• অন্যান্য

গেগেনপ্রেসিং, ট্যাক্টিকাল এনালাইসিস (পার্ট ২)

পোস্টটি ৩৭৩ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

গেগেনপ্রেসিংয়ের পজিটিভ দিক 

ফুটবলের ট্যাক্টিক্সগুলোর মধ্যে গেগেনপ্রেসিং হচ্ছে অন্যতম কঠিনতম ট্যাক্টিক্স এবং এর ইমপ্লিমেন্ট করা অনেক কঠিন কাজ। গেগেনপ্রেসিং অনেক কমপ্লিকেটেড এবং ফিজিক্যালি ডিমান্ডিং এবং এটি এপ্লাই করার জন্য হার্ড ট্রেনিং এবং প্লেয়ারদের নিজেদের মধ্যে খুব ভালো বোঝাপড়া থাকা প্রয়োজন। তবে পারফেক্টলি এক্সিকিউট করা সম্ভব হলে গেগেনপ্রেসিংয়ের মাধ্যমে অনেকভাবেই বেনিফিটেড হওয়া সম্ভব। 

 

১। ডিফেন্সিভ স্টেবিলিটি : একটা টিম বল পজেশন লস করার পরপরই সবচেয়ে বেশি ডিসঅর্গানাইজড হয়। এটাকিং ট্রাঞ্জিশনের সময় অপোনেন্ট থার্ডে ওভারলোড করে রাখার কারণে বল পজেশন লস করলেই অপোনেন্টের জন্য কুইকলি স্পেস ক্রিয়েট করে কাউন্টার এটাকের মাধ্যমে এক্সপ্লয়েট করে ফেলা সহজ হয়। মডার্ন ফুটবলে প্রায় সব টিমই অপোনেন্ট থার্ডে বল লুজ করার পরে কুইকলি নিজেদের ট্রাঞ্জিশন কমপ্লিট করে ফেলার চেষ্টা করে অপোনেন্টকে স্পেস এক্সপ্লয়েট না করতে দেওয়ার জন্য।

 

কোন টিম বল পজেশন লস করার পরে তাদের হাতে দুইটি অপশন থাকে। হয় তারা কুইকলি নিজেদের ডিফেন্সিভ ফর্মেশনে ফিরে গিয়ে অপোনেন্টের কুইক কাউন্টার থেকে নিজেদের ডিফেন্সলাইনকে প্রোটেক্ট করবে, অথবা তারা অপোনেন্ট থার্ডেই অপোনেন্টকে হাই ইন্টেনসিভ প্রেস করতে শুরু করবে বল রিকোভার করার উদ্দেশ্যে। দ্বিতীয় ক্ষেত্রটাই আসলে কাউন্টারপ্রেসিং বা গেগেনপ্রেসিং। এক্ষেত্রে সুবিধা হচ্ছে প্রেসিংয়ের কারণে অপোনেন্ট ব্যাকওয়ার্ডে মুভ করতে বাধ্য হবে এবং তাদের কাউন্টার করার চান্স অনেকটাই কমে যাবে। ফলে ডিফেন্সিভ স্টেবিলিটি অনেকটাই বৃদ্ধি পাবে৷ 

 

২। ডিসঅর্গানাইজেশন এভোয়েড করা : গেগেনপ্রেসিংয়ের সবচেয়ে বড় এডভান্টেজ হচ্ছে এক্ষেত্রে বল অপোনেন্ট থার্ডেই রিকোভার করা হয় বেশিরভাগ সময়। ফলে অপোনেন্ট থার্ডে ওভারলোড এবং অফেন্সিভ শেফ উভয়ই মেনটেইন করে রাখা যায়। কুইক বল রিকোভারি অপোনেন্ট থার্ডে কাউন্টারে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বাড়িয়ে দেয়। এক্ষেত্রে ইমিডিয়েট বল রিকোভারির কারণে অপোনেন্ট তাদের ট্রাঞ্জিশন ঠিক করার সুযোগ পায়না, ফলে ফ্রি স্পেস এক্সপ্লয়েট করে কুইক কাউন্টারে যাওয়া অনেকটাই সহজ হয়। 

 

