• অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ ২০২০
  • " />

     

    ইতি, তোমারই বিশ্বকাপ

    মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়াম কেমন ধূসর। কঙ্কালসার চেহারা নিয়ে একলা একা দাঁড়িয়ে সাইটস্ক্রিন, যা অলঙ্করণ ছিল এদের- সব চলে গেছে সিলেটে। বিপিএল যে ঢাকা থেকে সিলেট পর্বে গেছে কদিনের জন্য। শীতের সকালটা মিলিয়ে গেছে প্রায়, দুপুরের রোদটা এসে আলস্য বা বিষণ্ণতা বাড়িয়ে দিচ্ছে শুধু। প্রেস কনফারেন্স রুমে উপস্থিতি তেমন নেই, দেখেই বুঝা যায়- উপলক্ষ্যটা তেমন তাৎপর্যপূর্ণ নয় হয়তো সবার কাছে। অথবা এর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কোনও ইভেন্ট চলছে। 

    ২ জানুয়ারি, ২০২০।

    বিশ্বকাপ যাওয়ার আগে অ-১৯ দলের আনুষ্ঠানিক প্রেস কনফারেন্স। ডায়াসে কোচ নাভিদ নওয়াজ, অধিনায়ক আকবর আলি, ম্যানেজার এইএম কায়সার। টুর্নামেন্টের লক্ষ্য নিয়ে আকবর বললেন, তাদের সামর্থ্য আছে ফাইনাল খেলার। তবে ম্যাচ ধরে ধরে এগুতে চান তারা। তার কথাটা মূলত এর আগে কোচের সঙ্গে সুর মেলানো। ম্যানেজার কায়সার তুলে ধরলেন দলের প্রস্তুতি কেমন, কোচিং স্টাফের সদস্যদের পরিচিতি। 

    সংবাদ সম্মেলন শেষে আকবর বাইরে দাঁড়িয়ে। হাত বাড়িয়ে শুভকামনা জানাতে হাসিমুখে বললেন, “দোয়া করবেন ভাই।” আকবর সবার সঙ্গেই এমন করলেন প্রায়। 

    আকবর তখন কি জানতেন, ঠিক ৪১ দিনের মাথায় কী বেশে শের-ই-বাংলায় আসবেন তিনি, সে আগমনের উপলক্ষ্যে সংবাদ সম্মেলনের চেহারাটা কেমন হবে? 
     

    ****

    ১২ ফেব্রুয়ারি। 

    ঢাকায় এর মাঝে নতুন দুই মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন, মেট্রোরেলের কাজ হয়তো আরেকটু এগিয়েছে কিংবা এগিয়ে যাওয়ার ভান করেছে। শীত যাব যাব করেও যায়নি এখনও।। 

    বুধবার দুপুরে ঢাকার জ্যাম সেই পরিচিত চেহারায়। তবে জাহাঙ্গির গেট পেরিয়ে খানিকটা ফুসরত মেলে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার। বিমানবন্দরের ভিআইপি টার্মিনালের সামনে লোক সমাগম বাড়ছে- বেশিরভাগই সংবাদমাধ্যম। টেলিভিশন চ্যানেলের লাইভের কাভারেজে কে কখন ঢুকে পড়ছেন, তার ইয়ত্তা নেই। হুট করেই নিরাপত্তাকর্মীরা বাড়তি তৎপর, একটু পর তারা রীতিমতো হিমশিম খাবেন- কে সাংবাদিক, কে নয়, টার্মিনালে ক্যামেরাপারসন না রিপোর্টার কাকে আগে ঢুকতে দেওয়া হবে- সেসব ঠিক করতে। সংবাদকর্মীদের ভীড়ে বিমানবন্দরের কর্মকর্তাই ঢুকতে পারছেন না। 

    ‘ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নস’ লেখা বিসিবির বিশেষ বাসটা ততক্ষণে পৌঁছে গেছে মিরপুর থেকে। অবশ্য সেটি হুডখোলা কোনও দ্বিতল বাস হতে পারতো কিনা- সে নিয়ে আলোচনাও চলছে। মিরপুরে মুশফিক এসে চ্যাম্পিয়ন দলের ব্যানারের সামনে দাঁড়িয়ে স্যালুট দিয়ে গেছেন। 

