• ফুটবল

বাংলার ফুটবল মুক্তির ৬-দফা (২য় পর্ব); পাল্টাতে হবে মানসিকতা, খেলার ধরন।

পোস্টটি ৩৩৪ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

 

কোন ফর্মেশনে খেলবে দল সে সিদ্ধান্ত কোচের। এ বিষয়ে তাঁর পূর্ণ স্বাধীনতা থাকাই উচিত। তবে ফর্মেশন বেদ বাক্যের মত অপরিবর্তনীয় কোন বিষয় নয়। প্রতিপক্ষের শক্তিমত্তা, প্রতিযোগিতায় দলগত অবস্থান, ম্যাচ পরিস্থিতি ইত্যাদি বিবেচনায় ফর্মেশনে পরিবর্তন আসতে পারে যেকোন সময়ে। তবে পরাজয়ের ব্যবধান কমাতে অতি রক্ষণাত্মক ফুটবলের স্থান আধুনিক ফুটবল বিশ্বে কোথাও নেই। বিশ্ব র‍্যাংকিং এর নিচের সারিতে থাকা দেশগুলোও এই নেতিবাচক ফুটবল ধারা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তবে সবকিছুতেই শর্টকাটে লাভ খোঁজার জাতিগত বৈশিষ্ট্য আমরা কিভাবেই বা বর্জন করি? বিষয়টা একটু খোলাসা করে ব্যাখ্যা করা যাক।      

সাফল্য-ব্যর্থতা শব্দ দুটোর আপেক্ষিকতার মাত্রা খুব বেশি। ব্রাজিলের সমর্থকরা প্রায়ই গর্বিত কণ্ঠে বলে থাকে- বিশ্বকাপের রানার্স আপ হওয়াটাকেও নাকি তাদের কাছে (ব্রাজিলে) ব্যর্থতা! ব্রাজিলের বাস্তবতায় হয়তো সেটা তর্কযোগ্যভাবে সঠিক। বিশ্ব ফুটবল ও এশিয়ার সবচেয়ে পেছন সারিতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্থ করে ফেলা বাংলাদেশে ব্যবধান কিছু কমিয়ে পরাজয় বরণ সফলতা হিসেবে দেখা হয়। খালি চোখে দেখলে তাতে দোষের কিছু নেই। বরং আবেগের গড্ডালিকায় গা না ভাসিয়ে বাস্তবতায় পা রেখে ব্যবধান কমানো কৌশলকে ভুলও বলা যায়না। তবে ফুটবলের সকল মাপকাঠিকে দূরে সরিয়ে শুধু ব্যবধান কমানো সংখ্যাকে একমাত্র সত্যজ্ঞান করা দেশের ফুটবলের অন্যতম প্রধান অন্তরায়।   

বিশ্বকাপ বাছাইয়ের জন্য খেলা বাংলাদেশের সর্বশেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচটি ফিরে দেখা যাক। প্রতিপক্ষ ছিল এশিয়ার গড়পরতা শক্তির আরব পারের ছোট্ট দেশ ওমান। সেই ম্যাচে ৩-০ গোলে পরাজিত হবার পরও বাংলার ফুটবলাকাশে ছিল স্বস্তির মেঘ। সেই স্বস্তির মেঘ থেকে ঝরে পড়লো মনস্তাত্তিক জয়ের বৃষ্টি। স্বস্তির মেঘ পর্যন্ত হয়ত ঠিক ছিল। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে খেলতে নেমে তিন গোলে পরাজয়, মন্দ কি? তবে তাতে মনস্তাতিক জয়ের সুবাস খোঁজা, তাও অতি রক্ষণাত্মক কৌশলে! এটাই ভবিষ্যতের জন্য বড় অশানি সংকেত। পরীক্ষার খাতায় মুখস্থ অংক করে হয়ত স্কুল পরীক্ষায় পাস মার্ক পাওয়া যায়। তবে গণিত অলিম্পিয়াডে ভাল করতে হলে সেই পাস কোন কাজে আসেনা। কারণ মুখস্থ কৌশল শেখার সুযোগকে মেরে ফেলে। বন্ধ করে দেয় সামনে এগোনোর পথ। তাই পরাজয়ের ব্যবধান কমানো সংখ্যায় নয়, ফলাফলের উর্ধ্বে উঠে ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে বুক চিতিয়ে লড়াই করার স্পৃহার মাঝেই সাফল্য খোজা উচিত। বাংলাদেশের সাথে অন্যান্য কাছাকাছি শক্তির প্রতিবেশী দেশগুলোর পার্থক্য এখানেই। এ কারণেই হয়ত ওদের ফুটবল পারফর্মেন্সের গ্রাফটা উর্ধ্বমুখী আর আমাদেরটা নিম্নগামী।        

