• ফুটবল

৩-৪-৩ ফর্মেশন এবং এর বিবর্তনের গল্প

পোস্টটি ৩৯১ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।
৩-৪-৩ ফর্মেশন ফুটবলের অন্যতম প্রাচীনতম ফর্মেশনগুলোর মধ্যে একটি হলেও এর জনপ্রিয়তা বাড়তে শুরু করে ৮০'র দশকের শেষ সময় থেকে ৯০ দশকের শুরুর দিকে। ওই সময় অনেক বেসিক ফর্মেশনের বিবর্তন হতে শুরু করলেও ৩-৪-৩ ধীরে ধীরে ইউরোপিয়ান ফুটবলে জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। এর পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান রয়েছে ইতালিয়ান ফুটবলের। থ্রি ম্যান ব্যাক লাইন নিয়ে ডিফেন্সিভ স্টেবিলিটি অনেক বেশি থাকায় তখনকার সিরি আ'র দলগুলো ৩-৪-৩ ফর্মেশন এর দিকে ঝুকতে শুরু করে। শুরুর দিকে ৩-৪-৩ অনেক বেশি অফেন্সিভ ফর্মেশন হলেও ধীরে ধীরে এর বিবর্তন এবং বিভিন্ন কোচের নতুন নতুন ভেরিয়েশনের ফলে এটি একটি ভার্সেটাইল ফর্মেশনে পরিণত হয়েছে এবং এটি অ্যাটাকিং এবং ডিফেন্সিভ উভয় সেটাপের ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয়। তবে বর্তমানে ইউরোপিয়ান ফুটবলে খুব বেশি কোচকে ৩-৪-৩ ফর্মেশনে দলকে অপারেট করতে দেখা যায়না।
 

৩-৪-৩ ফর্মেশনের শুরু 

যদিও ৩-৪-৩ ফর্মেশন খেলা টিমগুলো নরমালি দুইজন মিডফিল্ডার এবং দুইজন উইঙ্গার নিয়ে খেলে, এই ফর্মেশনে প্রথম মেজর চেঞ্জ এনেছিলেন ডাচ লিডেন্ড ইয়োহান ক্রুইফ বার্সেলোনার কোচ থাকাকালে। ক্রুইফ ৩-৪-৩ ফর্মেশনে মিডফিল্ড কে ডায়মন্ড শেপে ব্যবহার করেছেন। এক্ষেত্রে ক্রুইফ আয়াক্স ম্যানেজার রাইনাস মিচেল এর ৪-৩-৩ এবং ৪-৪-২ ফর্মেশনের ফিলোসফিকে ৩-৪-৩ ফর্মেশনে অ্যাডাপ্ট করেছেন। ক্রুইফের ফিলোসফির বেসিক ছিল ৪-৪-২ ফর্মেশন এর ডায়মন্ড শেপ মেনটেন করা এবং প্লেয়ারদের ডায়নামিক মুভমেন্ট এর মাধ্যমে মাঠের প্রতিটা পজিশনে নিউমেরিক্যাল সুপেরিয়রিটি অর্জন করা। ক্রুইফের ৩-৪-৩ ডায়মন্ড ফর্মেশনে পেপ গার্দিওয়ালা হোল্ডিং মিডফিল্ডার হিসেবে অপারেট করতো এবং ব্যাক থ্রি তে ছিল রোনাল্ড কোম্যান, আলবার্ট ফেরের এবং ভিক্টর মুনোজ। ক্রুইফের মতে ৪-৩-৩ ফর্মেশনে অ্যাটাকিং থার্ডে অপনেন্টের সাথে ৬ ভার্সেস ৮ পজিশন তৈরি হয় ৪ জন ডিফেন্ডার থাকার কারণে । এক্ষেত্রে অ্যাটাকিং থার্ডে ম্যান মার্ক করা এবং স্পেস ক্রিয়েট করে ফরওয়ার্ড মুভমেন্ট করা অনেকটা চ্যালেঞ্জিং হয়। এজন্য ক্রুইফ ফোর ম্যান ব্যাকলাইন থেকে একজন ডিফেন্ডারকে মিডফিল্ডে শিফট করে অফেন্সিভলি নিউমেরিক্যাল সুপেরিয়রিটি অর্জন করার জন্য। ৩-৪-৩ ফর্মেশনে ক্রুইফের সাফল্যে ধীরে ধীরে অন্য কোচদের মধ্যে এর জনপ্রিয়তা বাড়াতে শুরু করে।
 