    এমিরেটসের বিমানটা এসে নেমেছে দুবাই থেকে। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী এসেছেন, বোর্ড প্রেসিডেন্টসহ প্রায় পুরো বিসিবিই সেখানে হাজির হয়েছেন তার আগেই। ভিআইপি টার্মিনালের একটা লাউঞ্জের সামনে সাজিয়ে রাখা ফুল, কাস্টম কিংবা পুলিশ তাদের শুভেচ্ছাবার্তার ব্যানার নিয়ে হাজির। 

    ৪.৫৫-তে অ-১৯ বিশ্বকাপজয়ী বাংলাদেশ সদস্যদের বিমান এসে নামার কথা, আনুষ্ঠানিকতা পেরিয়ে তারা বেরিয়ে এলেন আধা ঘন্টা বাদে। এর আগেই তাদেরকে ফুলের মালা গলায় পরানো হয়েছে। এমন ফুলেল সংবর্ধনা পাওয়া প্রথম ক্রিকেট দল নন তারা।
     


    ক্যামেরাম্যানদের হট্টগোল কয়েক দফা বেড়েছে এরই মাঝে। 

    আকবর আলির সঙ্গে পারভেজ হোসেন ইমন, শরিফুল ইসলামরা বেরিয়ে আসছেন, ক্যামেরার ঝাঁক পড়েছে যেন। চোখে-মুখে ক্লান্তির বদলে হাসির আভাটাই ফুটে উঠছে বেশি তাদের। বিসিবির এক কর্মকর্তা এসে আগে আকবরকে বের করে নিয়ে গেলেন। তার বাবা এসেছেন, আকবর শুধু বিশ্বকাপ জিতে আসছেন না, একটা পারিবারিক ট্র্যাজেডিও হয়ে গেছে তার। আকবরের বাবার মুখটা তাই অন্যরকম, ঠিক দেখে বুঝার উপায় নেই ভেতরে কী চলছে তার। 

    ভিআইপি টার্মিনাল থেকে বেরিয়ে এলেন ক্রিকেটার, কোচ, নির্বাচকরা- পুস্পবৃষ্টিতে সিক্ত হতে হতে। সঙ্গে তাদেরকে ঘিরে চলছে উল্লাসের চিৎকার- ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’। দলের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন মৃত্যুঞ্জয় চৌধুরি, ২ ম্যাচ খেলেই দেশে ফিরে এসেছেন যিনি। 

    বাইরে লোকসমাগম বেড়েছে, বেড়েছে চিৎকার। বিমানবন্দর প্রতিদিন এমন দৃশ্য দেখেনা। প্রতিদিন বাংলাদেশে একটা বিশ্বকাপ ট্রফি আসে না। এর আগে কখনোই আসেনি। 

    ****

    বিমানবন্দরের বের হওয়ার মুখে দুদিকের রাস্তা আটকানো। ভিআইপি আসলে যেমন হয়। এদিন এদিক দিয়ে যাবেন বিশ্বকাপজয়ীরা।

    একটু সামনে এগুতেই অসংখ্য মোটরবাইক, ক্রিকেটারদের মিরপুরযাত্রার সঙ্গীই হবেন তারা। রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে সারি সারি মানুষ, বিশ্বকাপজয়ীদের দেখার ইচ্ছে তাদের। ভিআইপি মুভমেন্ট বলে রাস্তা হুট করেই ফাঁকা হয়ে গেছে। 

    তবে মিরপুরে এসে ভিন্ন চিত্র। স্টেডিয়ামের বেশ দূরে পুলিশ ডাইভারশন তৈরি করে রেখেছে, গাড়ি ঠেলে সামনে যাওয়ার উপায় নেই। আন্তর্জাতিক বা বিপিএলের ফাইনাল ম্যাচের সময় শের-ই-বাংলার বাইরে হয়তো ভীড় হয়, তবে সে ভীড়ে এমন উন্মাদনা থাকে না। ঢাকঢোল বাজছে, চলছে উল্লাস আর ‘বাংলাদেশ, চ্যাম্পিয়ন’ শ্লোগান।  

