X
GO11IPL2020
  • ফুটবল

ডিয়াগো জোটা, ট্যাক্টিকাল এনালাইসিস

পোস্টটি ১১৪৪ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

একই ফ্রন্টলাইন নিয়ে দুর্দান্ত দুই সিজন কাটানোর পর লিভারপুলের ম্যানেজার জার্গেন ক্লপ তার অ্যাটাকিং লাইনআপে নতুন কিছু যোগ করার চিন্তা করে। ক্লপ এমন একজন তরুণ ফরোয়ার্ড কেনার চেষ্টা করছিলো যে ফ্রন্টলাইনে যেকোনো পজিশনে খেলার মতো ভার্সেটাইল হবে, দলের প্রয়োজনে বেঞ্চে থাকতেও আপত্তি করবেনা, যেকোনো মুহূর্তে মাঠে এসে দলের জয়ে অবদান রাখতে পারবে এবং স্যালারি ডিমান্ডও খুব বেশি হবেনা। লিভারপুল ম্যানেজমেন্ট টিমো ওয়ের্নার,ওসমান ডেম্বেলেসহ অনে পটেনশিয়াল প্লেয়ারদের সাথে লিংকড থাকলেও গত সেপ্টেম্বরে উলভস থেকে ডিয়াগো জোটাকে ৪১ মিলিয়ন পাউন্ড (এডঅন সহ ৪৫ মিলিয়ন) দিয়ে দলে নিয়ে আসে।

ইএফএল কাপে লিংকন সিটির সাথে ম্যাচে অভিষেক হলেও লিভারপুলের জার্সিতে জোটা তার প্রথম গোলের দেখা পায় আর্সেনালের বিপক্ষে ৩-১ গোলে জেতা ম্যাচে, বেঞ্চ থেকে সাবস্টিটিউট হয়ে আসার মাত্র ৮ মিনিট পরেই! এরপর এস্টন ভিলা, এভারটন এবং আয়াক্সের সাথে ম্যাচে বলার মতো তেমন ভালো খেলতে না পারলেও শেফিল্ড ইউনাইটেডের সাথে লিভারপুলের ২-১ গোলের জিতার ম্যাচে জোটার পারফর্ম্যান্স ছিলো দুর্দান্ত। শেফিল্ডের সাথে ম্যাচে ক্লপ এই সিজনে প্রথমবারের মতো তার ইউজুয়াল ৪-৩-৩ ফর্মেশন ছেড়ে ৪-২-৩-১ ফর্মেশনে খেলায়। মোহাম্মদ সালাহকে রাইট সাইড থেকে সেন্টারে শিফট করে রবার্তো ফিরমিনোকে তার নিচে নাম্বার ১০ রোলে এবং দুই ফ্লাঙ্কে জোটা এবং মানেকে খেলায়। ম্যাচের ৬৪ মিনিটে লেফট উইং থেকে মানের ক্রসে ওসবর্ন এবং স্টিভেন্সের টাইট মার্কের মধ্যে থেকেও হেডে গোল করে দলকে এগিয়ে নেয় জোটা। এই ম্যাচে জোটার এফেক্টিভ পার্ফমেন্স ক্লপের এটাকিং ট্রান্সিশনে মেজর টাক্টিক্যাল শিফট করার চিন্তা করতে বাধ্য করেছেন। এরপরে ইতিহাদে ম্যানসিটির সাথে ১-১ গোলে ড্র করা ম্যাচেও ক্লপকে ৪-২-৩-১ এ দলকে অপারেট করতে দেখা যায়।

ভ্যান ডাইকের লিগামেন্ট ইঞ্জুরির ম্যাচে এভারটনের সাথে ২-২ গোল ড্র করলেও এরপর টানা ৫ ম্যাচ জিতে লিভারপুল যেখানে জোটাকে কখনো উইঙ্গার কিংবা কখনো সেন্টার ফরোয়ার্ড রোলে লিভারপুল ফ্রন্ট লাইনকে লিড দিতে দেখা যায়। যদিও লিভারপুলের হয়ে খেলা প্রায় ম্যাচে জোটাকে লেফট বা রাইট ফ্ল্যাঙ্কে দেখা গেছে, জোটা নিজের ফার্স্ট চ্যাম্পিয়ান্স লিগ হ্যাট্রিক পায় সেন্টার ফরোয়ার্ড রোলে খেলে আটালান্টার বিপক্ষে। নরমালি উইঙ্গার রোলে খেললেও উলভসের অনেক ম্যাচে ৩-৫-২ ফরমেশনে জিমিনেজের পিছনে সেকেন্ড স্ট্রাইকার রোলে খেলতে হয়েছে, এজন্য জোটার সেন্ট্রাল পজিশনে খেলার অভিজ্ঞতাও আগে থেকেই রয়েছে। পজিশন ভার্সেটালিটি এবং অ্যাটাকিং ফ্লুইডিটির জন্য জোটা খুব সহজেই ক্লপের হেভি মেটাল ফুটবলের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে পেরেছে।

