• ফুটবল

ফুটবল, দ্বীপদেশে...

পোস্টটি ৮১০ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

একটু এগুলেই সাগর। বিস্তীর্ণ জলরাশির বুকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। মাঝরাতের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে যাচ্ছে ফেনিল ঢেউয়ের সৈকতে লুটিয়ে পড়ার শব্দে। প্রশান্ত বাতাসে গা এলিয়ে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে সবাই। ছোট্ট একটা দ্বীপ, জনবসতি কম। বিদ্যুতের বালাই নেই, সূর্য জলের মধ্যে টুপ করে ঢুকে পড়ার সাথে সাথেই নেমে আসে রাজ্যের অন্ধকার। মুঠোফোন সেখানে বিলাসী পণ্য, টেলিভিশন হচ্ছে নিছক বাতুলতা। পুলিশ আর স্থানীয় প্রধানের অনুমতি বাবদ সেখানে টেলিভিশন ঘরে রাখার অনুমতি মিলে! সৌরবিদ্যুতে চলবে না বলে রঙ্গিন টেলিভিশন সেখানে নেই, সাদা-কালো টেলিভিশনই তাই সেখানকার ভরসা! এত প্রতিকূলতার মাঝেও কুপির শিখা ম্লান হয়ে যায় ঐ বোকা বাক্স থেকে ধেয়ে আসা আলোর মাঝে। নারকেল গাছের মাথায় বাতাসের চিৎকার হারিয়ে যায় ঐ বাক্স থেকেই ভেসে আসা শব্দে। রাত পৌনে একটা বাজে উত্তেজনায় চকচক করে ঐ দ্বীপেরই কিছু অদ্ভুত ছেলেদের চোখ। এ উত্তেজনা ভালবাসার, রোমাঞ্চের। আবেগময় এ রোমাঞ্চের উৎপত্তিস্থল যে ফুটবল!

পাঠক, অনেক আগের কোন গল্প ফাঁদতে যাচ্ছিনা। অন্য কোন দেশের অন্য কোন জাতির গল্পও বলতে চাচ্ছিনা। নাফ নদীর মোহনা দিয়ে এগিয়ে গেলে যে অদ্ভুত যাদুর দেশে আমি, আপনি প্রায়ই ছুটি কাটাতে যাই; গল্পটি সেই সেন্ট মার্টিন দ্বীপের!

আমরা শহুরে লোক ওখানে গিয়ে যাই করি না কেন, স্থানীয়রা কিন্তু প্রচন্ড ধর্মভীরু মানুষ। শুরুতেই তো বলেছি, টেলিভিশন আনতে হলেও সেখানে আপনাকে পুলিশের অনুমতি নিতে হবে। আর রাতের বেলায় ফুটবল দেখা তো সেখানে অকল্পনীয় ব্যাপার। কিন্তু ঐ যে বলেছি, ফুটবলের জন্যে ভালবাসা তো আর তাতে থেমে থাকে না। দ্বীপের জেটিতে নেমে যে ছেলেটি আপনার ব্যাগ টানার জন্যে আকুতি জানাচ্ছিল, ভারী ব্যাগ মাত্র ১০-২০ টাকার বিনিময়ে বাজারের মধ্যে টেনে আনছিল, খোঁজ নিয়ে জানবেন সেই ছেলেটিই তার সমস্ত দিনের সিংহভাগ আয়ই ঢেলে দিচ্ছিল রাতের বেলায় ফুটবল দেখার ‘টিকিট’ কিনার জন্যে! কিংবা যে কিশোরটি আপনাকে ডাব কেটে এগিয়ে দিল, রাতের আঁধারে তাকেই হয়তো আপনি দেখবেন চুপিচুপি সৈকত ধরে এগিয়ে যাচ্ছে, খেলা দেখবে বলে। শতচ্ছিন্ন জামা পড়া যে তরুণটি আপনাকে ছেঁড়া দ্বীপ থেকে ঘুরিয়ে আনলো, জিজ্ঞেস করে দেখুননা- রিয়াল মাদ্রিদের সবকজন প্লেয়ারদের নাম সে হয়তো আপনাকে বলে দিতে পারবে। আপনার সাথে হয়তো তার উচ্চারণ মিলবে না, কিন্তু রোনালদোর নাম উচ্চারণের সময় তার যে মমতা থাকবে, বিশ্বাস করুন আপনার মমতার থেকে সেটি কোন অংশে কম নয়। মেসি অথবার নেইমার এর যাদুকরি কোন গোলের কথা আপনি কাউকে জিজ্ঞেস করে দেখুন না, আপনার মত অত বিশদ না বলতে পারলেও তার চোখের উত্তেজনা কিন্তু আপনি কিছুতেই এড়িয়ে যেতে পারবেন না। ফুটবল আসলে এমনই। লুকিয়ে চুকিয়ে স্যাটেলাইট ডিশ আর ব্যাটারির ব্যবস্থা করে সাদা-কালো টেলিভিশনের মধ্যে রোমাঞ্চ খুঁজে নেয়া- এ শুধু ফুটবল দ্বারাই সম্ভব।

আপনি যখন সোফায় গা এলিয়ে এল ক্লাসিকো দেখছিলেন, সেন্ট মার্টিনের সেই ফুটবল পাগল ছেলের দল তখন প্রবল উত্তেজনায় কাঁপছিল। পাশের রুমে স্বজনের ঘুম ভাঙ্গবে বলে হয়তো আপনি গোওওল বলে চিৎকার দিতে পারেননি, আর ঐ ছেলেরা চিৎকার করতে পারেনি তাদের এই নৈশ অভিযান বন্ধ হবার আশঙ্কায়। সেন্ট মার্টিনে প্রতি ম্যাচ ডে তেই কিন্তু এমন চলে। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ বলুন, প্রিমিয়ার লীগ বলুন অথবা লা লিগা; বড় দলের কোন খেলাই সেখানে কিন্তু মিস হয়না। চলে বাজি ধরাধরি, বার্সা-রিয়াল বিতর্ক; সাথে মেসি-রোনালদো দ্বৈরথ নিয়ে তুমুল বিতণ্ডা।

