• ক্রিকেট

বাংলাদেশের প্রথম ওয়ানডে সিরিজ জয়ের স্মৃতিচারণ

পোস্টটি ৫৮৮ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পর ২০০০ সাল থেকে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক ওয়ানডে সিরিজ খেলা শুরু। এরপর জিম্বাবুয়ে আর ভারতের সাথে দুটো সিরিজে সিরিজ জয়ের কাছাকাছি এলেও শেষ হাসি হাসতে পারেনি বাংলাদেশ। অবশেষে এলো ২০০৫ সালে জিম্বাবুয়ের বাংলাদেশ সফর। ঐতিহাসিক এই সিরিজে প্রথম টেস্ট জয়ের পাশাপাশি প্রথমবারের মত ওয়ানডে সিরিজ জেতে বাংলাদেশ। সেই সিরিজের শেষ ম্যাচের কিছু স্মৃতিচারণই আজ করা যাক।

সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচ হেরে বাংলাদেশ ব্যাকফুটেই ছিল। পাঁচ ম্যাচ সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচ হেরে শেষ পর্যন্ত সিরিজ জেতার রেকর্ড সাউথ আফ্রিকা ছাড়া আর কারো ছিলোনা। তবে পরের দুই ম্যাচ জিতে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছিলো টাইগাররা। সিরিজের শেষ ম্যাচ হয়ে যায় একই সাথে সিরিজ নির্ধারনী এবং ইতিহাসের হাতছানি দিতে থাকা এক ম্যাচ।

ম্যাচ শুরুর আগেই ধাক্কা খায় টাইগাররা। ফর্মে থাকা রাজিন ইনজুরির জন্যে বাইরে চলে যান। তার যায়গায় আসেন অলক কাপালি। এছাড়া বাঁহাতি স্পিনারদের বিরুদ্ধে জিম্বাবুয়ের ছন্নছাড়া অবস্থা দেখে তিন স্পিনার খেলানোর সিদ্ধান্ত হয়। বর্ষীয়ান খালেদ মাহমুদের জায়গায় আসেন টেস্ট সিরিজ সেরা এনামুল হক জুনিয়র।

আগের চার ম্যাচেই প্রথমে ব্যাট করা দল জয়লাভ করে। কাজেই টস জিতে জিম্বাবুয়ে ক্যাপ্টেন টাটেন্ডা টাইবু চোখ বুঁজে ব্যাটিং নেন। স্টুয়ার্ট মাতসিকেনেরি এবং বার্নি রজার্স ওপেনিং নামেন। মাত্র ১২ রানেই মাতসিকেনেরিকে এলবিডব্লিউ এর ফাঁদে ফেলেন নাজমুল। দলীয় ৪৪ রানে মাসাকাদজাও প্রয়াত মানজারুল ইসলাম রানাকে ফিরতি ক্যাচ দিয়ে ফেরত আসেন। দলের হাল ধরেন ব্রেন্ডন টেলর। এই দুজন মিলে ৩৫ ওভার পর্যন্ত আর উইকেট হারাতে দেননি। তবে জুটিতে রান যোগ হয় মাত্র ৯৫। টেলরকে আউট করে জুটি ভাঙ্গেন রফিক। পাঁচ ওভার পরই রানের গতি বাড়ানোর চেষ্টার বলি হন ইনিংসের সর্বোচ্চ ৮৪ রান করা রজার্স। এনামুলের বলে স্টাম্পিং এর শিকার তিনি।

পরের দশ ওভার শুধু জিম্বাবুইয়ানদের উইকেটে আশা-যাওয়ার গল্প। রজার্স-টেলর জুটির ধীর ব্যাটিং এর মাশুল গুণলো দল। রান বাড়ানোর চেষ্টায় সবাই বিলিয়ে এলেন নিজ উইকেট। একমাত্র টাইবু ৩১ রান করে কিছুটা প্রতিরোধ দেখান। মাশরাফির ইয়র্কারে তাঁর আউটের সাথে সাথে জিম্বাবুয়ের ইনিংস শেষ হয় ১৯৮ রানে। বাংলাদেশের বোলিং যেন ছিলো দলীয় প্রচেষ্টার অপূর্ব উদাহরণ। রফিক, নাজমুল, এনামুল প্রত্যেকের দুইটি করে উইকেট। মাশরাফি ও মানজারুলের একটি করে। দুইজন রান-আউট। তবে ইর্ষনীয় ছিলো ইকোনমি রেট। তিন স্পিনার মিলে ৩০ ওভার করে সাকূল্যে দিয়েছিলেন ৯৪ রান। এছাড়া প্রথম দুই ম্যাচে ভোগানো স্লগ ওভার সমস্যাও কাটিয়ে উঠেছিলেন বোলাররা। স্লগের ৯ ওভারে রান ওঠে মাত্র ৪৮।

