• ফুটবল

ফ্রম কার্ডিয়াক এরেস্ট টু ক্যারিংটন

পোস্টটি ৩৭৮ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ক্লাবটার সুপরিচিতি ঠিক কোন কারণে? হয়তো কেউ বলতে পারে সবচেয়ে বেশি লীগ জয়ী দল হিসেবে, কারো উত্তর হতে পারে একমাত্র ইংলিশ ক্লাব হিসেবে ট্রেবল জয়ের কারণে। তবে এগুলোকে ছাপিয়েও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এর সবচেয়ে বড় গর্বের জায়গা একটি শব্দ দিয়েই ফুটিয়ে তোলা যায়, সেটা হচ্ছে "কামব্যাক"। এই ক্লাব ভয়াবহ মিউনিখ ট্রাজেডি কাটিয়ে ইউরোপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। দীর্ঘ ২ দশকের বাজে অবস্থা থেকে কামব্যাক করে ফার্গির হাত ধরে পরবর্তী ২ যুগ ইংলিশ ফুটবলে একক আধিপত্য চালিয়েছে। ১৯৯৯ সালের চ্যাম্পিয়নস লীগের ফাইনালের মতো  অগণিত এমন ম্যাচ আছে যেখানে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড পিছিয়ে থেকেও ম্যাচের শেষ মুহূর্তে কামব্যাক করে ম্যাচের ফলাফল নিজেদের পক্ষে এনেছে।
eriksen 1
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এর মতো ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এর সদ্য সাইন করা প্লেয়ার এরিকসেনেরও ঠিক এমনই প্রত্যাবর্তনের গল্প আছে। হয়তো সেই গল্পটি আরো বেশি ইন্সপায়ারিং, আরো বেশি সুন্দর।

গত বছর ইউরোতে হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে এরিকসেন এর পড়ে যাওয়া, এই ঘটনা সবারই মনে থাকার কথা। ঐ মুহূর্তে কোপেনহেগেন এর পারকেন স্টেডিয়াম পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল, টিভি সেটের সামনে বসে থাকা কোটি কোটি দর্শক এরিকসেনের জন্য প্রার্থনা করছিল। এরিকসেন অজ্ঞান হওয়ার পরই তৎক্ষণাৎ সেই ম্যাচ বন্ধ করা হয়, যখন সবাই জানে এরিকসেন জ্ঞান ফিরে পেয়েছেন তখনই সেই ম্যাচ পুনরায় শুরু হয়।
eriksen 2
ঐ ঘটনার পর জানা যায় মাঠে এরিকসেনের কার্ডিয়াক এরেস্ট হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই অনেকের মনে চিন্তা জেগেছিল এরিকসেন ফুটবলে ফিরতে পারবেন কিনা। অনেকে তার বেঁচে থাকা নিয়েই শংকিত হয়েছিল।
eriksen 3
পারকেন স্টেডিয়ামের সেই ঘটনার পর ২০২১ সালের বাকি সময় এরিকসেন ফুটবলের বাইরে ছিলেন।  Implantable Cardioverter Defibrillator (ICD) লাগানোর কারণে সেরি আর নিয়ম অনুযায়ী এরিকসেন তার তৎকালীন ক্লাব ইন্টার এর হয়ে মাঠে নামার অনুমতি পাননি।

এতকিছুর পরও এরিকসেনের মনোবল ছিল দৃঢ়, লক্ষ্য ছিল একটাই- ফুটবলে ফেরা। আস্তে আস্তে যখন শারীরিক সুস্থতা লাভ করতে থাকেন, তখন থেকেই ইন্ডিভিজুয়ালি ট্রেনিং শুরু করেন। ট্রেনিং করেন তার ইয়ুথ ক্লাব Odense Boldklub এর সাথে, তাছাড়া ফিটনেস ধরে রাখার জন্য টেন হেগ এর আয়াক্সও তাকে রিজার্ভ টিমের সাথে ট্রেনিং করার সুযোগ দেয়।
eriksen 4
যেহেতু সেরি আর নিয়ম অনুযায়ী কোনো ইতালিয়ান টিমের হয়েই আর এরিকসেন এর মাঠে নামা হবে না,  তাই ২০২২ এর জানুয়ারিতে এরিকসেন এর সাথে মিউচুয়ালি কন্ট্রাক্ট টার্মিনেট করে ইন্টার মিলান, ফলে এরিকসেন ফ্রি এজেন্ট হয়ে যান।

