• ফুটবল

দাগ থেকে দারুন কিছু হওয়ার সাক্ষী সেলেসাওরা...

পোস্টটি ৬৪১ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

'দাগ থেকে যদি দারুণ কিছু হয়, তাহলে দাগ-ই ভালো'- সার্ফেক্সেলের এই বিজ্ঞাপনের সাথে কে-ই বা পরিচিত নয় বলুন। দাগ থেকে আগতে দারুন কিছু হয়, নাকি শুধুই বিজ্ঞাপনের খাতিরে এটা বলার জন্য প্রচার করা হয়- সে তর্কে না-ই গেলাম৷ তবে আক্ষরিক অর্থে যদি বলি দাগ থেকে ফুটবলে দারুন কিছু হয়; তাহলে সেটা কি বড্ড বেমানান শুনাবে? 

 

হয়তো শুনাবে। তবে তা সেলেসাও ফ্যানদের কাছে না। দাগ থেকেও যে দারুন কিছুও হয়- সেটার সাক্ষী যে তারা৷

 

ব্রাজিল তখন নিজেদের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বাজে অবস্থানে। যে ব্রাজিল ফুটবলের রাজত্ব চালিয়েছে বছরের পর বছর, র্যাংকিং-এর শীর্ষস্থানটা যাদের দখলে ছিল সবচেয়ে বেশী। যাদের রক্তে মিশে আছে ফুটবল। যাদের বলা হয়ে থাকে ফুটবলের আঁতুড়ঘর। সেই ব্রাজিলের এমন অচেনা রূপ আগে কখনো দেখেনি বিশ্ব। পাঁচ তারকা সম্বলিত হলুদ জার্সিটায় এক লজ্জাজনক দাগ লেগে গেছে ততোদিনে! 

 

সালটা ২০১৩, রেংকিংয়ে ব্রাজিলের অবস্থান ২২ নাম্বারে। ২০১০ বিশ্বকাপে হারের পর ২০১১ কোপাতেও ব্যর্থ ব্রাজিলের দায়িত্ব আবার তুলে দেওয়া হয় ২০০২ বিশ্বজয়ী কোচ স্কলারির হাতে।

উদ্দেশ্য ঘরের মাঠে ২০১৪ বিশ্বকাপ জয়।

তার আগে ঘরের মাঠে কনফেডারেশন কাপ জয় করাও ছিল অন্যতম লক্ষ্য।

 

স্বাগতিক দল হিসাবে ২০১৩ কনফেডারশন কাপ খেলার সুযোগ পায় ব্রাজিল। কনফেডারেশন মূলত বিশ্বকাপের পর ফিফার সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসর। ৬ টি মহাদেশ চ্যাম্পিয়ন দল, বিশ্বকাপ জয়ী দল ও স্বাগতিক দল নিয়ে প্রথমে ২ বছর পর পর অনুষ্ঠিত হলেও ২০০১ সালের পর থেকে প্রতি ৪ বছর পর পর আয়োজিত হয় এই টুর্নামেন্ট।

 

১৯৯২ সালে কিং ফাহাদ নামে শুরু হয় এই টুর্নামেন্টের পথচলা। তখন সৌদি ফুটবলের আমন্ত্রনে ৮ দল নিয়েই হত এই টুর্নামেন্ট।

১৯৯৭ সালে এটা কনফেডারশন কাপ হিসাবে ফিফার অধিনে পরিচালনা শুরু হয়।

এখন পর্যন্ত কনফেডারেশন কাপের সবচেয়ে সফল দল ব্রাজিল।

 

হ্যাটট্রিক সহ ৪ বার এই শিরোপা জয়ের রেকর্ড আছে ব্রাজিলের। কনফেডারেশন নাম হওয়ার পর প্রথম আসর ১৯৯৭ সালে কনফেডারেশন কাপে সুযোগ পায় ব্রাজিল। প্রথম বার অংশ নিয়েই বাজিমাত। রোনালদো ও রোমারিওর হ্যাটট্রিকে অস্ট্রলিয়াকে ৬-০ গোলে হারিয়ে শিরোপা ঘরে তুলে রোনালদো-রোমারিওরা। 