“If you have four men defending two strikers, you only have six against eight in the middle of the field: there’s no way you can win that battle. We had to put a defender further forward.”

-Johan Cruyff

 

4-8

ক্রুইফের ৩-৪-৩ ডায়মন্ড ফর্মেশন সেটআপ। একজন অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার থাকায় মিডফিল্ডে পাসিং অপশন অনেক বেড়ে যায়।
 
উদিনেসে দুর্দান্ত সময় কাটানোর পর ১৯৯৮ সালে আলবার্তো জাচ্চেরনি মিলানের দায়িত্ব নেন। তিনি মিলানে অফেন্সিভ ৩-৪-৩ ফর্মেশন ব্যবহার করেন যেটা মিলানকে তাদের ১৬ তম স্কুদেত্তা জিততে সাহায্য করে। তার থ্রি ম্যান ব্যাক লাইনে ছিল লুইগী সালা,আলেজন্দ্র কস্তাকুর্তা এবং পাউলো মালদিনি যারা ছিলেন ডিফেন্সিভলি এককথায় দুর্দান্ত।
 

মডার্ন ফুটবলে ৩-৪-৩ ফর্মেশন 

মডার্ন ফুটবলে প্রথমবারের মতো এফেক্টিভলি ৩-৪-৩ ফর্মেশন ইমপ্লিমেন্ট করে দেখান নাপোলির কোচ ওয়াল্টার মাজ্জারি। তার ৩-৪-৩ ফর্মেশন সেটআপ এফেক্টিভ হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ ছিল ওয়াইড এরিয়ায় ফাস্ট এবং এনার্জেটিক উইংব্যাক ক্রিস্টিয়ান মাজ্জিও এবং আন্দ্রে ডোসেনা। তার অ্যাটাকিং সিস্টেমে অ্যাটাকিং ট্রায়ো হামসিক, এডিনসন কাভানি এবং লাভেজ্জির অবদান ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ৩ সিজনে নাপোলি লিগে যথাক্রমে ৩য়, ৫ম এবং ২য় পজিশনে ছিলো।
 
চেলসির কোচ থাকাকালীন নিজের প্রথম সিজনে এন্তোনিও কন্তে ৩-৪-৩ ফর্মেশন ব্যবহার করে ১৬-১৭ সিজন খুবই ধারাবাহিক খেলে চেলসিকে প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা জেতান। দুই ফ্লাঙ্কে উইংব্যাক রোলে খেলা মার্কোস আলোনসো এবং ভিক্টর মোজেস পুরো সিজনজুড়েই ছিলো ডেস্ট্রাকটিভ ফর্মে। থ্রি ম্যান ব্যাকলাইনে ছিলো আজপিলিকুয়েতা, গ্যারি কাহিলি এবং তাদের মাঝে বল প্লেয়িং সেন্টারব্যাক রোলে ডেভিড লুইজ। মিডফিল্ডে ডাবল পিভট রোলে ছিলো এনগালো কান্তে এবং মাতিচ। কান্তে এনার্জেটিক হওয়ায় স্পেস কভার দেওয়ার রোল ছিলো তার উপর আর মাতিচ এবং লুইজ মিলে ডিপ থেকে গেম বিল্ডআপ করতো। ফরোয়ার্ড লাইনে হ্যাজার্ড এবং পেদ্রোর মাঝে ছিলো ডিয়াগো কস্তা। কস্তা দলের মেইন টার্গেট ম্যান হলেও প্রায়ই নিচে ড্রপব্যাক করতো হ্যাজার্ডের জন্য স্পেস ক্রিয়েট করে তাকে কাটইন করার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য।
 