পুনরায় ফুটবলে ফিরতে মরিয়া এরিকসেনকে প্রত্যাবর্তনের মঞ্চ দেয় ইংলিশ ক্লাব ব্রেন্টফোর্ড। জানুয়ারি উইন্ডোর শেষের দিকে ফ্রি এজেন্ট এরিকসেনকে ৬ মাসের চুক্তিতে দলে নেয় লন্ডনের এই ক্লাব।
eriksen 5
এরপরের গল্প.... সেটা তো সবাই জানেই তবে সেই গল্প সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। এরিকসেন তো ফুটবলে ফিরেছেনই, এমনভাবে ফিরেছেন যেনো তার কখনোই কিছু হয়নি। পারকেন স্টেডিয়ামের সেই ঘটনার আগে এরিকসেন যতোটা ধারালো ছিলেন, ঠিক তেমনই ছিলেন ব্রেন্টফোর্ডের হয়ে। এরিকসেন আসার আগে ব্রেন্টফোর্ডের অবস্থান ছিল রেলিগেশন জোনের আশেপাশে, সেখান থেকে খুব কম্ফোর্টেবলি সিজন শেষ করে ব্রেন্টফোর্ড। পার্থক্যটা গড়ে দেন এই এরিকসেনই। এমন একটি ঘটনার পর যে ঘটনার কারণে সবার ধারণা ছিল যে এরিকসেনের ক্যারিয়ার হয়তো এখানেই শেষ, ৭ মাস ফুটবলের বাইরে থাকার পরও এরিকসেন সেই ৪-৫ মাসে নিজেকে নিজের পজিশনের বিশ্বের অন্যতম সেরা একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। দেখিয়েছিলেন তার সমস্ত কোয়ালিটি যেগুলো তাকে বছরের পর বছর অন্যতম সেরা এটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে বিবেচিত করতো।
eriksen 6
সংক্্ষিপ্ত সময়ে এমন পারফরম্যান্স এর পর এরিকসেন ব্রেন্টফোর্ডের ফ্যান ফেভারিট হয়ে যান। ব্রেন্টফোর্ডের ম্যানেজার থেকে শুরু করে বোর্ড- সবাই সর্বোচ্চ চেস্টা করেছেন এরিকসেনকে ক্লাবে রাখার। এরিকসেনকে এমন চুক্তি অফার করা হয়েছিল যা তাকে ব্রেন্টফোর্ড ইতিহাসের সর্বোচ্চ বেতনধারী ফুটবলার বানাতো।

তবে ব্রেন্টফোর্ডের মাধ্যমে ফুটবলে ফিরলেও এটা সবার সামনে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে এরিকসেনের এখনো সামর্থ্য আছে টপ একটি ক্লাবে ম্যাচের পর ম্যাচ পারফর্ম করার। হয়তো এরিকসেন নিজেও সেটি ভাবতেন। তাই ব্রেন্টফোর্ডের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে এরিকসেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এর প্রস্তাব গ্রহণ করলেন। আর এখন তো তিনি অফিশিয়ালি ইউনাইটেড এর একজন প্লেয়ার।

এই ডিলটা তো ইউনাইটেড ফ্যানদের জন্য অবশ্যই এক্সাইটিং। তবে এরিকসেনের এভাবে ফিরে আসার গল্পটা তার চেয়েও অনেক বেশি ইন্সপায়ারিং। আজ থেকে ১৩ মাস আগে এরিকসেনের প্রাণ হুমকির মুখে পড়েছিল, সেখান থেকে এরিকসেন এখন বিশ্বের অন্যতম বড় একটি ক্লাবের প্লেয়ার। একটা পর্যায়ে তার চিকিৎসকও তাকে বলেছিলেন যে তিনি হয়তো আর কখনো ফুটবল খেলতে পারবেন না, সেখান থেকে তিনি এখনো নিজের সেরাটা দিয়ে ফুটবল খেলে যাচ্ছেন। এমনটা সম্ভব হয়েছে শুধুমাত্র এরিকসেনের হার না মানার মানসিকতার কারণেই। "আমি ফুটবলে কামব্যাক করবোই" এই প্রতিজ্ঞার কারণে এরিকসেন মৃত্যু মুখের পথযাত্রী হওয়ার পরও এভাবে প্রত্যাবর্তনের গল্প রচনা করতে পেরেছেন।
Eriksen 7
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এর সব সাইনিং নিয়েই এক্সপেক্টেশন থাকে, বাদ যাবেন না এরিকসেনও। এরিকসেন এরিক টেন হেগ এর দলের মূল একাদশের অবিচ্ছেদ্য অংশ হবেন কিনা, সেটা এখনো অজানা। তবে ইউনাইটেড ফ্যানরা এটা ভেবে আশ্বস্ত হবে যে তাদের দলে এরিকসেনের মতো একজন আছেন যে মাঠে নেমে নিজের সবটুকু সবসময় দিয়ে দিবেন, কারণ শুধুমাত্র এমন মেন্টালিটির কারণেই আজ এরিকসেন ফুটবলে ফিরতে পেরেছেন। এরিকসেন এমন একজন যে প্রাণ নাশের আশংকা কে জয় করে ফুটবলে ফিরেছেন, সে তো ফুটবলে মাঠে নিজের দলের জন্য প্রাণ দিয়ে খেলবেনই।