ফুটবল বিশ্বকে চমকে দিয়ে বাছাই প্রতিযোগিতার বাঁধা পেরিয়ে এবারই প্রথম  ইউরো খেলতে এসেছিল দক্ষিণ মধ্য ইউরোপের পুঁচকে দেশ উত্তর মেসিডোনিয়া। ঘটনাচক্রে ওমানের সাথে বাংলাদেশের সেই ম্যাচের এক সপ্তাহ পর ইউরোর চূড়ান্ত পর্বে উত্তর মেসিডোনিয়াও সেই একই ব্যবধানে হেরেছে ইউরোপ ও বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি নেদারল্যান্ডসের কাছে। পরাজয়ের ব্যবধান এক হলেও, বাংলাদেশ আর উত্তর মেসিডোনিয়ার খেলোয়াড়দের মানসিকতায় ছিল উত্তর আর দক্ষিণ মেরুর ব্যবধান। প্রথমবারের মত ইউরোর বাছাই পর্ব পেরিয়ে চূড়ান্ত পর্যায়ে খেলার যোগ্যতা অর্জন নিঃসন্দেহে উত্তর মেসিডোনিয়ার খেলাধুলার ইতিহাসের সর্বোচ্চ অর্জন। নেদারল্যান্ডসের সাথে তাদের জয়ের প্রত্যাশা কেউ করেনি। মেসিডোনিয়ানদের সে ম্যাচে হারানোর কিছুই ছিলনা। আক্রমণাত্বক ফর্মেশনে থেকে খেলতে নেমে সেই ম্যাচে আরো বড় ব্যবধানে হেরে যাওয়ার স্পষ্ট ঝুঁকি ছিল তাদের। অন্যদিকে অতি রক্ষণাত্বক কৌশল সাজিয়ে নেদারল্যান্ডসকে গোল বঞ্চিত করে ড্র আদায় করে নেয়ার কাগুজে সম্ভাবনার পাশাপাশি তুলনামূলক কম ব্যবধানে হারার বাস্তব সুযোগও ছিল। সেই নেতিবাচক পথে না হেঁটে উত্তর মেসিডোনিয়া ঝুঁকি নিয়েছিল। আগের দুই ম্যাচে নেদারল্যান্ডসের চেয়ে অপেক্ষাকৃত কম শক্তির দুই দেশের সাথে হেরে দ্বিতীয় রাউন্ডে যাবার সম্ভাবনা প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল আগেই। তবে অনেকগুলো “কিন্তু” আর “যদি”র সঠিক সন্নিবেশ ঘটলে এবং নেদারল্যান্ডসের মত প্রবল পরাক্রমশালী প্রতিপক্ষকে বড় ব্যবধানে হারিয়ে ছয় গ্রুপের চারটি সেরা তৃতীয়র একটি হয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে যাবার সুযোগ ছিল। সেই প্রায় অসম্ভব কাগুজে সম্ভাবনার পিছনে ছুটতেই আক্রমণাত্মক খেলার ঝুঁকি নিতে পরোয়া করেনি দেশটি। ফলাফল বলছে বাংলাদেশও তাদের বিশ্বকাপ বাছাইয়ের ওমান ম্যাচটা একই ব্যবধানে হেরেছে। তবে ভেতরের পরিসংখ্যানগুলোর দিকে তাকালে বাংলাদেশ আর মেসিডোনিয়ার মানসিকতার পার্থক্য বোঝা যাবে। গোলরক্ষকের সামনে দশজন খেলোয়াড়কে দাড় করিয়ে সেদিন বল দখলের কোন চেষ্টাই করেনি বাংলাদেশ। মাত্র ২০ শতাংশ বল পজেশনে রাখা বাংলাদেশ পুরাটাই ব্যয় করেছিল রক্ষণ পরিস্কারে। অপরদিকে প্রায় ৪১ শতাংশ বল নিজেদের নিয়ন্ত্রনে রেখে ওলন্দাজদের বিপক্ষে ১৩ টি শট নেয়া উত্তর মেসিডোনিয়ার প্রতি আক্রমণে উঠে আসার সাহসী গল্পটার কথাই বলছে। বড় দলের কাছে কম ব্যবধানে পরাজয়ের স্বস্তি খুজেনি ওরা। তবে খালি হাতেও ফেরেনি। বড় দলের সাথে সন্মুখ লড়াই থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরেছে, যা তাদের ভবিষ্যতে এগিয়ে নেবে।