    এসবের ভীড়ে এসে পৌঁছাল ‘ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নস’ লেখা সেই বাসটা। সে বাসের সবার সামনের সিটে বসা বিসিবি প্রেসিডেন্টের মুখভর্তি হাসি। জানালা খুলে ক্রিকেটারদের দেখতে দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে, একজন হাত বাড়িয়ে দিলে এক ক্রিকেটার হাত মেলালেন তারই ফাঁক দিয়ে। 

    জনস্রোত পেরিয়ে ক্রিকেটারদের বাসের কয়েক সেকেন্ডের পথ যেতে লাগলো কয়েক মিনিট।
     


    কদিন আগে ক্রিকেটারদের ধর্মঘটের সময় বিসিবির চাঞ্চল্য আর দশটা দিনের চেয়ে আলাদা ছিল। কিংবা নিষেধাজ্ঞার পর সাকিবের বেরিয়ে যাওয়ার সময় গেটের বাইরে সমর্থকরা চিৎকার করছিলেন। তবে সেসবকে নিশ্চিতভাবেই ছাপিয়ে গেল এ দিনটা। 

    অবশ্য শের-ই-বাংলার ভেতর তখনও জনারণ্য হয়নি, সেটা সচরাচর হয়ও না। শীঘ্রই জনস্রোত গেটের বাধা টপকে একেবারে সোজা বিসিবির ভেতর দিয়ে গ্র্যান্ডস্ট্যান্ডে! এর আগে একটা মঞ্চের মতো জায়গায় উঠে একজন ফ্লেয়ার ধরিয়েছেন, মুহুর্তেই সেটি যেন আপনাকে নিয়ে গেছে ইউটিউবে দেখা কোনও বিখ্যাত ফুটবল ক্লাবের উদযাপনে। বিসিবি শুরুতে উদযাপনের যে আনুষ্ঠানিকতা জানিয়েছিল- তাতে ক্রিকেটাররা মিরপুর আসবেন, আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন হবে- বলা ছিল এতটুকুই। 

    বিসিবি ঢোকার পথটা স্কুলের অ্যাসেম্বলি শেষে দোতলা বা তিনতলায় ওঠার কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে আপনি নিজে হাঁটেন না, অন্যদের ধাক্কায় এগিয়ে যান। শর্টকার্ট মারতে কেউ ঝুলে পড়লেন সিঁড়ির রেলিং ধরে, বাদুরঝোলা করে আরেকজনকে চ্যাংদোলা করে নিয়ে উঠে গেলেন আগেভাগে। 

    গ্র্যান্ডস্ট্যান্ড ভরে উঠতে সময় লাগলো না। ঢাকঢোল, চিৎকার, শ্লোগান- যাকে বলে মুখরিত চারপাশ। 

    সবার মুখেই প্রায় হাসি লেগে আছে। একদিকে ফুলের তোড়া নিয়ে উপস্থিত গ্রাউন্ডসম্যানরা, তাদের আনন্দও তো কম নয়!


    বিসিবি প্রেসিডেন্ট ও অন্য বোর্ড কর্তাদের সঙ্গে ক্রিকেটার ও সাপোর্ট স্টাফরা বেরুলেন আরেকটু পর। এবার সবার গলায় মালার বদলে ঝোলানো বিশ্বকাপের মেডেল, সঙ্গে ট্রফিটা। সঙ্গে আকবরের বাবা। ভদ্রলোক কেমন অপ্রস্তুত হয়ে গেছেন যেন, এমন কিছুর সঙ্গে তো পরিচিত নন তিনি। আরেকদফা উল্লাসে ভেঙে পড়লো গ্যালারি, যে আনন্দের যেন শেষ নেই। মিরপুর একটি চার বা উইকেটে উল্লাস করে ওঠে, তবে এমন উল্লাস তো এর আগে দেখেনি। 

    বোর্ড কর্তারা, কোচ, আর বিশেষ করে অ-১৯ দলের স্ট্রেংথ অ্যান্ড কন্ডিশনিং কোচ- যিনি এরই মাঝে বাংলাদেশীদের কাছে হয়ে গেছেন অন্যরকমের এক চরিত্র- একের পর এক দিয়ে গেলেন ইন্টারভিউ। উৎসবের ভীড়ে আজ ব্যস্ত সময়। 

