• ফুটবল, অন্যান্য
  • " />

     

    জামালদের হরিষে-বিষাদের বছরে বসুন্ধরা-আবাহনীর দুইরকম সাফল্য

    বিশ্বকাপ ও এশিয়া কাপ বাছাইয়ের মূল পর্ব নিশ্চিত করে প্রাথমিক লক্ষ্য পূরণ হয়েছিল বাংলাদেশ ফুটবল দলের। তবে বছর শেষে এসএ গেমসে অলিম্পিক ফুটবল দলের ব্যর্থতা নতুন করে হাহাকার তুলেছে ফুটবলে। ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ের নতুন নিয়মে অবশ্য খুব বেশি পরিবর্তন হওয়ার সুযোগ ছিল না, তাই তেমন কোনো পরিবর্তনও হয়নি। মেয়েদের জাতীয় দল একরকম হারিয়েই গেছে। তবে ঘরোয়া ফুটবলে বসুন্ধরা কিংস আর আবাহনী নতুন সব রেকর্ড গড়েছে। বছরের শেষে ফিরে দেখা দেশের ফুটবলে সাফল্য-ব্যর্থতার গল্প।  

    জাতীয় পুরুষ দল : যা কিছু পায় হারায়ে যায় না মানে সান্ত্বনা
    ভারতের বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইয়ে বাংলাদেশের ম্যাচটার কথা নিশ্চয়ই ভুলে যাওয়ার কথা নয় আপনার। কলকাতার সল্টলেক স্টেডিয়ামে সাদ উদ্দিনের প্রথমার্ধের গোলের পর ঢাকার ঘিঞ্জি গলি থেকে ভেসে আসা সমর্থকদের উল্লাস নতুন করে স্বপ্ন দেখিয়েছিল। অক্টোবরের ওই রাতটা স্মরণীয় হয়ে থেকেছে দেশের ফুটবলে। কিন্তু তাতে মিশে গেছে চাপা একটা বেদনাও।

    অক্টোবর মাসটা সুবাতাস বয়ে এনেছিল দেশের ফুটবলে। ভুটানের বিপক্ষে দুইটি প্রীতি ম্যাচ জয়ের পর বিশ্বকাপ বাছাইয়ে ঘরের মাঠে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ ছিল কাতার। ২-০ গোলে সেই ম্যাচ হারলেও বাংলাদেশ ফুটবলাররা বুক চিতিয়ে লড়াই করেছিলেন। স্কোরলাইন ঠিক ম্যাচের গল্পটা তাই বলছে না। এর পর ভারতের বিপক্ষে ড্র নিয়ে ফেরা। সবমিলিয়ে নতুন স্বপ্ন দেখার রসদ যুগিয়েছিলেন জামাল ভূঁইয়ারা।

    নভেম্বরে ওমানের কাছে ৪-১ গোলের হারটা স্বপ্নাতুর চোখে ধোঁয়াশা সৃষ্টি করেছিল বটে। কিন্তু তাতে আশাহত হাওয়ার মতো খুব বেশি কিছু হয়ত ছিল না। সব ভালো করে শেষে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে জেমি ডের দল। প্রায় জাতীয় দল নিয়ে নেপালের সাফ গেমসে অংশ নিতে গিয়েও ৫ দলের ভেতর তৃতীয় হয়ে ফিরেছিল বাংলাদেশ অলিম্পিক ফুটবল দল। ভুটানের কাছে হারটা ব্যর্থতার ষোলকলা পূর্ণ করেছে। শেষটা ভালো না হওয়ায় সবটাই তাই ঢাকা পড়ে গেছে বাংলাদেশের।

    ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে ১৯২ তম অবস্থানে থেকে বছর শুরু করেছিল লাল-সবুজরা। বাংলাদেশের পর ছিল আর মাত্র ১৮টি দেশ। বছর শেষ হয়েছে ১৮৭ তে থেকে। এর ভেতর জুলাইয়ে বিশ্বকাপ ও এশিয়া কাপের প্রাক বাছাই পর্বে লাওসকে হারানোর পর সর্বোচ্চ ১৮২ তে উঠেছিল বাংলাদেশ।



    লাওসের বিপক্ষে ওই ম্যাচটাই আসলে মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশের। এর আগে মার্চে প্রীতি ম্যাচে কম্বোডিয়াকে হারিয়ে আত্মবিশ্বাস সঙ্গী হয়েছিল জেমি ডের দলের। জুনে বিশ্বকাপের প্রাক বাছাইয়ে বাংলাদেশের ম্যাচ পড়েছিল লাওসের বিপক্ষে। প্রতিপক্ষের মাঠ থেকে ১-০ গোলে জয় ছিনিয়ে আনার পর ঘরের মাঠে লাওসের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করে বাংলাদেশ নিশ্চিত করেছিল বিশ্বকাপ বাছাইয়ের মূলপর্ব। লাওসের মাঠে একমাত্র গোলটি করেছিল রবিউল হাসান। ওই গোলটাই এ বছর বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থেকেছে। নইলে আবারও একরকম নির্বাসনেই যেতে হত জাতীয় দলকে।