৩। অফেন্সিভ থ্রেট বাড়ানো : গেগেনপ্রেসিংয়ের মাধ্যমে অপোনেন্ট থার্ডে বল উইন করার পর কুইক কাউন্টারে যাওয়া তুলনামূলক সহজ হয় যেহেতু অপোনেন্ট অলরেডি তাদের অফেন্সিভ ট্রাঞ্জিশনে মুভ করতে শুরু করে। তাদের তখনকার ডিফেন্সিভ শেপ অনেক দুর্বল হয়ে পড়ে যেহেতু তারা কাউন্টারে যাওয়ার জন্য ওয়াইড এরিয়ায় ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে এবং কাউন্টারপ্রেসিংয়ের কারণে তখন নিজেদের অনেক প্লেয়ার বলের কাছাকাছি এরিয়ায় কমপ্যাক্ট হয়ে থাকে। 

 

মডার্ন ফুটবলে গেগেনপ্রেসিংয়ের ভ্যারিয়েশন 

মডার্ন ফুটবলে জার্গেন ক্লপের হাত ধরে গেগেনপ্রেসিং জনপ্রিয় হতে শুরু করলেও হেইঙ্কস, গার্দিওয়ালা, মার্সেলো বিয়েলসাসহ আরো অনেক কোচেরই অবদান রয়েছে গেগেনপ্রেসিংকে আরো বেশি অর্গানাইজড এবং ইমপ্যাক্টফুল করার পেছনে। 

 

পেপ গার্দিওয়ালার ভ্যারিয়েশন : পেপের ফুটবল দর্শনের মূল ভিত্তি হচ্ছে বল পজেশন নিজেদের দখলে রাখা এবং পজেশন হারালে মাঠের যেকোন পজিশনে প্রেস করে কুইকলি বল রিকোভার করার চেষ্টা করা। গার্দিওয়ালার গেগেনপ্রেসিংয়ের বেসিক কনসেপ্ট ছিলো ৬ সেকেন্ড রুল। এর মানে হচ্ছে প্লেয়াররা বল পজেশন লস করার ৬ সেকেন্ড পর্যন্ত প্রেস করতে থাকবে। এরমধ্যে পজেশন রিগেইন করতে পারলে আবার নিজেদের ইউজুয়াল ট্রাঞ্জিশনে ব্যাক করে বিল্ডআপ করা শুরু করবে। কিন্তু এই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পজিশন রিগেইন করতে ব্যর্থ হলে নিজেদের ডিফেন্সিভ শেপে ব্যাক করবে এবং অপোনেন্টকে বল হোল্ড করতে দিয়ে তাদের মিসপাসের জন্য অপেক্ষা করবে। বল রিট্রিভ করার জন্য পেপের টিম অপোনেন্টের পাসিং লেন ব্লক করে প্রেস করার চেষ্টা করতো। অর্থাৎ পেপের মূল থিউরি ছিলো পাসিং লেন ওরিয়েন্টেড গেগেনপ্রেসিং। পেপের গেগেনপ্রেসিংয়ের আরেকটা স্পেসিফিক দিক ছিলো কাউন্টারপ্রেসিং করে বল রিগেইন করার পরে কুইক কাউন্টারে না গিয়ে আবার ব্যাকলাইন থেকে বিল্ডআপ করতে শুরু করতো। 

 

