• ফুটবল

পেপ গার্দিওয়ালা এবং বার্সেলোনার পজিশনাল প্লে (পার্ট ২)

পোস্টটি ৬৫৬ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

সেকেন্ড ফেজ : ব্যাকলাইনের প্রেসার কন্ট্রোল করে বল মিডফিল্ডে নিয়ে আসে এবং মিডফিল্ড যতোটুক সম্ভব বেশি প্লেয়ার দিয়ে ওভারলোড করে রাখে নিউমেরিক্যাল সুপিওরিটির জন্য।

১। মিডফিল্ড ট্রায়েঙ্গেল : বুসকেটস জাভি ইনিয়েস্তা ছিলো পেপের পজিশনাল প্লের মূল অবলম্বন যাদের মূল রোল ছিলো মিডফিল্ড কন্ট্রোল করা। তাদের অল্প স্পেসে বল হোল্ড করে রাখার এবিলিটি এবং অপোনেন্টের প্রেসিং কন্ট্রোল করে পজিশন ধরে রাখার এবিলিটি সম্পূর্ণ টিমকে মার্কারদের থেকে ব্লকড হওয়ার হাত থেকে বাচিয়ে অপোনেন্ট থার্ডে মুভ করতে সাহায্য করতো। মিডফিল্ড কন্ট্রোলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিলো প্লেয়ারদের নিজেদের মধ্যে ডায়াগনাল পজিশনিং। প্লেয়ারদের নিজেদের মধ্যে ডায়াগনাল পজিশনিং পাসিং এর ক্ষেত্রে অনেকগুলো এঙ্গেল ক্রিয়েট করে, ফলে অপোনেন্টদের জন্য তাদের মার্ক করা অনেকটা অসম্ভব হয়ে যায়। সবচেয়ে কমন পজিশনিং সিচুয়েশন ছিলো বুসকেটস সেন্টার সার্কেলের ডিফেন্সিভ হাফে থাকবে, জাভি সেন্টার লাইন বরাবর রাইট সাইডে পজিশন নিবে এবং ইনিয়েস্তা কিছুটা লেফ্ট সাইডে আরেকটা এডভান্সড পজিশন নিবে।

11.triangle

২। ট্রায়েঙ্গেল টু রম্বস : অপোনেন্টের ওভারলোডের কারণে মিডফিল্ডে বল সার্কুলেট করতে সমস্যা হলে মেসি মিডফিল্ডে ড্রপ করে মিডফিল্ডারদের পাসিং চ্যানেল বাড়ানোর জন্য। ফলে মিডফিল্ড ট্রায়েঙ্গেল রম্বসে ট্রান্সফর্মড হয়। এসময় বুসকেটস এবং জাভি ডিফেন্সিভ থার্ডে এবং মেসি ও ইনিয়েস্তা এটাকিং থার্ডে পজিশন নেয়। মেসি এবং ইনিয়েস্তা অপোনেন্ট বক্সের খুব কাছাকাছি থেকে ডিফেন্ডারদের ফোকাস তাদের দিকে রাখে, ফলে উইঙ্গাররা অনেকটা ফ্রি রোলে ফরোয়ার্ড রান নেওয়ার সুযোগ পায়। এই ট্যাক্টিক্স ডিফেন্সিভলি কমপ্যাক্ট টিমের বিপক্ষে খুব কার্যকরী।

12.rhombos

৩। অপোনেন্ট মিডফিল্ডকে ওয়াইড করে দেওয়া : এক্ষেত্রে জাভি এবং ইনিয়েস্তা নিজেদের সাইডের হাফ স্পেসে পজিশন নেয়। এর কারণ হচ্ছে এতে অপোনেন্টের মিডফিল্ডলাইন স্ট্রেচ হয়ে যায় এবং মিডফিল্ডে গ্যাপ ক্রিয়েট করে পাসিং চ্যানেল বাড়ানো যায়। অথবা অপোনেন্টের মিডফিল্ডাররা এক সাইডে সড়ে যায়। তখন বল অপর সাইডে সুইচ করলে হিউজ স্পেস এক্সপ্লয়েট করা সম্ভব হয়।

13.stretching

উপরের ছবিতে দেখা যাচ্ছে অপোনেন্টের মিডফিল্ডলাইন একদিকে সড়ে গেছে। ফলে ইনিয়েস্তা ইজিলি তার সাইডে হিউজ স্পেস এক্সপ্লয়েট করতে পারবে এবং ফরোয়ার্ড মুভমেন্ট নিতে পারবে।

 

৪। উইং প্লে :