তবে এই ভালবাসার মাঝেও কিন্তু থেকে যায়। ওখানে খেলা দেখতে টিকিট লাগে। ৫০-১৫০ টাকার মধ্যে উঠা নামা করে এর দাম। প্রতি সপ্তাহে তাই এই টাকা যোগাড় করে খেলা দেখা দ্বীপবাসী ছেলেদের কাছে বিলাসিতারও উপরে কিছু থাকলে সেটা। আমার আপনার মতো নিয়মিত খেলা দেখার সৌভাগ্য এজন্যেই তাদের হয়না।

বাংলাদেশের মানুষ কিরকম খেলা পাগল সেটার উদাহরণ শুধু সেন্টমার্টিনের এই ‘পাগল’ ছেলেগুলোই নয়। বাংলাদেশের প্রতিটা প্রান্তে এমন ফুটবল পাগল সমর্থক আছে। প্রত্যন্ত ঐসব জায়গায় হয়তো বিদ্যুৎ নেই, বিদ্যুৎ থাকলেও ডিশ নেই; তবুও উদ্ভাবনের প্রয়োগ থেমে থাকে না। নিজেরা চাঁদা তুলে স্থায়ী ব্যবস্থা হয়তো করে নেয়া হয়, নইলে সেন্ট মার্টিনের মতো ‘টিকিট’ পদ্ধতি চলে। এসব দেখে সেই পুরনো আফসোসই তাই ফিরে আসে, ফুটবলের প্রতি এত প্রগাঢ় টান থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ র‍্যাঙ্কিংএ কেন ১৭০ এর ঘরে? আরো দুঃখের ব্যাপার হচ্ছে এত পরিশ্রম কেবল ভিনদেশি লীগগুলো দেখার জন্যে। দেশের কোন ফুটবলারদের কথা জিগ্যেস করে দেখুন, মাদ্রিদের সব খেলোয়াড়দের নাম বলে যাওয়া সেই তরুণটি কিন্তু এবার থেমে যাবে! মাঝরাতে মেসির গোল দেখে যেই কিশোরটি নীরবে চেঁচাচ্ছিল, আমাদের মামুনুল অথবা এমিলির নাম সে ছেলেটিই বলতেই পারবে না। প্রিমিয়ার লীগ, চ্যাম্পিয়নস লীগের নিয়মিত দর্শক এরাই আমাদের নিজস্ব বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগের নামই হয়তো শুনে নি!   

যেখানে ফুটবলের জন্যে এত মায়া, সেখানেই কি বাফুফের গোচর থাকা উচিৎ নয়? চিন্তা করে দেখুন না, সারাদিনের ক্লান্তি শেষে সেন্ট মার্টিনের ঐ ছেলেগুলো গভীর রাতে নয় বরং বিকাল বেলা আবাহনী-মোহামেডান খেলা নিয়ে উত্তেজনায় কাঁপল! নিজেদের দল বলেই নয়তো তারা চট্টগ্রাম আবাহনীর নাম নিয়েই গলা ফাটালো! কাপ জিতলে বঙ্গোপসাগরের ধারের রূপালি সৈকতেই নাহয় বিজয় মিছিল বের করল! ভাবতেই ভাল লাগছে না? খেলা নিয়ে এদেশের মানুষের আবেগ আছে, নিঃস্বার্থ ভালোবাসাও আছে। কিন্তু সেটাকে কাজে লাগানোর সংগঠক কই?

সবুজাভ সাগরের তীরে প্রকৃতির কোলে বেড়ে উঠা এইসব দুরন্ত সেন্টমার্টিনের কিশোর কিন্তু ফুটবল নিজেরাও খারাপ খেলে না। বিচ ফুটবল ওরাও খেলে, এরপর সুঠাম শরীর নিয়ে ঝাঁপ দেয় সাগরে। এদের দৈহিক গঠন চমৎকার, দম অফুরন্ত, ফুটবলের প্রতি ভালবাসা অগাধ। রিওর সৈকতে এভাবে ফুটবল খেলতেই খেলতেই কিন্তু রোমারিও, রোনালদোর জন্ম হয়েছে। ইউরোপের শীর্ষ লীগে খেলা অসংখ্য ফুটবলারই শুরু করেছেন বিচ ফুটবল থেকে। মনের আনন্দে খেলতে খেলতেই উঠে এসেছেন বিশ্ব ফুটবলের মঞ্চে। এই কিশোরগুলোকে যদি সামান্য সুযোগটুকু দেয়া হয়, লাল-সবুজ বুকে বিশ্বমঞ্চে দাঁড়ানোর স্বপ্নটুকু দেখানো হয়, তাহলে তারা কেন পারবে না? একটু নজর দরকার শুধু, দরকার কর্মকর্তাদের একটু স্বদিচ্ছা। ওখানে একটা স্থায়ী খেলা দেখার ব্যবস্থা করে দেয়া অথবা উন্মুক্ত ট্রায়ালের নিয়ম এবং সময় সংক্রান্ত ন্যূনতম একটা পোস্টারের ব্যবস্থা করা এমন কোন অসম্ভব কাজ নয়।  বাফুফের কেউ কি শুনছেন?