গত সিজনে পিয়েরো গ্যাস্পারিনির আটলান্টা এক্সট্রাঅর্ডিনারি ফুটবল খেলেছে, তাদের ফর্মেশনও ছিলো ৩-৪-৩। আটলান্টার বেসিক স্ট্রাটেজি ছিলো কুইক হাই ইন্টেনসিভ বিল্ডআপ অ্যাটাক। গ্যাস্পারিনির ট্যাক্টিক্সে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রোল ছিলো ফ্রন্টলাইনের ইলিসিচ, জাপাতা এবং পাপু গোমেজের। দুর্দান্ত ফুটবল খেলে আটলান্টা ১৯-২০ সিজনে তাদের ক্লাব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ান্স লিগের কোয়ার্টার ফাইনালে কোয়ালিফাই করে।
 
 

ফর্মেশন স্ট্রাকচার 

৩-৪-৩ ফর্মেশনে থ্রি ম্যান ব্যাকলাইনের মাঝের সেন্টারব্যাক লিবারো (লিবারো একটি ইতালিয়ান শব্দ যার অর্থ বল প্লেয়িং সুইপার) রোল প্লে করে। একজন লিবারোর মেইন রোল হচ্ছে বল ক্যারি করে এটাক ইনিশিয়ালাইজ করতে উপরে মুভ করা এবং ডিফেন্ডিংয়ের সময় ফাইনাল ম্যান হয়ে অপোনেন্টের এটাক ডিফেন্ড করা। ৩-৪-৩ ফর্মেশনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রোল থাকে বল প্লেয়িং সেন্টারব্যাকের। কারণ একজন লিবারো উপরে উঠে ২ মিডফিল্ডারকে সাপোর্ট দেওয়ার জন্য এবং মিডফিল্ড ওভারলোড করার জন্য। ব্যাকলাইনের বাকি দুজনের রোল থাকে লিবারোকে ডিফেন্সিভলি সাপোর্ট দেওয়া এবং বিল্ডআপের সময় তার ফাঁকা রেখে যাওয়া স্পেস কভার দেওয়া। তাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে দলের প্রয়োজনে বিল্ডআপের সময় ডিফেন্সিভ ওয়াইড এরিয়া কভার দেওয়া। গোলকিপার থেকে ইনিশিয়াল বিল্ডআপের সময় তারাই শুরুতে বল রিসিভ করে বিল্ডআপ চালু রাখে।
 
৩-৪-৩ ফর্মেশনের কার্যকারীতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রোল পালন করে দুই উইংব্যাক। ৪ ম্যান মিডফিল্ডের অংশ হিসেবে অ্যাটাকিংয়ের শুরুতে দুই উইংব্যাক টাচলাইনের কাছাকাছি যতোটুক সম্ভব ওয়াইড এরিয়ায় পজিশন নেওয়ার চেষ্টা করে। অ্যাটাকিং ফেজের শুরুতে দুই উইংব্যাক ওভারল্যাপ করে উইং এরিয়া ধরে উপরে উঠে যায় ফ্রন্ট থ্রি কে নিউমেরিক্যাল সাপোর্ট দেওয়ার সময়। এসময় উইং এরিয়ায় টু ভার্সেস ওয়ান সিচুয়েশন তৈরী হয় এবং এতে উইঙ্গাররা সেন্টার এরিয়ায় কাট ইনসাইড করে এটেম্পট নেওয়ার সুযোগ পায়। এসময় অপোনেন্টের ডিফেন্সিভ থার্ডে ৫ ম্যান থাকায় ডিফেন্সকে এক্সপ্লয়েট করার সুযোগ তৈরী হয়। অন্যদিকে উইংব্যাকদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রোল হচ্ছে বল পজিশন হারালে কুইকলি ট্র্যাকব্যাক করে ডিফেন্সিভ লাইন মেনটেইন করতে সাহায্য করা। ডিফেন্সিভ ট্রাঞ্জিশনে ব্যাক থ্রি ২ উইংব্যাকের সাথে মিলে ব্যাক ফাইভ তৈরি করে যেখানে দুই উইংব্যাক উইং এরিয়া কভার করে অপোনেন্টের উইঙ্গারদের বল নিয়ে ফাইনাল থার্ডে ঢুকতে বাধা দেয়।
 