মার্সেলো বিয়েলসার ভ্যারিয়েশন : মার্সেলো বিয়েলসার প্লেস্টাইলের মূল দর্শন হচ্ছে ফ্রি ফ্লোয়িং ফুটবল কন্টিনিউ করা এবং বল পজেশন লস করলে হাই ফিজিক্যাল গেগেনপ্রেসিং করে বল রিট্রিভ করা। এক্ষেত্রে বিয়েলসার প্রেসিং স্টাইল হচ্ছে ম্যান টু ম্যান ওরিয়েন্টেড গেগেনপ্রেসিং। বিয়েলসা তার ফর্মেশন সেটাপের ক্ষেত্রে ডিফেন্সিভ থার্ডে অপোনেন্টের ফরোয়ার্ডদের চেয়ে একজন বেশি ম্যান খেলায়। ফলে অপোনেন্ট থার্ডে অপোনেন্টের চেয়ে একজন কম প্লেয়ার থাকে। এক্ষেত্রে বল পজেশন হারানোর সাথে সাথে অপোনেন্ট থার্ডে প্রত্যেকটা প্লেয়ারকে তাদের নিকটবর্তী প্লেয়ার দিয়ে মার্ক করে বল ক্যারিয়ারকে লং বল খেলতে বাধ্য করা হয়। বিয়েলসার প্লেয়ারদের এরিয়াল বলে ভালো দক্ষতা থাকার কারণে সেকেন্ড বলে পজেশন রিগেইন করার চান্স অনেক বেশি থাকে। ডিফেন্সে অপোনেন্ট প্লেয়ারদের চেয়ে একজন বেশি ডিফেন্ডার থাকে। এক্ষেত্রে একজন সেন্টারব্যাক কাউকে মার্ক না করে কভার ম্যানের রোল প্লে করে। বিয়েলসার সিস্টেমে সেই ডিফেন্ডারকে ফ্লেয়ার ম্যান বলা হয়। ফ্লেয়ার ম্যানের কোন ম্যান মার্কিংয়ের ডিউটি থাকে না এবং তার একমাত্র রোল হচ্ছে অপোনেন্ট গেগেনপ্রেসিং বিট করে বল হোল্ড করে ফরোয়ার্ড মুভ করলে তাদের ফ্রি স্পেস এক্সপ্লয়েট করতে বাধা দেওয়া এবং টিমমেটদের রেখে যাওয়া ফ্রি স্পেস কভার দেওয়া।

1-Man-to-man-Full-Pitch

     এখানে লিডসের ম্যান টু ম্যান ওরিয়েন্টেড গেগেনপ্রেসিং দেখা যাচ্ছে। প্রত্যেকের একজন করে মার্কার থাকলেও কুপার কোন মার্কিং রোল ছাড়া ফ্রি ফ্লেয়ার ম্যান হিসেবে স্পেস কভার দেওয়ার রোল প্লে করছে।

 

জার্গেন ক্লপের ভ্যারিয়েশন : গেগেনপ্রেসিংয়ের ক্ষেত্রে ক্লপের মূল মেথড হচ্ছে হাই ইন্টেন্সিটি মেনটেইন করে কন্টিনিউ প্রেস করা। টিমের সবাই বল হোল্ডারকে পেনিট্রেট করে অপোনেন্ট থার্ডে কুইকলি বল রিকোভার করতে চেষ্টা করে। এতে করে তারা বল রিকোভার করার সাথে সাথেই কুইকলি কাউন্টার এটাক করতে পারবে। প্রেসিংয়ের ক্ষেত্রে ক্লপের মূল কনসেপ্ট হচ্ছে অপোজিশনকে হার্ড এবং ফাস্ট প্রেস করা এবং নিজেদের স্ট্রাইকারদের স্পেস এক্সপ্লয়েট করে গোলস্কোরিং চান্স ক্রিয়েট করে দেওয়া। ক্লপ অপোনেন্ট থার্ডে প্রেসিং ট্র্যাপ ক্রিয়েট করে বল ক্যারিয়ারের চারপাশ থেকে ঘিরে তাকে টিমমেটদের থেকে আইসোলেটেড করে দেওয়া। নরমালি মানে এবং সালাহ সেন্টারব্যাক এবং ফুলব্যাকদের মাঝের স্পেসে পজিশন নিয়ে তাদের মধ্যকার পাসিং লেন ব্লক করে দেয়। ফিরমিনো তখন কিছুটা নিচে ড্রপ করে সেন্টারব্যাক এবং ডিফেন্সিভ মিডদের মধ্যকার পাসিং লেন ব্লক করে দেয়। ফলে সেন্টার ব্যাক প্যানিকড হয়ে মিডফিল্ডে লং বল দেওয়ার চেষ্টা করে এবং লিভারপুলের মিডফিল্ডাররা বল ইন্টারসেপ্ট করে কাউন্টার এটাক শুরু করে।

 

তথ্যসূত্র : গোল, ১০১-ট্যাক্টিক্স, ইউটিউব