• ফুটবল

আক্ষেপের কাছে যেন ভালবাসা হেরে না যায়

পোস্টটি ২৩৫৬ বার পঠিত হয়েছে

আক্ষেপের কথা পরে হবে। ভালবাসা দিয়ে শুরু করা যাক।


কবিগুরু লিখে গেছেন -"তুমি যে সুরের আগুন লাগিয়ে দিলে মোর প্রাণে, এ আগুন ছড়িয়ে গেল সবখানে।" কবিগুরুর কথা টেনেই আজ এমন একজন জাদুকরের কথা বলবো যিনি কিনা আগুন লাগিয়েছেন সবুজ গালিচায়। সে আগুন সবখানে শুধু ছড়িয়েই যায়নি এ আগুনে ঝলসে ধন্য হয়েছে আমার মত হাজার-কোটি ভক্তের হৃদয়।


একটু পিছনে ফেরা যাক। ২০০৬ সাল, জার্মানিতে ফুটবল বিশ্বকাপ। এই সময়টাতেই মূলত ফুটবলের প্রতি ভাললাগার শুরু। বাবা সে সময়টায় প্রায়ই '৮৬ সালে ম্যারাডোনার অতিমানবীয় কীর্তির গল্প করতেন, আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ের স্মৃতিচারণ করতেন। কোন এক অজানা কারনে তখন থেকেই ধীরে ধীরে আর্জেন্টিনার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ি। আর এভাবেই পরিচয় 'লা পুলগা'র সাথে। পুরো নাম লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। ফুটবল বিশ্বের অমূল্য গুপ্তধন।

 

_gift_ - L30MESSI _gift_

 

মেসির জন্যই মূলত বার্সেলোনা ফুটবল ক্লাবকে সমর্থন শুরু করি। এখন আমি পুরোদস্তুর কাতালান সমর্থক। ২০০৮-২০১২ ছিল বার্সেলোনার সোনালী সময়। এই পাঁচ বছরে বার্সেলোনা ট্রফিকেসে যোগ করেছে ১৪টি ট্রফি। এই সময়টাতেই মেসির কুঁড়ি থেকে ফুল হয়ে ফোঁটা, নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া। ফুটবল, মেসি, আর্জেন্টিনা ও বার্সেলোনার প্রতি ভাললাগাটা ভালবাসায় রূপ নেয়।

২০১১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। আমার আঠারোতম জন্মদিন। জন্মদিনের সবচেয়ে বড় উপহারটি সেদিন পেয়েছিলাম৷ সন্ধ্যায় যখন বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে মেসি বাহিনী মাঠে নামল সেটি ছিল আমার কাছে স্বপ্নের চেয়েও বেশিকিছু। স্টেডিয়াম থেকে কয়েকশ মাইল দূরে টিভির সামনে বসে খেলা দেখার সময় মনে হচ্ছিল যেন গ্যালারিতে বসে ভিনগ্রহের জাদুকরের ফুটবল শৈলীর অপূর্ব প্রদর্শন দেখছি। সেদিন উত্তেজনায় চোখের কোণে দু'ফোটা জল জমাটাই স্বাভাবিক ছিল।

image
এরপর অনেকটা সময় পেরিয়ে গেল। বা পায়ের জাদুতে রেকর্ড বইয়ের অনেক পাতা নতুন করে লিখতে বাধ্য করলেন আর্জেন্টিনার রোজারিওতে জন্ম নেওয়া এই জাদুকর। কি নেই তার ঝুলতে! সর্বোচ্চ পাঁচ বার ফিফা বর্ষসেরা পুরষ্কার, লা লিগার ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোল, সর্বোচ্চ এসিস্ট, এক বর্ষপঞ্জিতে প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে সর্বোচ্চ গোল, বার্সেলোনার হয়ে সর্বোচ্চ ৩১টি শিরোপা। আর মেসি-রোনালদো দ্বৈরথ তো ইতিহাসেরই অংশ হয়ে গেছে। কিন্তু এতসব অর্জনের পরও একটি অপূর্ণতা রয়ে গেছে। আকাশি-সাদা জার্সিতে যে বড় কোন শিরোপা জেতা হয়নি। সর্বকালের সেরার প্রশ্নে এই একটি শিরোপাই বাধা হয়ে দাড়িয়ে আছে।


সুবর্ণ সুযোগটা এসেছিল ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে। কিন্তু বিধিবাম। ফাইনালে মেসির কান্নাভেজা চোখে মাঠ ছাড়ার দৃশ্যটি তীক্ষ্ণ ফলার মতো বুকে বিঁধেছিল। সেদিনও চোখের কোণে দু'ফোটা জল জমেছিল। এরপর ২০১৫ ও ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালেও আর্জেন্টিনাকে একই পরিণতি বরণ করতে হল। ভাগ্যদেবী যেন সব দিয়েও শেষে এসে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। মনে হচ্ছিল যেন কেউ পুরনো ক্ষতে বারবার আঘাত করছে।

messi-7
২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপ। পরিস্থিতি এমন যেন মেসির জন্য হলেও আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ ঘরে তুলবে। কিন্তু শুরু হতে না হতেই আশার প্রদীপ নিভে গেল। দ্বিতীয় রাউন্ডে ফ্রান্সের বিপক্ষে ম্যাচ শেষে কাজান এরিনার সবুজ ঘাসে একাকী দাড়িয়ে তিনি। চোখ দুটো ছলছল করছিল। কাঁদতে গিয়েও পারছিলেন না। ওই নরম ঘাসে স্থবির হয়ে ছিল তার চারপাশ। আজ আর কাঁদবেন না তিনি। এর আগে বহুবার কেঁদেছেন। লিওনেল মেসি, বর্তমান ফুটবল জগতের সবথেকে আশ্চর্যতম ধ্রুবতারাটিকে বিশ্বকাপের মঞ্চে আবার দেখা যাবে কিনা তা সময়ই বলে দিবে।


আরেকবার চার বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার সূচনা। আক্ষেপের পর আবার নতুন করে আশায় বুক বাঁধা। এটাই হয়ত ফুটবলের স্বার্থকতা। তবে সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ের সোনায় মোড়ানো স্মারকটি উঁচিয়ে ধরতে না পারা যেন ফুটবলেরই ব্যর্থতা। এই আক্ষেপ হয়তো থেকে যাবে সারা জীবন। বেঁচে থাক ফুটবলের প্রতি ভালবাসা। আক্ষেপের কাছে যেন ভালবাসা হেরে না যায়।

 

                                                                                                                                                                                                                 

'প্যাভিলিয়ন ব্লগ’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। প্যাভিলিয়ন ব্লগে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি এবং ভিডিওর সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক এবং মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।