এই ফর্মেশনে দুই সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার ডিফেন্স এবং অ্যাটাকের মধ্যে ব্রীজের মতো রোল প্লে করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ৩-৪-৩ ফর্মেশনের সেন্টারমিড ডুয়োর মধ্যে একজন বক্স টু বক্স মিডফিল্ডার রোলে স্পেস কভার দেয় এবং অ্যাটাকিং পিরিয়ডে ফাইনাল থার্ডে পজিশন নেয়, অপরজন ডিপ লাইং প্লেমেকার অথবা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার রোলে নিচ থেকে খেলা বিল্ডআপ করে এবং অপোনেন্টের অ্যাটাকের সময় ব্যাক থ্রির সামনে থেকে প্রোটেক্টিভ শিল্ডের মতো কাজ করে। বক্স টু বক্স মিডফিল্ডার রোলে খেলা প্লেয়ারকে অনেক বেশি ডায়নামিক, এনার্জেটিক এবং ব্যালেন্সড হতে হয় যেকিনা দলের ডিফেন্সিভ ট্রাঞ্জিশন এবং অ্যাটাকিং ট্রাঞ্জিশন উভয় ক্ষেত্রেই সাহায্য করে। ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার নিচ থেকে খেলা অপারেট করে, দলের অ্যাটাকিংয়ের সময়ও নিচে ড্রপব্যাক করে থাকে এবং দল পজিশন হারালে ফার্স্ট ম্যান হিসেবে অপোনেন্টের কাউন্টার এটাক প্রোটেক্ট করে বল রিকোভার করার চেষ্টা করে। ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার রোলে থাকা প্লেয়ারকে ট্যাক্টিকালি দলের সবচেয়ে ফ্লুয়েন্ট প্লেয়ার হতে হয়, যার গেম রিড করার সামর্থ্য বাকি টিমমেটদের থেকে ভালো হবে এবং ম্যাচের সিচুয়েশন অনুযায়ী দলের টেম্পারমেন্ট স্লো অথবা এক্সেলেট করার সামর্থ্য থাকবে। মিডফিল্ড থেকে অপোনেন্ট থার্ডে পেনিট্রেট পাস দেওয়া, ডিপলাইন থেকে ম্যাচ কন্ট্রোল এবং জেনারেট করা এবং ওয়াইড এরিয়ায় উইংব্যাকদের সাথে পাসিং লেন ক্রিয়েট করে খেলাকে ওয়াইড করা একজন ডিফেন্সিভ মাইন্ডেড ডিপ লাইং প্লেমেকারের মেইন ফিচার।
 