১৯৯৯ সালে শিরোপার খুব কাছে গিয়েও মেক্সিকোর সাথে ৪-৩ গোলে হেরে রানার্স আপ হয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয় তাদের।

 

২০০১ সালে সেমিতে থমকে গিয়েছিল ব্রাজিলের যাত্রা। তবে সবচেয়ে বাজে কনফেডারেশন কাপ ছিল ২০০৩ সাল। সেবার প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় নিতে হয়েছিল সেলেসাওদের।

 

২০০৫ সালে এসে আবার শিরোপার স্বাদ পায় ব্রাজিল। আদ্রিয়ানোর জোড়া গোল এবং কাকা ও দিনহোর এক গোলে আর্জেন্টিনাকে ৪-১ গোলে হারিয়ে ২য় বারের মত কনফেডারেশন কাপ জয় করে ব্রাজিল। ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রকে ৩-২ গোলে হারিয়ে ৩য় বারের মত কনফেডারেশন কাপ জয় করে কাকা-ফ্যাবিয়ানোরা।

২০১৩ সালে স্পেনকে আকাশ থেকে মাটিতে নামিয়ে টানা ৩য় বারের মত কনফেডারেশন কাপ জয় করে নেইমাররা।

 

২০১৩ সালে কনফেডারেশন কাপ খেলতে নামার আগে খুবই বাজে অবস্থানে ছিল ব্রাজিল। ২২ নাম্বার র্যাংকিং-এ থেকে স্বাগতিক হয়ে সেবার কনফেডারেশন কাপে সুযোগ পায় ব্রাজিল।

দলের মূল ভরসা ২১ বছর বয়সী সদ্য স্প্যানিশ জায়ান্ট বার্সাতে নাম লেখানো নেইমার জুনিয়র। অভিজ্ঞ আর তারুণ্য নির্ভর দল নিয়ে বাজে অবস্থানে থেকেও আসরের হট ফেভারিটদের হারিয়ে অপরাজিত থেকেই শিরোপা ঘরে তুলে ব্রাজিল।

 

গ্রুপ পর্বে এশিয়ান জায়ান্ট জাপানকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে শুভসূচনা করে নেইমাররা।

খেলার মাত্র ২ মিনিটেই ডি বক্সের বাহির থেকে দুর্দান্ত শটে গোল করে বিশ্বকে নিজের প্রতিভার জানান দিয়েছিলেন নেইমার। পরের ম্যাচে উত্তর আমেরিকান চ্যাম্পিয়ন মেক্সিকোকে ২-০ গোলে হারায় সেলেসাওরা। সে ম্যাচেও বা পায়ের দৃষ্টিনন্দন ভলিতে দলের হয়ে একটি গোল করেন নেইমার।

 

গ্রুপের শেষ ম্যাচে আসরের অন্যতম ফেভারিট ইউরো রানার্সআপ ইতালিকে ৪-২ গোলে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েই সেমির টিকেট কাটে নেইমার-ফ্রেডরা। ব্রাজিলের হয়ে জোড়া গোল করেন আসরের সর্বোচ্চ গোলদাতা ফ্রেড। ফ্রি কিক থেকে বিশ্বের অন্যতম সেরা গোলরক্ষন বুফনকে বোকা বানিয়ে টানা ৩ ম্যাচে গোল আদায় করে নেন নেইমার। অপর গোলটি আসে দান্তের পা থেকে।।

 

গ্রুপ পর্বের ৩ ম্যাচেই গোল করে নিজেকে প্রমাণ করার পাশাপাশি নিজেদের ইতিহাসের সবচেয়ে বাজে অবস্থানে থাকা একটা দলকে টেনে নিয়ে যান সেমির মঞ্চে। সেমিতে কোপা চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়েকে ২-১ গোলে হারিয়ে ফাইনালে পৌঁছায় স্কলারি শিষ্যরা। ফাইনালে প্রতিপক্ষ তখনকার সময়ের সেরা দল স্পেন।