mesi banglaচিত্রঃ উত্তর মেসিডোনিয়া বনাম নেদারল্যান্ডস (উইয়েফা ইউরো ২০২০) ও বাংলাদেশ বনাম ওমান (এএফসি বিশ্বকাপ ২০২২ বাছাই) ম্যাচ দুটির তুলনামূলক পরিসংখ্যান; Information Source: Source: FIFA.com 

 

অন্যদিকে ওমান বা ভারতের মত মাঝারি শক্তির প্রতিপক্ষের সাথেই নয়, র‍্যাংকিং এ কাছাকাছি থাকা প্রতিপক্ষের সাথে খেলতে নেমেও বাংলাদেশের অতি রক্ষণাত্মক প্রবণতা দৃষ্টিকটুভাবেই চোখে পড়ে। প্রায় সমশক্তির প্রতিবেশী নেপালের সাথে এ বছরে খেলা একাধিক প্রীতি ম্যাচেও অতি রক্ষণাত্মক কৌশলের উর্ধ্বে উঠে খেলার সাহস দেখায়নি বাংলাদেশ। কাছাকাছি শক্তির প্রতিপক্ষর বিপক্ষে খেলার সুযোগ কাজে লাগিয়ে তরুণ ও অনভিজ্ঞ খেলোয়ারদের জাতীয় দলে অভিজ্ঞতা বাড়িয়ে নেয়া ও বিশ্বকাপ বাছাইয়ের প্রতিযোগীতামূলক ম্যাচে নামার আগে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নীরিক্ষা করাতে মনযোগী ছিল নেপাল। অন্যদিকে পূর্ণ শক্তির বাংলাদেশ প্রীতি ম্যাচের আক্রমণাত্মক খেলার স্বাভাবিক প্রবণতাকে উপেক্ষা করে অতি রক্ষণাত্মক মুখস্থ ফুটবল খেলে গেছে। নেপাল খেলার মানের উন্নতি নিয়ে ভেবেছে। আমরা ফলাফল নিয়ে ভেবেছি। প্রীতি ম্যাচ র‍্যাংকিংকে খুব সামান্যই প্রভাবিত করে, এটা জেনেও সেখানেও ফলাফল নির্ভর নেতিবাচক ফুটবল আমাদের ফুটবল সংস্কৃতির অংশে পরিণত হয়েছে।       

