• উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ
  • " />

     

    • উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ

    মরিসিও পচেত্তিনো : অলৌকিক নয়, লৌকিক

    আর্জেন্টিনা, ১৯৮৫।

    সান্তা ফের গ্রাম অঞ্চল মারফি। নিত্যদিনকার একরঙা জীবন এখানে। সবমিলিয়ে হাজার তিনেক মানুষের বসবাস। কৃষি অঞ্চল। এখানের শিশুরাও ছোটবেলা থেকে মূলধারা স্কুলে না গিয়ে, কৃষির জন্য বিশেষায়িত স্কুলে পড়ে। সারাদিনের শুনশান নীরব মারফি, আরও চুপ মেরে যায় রাত নামলেই।

    হেক্টর আর এমিলিয়ানোর পরিবারের সে রাতে জেগে থাকার কোনো কারণ ছিল না। দিনের কাজ শেষে সময়মতোই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। রাত দুইটা নাগাদ বাসার দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। বিরক্ত হওয়ার সুযোগ নেই, এমন রাতে খুব জরুরী কিছু ছাড়া কারও হাজির হওয়ার কথা নয় এই গ্রামে।

    ভেতর থেকে দরজা খোলার পর ভদ্রলোক পরিচয় দিলেন, তিনি মার্সেলো বিয়েলসা। ফুটবল স্কাউট। এতো রাতে বাড়ি এসেছেন তাদের ছেলেকে দেখবেন বলে। এবার বিরক্ত না হয়ে উপায় নেই হেক্টরের। কিন্তু এতো রাতে বাড়িতে এসে কেউ অনুরোধ করেছেন, সেটা ফেলার মতো বদমেজাজিও নন তিনি। ছেলেকে ডেকে ওঠালেন। বিয়েলসার কাছে নিয়ে গেলেন।

    বিয়েলসা সবার আগে দেখলেন তার পা, “এটা তো ফুটবলারদের পা। তুমি ফুটবল খেলবে। নিউওয়েলসে চলো।” বিয়েলসার  ১৩ বছর বয়সী ছেলেটার মুখের দিকে তাকালেন এরপর। বিয়েলসাকে আগে কখনও দেখেনি সে। বিয়েলসাও তাকে দেখেননি আগে। কিন্তু শুনেছেন গ্রামের স্কাউটদের কাছে, তাই ছুটে এসেছেন। আধো ঘুমে থাকা  মাউরিসিও পচেত্তিনোর স্বপ্ন দেখা শুরু তখন থেকে।

    বিয়েলসার হাত ধরে এরপর গল্পের মতো নিউওয়েলসের হয়ে একে একে সব ধাপ পেরিয়ে মূল দলে খেলা, সেখান থেকে আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে চড়ানো, ইউরোপে খেলা- সবকিছুর শুরু ওই রাতে।

    মিরাকল পচেত্তিনোর জীবনে তাই নতুন কিছু নয়। খেলোয়াড় হিসেবে নিউওয়েলস আর এস্পানিওল সমর্থকদের কাছে ভীষণ প্রিয় তিনি। কিন্তু এর বাইরে তারকাখ্যাতি কখনই ছিল না। কিন্তু যিনি ভাগ্য বদলে দিয়েছিলেন পচেত্তিনোর, সেই বিয়েলসার দর্শন সঙ্গী করে পচেত্তিনো বদলে নিয়েছেন নিজের জীবন।

    আমস্টারডাম, ২০১৯।

    ম্যাচ শেষের পর মাথা সবুজ মাঠে ঠেকিয়ে শুয়ে পড়েছেন পচেত্তিনো। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। যার জীবনে এতো মিরাকল, তিনিও ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন। টটেনহাম ম্যানেজার এরপর উঠে দাঁড়িয়ে কাঁদলেন কিছুক্ষণ। ম্যাচ শেষে তার একটা কথাই বলার ছিল, ‘ধন্যবাদ ফুটবল। ধন্যবাদ আমার খেলোয়াড়দের, ওরাই আসল নায়ক।