একজন লোন স্ট্রাইকারের দুইপাশে দুইজন উইঙ্গারকে রেখে ফ্রন্ট থ্রি গঠন করে। উইঙ্গাররা নরমালি কাউন্টার অ্যাটাকের সময় নিজেদের পেইস কাজে লাগিয়ে কুইকলি অপোনেন্টের ডিফেন্সিভ থার্ডে স্পেস এক্সপ্লয়েট করার চেষ্টা করে। অ্যাটাকিং ট্রাঞ্জিশনের সময় উইংব্যাক ডুয়ো ওভারল্যাপ করে উপরে উঠে আসে, এজন্য দুই উইঙ্গার হাফস্পেসে পজিশন নেয় এবং কাট ইনসাইড করে স্ট্রাইকারকে সাপোর্ট দেওয়ার চেষ্টা করে। উইঙ্গাররা রেগুলার ফাইনাল থার্ডে ফরোয়ার্ড রান নেয় এবং মিডফিল্ডারদের থ্রু বল কাজে লাগানোর চেষ্টা করে অথবা অপোনেন্ট ডিফেন্ডারদের নিজের দিকে ড্রাগ করে বক্স টু বক্স মিডফিল্ডারের জন্য স্পেস ক্রিয়েট করে এবং অপোনেন্টের ব্যাকলাইন ব্রেক করে এটেম্পট নেওয়ার সুযোগ করে দেয়। ডিফেন্সিভ ট্রাঞ্জিশনের সময় উইঙ্গাররা নিচে ট্র্যাকব্যাক করে অপোনেন্ট উইংব্যাকদের মার্কার হিসেবে কাজ করে, তখন ৩-৪-৩ ফর্মেশন ৫-৪-১ ফর্মেশনে পরিবর্তিত হয়।
 
এই ফর্মেশনে মূল রোলে থাকে স্ট্রাইকার, যাকে ম্যানেজারের দেওয়া স্পেসিফিক রোল অনুযায়ী ভার্সেটাইল হতে হয়। স্ট্রাইকারকে অনেক সময় ফলস নাইন রোলে খেলতে হয় মিডফিল্ডে পাসিং অপশন বাড়ানোর জন্য এবং অপোনেন্ট ডিফেন্ডারদের নিজের দিকে ড্রাগ করে টিমমেটদের জন্য স্পেস ক্রিয়েট করার জন্য। অ্যাটাকিং ফেজের সময় অপোনেন্ট থার্ডে পজিশন নিতে হয় গোলস্কোরিং এটেম্পট ক্রিয়েট করার জন্য। ডিফেন্সিভ ট্রাঞ্জিশনের সময় লোন স্ট্রাইকার হিসেবে খেলে ৩-৪-৩ কে ৪-৫-১ এ ট্রান্সফর্ম করে।
 

ট্যাক্টিকাল স্ট্রেন্থ

৩-৪-৩ ফর্মেশনের সবচেয়ে বড় এডভান্টেজ হচ্ছে ডিফেন্সিভলি এবং অফেন্সিভলি দুই ক্ষেত্রেই উইং এরিয়া ওভারলোড করে রাখা যায়। অ্যাটাকিং ট্রাঞ্জিশনের সময় দুই উইংব্যাক ওভারল্যাপ করে উপরে উঠে যায় উইঙ্গারদের সাপোর্ট দেওয়ার জন্য, আবার ডিফেন্সিভ ট্রাঞ্জিশনের সময় উইঙ্গাররা ট্র্যাকব্যাক করে অপোনেন্ট টিমের উইংব্যাকদের ম্যান মার্ক করে অথবা তাদের পাসিং লেন ব্লক করে দেয়। এই ফর্মেশন ব্যাবহার করে উভয় ফ্রাঙ্কেই ওভারলোড করে অ্যাটাক করা যায়। এতে অপোনেন্টের ডিফেন্ডাররা ওয়াইড এরিয়ায় ছড়িয়ে পড়তে বাধ্য হয় এবং ডিফেন্সিভ লাইনের কমপ্যাক্টনেস ব্রেক করে সেন্টার এরিয়া দিয়ে অ্যাটাকিং থ্রেট তৈরি করা যায়। উভয় ফ্লাঙ্কেই ওভারলোড হয়ে থাকায় উইঙ্গাররা সেন্টার এরিয়ায় কাটইন করার সুযোগ পায়। এতে উইঙ্গারদের ক্রসে গোলস্কোরিং চান্স তৈরী করার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়।
 