    বছর শেষে আতশ কাঁচে জেমি ডের দলের পারফরম্যান্সের ব্যবচ্ছেদ করা হলে অবশ্য খুব বেশি হতাশ হওয়ার সুযোগ নেই। ৯ টি আন্তজার্তিক ম্যাচ খেলে বাংলাদেশ হেরেছে মাত্র তিনটি ম্যাচ, আর জয় চারটিতে। এই নয় ম্যাচে বাংলাদেশ গোল করেছে মোট ১০টি, আর গোল খেয়েছে ৯টি। বাংলাদেশ গোলরক্ষকরা ক্লিনশিট রাখতে পেরেছেন ৪টি ম্যাচে। রক্ষণে ইয়াসিন খান, রিয়াদুল হাসান রাফি, রহমত মিয়ারা  আশা দেখিয়েছেন, তবে আক্রমণভাগের পুরোনো হতাশা নতুন করে আশাহত করেছে এ বছর। তবে এ সমস্যার তড়িৎ সমাধান যেহেতু নেই, তাই ধৈর্য্য ধরা ছাড়াও আর তেমন উপায় নেই সমর্থকদের।


    আরও পড়ুনঃ এসএ গেমসে ফুটবল দলের ব্যর্থতার কারণ কী?


    বসুন্ধরায় রাজার উত্থান
    বিশ্বকাপ খেলা ফুটবলার দানিয়েল কলিনদ্রেসকে দলে ভিড়িয়ে আগের বছরই চমক দেখিয়ে রেখেছিল বসুন্ধরা কিংস। সেটা ছিল শুরু মাত্র। এর পর বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে প্রথমবার খেলতে এসেই ঢাকা আবাহনীর আধিপত্য ভেঙে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বসুন্ধরা কিংস। চ্যাম্পিয়ন হওয়াটা অবশ্য চমক নয়, বসুন্ধরা যেভাবে শাসন করেছে সেটাই তাদের নামের সঙ্গে থাকা ‘কিংস’ শব্দটার যথার্থতা প্রমাণ করেছে। পুরো লিগে মাত্র একটি ম্যাচ হেরেছিল অস্কার ব্রুজোনের বসুন্ধরা। লিগের সঙ্গে স্বাধীনতা কাপ জিতে তারা মৌসুম শেষ করেছিল ডাবলস জিতে। ফেডারেশন কাপের ফাইনালে ঢাকা আবাহনীর কাছে হেরে ট্রেবলটা অল্পের জন্য হাতছাড়া হয়েছিল নতুন জায়ান্টদের।

    মাঠের ফুটবলের সঙ্গে মাঠের বাইরেও পেশাদারিত্বের ছাপ রেখে বসুন্ধরা দেশের ফুটবলে পথ দেখাচ্ছে নতুন করে। শীর্ষ পর্যায়ে এক মোসুম খেলেই একটি সমর্থকগোষ্ঠীও তৈরি হয়ে গেছে দলটির। অনুশীলন সুবিধা, বেতন বা মোটা অঙ্কের চুক্তি- সবমিলিয়ে কাড়ি কাড়ি অর্থও ঢেলেছে বসুন্ধরা। জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের বেশিরভাগ এখন বসুন্ধরা কিংসেরই অংশ। দেশের ফুটবলের রাজত্ব গড়েই তাই তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলার জো নেই বসুন্ধরা কিংসের। নতুন বছরে ঘরোয়া ফুটবলের সঙ্গে এএফসি কাপের পারফরম্যান্স দিয়েও বিচার করা হবে তাদের।

    এশিয়ায় আবাহনীর স্বপ্নযাত্রা
    এশিয়ার ক্লাব ফুটবলে ভালো কিছু করার যে তাড়না বসুন্ধরা এখন অনুভব করছে তার পেছনে বড় অবদান আছে ঢাকা আবাহনীর। টানা তৃতীয়বারের মতো লিগ জিততে না পারলেও এএফসি কাপে ইতিহাস গড়ে সেই হতাশা পুষিয়ে দিয়েছে মারিও লেমোসের দল। ভারত আর নেপালের চ্যাম্পিয়নদের পেছনে ফেলে দক্ষিণ এশিয়ার চ্যাম্পিয়ন হয়ে আবাহনী উঠেছিল জোনাল সেমিফাইনালে। সেখানেও প্রথম লেগে উত্তর কোরিয়ার এপ্রিল টুয়েন্টিফাইভকে হারিয়ে বড় চমক দেখিয়েছিল সানডে-বেলফোর্টরা। দ্বিতীয় লেগে অবশ্য ২-০ গোলে হেরে আর ফাইনালে ওঠা হয়নি আবাহনী। কিন্তু ইতিহাস আগেই গড়া হয়ে গিয়েছিল। বাংলাদেশ থেকে প্রথম দল হিসেবে এএফসি কাপের জোনাল সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেছিল ধানমন্ডির জায়ান্টরা। এশিয়ার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্লাব টুর্নামেন্টে আবাহনীর সাফল্য  মান বাড়িয়ে দিয়েছে দেশের ফুটবলেরও। এএফসি ক্লাব র‍্যাঙ্কিংয়ে পাঁচ ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশের ঘরোয়া লিগ।