    তার জন্য এর চেয়ে বড় সত্যি আর কি হতে পারে? টটেনহামকে প্রথমবারের মতো নিয়ে গেছেন তিনি ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতার ফাইনালে। এরপরও আলাদা করে আসল নায়ক কারা মনে করিয়ে দিয়েছেন সেটা। তাদের মধ্যে আলাদা করে নায়ক লুকাস মউরা। ক্যারিয়ারে এর চেয়ে স্মরণীয় ম্যাচ খেলেননি ব্রাজিলিয়ান, আর কোনোদিন খেলবেনও না হয়ত। যার হাত ধরে এই রূপকথা, সেই মউরা আর পচেত্তিনোর যোগসূত্রটা আরও শিহরণ জাগানিয়া।  

    গত দেড় বছরে পচেত্তিনোর কেনা একমাত্র খেলোয়াড় মউরা। এক লাইনের গল্পটার ভেতরে টটেনহামের অলৌকিক উথানের ভেতর-বাহির সবকিছুই লুকিয়ে আছে। ইউরোপের বাকি দলগুলো যখন প্রতি মৌসুমে টাকার বস্তা নিয়ে দলবদলে নামে তখন পচেত্তিনোকে বসে থাকতে হয়েছে হাত গুটিয়ে। এমন নয় যে নতুন খেলোয়াড় কিনতে চাননি তিনি। পারেননি। অনুমতি মেলেনি। নতুন স্টেডিয়ামের অর্থ যোগাতে শেষ কয়েক মৌসুম ধরে কেনার চেয়ে খেলোয়াড় বিক্রি করেছে বেশি টটেনহাম। চেয়ারম্যান ড্যানিয়েল লেভি ঘাঘু মাল, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আর ইউরোপের নামকরা ক্লাবে রুপান্তের পরিকল্পনা তার। কিন্তু সে জায়গায় পৌঁছাতে হলে কয়েক মৌসুমের ব্যয় কমিয়ে আনতে হত টটেনহামকে।

    লেভি নিশ্চিন্তে ব্যবসা করে যেতে পেরেছেন এই পচেত্তিনোর জন্যই। একের পর এক একাডেমি থেকে খেলোয়াড় তুলে এনেছেন পচেত্তিনো। ড্যালে আলি, ডায়ার,  ট্রিপিয়ের, ওয়ানিয়েমাদের সবাই দলে এসেছেন তার ধরে। বড় চুক্তির পথে হাঁটতেই পারেননি। সময়ে সময়ে ফ্রি ট্রান্সফারে সেরা খেলোয়াড়টা লুফে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। লুকাস মউরাও সেই ফ্রি ট্রান্সফারের একজন। কেইনের পাশাপাশি একজন স্ট্রাইকার লাগত পচেত্তিনোর। দুই বছর আগে সেটাও কিনেছিলেন নামমাত্র মূল্যে। ৩২ বছর বয়সী ফার্নান্দো ইয়োরেন্তেও তো টটেনহামের ফাইনাল যাত্রার বড় একটা অংশ।

    হ্যারি কেইন যখন ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে ম্যাচ চলাকালে বাদ পড়লেন- তখনও পচেত্তিনোর দলের ওপর ভরসা করার লোক ছিল না। সেই ম্যাচে বাঁচালেন হিউং মিন সন আর ইয়োরেন্তে। পরেরবার সেমিফাইনালের প্রথম লেগে সনও নেই। সঙ্গে ইনজুরিতে পড়া মুসা সিসোকোও আনফিট। আর কেইনের তো মৌসুমই শেষ। পচেত্তিনোর দল তখন প্রিমিয়ার লিগেও লড়ছে শেষ চারে জায়গা করে নিতে। অথচ দুইদিন পর পর ম্যাচ খেলার জন্য তার হাতে খেলোয়াড়ই নেই। ভিক্টর ওয়ানিয়েমাকে মিডফিল্ডে খেলালেন। দশ মাস ইনজুরিতে মাঠের বাইরে ছিলেন তিনি। পচেত্তিনোর হাতে আর কোনো অপশন থাকলে হয়ত তাকে নামাতেনও না। কিন্তু উপায় নেই।