ফলাফল নির্ভর, ব্যবধান কমানো পরাজয় অথবা কদাচিত ড্র এর জন্য খেলা বিরক্তিকর ও নেতিবাচক ফুটবলে র‍্যাংকিং এ অতি সামান্য উন্নতি দিয়ে ফুটবলের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই উন্নতি সম্ভব নয়। এ সহজ সত্য জাতীয় দলের বিদেশি কোচিং স্টাফদের অজানা নয়। তারা না চাইলেও এই সংস্কৃতিই তাদের ধারন করতে হবে। নতুবা পত্রপাঠ বিদায়। স্বল্প সময়ে তাদের ফলাফলগত দৃশ্যমান উন্নতি দেখাতে হবে। না হলে চুক্তি নবায়ন হবেনা। এটাই এদেশের সংস্কৃতি। আফগানিস্তানের মত সামান্য এগিয়ে থাকা প্রতিপক্ষের সাথে বিশ্বকাপ বাছাই পর্বের দ্বিতীয় লেগের ম্যাচটিতে প্রায় পুরোটা সময় অতি রক্ষণাত্মক খেলে অর্জিত ড্রয়ের পর দল বন্দনায় নেমেছিল ফুটবল নীতি নির্ধারক, সংশ্লিষ্ট গনমাধ্যমের অনেকেই।  বাংলাদেশের  অতি রক্ষণাত্মক কৌশল নিয়ে কাউকে সমালোচনা করতে দেখা যায়নি। যে দেশের মূল্যায়ন এরকম, সে দেশের কোচিং স্টাফরা দৃষ্টিসুখকর খেলানোর পথে হাঁটবেন না। ছয় মাস পর পর নবায়নযোগ্য চাকরিটা বাঁচাতে কম ব্যবধানে পরাজয় আর কদাচিৎ পাওয়া অফুটবলীয় ড্র তাদেরও খুব প্রয়োজন। মূল্যায়নের আগে যথেষ্ট সময় পাওয়া যে কোন ফুটবল কোচের মৌলিক অধিকার। বাফুফের কর্তাব্যক্তিদের কাছে এসব কেতাবি কথা। ক্ষমতাসীন ফেডারেশন সভাপতির তিন মেয়াদে দেশী বিদেশি মিলিয়ে কমপক্ষে ১৯ বার জাতীয় দলের কোচ বদল হয়েছে। এই সময়ে প্রতিবেশী ভারতের জাতীয় দলে কোচ বদল হয়েছে মাত্র ৬ বার। একজন ফুটবল শাসকের সময়ে এত বার জাতীয় কোচ বদল বিশ্ব রেকর্ড কিনা তা জানা না গেলেও তিনি যে কোচদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সাময়িক ফলাফলকে অগ্রাহ্য করার মত দূরদৃষ্টিবোধসম্পন্ন নন তা ঐ একটি পরিসংখ্যানটিতেই বোধ করি দিব্যলোকের মত পরিস্কার হয়ে যায়। কৌশলী কোচেরা এই সুযোগটি নেবেন। বঙ্গোপসাগরের তীরের ছোট্ট আয়তনের আবেগি জাতিটি ফুটবলে দীর্ঘমেয়াদে অগ্রযাত্রার সঠিক পথে আছে কি নেই, তাতে তাদের কি আসে যায়? তাদের কোচিংকৃত সময়ের ফলাফলটাই তাদের কাছে মুখ্য হবে, এটাই স্বাভাবিক। জর্জ কোটান ও হালের জেমি ডে এই সুযোগটাই নিয়েছেন। কোচ বদলের মিউজিক্যাল চেয়ার খেলায় এঁরা দুজনই কেবল তিন বছর টিকতে পেরেছেন। জেমি ডে অতিরক্ষণাত্মক কৌশলে কিছু ব্যবধান কমানো পরাজয় আর ড্র কিনে চাকরি বাঁচিয়ে এখনো টিকে আছেন।  

প্রতিবেশী ভারত, মালদ্বীপ, নেপাল বা আফগানিস্তানের ফুটবল পরিকল্পিত ও পাসিং নির্ভর হয়ে দিন দিন দৃষ্টিসুখকর হয়ে উঠছে, বল দখলের লড়াইয়ে না থেকে উদ্দেশ্যহীনভাবে বলকে সামনে বাড়িয়ে সাময়িকভাবে ডিফেন্স সামলানোর লাগামহীন প্রদর্শনীতে বিরক্তিকর ফুটবল চলছে দেশের ফুটবলে। আমাদের জাতীয় দলের দিকে দৃষ্টি রাখলে এত দিনে আপনার জানা হয়ে গেছে, আমাদের ডিফেন্ডাররা কখনো গোলরক্ষককে ব্যাক পাস করে বল নিয়ন্ত্রণ রাখেননা। তা না করে প্রতিপক্ষকে বিপদজ্জনক স্থানে থ্রো আর কর্নারের বিনিময়ে রক্ষণ সামলান। অথচ আধুনিক ফুটবলে ছোট বড় সব দলের গোলরক্ষক একজন মেইক শিফট ডিফেন্ডার, পাসিং গেমের অপরিহার্য অংশ হিসেবে গোল পোস্ট সামলানোর পাশাপাশি পাসিং গেমে অংশ নিয়ে রক্ষণে অতিরিক্ত ডিফেন্ডারের ভূমিকা পালন করেন।   

খেলা তৈরিতে গোল কিক এর কোন বিকল্প নেই বাংলাদেশ জাতীয় দলে। গোলরক্ষকের বাড়িয়ে দেয়া বলে ডিফেন্ডারদের ছোট ছোট পাসিং গেমে খেলা তৈরি করা, আধুনিক ফুটবলের মৌলিক কৌশল। এ দেশের জাতীয় দলে এই কৌশল ভুলেও প্রয়োগ হতে দেখা যায়না। বলের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার নুন্যতম চেষ্টা না করে প্রত্যেকবার খেলা শুরু করা হয় লম্বা লম্বা গোল কিকের মাধ্যমে। এই একটি ফর্মুলায় খেলে পজেশন ভিত্তিক ফুটবল খেলা অসম্ভব। আর আছে প্রতিপক্ষের অর্ধে থ্রোয়িং পেলে অবধারিতভাবে লম্বা থ্রোতে গোলমুখে জটলা তৈরি করে অপরিকল্পিত সুযোগ তৈরি করার মুখস্থ কৌশল। আধুনিক ফুটবলে এসব মুখস্থ কৌশলের স্থান নেই।       