বিল্ড আপ প্লে :

জোটা খুব অল্প সময়েই লিভারপুলে দুই উইংব্যাক রবার্টসন আর আলেক্স আরনল্ডের সাথে বোঝাপড়া বুঝিয়ে নিয়েছে নিজের দুর্দান্ত মুভমেন্ট এবং বুদ্ধিদীপ্ত পজিশনিং এর মাধ্যমে। ক্লপের ৪-২-৩-১ ফর্মেশনে জোটা রাইট ফ্লাঙ্কে খেলে, মোঃ সালাহ নরমালের চেয়েও অনেক বেশি সেন্ট্রালি পজিশন নেয় এবং ফিরমিনো ডিপে ড্রপ করে সালাহকে সেন্ট্রালি স্পেস ক্রিয়েট করে দেওয়ার জন্য। এসময় লিভারপুলের দুই উইংব্যাক সেন্টার লাইনের কাছাকাছি থেকে যতোটুকু সম্ভব ওয়াইড এরিয়ায় পজিশন নেয় সেন্টার এরিয়ার ওভারলোড কমানোর জন্য। তখন ফিরমিনো ডাবল পিভট রোলে থাকা উইনাল্ডম অথবা হেন্ডারসনের মধ্যে একজনের সাথে বিল্ডআপে অংশ নেয় এবং অপর মিডফিল্ডার ডিফেন্সে দুই সেন্টারব্যাকের মাঝে ড্রপব্যাক করে থ্রি ম্যান ব্যাকলাইন তৈরী করে।

 

jota

এখানে দেখা যাচ্ছে হ্যান্ডারসন ডিফেন্সে ড্রপব্যাক করে ফ্যাবিনহোর রাইটে পজিশন নিয়েছে এবং ফিরমিনো নিচে ড্রপব্যাক করে উইনাল্ডমের সাথে ডাবল পিভট রোল প্লে করছে। এসময় আরনল্ড যতোটুক সম্ভব রাইট ফ্লাঙ্কে সড়ে যায় এবং জোটা হাফ স্পেসে এসে ওভারলোড তৈরী করে। এজন্য বাকি অ্যাটাকারদের জন্য স্পেস ক্রিয়েট হয়।

 

1

এখানে শেফিল্ড ইউনাইটেডের সাথে ম্যাচে দেখা যায় শুরুতে জোটা ডিপে ড্রপ করে ব্যাকলাইনের সাথে কম্বাইন করার জন্য, আরনল্ডের পাস রিসিভ করে ফ্যাবিনহোকে পাস দেয়। এসময় ফিনমিনো হাফলাইনে ড্রপব্যাক করে পাসিং অপশন বাড়ানোর জন্য। এটা দেখে জোটা কুইক ফরোয়ার্ড রান নেয়। তখন ফ্যাবিনহো-আরনল্ড-হেন্ডারসনের মধ্যে কুইক কম্বিনেশনের পর জোটা বল পেয়ে সেন্টার এরিয়ায় কাটইন করে এবং দ্রুত লেফ্ট ফ্লাঙ্কে রবার্টসনকে বল সার্কুলেট করে।

 

রাইট উইঙ্গার হিসেবে জোটা :

রাইট উইং এ খেলার সময় জোটা আলেক্স আরনল্ডের সাথে রাইট ফ্লাঙ্কে নিউমেরিক্যাল এডভান্টেজ পাওয়ার জন্য হাফলাইনের কাছাকাছি নেমে পজিশন নেয়। এরপর বল পায়ে থাকলে ইনিশিয়াল বিল্ডআপের জন্য ড্রপব্যাক করে থাকা ফিরমিনোর সাথে কুইক ওয়ান টু ওয়ান করে সেন্টার এরিয়া ধরে কুইক কাটইন করার চেষ্টা করে। সালাহ তখন কিছুটা ওয়াইডে ড্রিফট হয়ে যায় স্পেস ক্রিয়েট করার জন্য। এসময় জোটা সেন্টার এরিয়া ধরে ফরোয়ার্ড রান নেয় অথবা ডিফেন্সের ভিতর দিয়ে দুই ফ্লাঙ্কে পাস দেওয়ার চেষ্টা করে। তখন জোটার ফরোয়ার্ড মুভমেন্ট আটকানোর জন্য ফাউল করা ছাড়া অপোনেন্ট ডিফেন্ডারদের কাছে কোন অপশন থাকেনা।