*** ওয়াইড এরিয়া ওভারলোড করে দেওয়া: তখনকার সময়ে বার্সেলোনার বিপক্ষে বেশিরভাগ দলই ৪-৪-২ ডিফেন্সিভ ফর্মেশনে টিমকে অপারেট করতো। এক্ষেত্রে আলভেস উংই ধরে উপরে ওভারল্যাপ করতো, এসময় জাভি আলভেসের দিকে শিফ্ট করতো। ফলে অপোনেন্ট উইঙ্গারের সাথে ২ ভার্সেস ১ সিচুয়েশনের তৈরী হতো। তখন অপোনেন্টের ফুলব্যাকের উপরে উঠার সুযোগ ছিলোনা কেননা তাকে পেদ্রোর মার্কার হিসেবে নিচে ড্রপ করে থাকতে হতো। এতে উইং এরিয়া দিয়ে ডেঞ্জারাস চান্স ক্রিয়েট করা সম্ভব হতো।

14.wing overload

*** জাভি/বুসকেটস ডায়াগনাল টু আলভেস : অপোনেন্ট ডিফেন্সলাইনকে ব্রেক করার আরেকটি ভালো উপায় ছিলো জাভি/ বুসকেটসের অপোনেন্ট থার্ডে আলভেসকে ডায়াগনাল ক্রস। আলভেস তখন অপোনেন্টের ডিফেন্সের মধ্যে দিয়ে ফরোয়ার্ড রান নিতো এবং এক মূহুর্তেই ডিফেন্সিভ অর্গানাইজেশনকে ব্রেক করে দিতো এবং তার ওয়ান টাচ ক্রসে মেসি বা ভিলা ইজিলি ট্যাপ ইন করে গোলে কনভার্ট করে দিতো।

15.diagonal alves

*** ভিয়া/ পেদ্রোর ওয়াইডে পজিশন নেওয়া : দুই উইঙ্গারেরই ওয়াইড এরিয়ায় পজিশন নেওয়াতে বেশ কিছু সুবিধা পাওয়া যেতো। দুই উইঙ্গারই তাদের মার্কার দিয়ে আইসোলেটেড হয়ে যেতো। মেসি ডিপে ড্রপ করে মার্কারকে নিজের দিকে ড্রাগ করে নিলো উইঙ্গাররা ডিফেন্সলাইনের ভেতর দিয়ে কাটইন করে গোল করার সুযোগ পেতো। সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিলো অপোনেন্টের ডিফেন্সিভ অর্গানাইজেশনকে হরিজন্টালি কমপ্যাক্ট হতে দিতো না, যেটা বার্সেলোনার মিডফিল্ডের পাসিং ফ্লুইডিটিতে ভালো এফেক্ট ফেলতো। 

16.wide area

থার্ড ফেজ : ফাইনাল থার্ডে পৌছানোর পর প্লেয়ারদের নিজেদের মতো করে ফিনিশিং করার স্বাধীনতা ছিলো। গার্দিওয়ালার মূল স্ট্রাটেজি ছিলো তার প্লেয়ারদের ইজিলি অপোনেন্টের ফাইনাল থার্ডে পৌছানোর রাস্তা তৈরী করে দেওয়া এবং তাদের ইন্ডিভিজুয়াল ফিনিশিং কোয়ালিটির মাধ্যমে গোলে কনভার্ট করা।

 

ডিফেন্সিভ অর্গানাইজেশন

টিমের এটাকিং ফিচারগুলোর পাশাপাশি ডিফেন্সিভ অর্গানাইজেশনেও সমানভাবে গুরুত্ব দিতে হয়। বার্সার ডিফেন্সিভ সাইডকে মূলত ২ ভাগে ভাগ করা যায়।

১। ডিফেন্ডিং উইথ দ্যা বল : যখন ম্যাচের শেষ মূহুর্তে বার্সেলোনা ১-০ গোলে এগিয়ে থাকে তখন প্লেয়ারদের নিজেদের থার্ডে অপোনেন্টের হাই প্রেসিং এর মধ্যেও বল সার্কুলেশন কন্টিনিউ রাখতে হয় ম্যাচ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত। এ ধরণের প্ল্যান ঠিকভাবে এক্সিকিউট করার জন্য দুর্দান্ত টেকনিক্যাল স্কিল এবং অপোনেন্টের প্রেসিংয়ের মধ্যেও বল কন্ট্রোল করে সার্কুলেশন কন্টিনিউ রাখার মতো নার্ভ কন্ট্রোল থাকতে হয়। নিউমেরিক্যাল এবং পজিশনাল সুপিওরিটি এই মোমেন্টে স্মুথ বল সার্কুলেশন ধরে রাখার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয়। ডিফেন্ডিং উইথ দ্যা বল বলতে মেইনলি বোঝায় এটাকে না গিয়ে বল পজিশন হোল্ড করে রাখা।

 