    মৌসুমের শেষ প্রান্তে এসে ম্যানেজাররা যখন ক্লান্তি আর ধকলের জন্য অভিযোগ করে যান, সেই সুযোগও নেই পচেত্তিনোর। তিনি জানেন, এতে তার কোনো লাভ নেই। তার সেই লম্বা স্কোয়াডই তো নেই। যা আছে সেটাই সম্বল।

    এটা যে পচেত্তিনোর জন্য নতুন কিছু তাও না। ২০১৪ সালে টটেনহামের ম্যানেজার হয়ে আসার পর থেকেই একই অবস্থা। প্রিমিয়ার লিগে তার প্রতিপক্ষ ম্যানচেস্টার সিটি, লিভারপুল, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, চেলসি, আর্সেনাল- কাড়ি কাড়ি অর্থ খরচ করে গেছে তার চোখের সামনে দিয়ে। পচেত্তিনো শুধু দেখে গেছেন, কোনো অনুযোগ নেই তার।  

    শেষ চার মৌসুমে এক ম্যান সিটি বাদ দিয়ে শীর্ষ চারে ধারাবাহিকভাবে থাকতে পারেনি বড়দলগুলোর কোনোটাই। পেরেছে টটেনহাম। ২০১৬ তে লিগ জেতারও খুব কাছাকাছি গিয়ে অবশ্য লেস্টার সিটির কাছে হার মানতে হয়েছিল। এতো বছরেও কেন শিরোপাশুন্য পচেত্তিনো সেই সমালোচনা থামেনি তাই। কিন্তু বাকি সাফল্য ব্যর্থতার হিসেবে পচেত্তিনোর পেছনের এই গল্পটা আড়ালে থেকে গেছে এতোদিন।

    যে স্টেডিয়াম নিয়ে এতকিছু সেখানে টটেনহামের ওঠার কথা ছিল গত বছর সেপ্টেম্বরে। সময়মতো কাজ শেষ করা যায়নি। তাই নভেম্বরে ঠিক করা হয় নতুন তারিখ। সেটাও শেষ পর্যন্ত হয়নি। শেষে মার্চে গিয়ে ঘরের মাঠ ফিরে পেয়েছে টটেনহাম। তার আগ পর্যন্ত খেলতে হয়েছিল ওয়েম্বলিতে। প্রায় দুই বছর ঘরের মাঠের সমর্থনটাও পুরোপুরি পাননি পচেত্তিনো।  

    শ্রমের প্রাপ্য সম্মান পেতে হয়ত আরেকটা মিরাকলের দরকার ছিল তার। এক অ্যাওয়ে গোলে পিছিয়ে থাকা ম্যাচ। ফিরতে হলে করতে হবে গোল। অথচ শুরুতেই গোল খেল টটেনহাম। এরপর অবশ্য কিছুক্ষণের জন্য ফিরে আসলো। কিন্তু ৩৬ মিনিটে হাকিম জিয়েচের গোলে টটেনহাম পিছিয়ে গেল আরও অনেকদূর। এমন ম্যাচে মনোবল ভাঙতে যা কিছু দরকার তার সবকিছুই চললো টটেনহামের ওপর দিয়ে প্রথমার্ধে।

    লিভারপুলের আগের রাতে অবিশ্বাস্য ফিরে আসার গল্প জানা ছিল। কিন্তু পচেত্তিনোর কাছে সেই সম্পদ ছিল না। লিগের শেষ ম্যাচে বেশিরভাগ সময় তার দল খেলেছে ৯ জন নিয়ে। ক্লান্ত-শ্রান্ত, মানসিক দিক দিয়েও ভেঙে পড়া একটা দল দ্বিতীয়ার্ধে অমন রাতারাতি বদলে যায় কীভাবে?