    আরও পড়ুনঃ পর্তুগিজ কোচের হাত ধরে আবাহনীর এএফসি কাপের স্বপ্নযাত্রা



    বয়সভিত্তিক দল : হাহাকারের মাঝে আশার আলো মেয়েরা    
    দক্ষিণ এশিয়া বা এশিয়া কোনো পর্যায়েই এবার আর সাফল্য ধরা দেয়নি ছেলেদের বয়সভিত্তিক ফুটবল দলে। সে তুলনায় মেয়েরা অবশ্য সফল। ৬ দেশের বঙ্গমাতা গোল্ডকাপের ফাইনালে উঠেছিল বাংলাদেশের অনুর্ধ্ব-১৬ মেয়েরা। লাওসের বিপক্ষে ফাইনাল ম্যাচটি অবশ্য বৃষ্টির কারণে বাতিল হয়েছিল। তাই যুগ্মভাবে চ্যাম্পিয়ন হয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে মেয়েদের। এর পর সেপ্টেম্বরে এএফসি অনুর্ধ্ব-১৬ চ্যাম্পিয়নশিপের মূলপর্বে খেলেছে মেয়েরা। প্রথম দুই মায়চে ১০ গোজ হজম করলেও শেষ ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার মেয়েদের রুখে দিয়েছিল বাংলাদেশ। অনুর্ধ্ব-১৫ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে অবশ্য অল্পের জন্য শিরোপা হাতছাড়া হয়েছিল মেয়েদের, ফাইনালে টাইব্রেকারে ভারতের কাছে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল স্বপ্নাদের।

    ছেলেদের অনুর্ধ্ব-১৮ সাফ ফাইনালেও ভারতই কপাল পুড়িয়েছে বাংলাদেশের। শেষ মুহুর্তের গোলে ২-১ গোলে হেরেছিল ইয়াসিন আরাফাতরা। এর পর অনুর্ধ্ব-১৯ এশিয়া কাপ বাছাইয়ের গ্রুপপর্ব পেরুনোর প্রত্যয় নিয়ে বাহরাইন গেলেও ছেলেরা ফিরেছিল গ্রুপের তলানীতে থেকে। জর্ডানের সঙ্গে ড্র করে পরের ম্যাচেই ভুটানের কাছে হেরেছিল বাংলাদেশ অনুর্ধ্ব-১৯ দল। ছেলেদের অনুর্ধ্ব-১৬ দলের অবশ্য একটি সাফল্য আছে। সাফ ফুটবলে তৃতীয় হয়ে ফেরার পর এএফসি অনুর্ধ্ব-১৬ বাছাইয়েও চার দলের ভেতর তৃতীয় হয়েছিল বাংলাদেশ। তবে দেশে অনুষ্ঠিত ইউয়েফা অ্যাসিসট্যান্ট ডেভেলপমেন্ট টুর্নামেন্টে শিরোপা জিতেছিল বাংলাদেশের কিশোররা।

    যেখানে নেই মেয়েরা
    এ বছর মেয়দের জাতীয় ফুটবল দল বলতে গেলে মাঠে নামারই সুযোগ পায়নি। বছরের শুরুর দিকে সাফ ফুটবলে অংশ নিয়ে গ্রুপপর্ব পেরিয়েছিল সাবিনারা। তবে যাত্রা ওখানেই থেমেছে ভারতের কাছে হেরে। এর পর এসএ গেমসে বাফুফে নারী ফুটবল দল না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এ বচহর আর খেলার সুযোগই হয়নি জাতীয় দলের ফুটবলারদের। তবে আপাতত তাদের জন্য সান্ত্বনার খবর হলো, নতুন বছর থেকে শুরু হচ্ছে মেয়েদের ফুটবল লিগ।

    ক্যাসিনোর কালোথাবা
    ঢাকা মোহামেডান, আরামবাগ ক্রীড়া চক্র, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ- প্রিমিয়ার লিগের ঐতিহ্যবাহী তিন ক্লাবে একরকম তোলপাড় হয়ে গেছে বছরের শেষ অংশে গিয়ে। ক্যাসিনো কেলেঙ্কারিতে একের পর অভিযুক্ত হয়েছেন এই ক্লাবগুলোর সঙ্গে যুক্ত থাকা কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। তাতে টালমাটাল হয়ে গেছে দেশের ফুটবল। মোহামেডান অবশ্য ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, আরামবাগ কোনোমতে দল গঠন করে লিগের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব ছাড়াও নিচের স্তরের ক্লাবগুলোও বাদ যায়নি ক্যাসিনোর কালোথাবা থেকে।