নেতিবাচক ফুটবলের এই চক্র ভেঙ্গে সাহসী আগ্রাসী খেলার ধারা চালু হলে নিজ অর্ধ ছেড়ে প্রতিপক্ষের অর্ধে খেলোয়াড়দের আনা গোনা বাড়বে। তখন জায়গা তৈরি হবে নিজ অর্ধে। পজেশন ধরে রেখে পাসিং ফুটবল খেলার স্পেইস তৈরি হবে। একই সাথে প্রেসিং ফুটবল দিয়ে প্রতিপক্ষের কাছ থেকে বল কেড়ে নেয়ার সক্ষমতাও বাড়বে। রাতারাতি আধুনিক ফুটবলে হয়তো আমরা অভ্যস্ত হতে পারবনা। এই সময়ে এশিয়ার মাঝারি দেশগুলোর সাথে পরাজয়ের ব্যবধান বেড়ে প্রতিপক্ষের সাথে আমাদের সত্যিকারের ব্যবধান তুলে ধরবে।। তাতে অস্থিরতা আর চাপ বাড়বে সন্দেহ নেই। র‍্যাংকিং এ অবনমিত হতে হতে এতটাই নিচে নেমেছি আমরা যে এর চেয়ে নিচে নামার বোধ করি খুব বেশি সুযোগ নেই। ধীরে হলেও টেকসই উন্নতির সুযোগ এখান থেকেই সৃষ্টি হবে। প্রতিদ্বন্দীতা আর পেশাদারিত্বের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে যাওয়া ফুটবলে শর্টকাটে সাফল্য পাওয়ার পথ খোলা নেই। শর্টকাটে সাফল্যের খোঁজে নেতিবাচক ফুটবলের টোটকা গ্রহণে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোরও আগ্রহ নেই। ভারত, মালদ্বীপ, আফগানিস্তান নিঃসন্দেহে এগিয়ে গেছে। ভবিষ্যতের দিকে তাকানো নেপাল আর ভুটানও চোখ রাঙ্গাচ্ছে খুব শিগগিরই আমাদের ছাড়িয়ে যাবার। উত্তর মেসিডোনিয়ার দিকে তাকালেই যে সত্যটা উপলব্ধি করা যায়। মাত্র বছর কয়েক আগে ফিফা রেংকিং এ ১৬২ তম স্থান থেকে যখন তারা ভবিষ্যৎমুখী পরিকল্পনা সাজাতে ব্যস্ত (২০১৬), সাময়িক সাফল্য সন্ধানে বাংলাদেশ তখন ১৬৫ তম স্থান থেকে (২০১৪) দীর্ঘমেয়াদী অবনতির দিকে ধাবিত হচ্ছিল।   

প্রতিবেশী ভারত আর আফগানিস্তানের সাথে একসময় প্রায় সমমানের ফুটবল খেলা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ে বিরক্তিকর এবং আত্মধবংশী অতিরক্ষণাত্মক খেলে বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে আদায় করা ড্র থেকে প্রাপ্ত দুই পয়েন্টে মিলেছে এশিয়ার বাছাই পর্বের সুযোগ। এটাকে মন্দের সাইড ইফেক্ট হিসেবে পাওয়া “ভাল” বলা যায়। তবে উন্নতির মনকলা খেয়ে খেয়ে দুইযুগের বেশি উল্টো পথে চলা বাফুফের তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলা হবে ভয়ংকর। কোচদের দীর্ঘমেয়াদী সময় দেয়ার পাশাপাশি ইতিবাচক ফুটবল খেলানোর জন্য চাপটাও দিতে হবে বাফুফেকেই। সংবাদ মাধ্যম আর ফুটবলানুরাগীদের ফলাফল ভিত্তিক মূল্যায়ন না করে এবং ফলাফলের দিকে না তাকিয়ে সমর্থন যোগাতে হবে ইতিবাচক ও সাহসী ফুটবলের জন্য।

Special thanks to Freeflagicons.com for allowing me to use the wonderful thumbnail in this blog article