    মাঠের খেলার অংশটা দেখা হয় আমাদের। বাদ পড়ে যায় ড্রেসিংরুমের গল্পগুলো। পচেত্তিনোর তার খেলোয়াড়দের কী বলেছেন সেটা তিনিই জানেন। সেসবের প্রভাবটাই কেবল দেখা গেছে মাঠে। 

    ব্যক্তিজীবনে প্রচন্ড বিশ্বাসী লোক পচেত্তিনো। চ্যাম্পিয়নস লিগে গ্রুপপর্বের টটেনহাম গ্রুপটাই দেখুন। বার্সেলোনা, ইন্টার মিলান, পিএসভি আইন্দহোভেন। শেষ ম্যাচে ন্যু ক্যাম্পে বার্সেলোনার বিপক্ষে ইন্টার আর পিএসভির ম্যাচের অনুরূপ ফল পেতে হত টটেনহামকে। পিএসভি ইন্টারকে আটকেও দিলেও ন্যু ক্যাম্পে তো দূর্গ। সেখানেই বার্সার সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করে অ্যাওয়ে গোলে ইন্টারকে সরিয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠেছিল পচেত্তিনোর টটেনহাম। এরপর বরুশিয়া ডর্টমুন্ডকে উড়িয়ে, টুর্নামেন্ট ফেভারিট ম্যানচেস্টার সিটিকেই বিদায়, শেষে এবার আলো ঝলমলে আমস্টারডাম শহরে আরও একবার জেগে জেগে স্বপ্ন দেখলেন পচেত্তিনো। অলৌকিক? নাকি ধৈর্য্য আর  পরিশ্রমের মূল্য?

    শেষ কবে কোনো ম্যানেজারকে ম্যাচ জেতার পর কাঁদতে দেখেছেন? পচেত্তিনো আবেগ ধরে রাখতে পারেননি ম্যাচ শেষে। উপুড় হয়ে পড়েছিলেন মাঠে। একবার উঠে দাঁড়িয়েছেন। খেলোয়াড়দের জড়িয়ে ধরে কেঁদেছেন। ম্যানেজার, খুব বেশি আবেগে ভেসে যাওয়ার সময়ও নেই। ম্যাচ পরবর্তী রিঅ্যাকশনে ক্লাব আর সমর্থকদের ধন্যবাদ জানাতে জানাতেও আরেকবার কেঁদে ফেলেছিলেন। এরপর আবার মাঠে ফেরত গেছেন। স্টেডিয়ামে তখন শুধু টটেনহাম সমর্থকেরাই আছেন। তাদের সঙ্গে আরেকবার উদযাপন করেছেন, আরেকবার ভেসে গেছেন আবেগে। 

    খেলোয়াড়দের সেরাটা বের করে আনতে একেক ম্যানেজারের ফর্মুলা একেকরকম। ইয়ুর্গেন ক্লপ ফুটবলের যদি হেভি মেটাল হন তো পচেত্তিনো হবেন রেগে। ফুটবল বাদ দিলেও দারুণ বিনয়ী লোক পচেত্তিনো। ইংলিশ ফুটবলে আধুনিক কালের নিপাট ভদ্রলোক বলা হয় তাকে।    

    পচেত্তিনো একবার বলেছিলেন তার দেখা সবচেয়ে প্রিয় ছবিটা তার নিজেরই। দুই বছর বয়সে ফুটবল হাতে তুলেছিলেন, “আমার জুতোর সামনে বড় একটা ফুটো ছিল। এই ছবিটা আমার সবসময় মনে থাকে। বয়স তখন দুই বছর। হাতে ফুটবল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। খুব আবেগের এই ছবিটা আমার জন্য। কারণ ওই এক ছবিই আমার জীবনের গল্প। আমার জীবনে যা হয়েছে সেটা এই বলের জন্যই।”

    আরেকটি শিহরণ জাগানো রাত শেষে পচেত্তিনোর ফুটবলকে ধন্যবাদ দেওয়াটা নতুন কিছু নয় তার জন্য। পুরনো গল্পটাই শুধু ঘুরে ফিরে নতুন করে বলা। শুরুতে সে গল্পটা জেনেছিল সান্তা ফের লোকজন। এস্পানিওল হয়ে সাউদাম্পটন থেকে লন্ডন এখন জানবে পুরো বিশ্ব। নিজেকে সেখানেই নিয়ে গেছেন পচেত্তিনো। খেলোয়াড় জীবনের অপ্রাপ্তিটা ঘোচালেন ম্যানেজার হিসেবে। আর তার ফুটবলে মিশে থাকলো সেই ঘুম থেকে ডেকে ওঠানো পাগলাটে লোকের  দর্শনটাও।