• ক্রিকেট

কগনিটিভ বায়াসের সাথে ক্রিকেটীয় সিদ্ধান্তের সম্পর্ক

পোস্টটি ৩১৯ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

বায়াস, সোজা বাংলায় এর অর্থ পক্ষপাতী প্রবণতা। কগনিটিভ বায়াস হলো এমন সব বায়াস যা আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহনকে ভুল পথে চালিত করতে পারে। দৈনন্দিন জীবনের যেকোনো ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে সামাজিক, রাষ্ট্রীয়সহ সবধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষেত্রেই বায়াসের উপস্থিতি থাকতে পারে। ক্রিকেটকে কেন্দ্র করে আমরা নিজেদের মধ্যে ঠিক কীভাবে এই কগনিটিভ বায়াস লালন করি সেটাই খুঁজে দেখার চেষ্টা করব আজ।

 

[১]

শুরুটা করা যাক কনফার্মেশন বায়াসকে দিয়ে। কনফার্মেশন বায়াস মূলত এমন একটি কগনিটিভ বায়াস যা আমাদেরকে আমাদের ধ্যান ধারনার উপরেই স্থির থাকতে প্রলুব্ধ করে। সিদ্ধান্ত গ্রহনের সময় আমরা কেবল সেসব বিষয়ের উপরেই অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকি যা আমাদের নিজেদের বিশ্বাসের সাথে মিলে যায়। উদাহারণ হিসেবে আপাতত নেয়া যাক ২০১৯ বিশ্বকাপের একটি বিষয়কে। বিশ্বকাপের আগে মাশরাফির দলে থাকা উচিত কি না তা নিয়ে আলোচনা কম হয়নি। যেকোনো আলোচনাকে কেন্দ্র করে দল হয় কয়েকটি। কিছু দল প্রত্যক্ষভাবে আলোচনায় অংশ নেয়, আবার কিছু দল ওই আলোচনা শুনে "যার লজিকে জোর বেশি, আমি ভাই সেদিকে আছি" নীতি মেনে নিয়ে দর্শক সাড়ীতে থাকে।

 

মাশরাফিকে নিয়েও সেই বিশ্বকাপের শুরুতে, বিশ্বকাপ চলাকালীন এবং বিশ্বকাপ শেষে এমন কিছু দলের সৃষ্টি হয়। যাদেরকে সজ্ঞায়িত করতে গেলে (i) ‘আমরা ম্যাশের পাগলা সাপোর্টার’ আর (ii) ‘মাশরাফি ক্যাপ্টেন কোটায় খেলে’ নামে সজ্ঞায়িত করা যেতে পারে। 

 

এদের মধ্যে প্রথম দলের মানুষেরা মাশরাফিকে দলে রাখবেনই আর দ্বিতীয় দলের মানুষেরা মাশরাফির জন্য তখন থেকেই দলে জায়গা দেখেননি। দুই পক্ষের মানুষের হাতেই যত যুক্তি-প্রমাণ ছিলো বেশিরভাগই এই "কনফার্মেশন বায়াস" কেন্দ্রিকই, পারফরম্যান্স কেন্দ্রিক না। কীভাবে সেটা? দেখানো যাক তবে কিছুটা।

 

যারা বিশ্বাস করতো মাশরাফি সে সময়েও খুব ভালো বোলার, ইংল্যান্ডের কন্ডিশনেও সে ভালো করতে পারবে তারা তার পক্ষে লজিক দিতে গিয়ে ইংল্যান্ডের কন্ডিশন ভুলে গিয়ে দেশের মাটিতে সেসময়ের মাশরাফির বাঘা বাঘা সব পরিসংখ্যান তুলে আনছিলো। আর যারা মাশরাফিকে দেশের মাটিতেও দলে রাখার পক্ষে ছিলো না, তারা মাশরাফির প্রত্যেকটা সাফল্যের পেছনে তার অবদানকে অস্বীকার করে দলের অন্য কারও অবদানকেই শুধু সামনে এনেছিলো (২০১৫ বিশ্বকাপের পর পাকিস্তান সিরিজ জয়ে তামিমের, ভারত সিরিজ জয়ে মুস্তাফিজের, দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজ জয়ে সৌম্যদের ভূমিকা দেখলেও ক্যাপ্টেন মাশরাফির কোনো কৃতিত্ব তারা দেখেনি)। এই দুই পক্ষের মানুষই নিজেদের মধ্যে লালন করেছে কনফার্মেশন বায়াস।

 

এই কনফার্মেশন বায়াসের আর দুটো উদাহারণ দেয়া যাক। মুশফিক দলের সেরা ব্যাটসম্যান, মিস্টার ডিপেন্ডেবল। কোনো এককালে এ কথাটা মগজে ঢুকার ফলে এখনো সে টি২০ দলের নিয়মিত প্লেয়ার। ম্যানকাড নিয়েও আমাদের চিন্তাভাবনা কনফার্মেশন বায়াসেই আটকে আছে

 

[২]

ফলস কনসেনসাস ইফেক্ট এমন একটি বায়াস যার কারণে অন্য কতজন আমার সাথে একমত সেদিকে দৃষ্টি না দিয়ে এটাই ঠিক, সবাই-ই আমার পক্ষে আছে এমনটা বিশ্বাস করে ফেলে মানুষ। দেশের ক্রিকেটে এমন উদাহারণ তো ভুঁড়ি ভুঁড়ি দেয়া যাবে। 

ক) '১৯ বিশ্বকাপে মাশরাফির সব ম্যাচ খেলে যাওয়া তার কাছে সঠিক সিদ্ধান্ত মনে হয়েছে।

খ) মুশফিক মনে করেন, তিনি দেশের সেরা উইকেট কিপার।

গ) নান্নু-বাশাররা মনে করেন তারা খুব ভালো দল নির্বাচন করছেন।

ঘ) মোহাম্মদ মিঠুন মনে করেন তিনি টেকনিক্যালি অনেক ভালো।

ইত্যাদি।

 

[৩] 

"সাকিব টেস্ট খেলতে চায় না"- এমন কথা আকরাম খান থেকে শুনেছেন। দেশের তথাকথিত বড় বড় সাংবাদিকেরা জানিয়ে দিলেন, "ময়না পাখির গান এখন থেকে শুধু রঙিন পোশাকেই শুনতে পাওয়া যাবে"। তারা বুঝাতে চাইলো বিসিবি সাকিবকে টেস্ট থেকে বাদ দিতে যাচ্ছে, আমরা ধরে নিলাম অভিমানে সাকিব টেস্ট থেকে অবসরে যাচ্ছেন। আদতে কিন্তু এর কিছুই হলো না, নতুন কেন্দ্রীয় চুক্তিতে সাকিব ৩ ফরমেটেই খেলবেন বলে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। এখন কোনো কারণে যদি আমরা দেখতাম সাকিব কোনো কারণে ২-১ টেস্ট থেকেও বিরতি নিয়েছে, আমরা ধরে নিতাম- সাকিব আসলেই টেস্ট খেলতে চায় না। এটাই মিসইনফরমেশন ইফেক্ট। অনেকে এখনো বলবে, সাকিব আসলেই টেস্ট খেলতে চায় না, সেটা ভিন্ন ব্যাপার।

 

মিসইনফরমেশন ইফেক্টের আরেকটি উদাহারণ দেখা যাক। ২০১৫ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশ ম্যাচের আম্পায়ারদের কিছু প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্তের পর থেকে এখন ভারত - বাংলাদেশ ম্যাচে বাংলাদেশের বিপক্ষে আম্পায়ার কোনো ভুল বা দর্শকের চোখে ভুল এমন সিদ্ধান্ত দিলেই সেখানে চক্রান্তের গন্ধ পাই আমরা। কারণ আমাদের কাছে ইনফরমেশন/মিসইনফরমেশন পৌছে গেছে এই বলে যে, “আইসিসিও বাংলাদেশের বিপক্ষে থাকে”।

 

[৪] 

এংকরিং বায়াস নিয়ে কথা বলতে তামিম ইকবালের এংকরিং রোলকেই সামনে নিয়ে আসা যাক। 'ফার্স্ট ইম্প্রেসন'- এটুকুই এংকরিং বায়াসের মূল ভিত্তি বলা যায়। তামিম ইকবাল কিছু ম্যাচে ম্যাচের দাবি অনুযায়ী এংকরিং রোলে খেলে সফলতা পেয়ে মনে করলেন এটাই ঠিক। বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পাহারসম রানের নিচে চাপা পরেও তিনি এংকরিং রোলই ফলো করে গেলেন। প্রথমে কিছুতে সফলতা পেয়েছি মানে এভাবেই পেতে থাকব, প্রথমে কিছু ভালো লেগেছে বলে এটা সবসময়ই ভালো- এমনটা ভাবাই এংকরিং বায়াস। ইভ্যালির শুরুর দিকের কাস্টমাররা যেমন এখনো ইভ্যালির ফ্যান, শুরুর সৌম্য সরকারের খেলা দেখে অনেকেই এখনো সৌম্যের হাইডার্ড ফ্যান। এগুলোই এংকরিং বায়াসের ফল।

 

[৫]

'এক্টর অবসার্ভার বায়াস' নামে একটা টার্ম আছে। নিজে ক্যাচ নিতে না পারলে "নিউজিল্যান্ডের আকাশ বেশি উজ্জ্বল হওয়ায় ক্যাচ বেশি মিস হয়েছে" আর অন্য কেউ ক্যাচ মিস করলে "এদের এই বডি ল্যাঙ্গুয়েজ নিয়ে মাঠে নামে কীভাবে?" বলাটাই এক্টর অবসার্ভার বায়াস।

 

৩ বলে ২ রান লাগে, এমন ম্যাচ বাংলাদেশ হেরে গেলে সেটা মেনে নেয়া যায় না, তবে ব্যাপারটা স্বাভাবিক হিসেবে নেয়া; আর মোটামুটি একই রকম ঘটনা আইপিএলে ঘটলে নিশ্চিত ফিক্সিং-এর গন্ধ পাওয়াকেও এক্টর অবসার্ভার বায়াস বলে।

 

বাংলাদেশের বিপক্ষে আম্পায়ারের দেয়া কোনো ভুল সিদ্ধান্তকে চক্রান্ত মনে হওয়া আর বাংলাদেশের পক্ষে আম্পায়ারদের দেয়া ভুল সিদ্ধান্তগুলোকে হিউম্যান এরর মনে করাই এক্টর অবসার্ভার বায়াস।

 

[৬]

কোনো একটা বাজে ব্যাপার টানা হতে থাকলে সেটাকে আর বাজে মনে না হওয়ার ব্যাপারকে বলা হয় এভাইবিলিটি হিউরিস্টিক। যেমন: সৌম্য, লিটনরা বারবার ব্যর্থ হতে হতে এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে সেটাকে আর ব্যর্থতা মনে হয় না নির্বাচকদের কাছে। তারা খেলতে নামলে ব্যর্থ হবে এটাই বরং নিয়ম মনে হয় দলের নির্বাচকদের কাছে।

 

[৭] 

আমরা সফল হবোই, কোনো পাইপলাইন না থাকলেও সফল হবো, কোনো প্রোপার প্ল্যানিং না থাকলেও আমরা সফল হবো, ২০১৯ বিশ্বকাপ বাংলাদেশই জিতবে, ২০২৩ বিশ্বকাপ জেতার সুবর্ণ সুযোগ আছে আমাদের সামনে, সাকিব বলেছে এবার আমাদের ভালো সম্ভাবনা আছে- এমন চিন্তাভাবনাগুলোই অপটিমিজম বায়াসের ফল।

 

[৮]

"College is for Suckers"- নিউ ইয়র্ক টাইমসের এমন কথা বলার পেছনে প্রভাবক হিসেবে ছিলো বিল গেটস, জুকারবার্গের ড্রপডাউট হয়েও সফল হওয়ার ঘটনা। অগণিত ড্রপআউটদের ব্যর্থতার ভীরে গুটিকয়েক কয়েকজনের সফলতার গল্প শুনে সেটাকেই ফ্যাক্ট হিসেবে নিয়ে নেয়াকে বলে সারভাইভারশিপ বায়াস। 

 

এই বায়াসের ফলে আমাদের দেশের কোনো এক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ড্রপআউট হওয়া কোনো এক ছেলে তাকে তুলনা করে ফেলে হার্ভার্ড ড্রপআউট বিল গেটস আর জুকারবার্গের সাথে। 

 

আলাদা কোনো ক্রিকেটীয় ব্যাকরণ না শিখেই বিশ্ব ক্রিকেটে মুস্তাফিজের ঝলক দেখে অনেকেই ধরে নেয় এভাবে ওভাবে করেই বড় প্লেয়ার হওয়া যাবে, প্র‍্যাকটিস লাগে না। স্বয়ং মুস্তাফিজকেও টিকে থাকতে কষ্ট করতে হয়েছে সেটা যেমন দেখে না তারা, তেমনি চোখের সামনে থেকে নাসির হোসেনের হিরো থেকে জিরো হয়ে যাওয়াকেও তারা মূল্যায়ন করে না। তাদের ফোকাস শুধু ওই হঠাৎ এসে ক্যালমা দেখিয়ে যুগের পর যুগ টিকে থাকার আশাতেই। এজন্যই এদেশে সৌম্য, শান্ত, নাসিররা নষ্ট হয়ে যায়; টেন্ডুলকার হয়ে উঠতে পারার চেষ্টাও থাকে না তাদের।

 

[৯]

ক্যাচ নিতে না পারলে উজ্জ্বল আকাশের দোষ, বোলারের সামনে দাঁড়াতে না পারলে আলাদা কন্ডিশনের দোষ, ম্যাচ জিততে না পারলে আম্পায়ারের দোষ, দল নির্বাচনে ব্যর্থ হলে খেলোয়ারদের দোষ, সভাপতির দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে বাকিদের দোষ দেয়ার প্রবণতাকে বলে সেল্ফ সার্ভিং বায়াস।

 

[১০]

সমর্থকদের মধ্যে সাকিবিয়ান, তামিমিয়ান, রিয়াদিয়ান থেকে শুরু করে হালের আফিফ, সোহান বা পুরোনো ইমরুল কায়েসদেরও ফ্যানবেজ আছে। নিজের প্রিয় প্লেয়ারের ভালোটাকে ফোকাস করে দেখাতে গিয়ে বাকিদের ভালোকে গোপন করা, উহ্য রাখা কিংবা অস্বীকার করাটা এটেনশনাল বায়াসের ফল। টেস্টে রিয়াদের ভালো দেখাতে গিয়ে ওই পজিশনে খেলা বাকিদের পারফরম্যান্সকে গুরুত্ব না দেয়া, সোহানের কিপিংকে ভালো দেখাতে গিয়ে তার ব্যাটিং নিয়ে আলাদা করে কথা না বলা - এসবও এই বায়াসের ফল।

 

[১১] 

- "আমিই বলেছিলাম ওকে দলে নিতে।"

- "আমি আগে থেকেই জানতাম ও ভালো করবে।"

- "আমিই দলের সেরা উইকেট কিপার।"

- "আমাদের আসলে কোনো কোচ লাগে না, নিজেরাই পারব"

এরকম "আমি একাই একশো" ভাবাটাকে বলে দ্যা ডানিং-ক্রুগার ইফেক্ট।