ডিফেন্সিভ লাইনে একজন এক্সট্রা ডিফেন্ডার থাকায় তা ফাইনাল থার্ড কমপ্যাক্ট রাখতে সাহায্য করে এবং অপোনেন্ট অ্যাটাকারদের পাসিং চ্যানেলগুলোও কভার করতে সাহায্য করে, যেকারণে অপোনেন্টের থ্রেট ক্রিয়েশনের চান্স কমে যায়। বল প্লেয়িং সেন্টারব্যাক ব্যাকলাইন থেকে গেম বিল্ডআপে সাহায্য করে এবং তারসাথে অপোনেন্টের কাউন্টার অ্যাটাকিং থ্রেটের মধ্যে ডিফেন্সলাইন মেনটেইন করতে সাহায্য করে। ডিফেন্সিভ ট্রাঞ্জিশনের সময় ৩-৪-৩ ফর্মেশন ৫-৪-১ এ ট্রান্সফর্ম করে। এক্ষেত্রে ডিফেন্সিভ লাইনে ৫ জন ডিফেন্ডার থাকায় অপোনেন্টের পক্ষে এই কমপ্যাক্ট ডিফেন্সলাইন ব্রেক করা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। অপোনেন্টের অ্যাটাকাররা স্পেস বের করতে না পেরে ফ্রাস্টেটেড হয়ে যায় এবং পেনিট্রট হয়ে থ্রু বল দেওয়ার চেষ্টা করে। এতে করে অপোনেন্টের পজিশন লস করার চান্স থাকে এবং কুইক অ্যাটাকিং ট্রাঞ্জিশন চেঞ্জ করে কাউন্টার অ্যাটাকের মাধ্যমে গোলস্কোরিং চান্স তৈরী করা সম্ভব হয়।
 
২০১৫-১৬ সিজনে আগের সিজনে লিগ জেতা চেলসি তাদের তৎকালীন কোচ হোসে মরিনহোর আন্ডারে খুবই বাজে সিজন পাড় করে এবং ১০ম পজিশনে থেকে লিগ শেষ করে। ২০১৬ সালে চেলসির দায়িত্ব নেওয়ার পর নিজের প্রথম সিজনেই কন্তে চেলসিকে প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা জেতান যেখানে চেলসি ৯৩ পয়েন্ট পায় এবং লিগে ৮৫ গোল করে। চেলসির সাফল্যের সবচেয়ে বড় কারণ ছিলো থ্রি ম্যানের কমপ্যাক্ট ডিফেন্সিভ লাইন। দুই ফ্লাঙ্কে মোসেস এবং আলোনসোর কুইক ওভারল্যাপিং রান, লিবারো রোলে ডেভিড লুইজের মাতিচের সাথে ডিপ থেকে গেম বিল্ডআপ করা এবং বক্স টু বক্স মিডফিল্ডার রোলে কন্তের ধারবাহিকভাবে এনার্জেটিক পারফর্ম করে যাওয়া সবকিছুর অবদান চেলসির লিগ জেতার পিছনে।
 
Screen-Shot-2020-12-09-at-11.50.39-PM
         চেলসিতে কন্তের ৩-৪-৩ ফর্মেশন সেটআপ

উইকনেস 

৩-৪-৩ ফর্মেশনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো উইংব্যাকরা ঠিকমতো ট্র্যাকব্যাক করতে না পারলে দুই ফ্লাঙ্কে মিডফিল্ডারদের বাজেভাবে এক্সপোজড হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। উইংব্যাকরা ঠিকমতো ট্র্যাকব্যাক না করলে অপোনেন্ট উইং এরিয়ায় প্রচুর স্পেস পায়৷ এতে দুই মিডফিল্ডারের উপর উইং এরিয়া কভার দেওয়ার প্রেসার তৈরি হয়। তখন ডিফেন্সলাইনের উপর মিডফিল্ডের শিল্ড একেবারেই ব্রেক হয়ে যায় এবং মিডফিল্ড টোটালি এক্সপোজড হয়ে যায়। এতে থ্রি ম্যান ব্যাকলাইনের উপর সরাসরি অপোনেন্টের অ্যাটাকিং প্রেসার পড়ে।
 