রাজিন সালেহ তখন নিয়মিত ওপেন করছেন ওয়ানডেতে। কাজেই তার উপস্থিতিতে অলক আসায় কে করবেন ওপেনিং তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। সবাইকে অবাক করে দিয়ে কোচ নামিয়ে দেন ওয়ানডেতে ব্যাট হাতে বাংলাদেশের প্রথম জয়ের নায়ক মোহাম্মদ রফিককে। মূলত বোলার হলেও ওপেন তিনি আগেও করেছেন। কাজেই ফিল্ডিং রেস্ট্রিকশনের সুবিধা তিনি ভালোই নিতে পারবেন। আর এরকম লো-স্কোরিং ম্যাচে প্রথম ১৫ ওভারে ভালো রান হলে ম্যাচ হাতের নাগালে চলে আসে অনেকটাই।

দলীয় ১১ রানেই নাফিস ইকবাল পানিয়াঙ্গারার বলে বোল্ড। উইকেটে এলেন আফতাব আহমেদ। এরপর শুরু হয় ঝড়! সত্যিকারের ঝড় না হলেও ব্যাট হাতে যেন সত্যিই ঝড় তোলেন রফিক-আফতাব জুটি। শুরুটা করেন আফতাব। এমপোফু আর পানিয়াঙ্গারার পরপর দুই ওভারে ছয় আর চার মেরে। কিন্তু এ ছিলো কেবলি পূর্বাভাস। এরপর রফিক যোগ দেন তাঁর সাথে। এমপোফুর করা ওভারে এক ছক্কা আর এক চারে আসলো ১২ রান। এমপোফু পিটুনি খাচ্ছেন আর তার বোলিং সঙ্গী পানিয়াঙ্গারাই বা বাদ যাবেন কেন? ঠিক যেন আগের ওভারেরই পুনর্মঞ্চায়ন। এই ওভারেও একটা ছক্কা আর একটি চার, চার এলো আফতাবের ব্যাট থেকে। আর পানিয়াঙ্গারাকে লং লেগের ওপর দিয়ে যে ছক্কা হাঁকালেন রফিক, তা বোধহয় পানিয়াঙ্গারা সারা জীবন মনে রাখবেন। দুই টাইগারের রূদ্রমূর্তিতে দিশেহারা অধিনায়ক বাধ্য হয়ে বোলিং পরিবর্তন করেন। আসেন অলরাউন্ডার এলটন চিগুম্বুরা। এরপর যে ওভার তিনি করলেন,সেটা তাকে কয়েকদিনের দুঃস্বপ্ন উপহার দেওয়ার জন্যে যথেষ্ট। প্রথম বলেই ডাউন দ্যা উইকেটে গিয়ে আফতাবের বিশাল ছয়। পরের বলে চার। তার পরের বলে দুই। তিন বলে ১২ রান দিলেও ক্রমেই মনে হচ্ছিল বোলার লাইনে আসছেন।  কিন্তু পরের তিন বলে আবার অন-ড্রাইভ, কভার ড্রাইভ আর ডাউন দ্যা উইকেটে গিয়ে তিন চার। অর্থাৎ এক ওভারে এলো ২৪ রান। এটিই  তখন পর্যন্ত ওয়ানডেতে কোনো বাংলাদেশী ব্যাটসম্যানের সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড। ২০০৭ সালে দীনেশ মঙ্গিয়ার ওভারে রাজ্জাক আর মাশরাফি ২৬ রান নিয়ে (মাশরাফি ২৫ ও রাজ্জাক ১) এই রেকর্ড ভাঙ্গেন। এই বেধড়ক পিটুনির পরপরই জিম্বাবুইয়ানদের কনফিডেন্ট নষ্ট হয়ে যায়। মাঠে তাদের শরীরী ভাষাতেই বোঝা যাচ্ছিলো। এমন ওভার আর না আসলেও মোটামুটি প্রতি ওভারেই একটি করে চারের দেখা পাচ্ছিলো বাংলাদেশ। ফলে রানরেট নিয়ে ভাবতে হয়নি কখনোই। ফিল্ডিং রেস্ট্রিকশনের ১৫ ওভারে (তখন প্রথম ১৫ ওভার ছিলো ম্যান্ডেটরি ফিল্ডিং রেস্ট্রিকশন) রান এলো ১১৯, মাত্র এক উইকেট হারিয়ে। এর মধ্যে আফতাব তুলে নিয়েছেন তাঁর ফিফটি।