 

Jota3

এই ছবিতে দেখা যাচ্ছে জোটা একদম রাইট ফ্লাঙ্কে সড়ে গিয়েছে টিম উইডথ বাড়িয়ে সেন্টার এরিয়ার ওভারলোড কমানোর জন্য। তখন হেন্ডারসন কিছুটা উইং এর দিকে সড়ে আসে জোটার পাসিং অপশন বাড়ানোর জন্য এবং আরনল্ড কুইক ওভারল্যাপিং রান নেয় জোটার রেখে আসা ফ্রি স্পেস কাজে লাগিয়ে অপোনেন্টের ডিফেন্স এক্সপ্লয়েট করার জন্য।

 

ক্লপের গেমপ্ল্যানের বড় অংশই অ্যাটাকিং ট্রাঞ্জিশনের উপর নির্ভর করে। জোটাকে অন দ্যা বল অথবা অফ দ্যা বল দুইভাবেই মিডফিল্ড থেকে সেন্টার এরিয়া ধরে ফরোয়ার্ড রান নিতে দেখা যায়। এক্ষেত্রে সে তখনই বল রিলিজ করে যখন তার এরিয়ায় অপোনেন্টের ওভারলোড হয়ে যায় বা অপোনেন্ট তাকে ট্যাকেল করার চেষ্টা করে। এই কুইক কম্বিনেশনের কারণে সে ফাইনাল থার্ডে টিমমেটদের জন্য হিউজ স্পেস ক্রিয়েট করতে পারে এবং এভাবে অপোনেন্টের ডিফেন্সকে এক্সপ্লয়েট করে দিতে পারে। উলভস, পর্তুগাল এবং লিভারপুলের হয়ে জোটার কিছু গোল অ্যানালাইজ করলে দেখা যায় ফ্রি স্পেসে তার ব্লাইন্ড মুভমেন্ট রান, টিমমেট বল রিলিজ করার আগেই তার পাসিং এরিয়া প্রেডিক্ট করা এবং খুব দ্রুত প্রাইম গোলস্কোরিং পজিশনে চলে যাওয়া তার গোল পাওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ।

 

exploting-space-jota

ছবিতে আটলান্টা ম্যাচে জোটাকে স্পেস এক্সপ্লয়েট করতে দেখা যাচ্ছে। আলেক্স আরনল্ড বল পায়ে উইং ধরে আগাচ্ছিলো। তখন মানে একদম টাচলাইন বরাবর পজিশন নিয়ে একজন মার্কারকে তার দিকে টেনে নেয়। এই স্পেসের মধ্যে জোটা ফরোয়ার্ড রান নেয় এবং আরনল্ড সেই ফ্রি স্পেসে থ্রু বল দেয়। এভাবেই আটলান্টা ম্যাচে লিভারপুল নিজেদের প্রথম গোল পেয়েছিলো।

লিভারপুলের হয়ে বেশিরভাগ ম্যাচ বেঞ্চ থেকে স্টার্ট করার পরেও এই সিজনে লিভারপুলের হয়ে জোটার পারফরমেন্স অনেক ইমপ্রেসিভ। বেঞ্চ থেকে নেমে দলের জয়ে ভালো অবদান রেখে ক্লপের আস্থার প্রতিদান দিচ্ছে নিয়মিত। ৪১ মিলিয়ন পাউন্ডে কিনতে হলেও জোটার ট্রান্সফার লিভারপুল কিংবা উলভস দুই পক্ষের জন্যই উইন-উইন সিচুয়েশন বলা যায়। এই সিজনে একের পর এক রেগুলার প্লেয়ারের ইনজুরিতে লিভারপুল যেভাবে চোটজর্জরিত, গত সিজনের মতো প্রিমিয়ার লীগের শিরোপা ধরে রাখতে হলে জোটাকে এটাকিং লাইনআপে লিডিং রোল প্লে করতে হবে সেটা বলার অপেক্ষা রাখেনা।