২।কাউন্টারপ্রেসিংয়ের সাহায্যে ডিফেন্ডিং উইদাউথ দ্যা বল : বার্সেলোনার কোন প্লেয়ার যখন অপোনেন্টের কাছে বল পজিশন হারায়, ইমিডিয়েটলি প্লেয়াররা মৌমাছির ঝাঁকের মতো বল ক্যারিয়ার এবং তার সম্ভাব্য সকল পাসিং লেনগুলোকে ব্লক করে দেয়। এক্ষেত্রে হয় বল ক্যারিয়ার পজিশন লস করে অথবা ফোর্সড হয়ে প্যানিকড লং বল খেলে এবং পজিশন লস করে। এই প্রেসিং ট্যাক্টিক্সকে "৬ সেকেন্ড রুল" বল হয় যেটা পেপ গার্দিওয়ালারই ইমপ্লিমেন্ট করা। বল হোল্ডারকে সর্বোচ্চ ৬ সেকেন্ড ধরে প্রেসার দেওয়া হয় পজিশন রিগেইন করে আনার জন্য। এরপরও যদি পজিশন রিগেইন করতে ব্যার্থ হয় তখন প্লেয়াররা আবার তাদের নিজেদের পজিশনে ফলব্যাক করে পজিশনাল অর্গানাইজেশন ঠিক করে ফেলে।

 

***প্রেস ট্র্যাপ:  প্রেসিংয়ের সময় প্লেয়াররা কখন প্রেস করবে আর কখন হোল্ড ব্যাক করবে তার উপর নির্ভর করে পেপ একটি স্পেসিফিক গাইডলাইন তৈরী করে দেয়।

 *অপোনেন্ট যখন নিজেদের থার্ডে বল হোল্ড করে রাখে।

 *অপোনেন্ট ঠিকভাবে বলের কন্ট্রোল নিতে না পারলে, হেবি টাচ এবং বাজে পাসের সময়।

 *সাইডলাইনের কাছাকাছি অপজিশন পজিশন হোল্ড করলে।

*অপোনেন্ট কেবলমাত্র পজিশন উইন করলে।

এসব ক্ষেত্রে কুইকলি প্রেসিং করা হয় এবং অন্যসময় প্লেয়াররা নিজেদের পজিশনে ট্র্যাকব্যাক করে।

 

*** উইং এরিয়ায় প্রেসিং: অপোনেন্ট থার্ডে বার্সেলোনার প্রেসিং হয় সবসময় পাসিং লেন অরিয়েন্টেড। এক্ষেত্রে প্লেয়াররা তাদের স্পেসিফিক ম্যানদের মার্ক করবে। কিন্তু বাকিদের ফ্রি হতে দিবে যাতে তার পাসিং অপশন পায়। পাস দেওয়ার পরে প্লেয়াররক পাসিং লেন ব্লক করে বল ইন্টারসেপ্ট করার চেষ্টা করবে। বার্সেলোনার প্লেয়াররা সমস্ত পসিবল পাসিং লেন কভার করার চেষ্টা করবে এবং অপোনেন্টকে প্যানিকড লং বল খেলতে বাধ্য করবে। এক্ষেত্রে অপোনেন্ট থার্ডে পজিশনাল সুপিওরিটি বল রিগেইন করতে সাহায্য করবে।

17.pressing 1

***সেন্টার এরিয়ায় প্রেসিং : এক্ষেত্রে মেসি দুই সেন্টাব্যাকের মাঝে পজিশন নিবে, ভিয়া এবং পেদ্রো দুজন অপোনেন্ট ফুলব্যাকদের মার্ক করবে, জাভি এবং ইনিয়েস্তা হাফ স্পেসও কার আশেপাশের এরিয়ায় পাসিং লেন ব্লক করতে চেষ্টা করবে, বুসকেটস সেন্টার ডিফেন্ডারদের সামনে থেকে শিল্ডের মতো কভার দিতে চেষ্টা করবে, আলভেস এবং আবিদাল অপোনেন্ট উইঙ্গারদের ম্যান মার্ক করবে অথবা উপরে উঠে মিডফিল্ডকে ওভারলোড করার চেষ্টা করবে, পিকে এবং পুয়োল/ মাশচেরানো ব্যাকলাইনে থেকে অপোনেন্টের লং বল প্রোটেক্ট করার চেষ্টা করবে। এক্ষেত্রে দেখা যায় সেন্টার ফরোয়ার্ড এবং মিডফিল্ডাররা তাদের মার্কারের শ্যাডোর মতো থেকে সেন্টার এরিয়ায় তাদের পাসগুলোকে ইন্টারসেপ্ট করার চেষ্টা করবে।

18.pressing 2

 

তথ্যসূত্র: ব্রেকিং দ্যা লাইন, ফুটবল ব্লাডি হেল, বার্সেলোনা এনালাইসিস, টোটাল ফুটবল এনালাইসিস।