যারামেন্ট এ লিটন দাস এ দেশের ক্রিকেটে অন্যতম সেরা, হয়তো সবচেয়ে সেরা! কিন্তু ঐ যে? প্রতিভার পাশা খেলা! তা সেই প্রতিভার ছিটেফোটা ছাপ তিনি রশিদ কে মারা লফটেড শটে কিছুটা হলেও দেখিয়েছেন। কমেন্ট্রিতে যখন বলা হচ্ছিল শটটি এই টুর্নামেন্টেরই সেরা শট কিনা তখন তিনি যেন বুঝিয়ে দিলেন, 'ক্রিকেট টা মাথা দিয়েও খেলতে হয়!' অন্তত, পরের বলেই অফ স্ট্যাম্পের বাইরের বলে প্রতিপক্ষের সেরা বোলারকে স্লগ সুইপের কোন অর্থ হয় না!

এরপর শুরু কলাপ্স! রশিদ খান কে উইকেট না দেবার পণ করা ব্যাটসম্যানেরা রান আউট হয়ে এলেন। সাকিব আল হাসান কি বুঝে বলটা কোনমতে ঠেলে দিয়েই দৌড় লাগালেন কে জানে, ইমরুল কায়েসই বা কেন দুই স্টেপ এগিয়ে ফিরে যেতে চাইলেন কে জানে, তবে এতসব 'কে জানে' র মাঝে ইমরুল হয়তো জেনে ফেলেছিলেন আজকের ম্যাচটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ তার নিজের জন্যেও।

দলের বাইরে তিনি তো বটেই, এমনকি ক্যাপ্টেন কোচ কারো পরিকল্পনাতেও তিনি সেভাবে নেই। সেই তিনি কি দারুণই না খেললেন! কত সাবলীলভাবেই না রশিদ খান কে সামলালেন। ফিটনেসের দোহায় দিয়ে বারবার উপেক্ষা করা ইমরুল কায়েস এই গরমে ক্রিজে দিব্যি কাটিয়ে দিলেন ৩০ ওভার! এই কায়েস অচেনা, এই কায়েস সেরা!

এরপর যে মানুষটির কথা বলব তিনি সম্ভবত বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্যে এক আশীর্বাদ। কে জানে, রবার্ট ব্রুসের হাতে একজন মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ থাকলে যুদ্ধ আর দ্বিতীয়বারে যেত কিনা! চাপের মুখে ত্রাতা মাহমুদুল্লাহ রিয়াদকে বর্ণনা করা যায় না, ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না, শুধুমাত্র কুর্নিশ করা যায়!

শুরুর ধাক্কার পর স্কোরবোর্ডে জমা হল ২৪৯! জয়ের জন্যে যথেষ্ট। যেখানে আবু ধাবীর এই উইকেটে ২৫০+ চেজ করে জেতার হার মাত্র ১৫%। সবকিছুই চলছিল পরিসংখ্যান মোতাবেকই। কিন্তু পরিসংখ্যানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মিথুন ফেলে দিলেন শাহজাদের ক্যাচ, অভিষিক্ত অপু হলেন উইকেটবঞ্চিত!

একবার জীবন পেয়ে শাহজাদ আর কিছু না ভেবে করে ফেলেন হাফ সেঞ্চুরি। সেখান থেকে তাকে থামাতে হলে ক্যাপ্টেনের লাগত বিশেষ কাউকে। সেই বিশেষ কেউ টা কে? এ সময় যাকে লাগে তিনি ছাড়া আবার কে? মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ! স্রষ্টার আশীর্বাদের মহিমা বড্ড রহস্যময়!

ম্যাচ ক্রমাগতই কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। আফগান কাপ্তান আসগর আর আফগান ডিপেন্ডেবল হাশমতুল্লাহ শাহিদী মিলে ম্যাচে যখন বাঘের সাজানো ডিনারকে ফেলেই দিচ্ছিলেন তখনই আবার মাশরাফির জোড়া ধাক্কা! মাশরাফি স্বস্তিতে নেই বোঝা যাচ্ছিল, ব্যাটিং এর সময়ও আউট হয়ে প্যাভিলিওনে ফেরার পথে খোঁড়াচ্ছিলেন। সেই মাশরাফির জোড়া আঘাতে সাজঘরে একসাথে দুইজন। পেন্ডুলামের মত দুলতে থাকা সরল দোলক সদৃশ ম্যাচের বব তখন একদম সাম্যাবস্থায়!

মোহাম্মদ নাবীর ভূত দেরাদুন থেকে উড়ে আসছিল আবু ধাবীতেও। সেই ভূত তাড়াতে লাগল সাকিবের টোপ যা কিনা নাবী গিলে ফেললেন আরামসে। কিছুক্ষণ আগেই ক্যাচ না নেওয়া শান্ত এবারের ক্যাচে যেন প্রায়শ্চিত্ত করলেন!

এরপর সেই লাস্ট ওভার। ৬ বলে ডিফেন্ড করতে হবে মাত্র ৭ রান। মডার্ন ডে ক্রিকেটে যেটা আসলে কোন ব্যাপারই নয়, শিশিরভেজা উইকেটে তো ব্যাপার আরো সহজ। কিন্তু 'কিছু ছেলে থাকে যাকে সবসময়ই বিশ্বাস করা যায়', ঠিক তেমনই একজন বোধহয় মুস্তাফিজ। ৫ ওভার পরেই তিনি বল করতে পারছিলেন না, সেই তিনিই ম্যাচ জেতালেন একজনের অনুপ্রেরণাতে, যিনি ভাঙ্গা হাতে ব্যাটিংয়ে পাঠাতে তামিমকেও অনুপ্রাণিত করেছিলেন.. তিনি একজন যোদ্ধা, একজন সেনা, গ্রীক পূরাণের হারকিউলিস যার কাছে নয় মাথাওয়ালা দানবও তুচ্ছ! তিনি মাশরাফি বিন মুর্তজা!

এভাবেই মুস্তাফিজ আটকে দিলেন আফগান জয়রথ, দীনেশ কার্তিকের ভূত সামিউল্লাহ শেনওয়ারির উপর ভর হওয়ার আগেই বুদ্ধিদীপ্ত এক বাউন্সারে তা তাড়িয়ে দিলেন। আমরা পেলাম এমনই এক জয় যা গত কয়েকদিনে বড্ড প্রয়োজন ছিল। যার জন্যে আমাদের শরীরি ভাষা ঠিকরে বের হতে পারছিল না..... পরিশেষে যার জন্যে আমরা আফগান জুজু তাড়াতে পারছিলাম না।

 

'প্যাভিলিয়ন ব্লগ’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। প্যাভিলিয়ন ব্লগে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি এবং ভিডিওর সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক এবং মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।