 

স্পেন তখন আকাশে উড়ছিল। সেসময়ের স্পেন দলটি ছিল তাদের ইতিহাসের সেরা একটি দল। ২০০৮ ইউরো, ২০১০ বিশ্বকাপ, ২০১২ ইউরো।

টানা ৩ টি মেজর টুর্ণামেন্টর শিরোপাধারী ক্যাসিয়াস, পিকে, রামোস, জাভি, ইনিয়েস্তা, তোরেসদের নিয়ে গড়া বিশ্বসেরা দল স্পেন। ব্রাজিল স্পেনকে হারাবে এটা অনেকের কাছে স্বপ্নই মনে হচ্ছিল।

 

কিন্তু দলটার নাম যে ব্রাজিল। দলটি সামান্য হোচট খেলেও যে হারিয়ে যায়নি, সেটা কি কারো মাথায় ছিল? এক টানে আকাশ থেকে মাটিতে নামিয়ে আনলো স্পেনকে। গুনে গুনে ৩ বার রামোস-পিকের ডিফেন্স ভেদ করে ক্যাসিয়াসকে ফাকি দিয়ে স্পেনের জালে বল জড়ায় নেইমার ও ফ্রেড।

 

বাংলাদেশ সময় ১ জুলাই ভোর ৪ টা।

শুরু হল কনফেডারেশন কাপের ফাইনাল ম্যাচ।

খেলার মাত্র ২ মিনিটেই স্প্যানিশ ডিফেন্স দূর্গ ভেঙ্গে বল জালে জড়িয়ে পুরো মারাকানাকে আনন্দের জোয়ারে ভাসিয়ে দেন নাম্বার নাইন ফ্রেড।

 

গোল শোধ করার দারুন সুযোগ পায় স্পেন।

জুলিও সিজারকে ফাঁকি দিয়ে ব্রাজিলের জালে বল জড়িয়ে দিচ্ছিলেন ফার্নান্দো তোদের। হঠাৎ যেন উড়ে এসে জুড়ে বসলেন ডেভিড লুইজ। বল গোলবার অতিক্রম করার আগ মুহুর্তে চোখের পলকে এসে বল ক্লিয়ার করে ব্রাজিলকে রক্ষা করেন ডেভিড লুইজ।

 

বিরতির আগে অস্কারের পাস থেকে বা পায়ে নেইমারের বুলেট শট খুঁজে নেয় স্পেনের জালের ঠিকানা। র্যাংকিং-এর শীর্ষ দলের এমন অসহায় আত্মসমর্পণ হতাশায় রূপ নিল রাইভাল শিবিরে।

বিরতি থেকে এসে ফ্রেডের আরেকটি গোল।

৩-০ গোলে এগিয়ে সেলেসাওরা।

৬৮ মিনিটে দ্রুতগতিতে বল নিয়ে ছুটে চলা নেইমারকে ফাউল করে সরাসরি লালকার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন পিকে। ১০ জনের দলে পরিণত হয় স্পেন। তবে শেষমুহুর্তে আর কোন গোল না হওয়ায় স্পেনকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে টানা ৩য় বারের মত কনফেডারেশন কাপ নিজেদের করে নেয় ব্রাজিল। ফার্নান্দো তোরেসের সাথে ৫ গোল করে যৌথভাবে আসরের সেরা গোলদাতা হন নাম্বার নাইন ফ্রেড।

 

আর পুরো আসরে ৪ গোলের সাথে ৪ এসিস্ট করে কনফেডারেশন কাপের সেরা প্লেয়ার নির্বাচিত হন ব্রাজিলিয়ান সুপারস্টার বনে যাওয়া নেইমার জুনিয়র।

 

- শাহ আহমদ উজ্জ্বল