    কেক কাটা হলো, ট্রফি উঁচিয়ে ধরলেন বোর্ড প্রেসিডেন্ট আর অধিনায়ক। উড়লো কনফেত্তি। এরপর আতশবাজিতে ছেয়ে গেল মিরপুরের আকাশ। 

    বিশ্বকাপ বাংলাদেশে এলো। 

    আর আকবর ও নাভিদ এগুলেন প্রেস কনফারেন্স রুমের দিকে, যে রুমে ২ জানুয়ারি শেষবার এসেছিলেন তারা। 

    **** 

    এই ৪১ দিনে বদলে গেছে অনেক কিছু। 

    সেদিন প্রেস কনফারেন্স যিনি পরিচালনা করেছিলেন, তাকে পাওয়া গেল না এদিন। সে দায়িত্ব এবার স্বয়ং বিসিবির মিডিয়া কমিটির চেয়ারম্যানের। আকবর-নাভিদের সঙ্গে এদিন ডায়াসে বিসিবি প্রেসিডেন্ট, গেম ডেভলপমেন্ট কমিটি ও এই দলের ‘অন্যতম’ কারিগর খালেদ মাহমুদ সুজন। এপাশে ও পেছনে আরও জনাকয়েক ডিরেক্টর। 

    আর শোভা পাচ্ছে ট্রফিটা। 

    প্রেস কনফারেন্স রুম অন্য চেহারা নিয়েছে তখন। 

    বিসিবি প্রেসিডেন্ট সেখানে এই দলের প্রত্যেককে অ-২১ নামের আরেকটি সিস্টেমে নিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিলেন, বললেন, প্রত্যাশিত কিন্তু ক্রীড়াঙ্গনেরই সবচেয়ে বড় অর্জনটা এই দল বয়ে এনেছে বাংলাদেশের জন্য।

    আকবরের কথা বলতে গিয়ে মুখটা ঝলক দিয়ে উঠলো কোচের, শিষ্যের জন্য গর্বটা তার চোখেমুখে স্পষ্ট তখন। আরেকবার এই দলের গড়ে ওঠার কথাটা বললেন তিনি। 

    আর আকবর আরেকবার মুগ্ধ করলেন তার কথা আর পরিণতবোধ দিয়ে। হুট করে কোনও প্রতিযোগিতায় স্কুল-কলেজের জন্য পুরষ্কার বয়ে আনা কেউ নন তখন তিনি, রীতিমতো আত্মবিশ্বাসী ও পড়াশুনা করা ভাল ছাত্র। যিনি ফার্স্ট হন, আবার সহপাঠ্যক্রমিক কার্যক্রমে এগিয়ে থাকেন সবার চেয়ে। অবশ্য দেশে ফিরলে কিছু একটা হবে, সেটি আঁচ করতে পারলেও যা হলো তেমন কিছু প্রত্যাশা ছিল না তারও।

    ****

    শের-ই-বাংলার হৈ-হুল্লোড় থেমে গেছে তখন। ফ্লাডলাইটটা নেভার আগে পড়ে থাকা কনফেত্তি সরিয়ে ফেলছিলেন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। উৎসব আপাতত শেষ, হয়তো সামনে এগুনোর পালা এবার। 

    অবশ্য বিসিবিতে অদ্ভুত আনন্দের এই দিনটাই এই দলের জন্য শেষ নয়। সরকার সামনে তাদেরকে গণ-সংবর্ধনা দেবে। তবে আপাতত সবাই নিজ নিজ বাড়ি যাবেন। ক্লান্ত তারা। প্রেস কনফারেন্স শুরুর আগেই আকবর কোচকে বলছিলেন, ঘুম প্রয়োজন তার। 

    এরপর প্রিমিয়ার লিগ বা অন্য খেলা নিয়ে আবার ব্যস্ত হয়ে উঠবেন। হয়তো তাদের কাজ শুরু হলো মাত্র। 

    তবে যেটি শেষ করে আসলেন, সেটি হয়ে থাকলো ইতিহাস। সে ইতিহাসে ভর করে বাংলাদেশে একটা বিশ্বকাপ এলো।