এরপর রানের গতি কিছুটা কমে আসে। তবে সিঙ্গেলসের উপর ভালোই চালাচ্ছিলেন আফতাব-রফিক। মাঝে মাঝে দেখা মিলছিলো রফিকের বিগহিট। নিজের ফিফটি তুলে নিলেন তিনিও। ইনিংসের ২৫তম ওভারে গিয়ে দলীয় ১৬১ এবং ব্যাক্তিগত ৭২ রানের মাথায় চিগুম্বুরার বলে প্রসপার উতসেয়ার হাতে ক্যাচ দিয়ে বিদায় নেন তিনি। ৬৬ বলের ইনিংসে ছিলো সাতটি চার ও চারটি ছয়ের মার। তবে এর মধ্যে ম্যাচ বাংলাদেশের পকেটে। কেননা আফতাবের সাথে একুশ ওভার চার বলে ১৫০ রান যোগ করে দিয়ে গেছেন।

বাংলাদেশের ফিনিশিং দিতে এরপর এলেন কাপ্তান হাবিবুল বাশার। অর্ধেকেরও বেশী ওভার হাতে, লাগবে মাত্র ৩৮ রান,উইকেটে সেট ব্যাটসম্যান আফতাব। তাই জয় নিয়ে সংশয় জাগেনি। কোনো হতাশাবাদীর মনে যদি জেগেও থাকে তবে তা দূর করতে শুরু করেন বাশার। শুরুর দুঃস্বপ্ন ভুলে রফিকের উইকেট নেওয়া চিগুম্বুরার এক ওভারে তিনটি চার মারেন। ৩২ ওভার শেষে দলের রান ঠিক জিম্বাবুয়ের সমান ১৯৮। এর মধ্যে পার্টনারশিপে জমা পরা ৩৭ রানের মধ্যে বাশারের অবদানই ৩০!

একরান বাকী থাকতে নয় ফিল্ডারকেই ত্রিশগজি বৃত্তের ভেতরে এনে মাসাকাদজার হাতে বল তুলে দেন টাইবু। প্রথম পাঁচ বলে কাঙ্খিত সিঙ্গেল বের করতে পারলেন না বাশার। তবে শেষ বলে চমৎকারভাবে কাভার আর পয়েন্টের মাঝখান দিয়ে গ্যাপ বের করে বল সীমানাছাড়া করলেন। অপরপ্রান্তে আফতাব তখন অপরাজিত ৮১ রানে। বাংলাদেশ পেল অভূতপূর্ব বিজয়। আগের জয়গুলো যেখানে ছিলো কষ্টার্জিত সেখানে এই জয় প্রতিপক্ষকে দুমড়ে-মুচড়ে তুলে নেওয়া। এমন জয় আগে  দেখেনি এদেশের মানুষ। ব্যাট হাতে ৭২ আর বল হাতে দুই উইকেট তুলে নিয়ে ম্যাচসেরা রফিক। তবে সিরিজসেরার পুরষ্কার গেলো বার্নি রজার্সের হাতে।

অন্য অনেক জয়ের তুলনায় এটা হয়ত কিছুই নয়। তবে এই একটা ম্যাচই প্রথম আমাদের মনে বিশ্বাস এনে দিয়েছিল আমরা শুধু জিততে পারিনা, প্রতিপক্ষকে উড়িয়ে দিতে জানি। জানি পিছিয়ে পড়েও সিরিজ জিততে। প্রথম সিরিজ জেতার অভিজ্ঞতাও যে এখান থেকেই। যা ভবিষ্যতের অনেক সিরিজ জয়ের পেছনেই হয়ত ভিত্তিমূল হিসেবে কাজ করেছে।

সেই ম্যাচের স্কোরকার্ড