এছাড়াও লিবারো রোলে থাকা ডিফেন্ডারের উপর বিল্ডআপ ইনিশিয়ালাইজ করার দায়িত্ব থাকে। বিল্ডআপের শুরুতে লিবারো বল পায়ে কিছুটা উপরে উঠে যায়। এসময় বাকি সেন্টারব্যাক ডুয়ো তার রেখে যাওয়া ফ্রি স্পেস কভার করে। এসময় উইংব্যাকরা উপরে উঠে যায় অ্যাটাকিং ট্রাঞ্জিশন মেনটেইন করে মিডফিল্ডে পাসিং অপশন বাড়ানোর জন্য৷ ইনিশিয়াল বিল্ডআপের সময় লিবারো পজিশন লস করলে অপোনেন্ট খুব সহজেই অ্যাটাকিং থার্ডে ৩ ভার্সেস ২ পজিশন তৈরী করার সুযোগ পায়, এবং ফাইনাল থার্ডে প্রচুর স্পেস পাওয়ার কারণে সহজেই গোলস্কোরিং চান্স ক্রিয়েট করতে পারে। এজন্যই লিবারো রোলে থাকা ডিফেন্ডারের বল প্লেয়িং এবিলিট তার ডিফেন্ড করার এবিলিটির মতোই স্ট্রং হতে হয়।
 
ফিজিকালিটির দিক থেকে ৩-৪-৩ ফর্মেশনে প্লেয়ারদের অনেক বেশি এরিয়া কভার দিতে হয়। এজন্য তাদের হাই ওয়ার্কলোডেড এবং স্ট্যামিনাসম্পন্ন হতে হয়। ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার রোলে খেলা মিডফিল্ডারকে ডিফেন্সলাইনের সামনে থেকে শিল্ড হিসেবে ডিফেন্সলাইনকে প্রোটেক্ট করতে হয়। এজন্য তাকে পুরো মিডফিল্ড এরিয়া কভার দিতে হয়, যেকারণে তার অবিশ্বাস্য রকমের হাই ওয়ার্কলোডেড হতে হয়। একইসাথে বক্স টু বক্স মিডফিল্ডার এবং উইংব্যাক রোলে খেলা প্লেয়ারদের দলের অ্যাটাকিং ট্রাঞ্জিশন এবং ডিফেন্সিভ ট্রাঞ্জিশন উভয়ক্ষেত্রেই সমানভাবে অবদান রাখতে হয়। এরমধ্যে কোনক্ষেত্রে ওয়ার্করেটের ঘাটতি হলেই তা সম্পূর্ণ দলের উপরেই প্রভাব ফেলে। যেকারণে তাদের ফিজিকাল এবিলিটিও অনেক স্ট্রং হতে হয়। এতো হেবি ওয়ার্ক প্রেসারের কারণে লম্বার সময় ধরে চলতে থাকা সিজনে প্লেয়ারদের ইঞ্জুরি প্রবনতা বাড়তে থাকে এবং সিজন যতো আগাতে থাকে প্লেয়ারদের পার্ফমেন্সে ততো ডাউনফল শুরু হয়।
 
 
রাইনাস মিচেল থেকে শুরু করে অ্যান্তোনিও কন্তে পর্যন্ত, গত কয়েক দশকে ৩-৪-৩ ফর্মেশন অনেক ধরণের পরিবর্তন এবং বিবর্তনের মধ্য দিয়ে গিয়েছে। ম্যানেজাররা দলকে ডিফেন্সিভ স্টেবলিটির সাথে ফ্রি ফ্লোয়িং কাউন্টার অ্যাটাকিং ফুটবল খেলাতে পছন্দ করে বলে ভবিষ্যতেও নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়েই ৩-৪-৩ ফর্মেশনের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে।