• ক্রিকেট

ক্রিকেট, নগর ও সমাজ-২খঃ একটি স্কুল-উপন্যাস ও ক্রিকেটের আদিসুরঃ শেষ অংশ

পোস্টটি ৪৩৪ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

(১ম অংশ পর্ব ২-ক পড়ুন এখানেঃ https://pavilion.com.bd/user/feeds/6672/details )

পর্ব ২-খ
৩।

কি ছিল সেই দর্শন? ক্রিকেটের সাথেই বা এর যোগ কোথায়?

আমাদের প্রথম পর্বের একটু রেফারেন্স নিতে হবে। জর্জিয়ান যুগের প্রথম দিকে কিংবা এরও আগে ইংল্যান্ডের পাবলিক লাইফে ছিল ব্যাপক বিশৃঙ্খল অবস্থা। সে সময়টাতে ক্ষয়িষ্ণু জোতদার শ্রেণীর সাথে দিনে দিনে বেড়ে ওঠা বণিকশ্রেনীর ক্ষমতা আর নানা বিষয়ের টানাপোড়েনে সমাজে এক ধরনের অস্থিরতা ছিল। একটা সময়ে অর্থনীতির সুবিধার্থে ভুট্টা শস্যের উৎপাদন উৎসাহিত করতে চোলাই ইন্ডাস্ট্রিকে ব্যাপক ছাড় দেয়া হল। ফলে এক সময় নব্য গ্রেটবৃটেন জুড়ে সুরার ব্যাপক প্রাচুর্য্য! এদিকে সুপেয় পানির ব্যাপক আকাল, কলেরা ও পানিঘটিত রোগ নিত্য সমস্যা (লন্ডনের সেই কুখ্যাত কলেরা মহামারি স্মরণ করতে পারেন)। লোকজন তেষ্টা মেটাতে সহজ সমাধান নিলো সেই চোলাই পানীয়ে। কৌতুক আছে বৃটেনের শহরবাসী সকালে নাস্তায় পানির বিকল্প হিসেবে সেই যে পানীয় ধারণ শুরু করে দেন, তার প্রভাবে বেলা বারোটা না বাজতেই রাস্তা জুড়ে সব বেহেড মাতালে ছেয়ে যায়। ফলে যেকোন আলাপচারিতা, কেনাকাটা, দরকষাকষি, প্রতিযোগিতা শীঘ্রি এক কিম্ভূত গোলমালে রূপ নেয়। সাথে বৃটিশদের সেই চিরন্তন জুয়া, অর্থকড়ির প্রতি আকর্ষণ যোগ করুন, সোনায় সোহাগা। ধরুন, রাস্তার পাশে দুই পিচ্চিও যদি খেলাচ্ছলে মারামারিতে মাততো, তাদের চারপাশে গোল হয়ে ভিড় জমে যেত এদের নিয়ে বাজি ধরতে। এর মধ্যে বাজির পয়সা উসুলে সিরিয়াস কেউ হয়তো হুড়োহুড়ি করছে সামনের লাইনে জায়গা পাবার জন্য। এর মধ্যে কেউ আবার সামনের সিট ভাড়া দিচ্ছে ভিআইপি বক্স হিসেবে। এ চিত্র বদলে যেতে লাগলো যখন বৃটেন ঘরে যোগাযোগ আর প্রযুক্তিতে উদ্ভাবন করতে লাগলো আর বাইরে উপনিবেশ নিয়ে বেশ জেঁকে বসলো। আয় রোজগার ভাল হলো, ঘরে আর অভাব নেই, দুনিয়া জুড়েও প্রভাব প্রতিপত্তি বাড়ছে। এহেন অবস্থায় এমন হৈ হাঙ্গামা-জুয়াচুরির পরিচয় তো আর মানায় না।

ইউরোপীয় শক্তিগুলো এসময়ে একদিকে ইউরোপে আর অন্যদিকে পৃথিবীর নানাপ্রান্তে উপনিবেশ নিয়ে নিজেদের প্রভাবের লড়াইয়ে বেশ ব্যস্ত ছিল। ফলে একদিকে সমাজের ডিসিপ্লিন আর আরেকদিকে মিলিটারি ডিসিপ্লিনের দরকার হয়ে পড়লো। অন্যদিকে প্রকাশনা ও লিটারেসি এই সময় বেগবান হল প্রিন্টিং সুলভ ও প্রকাশনার ওপর বাধানিষেধ উঠে যাওয়াতে। ফলে একদিকে নানাবিধ চিন্তা দর্শনের প্রভাবে আর অন্যদিকে কলোনিয়াল দুনিয়াতে কালচারাল সুপ্রিমেসি প্রতিষ্ঠার তাগিদে ‘ডিসিপ্লিনড জেন্টলম্যানশিপে’র ধারণা আকার পেতে লাগলো। গ্রামভিত্তিক কৃষিসমাজ যখন শিল্পনির্ভর শহুরে সমাজে বদলাতে লাগলো, কায়িক শ্রমের অভাবে স্বাস্থ্যসমস্যাটিও বেশ টের পাওয়া গেল।

নিয়মানুবর্তিতা, সুস্বাস্থ্য, উন্নত আচার ব্যবহার - সমাজ সংস্কার আর কালচারাল সুপিরিওরিটির ইমেজ প্রতিষ্ঠার তাগিদে ব্রিটেনে যে নতুন দর্শনটি জায়গা করে নিলো - তাকে বলা হয় ‘মাসকুলার ক্রিশ্চিয়ানিটি’। ধারনাটি হচ্ছে একজন আদর্শ ‘বৃটিশ জেন্টলম্যানে’র যিনি একই সাথে এথলেটিক (খেলাধুলা, অভিযান, শিকার, শারিরীক কসরতে পারদর্শী এবং সুবেশী) আর আদর্শবাদী (সমাজ ও দূর্বলের কল্যাণে ধর্মীয় মূল্যবোধগুলো ধারণ করেন, দূর্বলকে রক্ষা করেন এবং সদালাপী, সদয়)। ‘দূর্বল’কে ‘রক্ষা’র তাগিদেই তাকে সবল হতে হবে। এসময়ের গল্প উপন্যাসের হিরোকে লক্ষ্য করলেও দেখবেন, সে এডভেঞ্চেরাসঃ ‘দুর্গম’ অভিযানে যাচ্ছে, আবিষ্কার করছে, শিকার, খেলাধুলায় বা শারীরিক কসরতে তাক লাগিয়ে দিচ্ছে। আবার সে নৈতিকভাবে উন্নতঃ অসহায়ের জন্য দিলদরিয়া, ‘দূর্বল’কে রক্ষা করতেই সে ‘শক্তিধর’ [সুপারহিরো কনসেপ্ট এখনো?]। এই মাসকুলার ক্রিশ্চিয়ানিটির ভাবাদর্শেই গড়ে উঠেছে ওয়াই এম সি এ (ইয়ং মেনস ক্রিশ্চান এসোসিয়েশন), স্বামী বিবেকানন্দও এ ধারণার আদলেই গড়ে তুলেছিলেন তার ইসকন। সুদূর মেইজি জাপানে ‘টম ব্রাউন’স স্কুল ডেজ’ স্কুল পাঠ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলোও ঠিক একারণেই, সম্রাট মেইজির সংস্কারে জাপানেও তখন শিল্পায়নের ঢেউ আর পশ্চিমা অনুপ্রেরণায় ‘আধুনিকীকরণ’ চলছিল।

সমাজবিদরা বলেন ‘মাসকুলার ক্রিশ্চিয়ানিটি’ দু অর্থেই ছিল মাসকুলারঃ এটি ছিল সম্পূর্ণই পুরুষকেন্দ্রীক ভাবনা, আর দেহসৌষ্ঠব ও শারীরিক কার্যক্রমকে মহিমান্বিত করে মাসকুলার। এর আগ পর্যন্ত চার্চের সাথে শরীরকে প্রাধান্য দিয়ে ভাবনার তেমন সংশ্রব দেখা না গেলেও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ চার্চের মতবাদ আসতে লাগলো শরীরচর্চা আর আত্মিক উৎকর্ষের যোগসূত্রে। অনেকটা কাউন্টার রিফর্মেশনের আদলেই যেন ইউরোপীয় হিউম্যানিজম দর্শনের উত্তরে এর বিস্তার। তবে দুই দর্শনেরই সমালোচনা আছে শুধুমাত্র সাদা পুরুষকে নিজস্ব সংজ্ঞায় ‘উন্নত মানুষ’ হবার আর বাদবাকি সবাইকে ‘দূর্বল’ সাবাস্তে ‘রক্ষা’র বিশেষ ম্যান্ডেট দেয়াতে।

যাহোক, টমাস আর্নল্ডের রাগবি স্কুল আর পরবর্তীতে আরো ব্রিটিশ স্কুল এই দর্শনেই তাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে নিবেদিত করেছেন। গল্পের টম ব্রাউনও গল্প এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে আরো ব্রিটিশ জেন্টলম্যানে পরিণত হয়েছে। এই ব্রিটিশ জেন্টলম্যানশিপ বা তার পেছনে কালচারাল সুপ্রিমেসির আরেক অন্যতম বাহক ছিল ক্রিকেট। তৃতীয় পর্বে আমরা দেখবো ক্রিকেট খেলাটির গড়ে ওঠা আর অর্থনীতিতে জর্জিয়ান ইংল্যান্ডের ক্লেদাক্ততা রয়ে গিয়েছিল, তারপরও ভিক্টোরিয়ান ইংল্যান্ডে ‘সভ্যতা’ আর ‘নৈতিকতা’-র প্রতীক হিসেবে ক্রিকেট প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। “ইট’স নট ক্রিকেট”- ছিল এসময়ের সুপ্রচলিত উক্তি, যেটা সেই নৈতিকতার মাপকাঠিকে নির্দেশ করতো। স্কলাররা বলেন ব্রিটিশরা ক্রিকেটকে তাদের উপনিবেশগুলোতে ব্যবহার করেছেন সেই ভব্যতার মাপকাঠি হিসেবে, সোশাল ডিসিপ্লিন আর কালচারাল সুপ্রিমেসির টুল হিসেবে। হলিউড মুভি যেমন আমেরিকান কালচারাল সুপ্রিমেসি আমাদের মাথায় প্রতিষ্ঠা করেছে, ক্রিকেট ছিল ঠিক তেমনি বৃটিশ সুপ্রিমেসির সফট টুল। সেই ক্রিকেটই আবার কিভাবে ঠিক উলটো কাজটি করেছিল, সেটাই বলেছিলেন সি এল আর জেমস দারুণভাবে, বিভিন্ন উপনিবেশগুলোতে আর হাল জামানায়ও আমরা অনেক ঘটনায় প্রত্যক্ষ করেছি।

যথারীতি টম ব্রাউনের গল্পের ক্লাইম্যাক্স পয়েন্টটিও ক্রিকেট ম্যাচ নিয়ে - সে অধ্যায়ের নাম ‘টম ব্রাউন’স লাস্ট ম্যাচ’। ক্রিকেট এনালজি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, গল্পের নায়কও জেন্টলম্যানশিপের প্রতিষ্ঠা করছেন ক্রিকেটের বরাত দিয়েই। এই বইটি, রাগবি স্কুলের সংস্কার, আর বৃটিশ স্কুলগুলোর ক্রিকেটকে সিরিয়াসভাবে নেয়া তাই গভীরভাবে সম্পর্কিত। ইউনিভার্সিটিগুলোর পাশাপাশি সুবিখ্যাত স্কুলগুলো হয়ে ওঠে ক্রিকেটের কুলীনকালের অন্যতম সূতিকাগার। ইটন বনাম হ্যারো স্কুলের ম্যাচ হয়ে ওঠে শতাব্দী ধরে অন্যতম মর্যাদার লড়াই।

তাই ‘টম ব্রাউন’স স্কুল ডেজ’-এর ২য় প্রচ্ছদটিতে আমরা দেখি ক্রিকেটকে।

৪।

তৃতীয় প্রচ্ছদটি বলে অন্য আরেক কথা।

ক্রিকেট খেলাটি সংস্কৃতির বার্তাবাহকের দায়িত্ব নিয়ে ব্রিটিশ কমনওয়েলথে ছড়িয়ে গেলেও কিছু ক্ষেত্রে কালচারাল ব্যারিয়ার পার হতে পারেনি। সেটার কিছুটা আঁচ করা যায় এ বইয়ের জাপানী ভার্সনে। একটু আগেই বলা হয়েছে মেইজি জাপানের সমাজ ও শিক্ষা সংস্কারের অংশ হিসেবে এই বইটি তাদের পাঠ্যক্রমে যোগ করা হয়েছিল। কিন্তু জেনে অবাক হবেন যে গুরুত্বপূর্ণ এই ক্রিকেট অধ্যায়টিই বাদ দেয়া হয়েছিল জাপানী অনুবাদ থেকে, কারণ জাপানীরা ক্রিকেট চেনে না তাই তাদের বুঝতে অসুবিধা হবে বলে। ফলে জাপানের সংস্কারকালীন আবহাওয়াতেও ক্রিকেট স্থান নিতে ব্যর্থ হয়েছিল। অথচ প্রায় সমসাময়িককালেই বেসবল জাপানে জায়গা নিতে শুরু করে, এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকা শত্রুশিবিরে থাকার পরও যুদ্ধের আগে পরে এই আমেরিকান খেলার প্রসারে কোন ভাটা পড়েনি জাপানে।

বেসবলই মনে করিয়ে দেয় আরেকটি কালচারাল ব্যারিয়ারের। তৃতীয় প্রচ্ছদটিতে টম ব্রাউনের হাতে বেসবল ব্যাট। এটি বইটির নিউ ইয়র্ক সংস্করণ। আমেরিকা এসে গল্পের ক্রিকেট হয়ে যায় বেসবল। কেন? এ মুহুর্তে পুরনো একটি প্রশ্নও এসে যায় আমেরিকা বড়সড় ব্রিটিশ কলোনি হওয়ার পরও ক্রিকেট এখানে নেই কেন? এ আরেক বড় গল্প, শুধু নির্যাস্টুকু স্মরণ করা যায়ঃ আমেরিকান রেভ্যুলুশন বা স্বাধীনতা যুদ্ধের পর সেই আঠারো শতকেই আমেরিকা সচেতনভাবেই নিজেদের ব্রিটিশ পরিচয় থেকে আলাদা হওয়ার যথাসম্ভব চেষ্টা করেছিলো। নতুন জাতীয়তাবাদের স্রোতের পরও আমেরিকায় ক্রিকেট ভালই চলছিলো, তবে উনিশ শতকে আমেরিকান গৃহযুদ্ধের পর বেসবলের রূপান্তর হয় ‘আমেরিকান স্পোর্টস’ হিসেবে আর ক্রিকেট চলে যায় চোখের আড়ালে। এই আইডেন্টিটি পলিটিক্স এতোটাই যে, পেঙ্গুইন ভার্সনের টম ব্রাউনকে ক্রিকেট ব্যাট রেখে আমেরিকার অক্সফোর্ড প্রেসের ভার্সনে বেসবলের ব্যাট তুলে নিতে হয়। ব্রিটিশ কমনওয়েলথের মতোই ব্রিটিশ ইমপেরিয়াল গেমটি থেকে আমেরিকার অনুপস্থিত থেকে যাওয়া।

‘টম ব্রাউন’স স্কুল ডেজ’-এর প্রচ্ছদগুলো এভাবেই যেন ইঙ্গিতে খেলাটির সাথে সমাজের গল্পগুলো বলে। পরের পর্বগুলোতে আমরা এর সাথে নগর ও নগরজীবনের সম্পর্কটিও খুঁজবো।

 

#SamiHasan #CricketCitySociety #ক্রিকেটনগরওসমাজ